বাংলাদেশের গত নির্বাচনে রাতারাতি সব হিসাবনিকাশ পাল্টে দিতে ভারতের সফল কূটকৌশলে অনেকেই বিষ্মিত। ইওরোপ আমেরিকাসহ সকল গনতান্ত্রিক শক্তি যেখানে আন্তর্জাতিক মানের একটা যথার্থ নির্বাচন করাতে বছরব্যপী দৌড়ঝাপ করলো সেখানে ভারত কি এমন মন্ত্র দিলো যে সবাই রাতের আঁধারে লেজ গুটিয়ে পালালো, এই হিসাব নিয়ে জল্পনাকল্পনা এখনও চলছে। এমনকি যে মহাপরাক্রমশালী আমেরিকা ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কথা এক বছর আগেই জানিয়ে রাখলো তারাও চুপসে গেল! সাধারনভাবে মনে করা হয় দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় চীনের আধিপত্য ঠেকাতে ভারতকে আমেরিকার দরকার, সে জন্য তারা বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ভারতের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যায় নাই। ভারতকে হাতে রাখতে বা তাদেরকে না চটাতে এই পিঠটান। এটা একটা সহজ সমীকরন। হয়তো তাই। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় একে একে প্রায় সবগুলো দেশই চীনের কব্জায় বা প্রভাববলয়ে চলে গেছে বা যাওয়ার পথে। কেউ কেউ মনে করেন বাংলাদেশও যায় যায়। সরকার পরিবর্তন হলে তা আর নিয়ন্ত্রনে নাও থাকতে পারে। অতএব গনতন্ত্র কায়েমের নামে রিষ্কে যাওয়া ঠিক হবে না, এই যুক্তি পশ্চিমারা মেনে নিয়েছে।
এই হিসাবটা আমরা মোটামুটি জানি, কিন্তু দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় ‘বাঘ এলো’ জুজু ছাড়াও ভারতের আরও যে কিছু ব্যপার আছে এটা এখনও বুঝতে পারছি না। এটা এখন মানতে হবে আমেরিকা রাশিয়া চীনের পর ভারতও বিশ্ব রাজনীতিতে একটা জায়গা করে নিয়েছে। ভারত এখন আর সেই আগের ভারত নাই। এই মূহুর্ত পর্যন্ত ভারতের জনসংখ্যা প্রায় ১৪৪কোটী, যা চায়নার প্রায় সমান বা কোনকোন হিসেবে বেশী। বিশ্বে সবচাইতে বেশী জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশ। সামরিক শক্তির দিক থেকে চতুর্থ। প্রায় প্রতিটি দেশেই ভারতীয়দের বসবাস। অনেকে বংশ পরম্পরায়, কয়েক পুরুষ ধরে। ইওরোপ আমেরিকা আফ্রিকা মধ্যপ্রাচ্য অস্ট্রেলিয়া কানাডা এমনকি ক্যারাবিয়ান দেশগুলোতেও তাদের দাপুটে উপস্থিতি। ভাল চাকরি করেন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। বিভিন্ন দেশের নাগরিকত্ব নিয়ে তারা সে সব দেশের রাজনীতিতেও সরব। অনেকে ভাল অবস্থা করে নিয়েছেন। স্থানীয় বা জাতীয় পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধি হচ্ছেন। অনেক দেশের রাষ্ট্রীয় নীতি নির্দ্ধারনেও ভুমিকা রাখছেন। আমি যেটা লক্ষ্য করেছি, সার্বিকভাবে ভারতীয়দের দেশপ্রেমবোধ অত্যন্ত প্রগাঢ়। ওয়ান্স এন ইন্ডিয়ান ইজ অলওয়েজ এন ইন্ডিয়ান- সে যে দেশেই জন্মগ্রহন বা বেড়ে উঠুক।
এই দেশের জনসংখ্যার আশি শতাংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বি। ১শ’ ১৫কোটীর বেশী। অন্যান্ন দেশে বসবাসরতদের মিলিয়ে সারা বিশ্বে এই ধর্মাবলম্বির সংখ্য ১২০কোটীর মত। ভারত যেহেতু হিন্দু ধর্মের উৎপত্তিস্থান সেহেতু তাদের সবার কাছে তা পবিত্র ভুমি। ফলে যেখানে যে দেশেই অবস্থান করুক, ভারতীয়রা নিজ দেশের স্বার্থের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে থাকে। ভারতের জাতীয় স্বার্থের