নবমী’র ফাঁকা ভিড়



সেই একবার আমার খুব মনখারাপ। অবশ্য, মনখারাপ একটু বেশি নরম বিশেষণ হয়ে যাবে এক্ষেত্রে। বেশ কিছুদিন হল হাতে কোনও কাজকম্মো নেই, রোজগারপাতির কোনও হদিশও পাচ্ছি না কোথাও। লেখালেখিও তেমন হচ্ছে না, বন্ধুরাও যার যার চাকরি আর পড়াশোনা নিয়ে নানান জায়গায় ব্যস্ত। সব মিলিয়ে দিশেহারা চেহারা নিয়ে দিন থেকে রাত ঘুরে বেড়াচ্ছি শহরের এ রাস্তা থেকে ও রাস্তা। কাজ বা কবিতা, যেটা আগে পাওয়া যায়। জুটছে না কোনওটাই।
এরই মধ্যে কখন যেন এসে পড়েছে পুজো। যেমন হয় প্রতি বছর, কলকাতা সেজে উঠছে একটু একটু করে। বাস থেকে নেমে পড়ে প্রথম যে-পথচলতি বইয়ের দোকানের দিকে চোখ যাচ্ছে, রাংতা মোড়া রোদ্দুরের মতো সার বেঁধে সাজানো আছে একের পর এক পুজোসংখ্যা। এক সময়ে কত লুকনো আনন্দের ঠিকানা ছিল এইসব বই, কিন্তু সে-বছর তাদের ছুঁয়েও চেখতে ইচ্ছে করছে না। রোদ্দুর গায়ে মাথায় লাগছে ঠিকই, তবে একটু ছায়া দেখে দাঁড়িয়ে পড়তে পারলে অক্টোবরের দিনের বেলার হাওয়া বুঝিয়ে দিচ্ছে, আমি আশ্বিনের লোক। অন্য সময়ে গাঢ় নীল আর অল্প ঠান্ডা আঁচের সেই হাওয়া মনে পড়িয়ে দেয় কত কী, সে-বছর তাকে গায়ে চাপাতে ভালই লাগছে না আমার। কলকাতার কোন কোন পাড়ার কোন কোন ফুটপাথে ফুটে থাকে পুজোর সবচাইতে বড় উপহারের থোকা, সেসব ঠিকানা আমার জানা। কিন্তু তীব্র আর নতুন সেই আদিম ছাতিমগন্ধকে সে-বছর এড়ানোর চেষ্টায় কত-না আনকোরা গলিঘুঁজি আবিষ্কার করে ফেলা হয়ে গেছে আমার। সন্ধের দিকে বড় রাস্তায় ঝমঝমিয়ে জ্বলে উঠছে হাজার আলোর কারুকাজ, আর সেসব রোশনাই থেকে একটু ভিতরে ঢুকে এলেই যেসব ডাকনামের পাড়া, সেখানে মাথার ওপর আঁচের ছায়া ফেলছে গরিব টুনির দল। কিন্তু আমি তখন সেই সমস্ত কিছু থেকে পালাতে চাইছি। কেবল মনে হচ্ছে, চারপাশের এই সেজে ওঠা আসলে আমার বিরুদ্ধে এক ষড়যন্ত্র, আমার যাবতীয় অপারগতার কেকের মাথায় বসানো, দাঁত-বার-করা এক হিংস্র চেরিফল।
বইপাড়া যাচ্ছিলাম ঘন ঘন সেবার। কাজ নেই তো কোনও, এমনিই। ছাতিমের চেয়ে, পুজোসংখ্যার চেয়ে, পুরনো বইয়ের গন্ধ, ইনফিউশনের ঝোঁক আমায় কিছুটা হলেও স্বস্তি দিচ্ছিল। আর আড্ডা। পাণ্ডুলিপি নেই হাতে আমার। লেখাই নেই, তো পাণ্ডুলিপি হবে কোত্থেকে। বন্ধুবান্ধবরা প্রকাশকদের টেবিলে সময়মতো জমা দিয়ে দিয়েছে তাদের হাতের হরফ, আর ক’মাস বাদেই নিজের নাম-ছাপা নতুন বইয়ের গন্ধে ভরে উঠবে তাদের বাড়ি। আমার নেই সে-বছর কিছু। পরীক্ষায় কোনও কালেই সময়ে খাতা জমা দিতে পারিনি যে, সে-বছর উস্কোখুস্কো আমাকে দেখলে যে-কেউ এ কথা বলে দিতে পারতেন। একজন কেবল অন্য কথা বলছিলেন, ওই বইপাড়ায় হাঁটতে হাঁটতেই। বাদল’দা, আমাদের বাদল বসু।
