গনতন্ত্র মঞ্চের সাথে বিএনপির বিচ্ছেদ এবং প্রসাঙ্গিক কিছু কথা

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি ও তার দীর্ঘদিনের মিত্রদের সম্পর্ক ভাঙনের ঘটনাগুলো কেবল তাৎক্ষণিক নির্বাচনী কৌশলের ব্যর্থতা নয়, বরং একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক সংকটের প্রতিফলন। গণতন্ত্র মঞ্চের ভাঙন, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্নার প্রকাশ্য বিচ্ছেদ কিংবা এর আগে জেএসডির সম্পর্ক ছিন্ন করা—সব মিলিয়ে এটি স্পষ্ট যে বিরোধী রাজনীতির ঐক্য ধারণাটি এখন গভীর চাপে রয়েছে।

হাসিনা বিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপির যে অঙ্গীকার ছিল—একসাথে আন্দোলন, একসাথে নির্বাচন—তা ছিল কৌশলগতভাবে সঠিক এবং রাজনৈতিকভাবে প্রয়োজনীয়। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা একটি বড় দল হিসেবে বিএনপির একার পক্ষে আন্দোলনকে সর্বজনীন রূপ দেওয়া সম্ভব ছিল না। তখন মান্না, আসম আব্দুর রবের মতো নেতারা বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। এদের প্রত্যক্ষ ভোটব্যাংক হয়তো সীমিত, কিন্তু দেশব্যাপী পরিচিতি, মিডিয়ায় গ্রহণযোগ্যতা এবং “ভিন্ন কণ্ঠ” হিসেবে উপস্থিতি আন্দোলনে একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক বৈচিত্র্য এনে দেয়। আন্দোলনের ময়দানে এই বৈচিত্র্যই বিএনপির জন্য ছিল শক্তি।

কিন্তু আন্দোলন থেকে নির্বাচনের রাজনীতিতে পা রাখার পর দৃশ্যপট দ্রুত বদলে যায়। একটি আসনের মূল্য যখন অস্তিত্বের প্রশ্নে পরিণত হয়, তখন বড় দল স্বাভাবিকভাবেই হিসাবি হয়ে ওঠে। বিএনপির হাই কমান্ডের অনিশ্চয়তা—কোথায় জিতবে, কোথায় হারবে—এই অনিশ্চয়তাই মিত্রদের জন্য আসন ছাড় দেওয়ার পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বাস্তবতা হলো, বিএনপি মনে করেছে গণতন্ত্র মঞ্চ বা তার শরিকদের আলাদা করে উল্লেখযোগ্য ভোট নেই; তাই আসন ছাড় দেওয়া মানে নিজেদের সম্ভাব্য জয়ের জায়গা ঝুঁকির মুখে ফেলা।

এই দৃষ্টিভঙ্গি স্বল্পমেয়াদে হয়তো বাস্তববাদী মনে হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতীও হতে পারে। রাজনীতি কেবল ভোটের অঙ্ক নয়; এটি আস্থার, সম্পর্কের এবং ভবিষ্যৎ সমীকরণের বিষয়। গণতন্ত্র মঞ্চ বা নাগরিক ঐক্যকে ধরে রাখার জন্য বিএনপি যে ব্যাপক আলোচনা বা সমঝোতার উদ্যোগ নেয়নি, সেটিই আজ বড় ব্যর্থতা হিসেবে সামনে এসেছে। বিচ্ছেদ ঘোষণাগুলো হঠাৎ নয়; এগুলো দীর্ঘদিনের অবহেলা ও অসম্মানের জমে ওঠা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।

মান্নার ঘোষণার রাজনৈতিক তাৎপর্য এখানেই যে, এটি কেবল একটি দলের সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি বার্তা। বার্তাটি হলো—বিএনপির ছায়ায় থেকে নয়, নিজেদের শক্তির উপর ভর করেই তারা রাজনীতি করতে চান, ফলাফল যাই হোক না কেন। এটি সাহসী অবস্থান, কিন্তু একই সঙ্গে এটি বিএনপির জন্য সতর্ক সংকেতও। কারণ আজ যারা আলাদা পথে হাঁটছেন, আগামী কোনো আন্দোলনে তারা বিএনপির ডাকে সাড়া দেবেন কি না, তা আর নিশ্চিত নয়।

বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণার মধ্যে ছিল—ছোট দলগুলোর ভোট নেই, তাই তারা অপরিহার্য নয়। কিন্তু আন্দোলনের রাজনীতি প্রমাণ করেছে, ভোটের বাইরেও রাজনৈতিক মূল্য আছে। পরিচিত মুখ, গ্রহণযোগ্য ভাষা, আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্যতা—এসব মিলেই একটি আন্দোলন বড় হয়। মান্না বা আসম আব্দুর রবের মতো নেতারা সেই জায়গায় বিএনপির অনেক প্রথম সারির নেতার চেয়েও কার্যকর ছিলেন। এই সত্য অস্বীকার করে বিএনপি হয়তো নির্বাচনের হিসাব মিলিয়েছে, কিন্তু ভবিষ্যতের আন্দোলনের পুঁজি ক্ষয় করেছে।

প্রশ্ন হলো, আগামীতে যদি আবার আন্দোলনের প্রয়োজন হয়—যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় অসম্ভব নয়—তখন কি বিএনপি নতুন কোনো মিত্র পাবে? বর্তমান পরিস্থিতিতে উত্তর সহজ নয়। রাজনৈতিক দলগুলো এখন দেখছে, বিএনপির সঙ্গে জোট মানে শেষ পর্যন্ত নিজেদের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া। এই ধারণা যদি আরও দৃঢ় হয়, তবে ভবিষ্যতে কেউই সহজে বিএনপির পাশে দাঁড়াতে চাইবে না। তখন বিএনপিকে একাই আন্দোলনের ভার বহন করতে হবে, যা অতীতে বারবার কঠিন প্রমাণিত হয়েছে।

তবে এখানেই শেষ কথা নয়। রাজনীতি পরিবর্তনশীল। বিএনপি চাইলে এখনও ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ আছে—যদি তারা আত্মসমালোচনায় যায় এবং বুঝতে পারে যে মিত্র মানে কেবল ভোট নয়, বরং রাজনৈতিক সহযাত্রা। বিশ্বাস ভাঙতে সময় লাগে না, কিন্তু জোড়া লাগাতে লাগে আন্তরিকতা ও ধৈর্য। সেই উদ্যোগ যদি না নেওয়া হয়, তাহলে গণতন্ত্র মঞ্চের ভাঙন হয়তো ভবিষ্যতের আরও বড় রাজনৈতিক একাকীত্বের পূর্বাভাস হয়ে থাকবে।

লেখক: হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক: শুদ্ধস্বর ডটকম .

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.