প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা চেতনা যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি চেতনার কারণে গড়ে ওঠা প্রতিবাদও প্রয়োজনীয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই দুই বিষয় এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে, কোনোটাকেই আলাদা করা যাচ্ছে না। তবে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে চিন্তা বা চেতনা যত গুরুত্বপূর্ণই হোক না কেন, গণমানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া তা বিজয়ী হয় না। যদিও গণমানুষের অংশগ্রহণ বলতে, কোনো একক ও অবিভাজ্য আন্দোলন বোঝায় না। বরং সব মতের সমন্বয়ে একমুখী আন্দোলন হয়ে থাকে। এর মধ্যে প্রধান ধারা থাকে, অপ্রধান ধারা থাকে। যারা বিজয়ী হন তারা যে সব মত ধারণ করতে পারেন তা নয়, সে কারণেই আবার আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। যদি বিজয়ী পক্ষের প্রধান অংশটা মনে করে, আর কারও মত বা যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয় তাহলে তারা দমন করার মানসিকতা দ্বারা পরিচালিত হয়। মানুষ দেখে, একদা আন্দোলনের মিত্ররা আবার পরস্পরবিরোধী হয়ে পড়ছে, একে অপরের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও শক্তি প্রয়োগ করছে প্রতিটি গণআন্দোলনের পরে এমন ঘটনা ঘটে থাকে। এবারও হয়তো এর ব্যতিক্রম হবে না। সত্য কল্পনার চেয়েও রোমাঞ্চকর, এবারের নির্বাচনে সেটা আবার সত্য হলো। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন দাবি, শর্ত আর হুংকারের কারণে মনে হয়েছিল যে, নির্বাচন করাটাই বোধ হয় অসম্ভব হয়ে পড়বে। সামাজিক প্রচার মাধ্যম সত্য যতটা প্রচার করে, তার চাইতে বেশি করে পরিকল্পিত প্রচার। সংগঠিত বিভ্রান্তি ছড়ানোর এমন বাতাবরণ তৈরি হয় যে সত্য বলে, আমি তবে কোথায় এবং কেমন করে থাকি? শেষ পর্যন্ত সত্যই জয়ী হবে, এ প্রত্যয় কখনো কখনো দুর্বল হয়ে পড়ে। মনে হয়, মিথ্যা প্রচার একটা কার্যকর কৌশল। রাজনীতিতে বিতর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যৌক্তিক বিতর্ক করার পরিবেশ ছাড়া মত প্রকাশ করা যাবে না। তা না হলে, গণতন্ত্র তখন শুধু কথার কথায় পরিণত হয়।
প্রতিশ্রুতি রাজনীতিতে খুব গুরুত্ব বহন করে। প্রতিশ্রুতির দুটো দিক আছে, একটা নিজের কথার মর্যাদা রক্ষা করা, অন্যটা হলো জনগণের প্রতি দায় বহন করা। অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দিয়ে মানুষকে আকৃষ্ট করা আসলে, মানুষের সঙ্গে প্রতারণা। আবার মুখের কথায় মনের ভাবকে আড়াল করার চেষ্টা করেন অনেকে। নারীর প্রতি কী ধরনের মনোভাব পোষণ করেন, নিজের ধর্মের বাইরে অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি মনোভাব কী, ভাষা এবং সংস্কৃতি আলাদা হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষেরা সংখ্যালঘুদের প্রতি কোন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন এবং রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে তারা এই বিষয়ে কী করবেন তা তারা বলে থাকেন। ক্ষমতায় গেলে তার পরীক্ষা হয়, কিন্তু ক্ষমতায় না গেলেও কি তার প্রমাণ পাওয়া যায় না? তারপরও ক্ষমতা হাতে পেলে বুঝা যায়, প্রতিশ্রুতি পালন করার দায় তাদের কতটা। নানা সংশয়ের নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপির নবগঠিত মন্ত্রিসভা ৫০ জনের। এদের মধ্যে ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী এবং টেকনোক্রেট মন্ত্রী তিনজন। এই মন্ত্রিসভার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এখানে নতুন মুখ আছে অনেক। যারা আগে কখনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হননি। প্রথমবার