আনন্দ পাবলিশার্স-এর দোতলার অফিসঘরে ঢুকতেই ডান হাতে তখন তাঁর মসনদ। উপচে পড়া কাজের ফাঁকে ফাঁকে তরুণ কবিদের ভিড় আছড়ে পড়ছে প্রায় রোজই। না, পাণ্ডুলিপি জমা দিতে নয়। সোজা তাঁর হাতে গয়ে কবিতার তাড়া জমা দেবে, এমন সাহস খুব বেশি লোকের ছিল না। কিন্তু আড্ডার জন্য তাঁর টেবিল উন্মুক্ত ছিল। আর খোলা ছিল তাঁর রুমালে ঢাকা সাদামাঠা মন, ওই তরুণ কবিদের খাতিরেই। অনেকে রাগ করবেন নিশ্চিত, কিন্তু গদ্যকারদের বিশেষ দেখিনি তাঁর এই মজলিশে। যদিও, কবিদের আদর করে বকুনি দিতেও তাঁর জুড়ি ছিল না, আর কবিরাও, অনেক সময়েই, অল্প উসকে দিয়ে অপেক্ষা করতেন, কখন বাদল’দার সেই মোক্ষম বাক্য বর্ষিত হবে।
এহেন মজলিসের মধ্যেও আমার জন্যে, কে জানে কেন, আলাদা এজলাস বসিয়ে রেখেছিলেন বাদল’দা। কখনও হয়তো দু’এক কথা বলেছি তাঁকে, বলেছি নিজের না-পারা আর গুমরে মরার কথা। শুনে চুপ করে গেছেন তিনি। তারপর, ‘চলো, বারান্দায় যাই’ বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছেন। পেছন পেছন গেছি আমিও। ওঁর অফিসের বারান্দায় লম্বাটে পুরনো আমলের জানলার সামনে দাঁড়িয়ে মুঠো ভরে সিগারেট টেনেছেন, কথা বলেননি একখানাও। আমিও চুপ। আবার ঘরে গিয়ে বসেছি ওঁর সামনে। এ কথা সে কথা আড্ডা হয়েছে। হঠাৎ সন্ধের মুখে হয়তো বললেন, ‘চলো তো, দেখা যাক একবার’।
আমি কিছুই জানি না, কোথায় চলেছি। গম্ভীর মানুষ, নিজে থেকে খোলসা করে না-বললে কারণ জিগ্যেস করে এমন সাহস কারও নেই। আমার তো নয়ই। কলকাতার বিকেল যখন নেমে আসছে ছাদগুলো থেকে, তখন নিজে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে গেলেন হয়তো এক বিজ্ঞাপনের অফিসে। একটা কাজ হয় কি আমার? আমাকে পাশে বসিয়েই সেই নিয়ে তদবির করে গেলেন খানিক। সেখানে জুটল দু’একটা কপি লেখার বরাত। আবার কোনও দিন হয়তো বেশ নামকরা, প্রতিষ্ঠিত, ত্রৈমাসিক পত্রিকার দফতরে হাজির হলেন আমাকে বগলদাবা করে, যদি ফ্রি ল্যান্স লেখালেখির কাজে কিছু পাওয়া যায়। নেহাত লজ্জাই হতো আমার, কিন্তু আমিও তো নিরুপায়। চেনাজানা অনেককেই বলছি তখন একটা কাজ জুটিয়ে দেবার কথা। সকলেই যে পেরে উঠবেন, এমনটা আশা করা যায় না। নিজেও এদিক ওদিক গিয়ে নানা আপিসে বা সংস্থায় কথা বলছি। দু’একদিনের কাজ পাচ্ছি কোথাও হয়তো। কিন্তু সেই কাজের সামান্য যে-পারিশ্রমিক, তা পেতে মাসের পর মাস ঘুরে যাচ্ছে। ভেঙে যাচ্ছি এইভাবে। আর সেই ভাঙতে থাকা আমাকে টুঁটি ধরে দাঁড় করিয়ে রাখবার চেষ্টা করে যাচ্ছেন এই মানুষটি, বাদল বসু। অথচ এমন নয় যে, তাঁর সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের পরিচয় বা বুক ফুলিয়ে বলবার মতো ঘনিষ্ঠতা। কিন্তু, চালিয়ে যাচ্ছেন একনাগাড়ে।
