বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই (১৯৭১) দেশকে গড়ে তোলার সামনে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ এসে দাঁড়ায়—যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠন, রাষ্ট্রীয় কাঠামো প্রতিষ্ঠা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সামাল দেওয়া, এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ও পাকিস্তানি ভাবধারার শক্তিকে দমন করা। এই সময়ে জাতির অবিসংবাদিত নেতা, জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান—যিনি “বঙ্গবন্ধু” উপাধি পেয়েছিলেন নিউক্লিয়াসের পক্ষ থেকে—বাংলাদেশের মানুষের কাছে সর্বোচ্চ আশার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।
জাতির পিতার এই মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য সিরাজুল আলম খান, যিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন নিউক্লিয়াস ও বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ)-এর অন্যতম নেতা, একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব রাখেন। প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য ছিল বঙ্গবন্ধুকে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থেকে দূরে রেখে দেশের সর্বজনস্বীকৃত প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রাখা। প্রস্তাবের প্রধান দিকগুলো ছিল— • বঙ্গবন্ধু সরাসরি সরকার বা দলের কোনো দায়িত্বে থাকবেন না, যাতে তার অবস্থান রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে থাকে। • তিনি দেশের সর্বোচ্চ নৈতিক ও জাতীয় নেতা হিসেবে থাকবেন, আর রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম চলবে তার নির্দেশনা অনুযায়ী। • বঙ্গবন্ধুর বাসস্থান হবে রাজধানীর বাইরে একটি সুরক্ষিত স্থানে, যা বাঙালি জাতির ভবিষ্যৎ চেতনা বিকাশের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। • দেশের যেকোনো স্থানে দ্রুত যাতায়াতের জন্য সার্বক্ষণিক বিমান ও হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা থাকবে। • বিদেশি গুরুত্বপূর্ণ অতিথিরা এলে সরকারের পক্ষ থেকে তাদের বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হবে। • বঙ্গবন্ধু যাতে সবসময় টেলিফোন বা বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে সারা দেশের মানুষের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারেন, সেই ব্যবস্থাও থাকবে। রাজনৈতিক কাঠামোর দিক থেকে, সিরাজুল আলম খান প্রস্তাব দেন— • মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি বিপ্লবী জাতীয় সরকার গঠন করতে হবে। • এই সরকারে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া সব রাজনৈতিক দল ও শক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। • ১৯৭০ সালের নির্বাচিত গণপরিষদের সদস্যদের দিয়ে নতুন সংবিধান রচনা করা হবে। • নতুন সংবিধানের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। • নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত বিপ্লবী জাতীয় সরকার অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিসেবে দেশ পরিচালনা করবে।
কিন্তু আওয়ামী লীগের ভেতরে খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে থাকা ডানপন্থী গোষ্ঠী এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে। ফলস্বরূপ জাতীয় সরকার গঠনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ষড়যন্ত্র বৃদ্ধি পেতে থাকে, যার পরিণতিতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটে, যেখানে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সিরাজুল আলম খানের মতে, যদি বঙ্গবন্ধু সেই সময় এই প্রস্তাবটি বাস্তবায়ন করতে পারতেন, তবে হয়তো ইতিহাসের সেই কালো অধ্যায় এড়ানো সম্ভব হতো। কিন্তু পরিস্থিতির চাপে বঙ্গবন্ধু তাকে বলেছিলেন—“পারলাম না সিরাজ”।

হাবিব বাবুল , প্রধান সম্পাদক
শুদ্ধস্বর ডটকম ।