নির্বাচিত হয়েই মন্ত্রিসভায় জায়গা করে নেওয়া নেতার সংখ্যাও কম নয়। মন্ত্রীদের ২৫ জনের মধ্যে ১৬ জনই নতুন মুখ। প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে ২৪ জনই নতুন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও এবারই প্রথম মন্ত্রিসভার সদস্য হয়েছেন। একজন ব্যক্তি আসলে কতটুকু করতে পারেন? পদ্ধতি এক থাকলে, নেতৃত্বের নতুন মুখ কি ভিন্নরকম কিছু জন্ম দিতে পারবেন? ফলে তাদের ব্যক্তিগত দক্ষতা এবং সততার পরীক্ষা হবে, কিছু নতুন আচার বা সংস্কৃতি চর্চা হবে কিন্তু মূল সমস্যাগুলো থেকেই যাবে।
এবারের নির্বাচন ছিল বহুল আকাক্সিক্ষত আর ভীষণ অনিশ্চয়তায় ভরা। নির্বাচন হবে কিনা এই দোলাচলে ভুগেছে মানুষ শেষ পর্যন্ত। এ যেন বিশ্বকাপের টানটান উত্তেজনায় ভরা খেলা। যেখানে রেফারিকে নিয়ে সন্দেহ, আয়োজকদের নিয়ে সংশয় আর খেলোয়াড়দের মধ্যে মারমার কাটকাট অবস্থা। মানুষকে কতভাবে পক্ষে আনা যায় তার চেষ্টা নির্বাচনে সবসময়ই থাকে। কিন্তু টাকা আর ধর্মের ব্যবহার এবার হয়েছে অনেক বেশি। তাই শেষ বাঁশি বাজার পরও, খেলার ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা যেন স্নায়ুক্ষরা উত্তেজনা তৈরি করেছিল। এবারের সংসদ নির্বাচন তার চেয়ে কম কিছু ছিল না। এই নির্বাচন অতীতের নির্বাচনগুলোর চাইতে শান্তিপূর্ণ হয়েছে, কিছু আসনে ভোট গণনা এবং ফলাফল ঘোষণা নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হলেও নির্বাচনের ফলকে প্রত্যাখ্যান করার মতো ঘটনা ঘটেনি। ৩০টি আসনের ফল নিয়ে অভিযোগ করলেও, নির্বাচনের ফলকে কার্যত মেনেই নিয়েছে বিরোধী দলগুলো। এর মধ্যেই নির্বাচিত দলের প্রধান বিরোধী দলগুলোর নেতাদের বাড়িতে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে, তা রাজনৈতিক সৌজন্য বলে প্রশংসিত হয়েছে। রাজনৈতিক বিরোধিতা যেন প্রতিহিংসায় পরিণত না হয় এটা দেশের মানুষের অন্যতম চাওয়া। উত্তেজনার আগুনে ঘি ঢালার মতো অনেকে থাকলেও, বিজয়ী দলের নেতৃত্ব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রেখেছে।
আর একটি প্রশ্ন আছে, কী হবে জুলাই সনদের? এমনিতেই ‘হ্যাঁ’ ‘না’ ভোটের প্রশ্ন নিয়ে বিতর্ক ছিল। তারপর ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হলো, এই সংসদ একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করবে। ফলে আবার জটিলতা দেখা দিল। প্রশ্ন এলো, নির্বাচন তো ছিল জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সংবিধান মেনেই এটা গঠিত হবে, কাজ করবে। সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করানোর আইনি বিধান আছে। কিন্তু সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ বাক্য কে পাঠ করাবেন? ফলে বিজয়ী দল যাদের এমন পরিমাণ সংসদ সদস্য আছে যে, তারা সংবিধান সংশোধন করার ক্ষমতা রাখে তাদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হলো, তারা তো সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন কি? তাদের মুখপাত্র বললেন, আমরা কেউ সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হইনি এবং সংবিধানে এটা এখনো ধারণ করা হয়নি। গণভোটের রায় অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হলে সেটা সংবিধানে আগে ধারণ করতে হবে এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যকে কে শপথ নেওয়াবেন, সেটা বিধান করতে হবে।’ তারা আরও বললেন, ‘সাংবিধানিকভাবে জাতীয় সংসদে গৃহীত হওয়ার পরে তখন জাতীয় সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ নেওয়ার বিধান করা যাবে। আমরা এখন সাংবিধানিকভাবে এই পর্যন্ত এসেছি। আমরা সংবিধান মেনে এ পর্যন্ত চলছি এবং আশা করি সামনের দিনেও চলব।’ তারা জানিয়েছেন, ‘গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার হলে, সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথের ফরম যুক্ত হলে, কে এই শপথ পড়াবেন তা নির্ধারিত হলে, তখন সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া যাবে।’