এরই মধ্যে এসে পড়েছে পুজো। শরতের ষড়যন্ত্র, আমার বিরুদ্ধে। এবং, চেরির মাথায় আইসক্রিমের বিন্দুর মতো প্রতিভায়, দুটি একটি টিউশনি যে ছিল, তারাও চলে গেল সেবার। ক্লাইম্যাক্সের আগে এরকম হতে হয়, ভাবলাম আমি। কিন্তু এর শেষ কোথায়, তা বুঝে ওঠবার মতো মন তখন আর ছিল না আমার। ষষ্ঠী কাজ হয়ে ছুটি পড়ে যাবে বইপাড়ায়। আনন্দ পাবলিশার্সে তখন নতুন নতুন বইয়ের প্রুফ নেমে আসছে কম্পোজিটরদের হাত থেকে রাতুলদা’র টেবিলে, পুজোর পর বই হতে যাবে তারা। এত এত অন্ধকারের মধ্যে সেই সব কাগজদের দেখলে মন ভাল হয়ে যাচ্ছে একটু। তাই রোজই গড়িয়া থেকে কলেজস্ট্রিট ছুটে যাচ্ছি।
‘নবমীর দিন কী করছ বলো তো?’ দ্বিতীয়া বা তৃতীয়া হবে সেদিন, প্রশ্নটা করলেন বাদল’দা। এমনিতে আমাদের চল ছিল মায়ের কাকার বাড়ির পুজোতে যাওয়া, ওখানেই বেশির ভাগ সময়টা কাটানো। কিন্তু সে-বছর আমি সেই জমজমাট ভাইবোনেদের ডাকের সাজ আর পুনর্মিলনী থেকেও ছুটি দিয়েছিলাম নিজেকে। বাবার হাতেও কাজ নেই, অন্ধকারের মধ্যে থেকে জোনাকি বেছে বার করা ছাড়া। বাকি অন্ধকার আমার হাতে। মায়ের গানের ক্লাসটুকু ভরসা। এই অবস্থায় নিজের ছোট ঘরে জগজিৎ সিংকে সঙ্গী করে পুজো কাটানো ছাড়া উপায় কী? বললাম সে-কথা।
বললেন, ‘আমাদের আবাসনে বড় করে পুজো হয়, বুঝলে? আমরা তো থাকিই, আমাদের আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, সকলে আসেন। নবমীর দুপুরে সবার জন্য রান্না হয়। গরম ভাত, ডাল, দু’তিন রকম ভাজা, আর খাসির মাংস। সেটা বড় কথা নয়, তুমি সকাল সকাল চলে এলে আমিও আড্ডার লোক পাবো। দুপুরে খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার ফিরে যেও বাড়িতে, কী বুঝলে?’ এই শেষের ‘কী বুঝলে’-টা আসলে সম্মতির আগাম নির্দেশ বাদল’দার মুখে। বাধ্য বাচ্চার মতো ঘাড় নাড়লাম। তাহলে নবমী, দুপুরবেলা, বাদল’দার বিধাননগরের আবাসনে।
ফিরছি যখন, কলেজ স্কোয়ারের পুজোর গন্ধে ম’ম করছে চারপাশ। বাসের বহমান স্রোতের গায়ে ভেসে যাচ্ছে টুনির চকচকে আলোর ধাতু। তারই মধ্যে কোনও একখানা ভিড় বাসে নিজেকে গুঁজে দিয়ে চলেছি, আর ভাবছি, এত এত সত্যিকারের কবিকে এত দিন ধরে চেনেন তো বাদল’দা। হঠাৎ আমাকে একা নেমন্তন্ন করলেন কেন তাঁদের বাড়িতে? আসলে আর কিছুই না, আমার এই ভাল-না-থাকার মরসুমে বাদল’দাও সঙ্গী হয়ে পড়েছিলেন কখন যেন। ইট বেরিয়ে আসা ঠোক্কর মাখানো ফুটপাথে যখন যখন পা পড়েছে আমার, বাদল’দার কালো জুতোও সেখানে ছাপ রেখে গেছে। আমার চেয়ে, আমাদের অনেকের চেয়ে ঢের বেশি পাথর বাদল’দাকে দু’হাতে সরাতে হয়েছে তাঁর যৌবনে। তাঁর হাতের রেখা থেকে সেসব পাথরের দাগ মুছে যায়নি তখনও। আমার এই নিভে-আসা-দিনগুলো হয়তো সেই দাগে নতুন করে বারুদগুঁড়ো ঢেলেছে, এই।
নবমীর দিনখানা মনে আছে আমার আজও, মনে থাকবে চিরকাল। ওর চাইতে বেশি স্পষ্ট নবমী’র স্মৃতি আর তৈরি হবে বলে মনে হয় না। নতুন ধবধবে ফতুয়া আর নতুন চেক লুঙ্গি পরে নিজের রোদ্দুরভরা বিছনায় ছড়িয়ে বসেছেন, চারপাশে কাগজ আর বই, একদিকে চেয়ার নিয়ে বসেছি আমি। পুজো ব’লে বাড়ি একেবারে গমগম। নীচে, আবাসনের রাস্তাঘাটে জব্বর হইহল্লা চলছে। একটু দূরে মণ্ডপে বিসমিল্লা’র ললিত। কুমকুম’দি দিব্যি সেজেগুজে কখনও সখনও খোঁজ নিয়ে যাচ্ছেন, দফায় দফায় চা আর টা পাঠিয়ে দিচ্ছেন আমাদের আড্ডার খাতিরে। আর বাদল’দা, কীসের কোন খামখেয়ালে, নিজের স্মৃতির ঝাঁপি উজাড় করে গল্প শোনাচ্ছেন।
শরদিন্দু থেকে সত্যজিৎ, বুদ্ধদেব বসু থেকে সুভাষ মুখুজ্জে, সুনীল থেকে জয়, প্যারিস থেকে পর্তুগাল, ঝরিয়া থেকে ঝাড়গ্রাম। নবমী’র রোদ বারবার বদলে ফেলছে তার তেজ, সেন্টার স্টেজের আলোর মতোই, কাহিনি বুঝে। আমিও ভুলে যাচ্ছি আগামীকালের জন্য দুশ্চিন্তা করবার কথা আর গতকালের গ্লানি কাঁধে নিয়ে বয়ে বেড়ানোর ঝামেলা। আসলে, সম্মোহন করছেন বাদল’দা।
দুপুরে সত্যিই পাত পেড়ে জমিয়ে খাওয়াদাওয়া হল। জীবনে ওই একবারই বাদল বাসু’র ঠিক পাশটিতে বসে খেয়েছিলাম। আর কাশফুলের মতো, অরুণ মিত্রের চুলের মতো সাদা গরম ভাতকে অনেকদিন পর অত সুস্বাদু বলে মনে হয়েছিল আমার। আবাসনের পুজো দেখা হল, এপাশ ওপাশ চলতি আবাসিকদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়ে বাদল’দা ফের আমায় নিয়ে পৌঁছলেন তাঁর বইভর্তি ঘরে। আমি যত বলছি, ‘আপনি এবার জিরিয়ে নিন একটু, আমি আসি আজ’ – ছাড়বেন না কিছুতেই। ‘তোমার কি বিশাল কাজ আছে নাকি, বাড়িতে গিয়ে?’ এর উত্তর নীরবতা এবং বসে পড়া। আবার গড়াল আড্ডা, দুপুরের ঝিমিয়ে আসা রোদের পাশাপাশি, একঘেয়ে পাখিদের ডাকের সঙ্গে সঙ্গে।
সন্ধে হল যখন, যখন পথের ধারে ধারে ছাতিমগুচ্ছ আর বাধ মানতে চাইল না কিছুতে, অক্লান্ত বিসমিল্লা পৌঁছলেন শ্যামকল্যাণে, আমার আর বাদল’দার মুঠো ছেয়ে যখন মুড়ি ফুটে থাকল কাছে দূরে, আর আকাশে জেগে উঠল খুশিদের ফানুস, আমি ছুটি নিলাম। সল্টলেক থেকে গড়িয়া, ভিড় বাসে অনেকখানি পথ। আমার সঙ্গে পায়ে পায়ে নেমে এলেন নীচে, এগিয়ে দিলেন দরজা পর্যন্ত। শেষমেশ, কত-ইতিহাস-অবলীলায়-ছোঁয়া হাতের চওড়া পাতাখানা বসালেন আমার ভঙ্গুর কাঁধে। বললেন, ‘বেশি ভেবো না। এমন দিন সকলকে পেরোতে হয়েছে, তোমাকেও হচ্ছে। ভাল দিন আসবে। পুজোর পর এসো অফিসে, দেখি যদি কিছু…’ – অসমাপিকা এই জ্যোৎস্না আমার সঙ্গে সঙ্গেই বাসে উঠল, ভিড়ের মধ্যে তাকে প্রতিবন্ধী বলে চিনতে পারল না কেউ।