রুদ্ধশ্বাস নাটকীয়তা হয়েছিল শপথ নিয়ে। বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গণভোটের রায় অনুসারে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে হলে, আগে সংসদে যেতে হবে। সংসদে প্রয়োজনীয় আইন ও সংবিধান সংশোধন করতে হবে। কারণ বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ পড়ানোর এখতিয়ার সিইসির নেই। তারা আরেকটি চমকপ্রদ তথ্য দিয়েছিলেন, সিইসি তাদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ পাঠ করানোর জন্য ‘অ্যাপ্রোচ’ করেননি। ফলে বিএনপি সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়নি। আমাদের রাজনীতি উত্তেজনা আর চমকে ভরা। প্রধান বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিলে, জামায়াতে ইসলামীর জয়ী সংসদ সদস্যরা কোনো শপথই নেবেন না। সঙ্গে সঙ্গে এনসিপির নেতারাও জানালেন, তারাও শপথ নেবেন না। বিএনপি ছিল তাদের বক্তব্যে অবিচল। টানটান উত্তেজনার মধ্যে মঙ্গলবার বেলা পৌনে ১১টার কিছু আগে জাতীয় সংসদ ভবনের শপথকক্ষে বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেন। শপথ পড়ান প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)। শপথের জন্য নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দুটি ফরম দেওয়া হয়। এর একটি ছিল সাদা রঙের, যেটি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার ফরম। অন্যটি ছিল নীল রঙের, যেটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার ফরম। বিএনপির নির্বাচিত প্রার্থীরা সংসদ সদস্যের শপথপত্রে স্বাক্ষর করেন। আর তার পরপরই জামায়াতে ইসলামী সিদ্ধান্ত পাল্টে ফেলে। তারা জাতীয় সংসদের সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেন। ফলে এনসিপির কোনো উপায় থাকল না। জামায়াতে ইসলামীর পরপর তারাও শপথ নিলেন। ক্ষমতাসীন দল বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেন না আর বিরোধী দলের কাতারে যারা থাকবেন, তারা সংস্কার পরিষদের শপথ নিলেন। সংসদে তা হলে কী হবে, এই প্রশ্ন জনমনে তৈরি হয়েছে।
উত্তেজনা আর নাটকীয়তার শপথ তো হলো, এখন জনগণের কী হবে? শপথ নেওয়ার সময় সংসদ সদস্যরা যে শপথবাক্য পড়েছেন তাতে তারা বলেন, ‘আমি (যার যার নাম) সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইয়া সশ্রদ্ধচিত্তে শপথ (বা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা) করিতেছি যে, আমি যে কর্তব্যভার গ্রহণ করিতে যাইতেছি, তাহা আইন-অনুযায়ী ও বিশ্বস্ততার সহিত পালন করিব; আমি বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণ করিব; এবং সংসদ-সদস্যরূপে আমার কর্তব্য পালনকে ব্যক্তিগত প্রভাবিত হইতে দিব না।’ শপথ কতটুকু পালিত হবে তাদের কর্মে আর মর্মে? সংসদ সদস্যরা কতটুকু বিশ্বস্ততার সঙ্গে তাদের দায়িত্ব পালন করেন, সেটা এখন দেখার বিষয়। নির্বাচনে ব্যবসায়ী এবং কোটিপতিরা যে বিপুল টাকা খরচ করে সংসদ সদস্য হয়েছেন তা কীভাবে উসুল করবেন, আইন কতটা জনগণের পক্ষে থাকবে আর রাজনীতি কতটা শান্তিপূর্ণ থাকবে, সেই প্রশ্নটাই এখন মুখ্য। সরকারের ভূমিকা এবং বিরোধী দলের চাপে, চব্বিশের চেতনা আর ছাব্বিশের প্রতিশ্রুতি কতটা রক্ষা পাবে তার পরীক্ষা হবে সামনের দিনগুলোতে।
রাজেকুজ্জামান রতন
রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