তখন ভেবেছি, কেন বাদল’দা আমার সঙ্গে একটা গোটা পুজোর দিন ব্যয় করলেন এভাবে? কেন বিকেলের পর বিকেল আমাকে নিয়ে ঘুরে বেড়ালেন কাজের খোঁজে? যে-মানুষটার সামনে এসে সত্যি কথা বলতেও সকলের বুকের পাটা লাগে, কীভাবে তিনি এত সহজ হয়ে উঠলেন এক নবমী’র দুপুরবেলা? পরে বুঝেছি, মানুষটাই ছিলেন ওইরকম। সে যত ছোট আর তুচ্ছই হোক না কেন, যে-কোনও লড়াইয়ের পাশে থাকার অভ্যাস তাঁর শেষ দিন পর্যন্ত যায়নি। সিংহাসনটা আসলে তাঁর বুকের মধ্যে অবহেলায় পড়ে ছিল, সাজানো ছিল না বাইরে কোথাও।
সেই শেষ-না-হওয়া বাক্যের জোরেই বোধহয়, বাকি মরসুমটা আমি আগের চাইতে ভাল কাটিয়েছিলাম। পুজোর পরেও কাজ জুটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা থামাননি বাদল’দা, যতদিন-না আমার একটা হিল্লে হয়েছে কোথাও, যতক্ষণ-না চালিয়ে নিতে পেরেছি ডাল ভাতের খরচটুকু। নিজের অস্বাচ্ছন্দ্য, নিজের অসহায়তা, নিজের দারিদ্র, নিজের দুর্ভোগের কথা ধারাবাহিকভাবে ফলাওরূপে প্রচার করার মধ্যে কোনও মহত্ব আছে বলে আমি মনে করি না। বরং তার আড়ালে আমি সমবেদনার জন্য আকুতিকেই লুকিয়ে থাকতে দেখতে পাই। কিন্তু দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানো দু’একজন বিরল মানুষদের কথা বারেবারে বলে চলা প্রয়োজন বলেই আমার বিশ্বাস। কেননা এমন মানুষদের দেখা আমরা বারেবারে পাই না।
আজ আমার সেই আগাম নবমী। ন’ তারিখ, অক্টোবর। বাদল’দার চলে যাবার দিন। যে-তারিখটার কথা মনে করতে চাই না কিছুতেই, ক্যালেন্ডার আজ তারই পক্ষে ভোট দিচ্ছে। কিন্তু আমার খাতায়, ছাতিমের গন্ধে ভরা এই নীলচে রোদ্দুরের মরসুমে যে-কোনও ৯ শেষমেশ পৌঁছে যায় নবমী’র দুপুরবেলায়। ভাতের গন্ধে, ডালের ঝর্নায়, মাংসের দ্বিধাবিভক্ত আলুর ধোঁয়ায়, চাটনির ছটফটে কিসমিসে, আর সবশেষে মুঠোবন্দি একখানা রোগাসোগা সিগারেটে। লড়াই তো শেষ হয় না কোনও দিন কারও, ধরণ পালটে যায় তার। আজ যেসব লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, বাদল’দার বিছনায় বসে একবার বিকেলের পার্টটুকু ঝালিয়ে নিলে স্টেজে ভাল করতাম। কিন্তু এই পুজোর রমরম সাজে, আলোয় সেজে উঠতে থাকা আবাসনের ব্যস্ত ভিড়ে খোঁজ করতেই কে যেন বলল, বাদল’দা নেই। আমি জানি, বাদল’দা নেই। রোগাসোগা, মনখারাপ-করা একটা ছেলের হাত ধরে তার জন্যে কাজ খুঁজতে বেরিয়েছেন। সেই ছেলেটাকেও তো হারিয়েছি আমি, কোনও এক নবমী’র ফাঁকা ভিড়ে…

শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায় , কবি এবং কথাসাহিত্যিক ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.