পক্ষে সাধ্যমত কাজ করে থাকে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথাই যদি ধরি, প্রায় ৭০ লক্ষ ভারতীয় এ দেশে বাস করে। মোট জনসংখ্যার দুই পার্সেন্টেরও বেশী। ব্যবসা বানিজ্যে ভাল অবস্থান তাদের। আইটি সেক্টর জব মার্কেটে বলতে গেলে একচ্ছত্র আধিপত্য। বিভিন্ন পেশায় এগিয়ে। রাজনীতিতে দিনেদিনে অবস্থান সংহত করে চলেছে। হোয়াইট হাউজ বা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে, অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদ পদবীতে ভারতীয বংশোদ্ভূতদের নিয়োগের হারও নেহায়েৎ কম না। ফলে রাজনীতি বা প্রশাসনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাদের প্রভাব একেবারেই থাকে না তা বলা যাবে না। একটা উদাহরন দেই। গত বছর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের সাধারন অধিবেশনে যোগ দিতে এলে জানা গেল তিনি মার্কিন প্রশাসনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার সাথে কথা বতে চাইছেন কিন্তু কেউ এ্যপয়েন্টমেন্ট দিচ্ছে না বা কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে হুট করে দেখা গেল একেবারে খোদ প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা উপদেষ্টা দলবল নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সমীপে হাজির! পরে এক ভারতীয় সাংবাদিক দাবী করলেন এই সাক্ষ্যাৎকারটি নাকি ব্যবস্থা করে দিয়েছে ভারতীয় বংশোদ্ভূত এক ব্যবসায়ী।
মার্কিন প্রশাসনে ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের প্রভাবের বিষয়টা এখন মোটামুটি সবাই জানে। বলা হয়, বাংলাদেশ প্রশ্নে পিঠটান দেওয়া, ভিসা নিষেধাজ্ঞার প্রয়োগ আটকে দেওয়া, আইএমএফের ঋণ পাইয়ে দেওয়াসহ নানা দিক দিয়ে মার্কিন আনুকূল্য এনে দেওয়ার পেছনে ভারতীয় লবি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছে। ঠিক একইভাবে ইওরোপসহ অন্যান্ন দেশেও ভারতীয় প্রভাব দিনেদিনে বেশ শক্তিশালী হয়ে ওঠায় বাংলাদেশ প্রশ্নে তারাও চুপ মেরে গেছে। তার অর্থ বিশ্ব রাজনীতিতেও ভারতকে বাদ বা হিসাবের বাইরে রাখা পশ্চিমাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। কিছুদিন আগে কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকার অভিযোগ আনলো ভারত এক দেশে স্বাধীনতাকামী শিখদের এক নেতাকে হত্যা করেছে অন্য দেশে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছে। ভারত তা অস্বীকার করলো। সত্য-মিথ্যা যাই হোক দেশদু’টি এই অভিযোগ তোলার মধ্য দিয়ে এটা মেনে নিয়েছে দুরদেশেও ভারত টার্গেট হিট করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে ভারত যে অবস্থান করে নিচ্ছে তাতে মনে করা যেতে পারে নিরাপত্তা পরিষদে তাদের সদস্যপদ আটকে রাখাও বেশীদিন সম্ভব হবে না। এই হিসাবটা ভারত বোঝে। ফলে আমেরিকার চোখ রাঙানী উপেক্ষা করে তারা রাশিয়ার সাথে সখ্যতার সম্পর্ক রাখতে পারে, তেল আনতে পারে, ইরানের সাথে সম্পর্ক গাঢ় করতে পারে এমনকি অতি সম্প্রতি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার হুমকী উপেক্ষা করে ইরানের বন্দর লীজও নিতে পারে। এতে মনে করার যথেষ্ঠ কারন আছে ভারত একটা সুপার পাওয়ার হয়ে উঠছে। কথিত মুরুব্বীদেরকে থোড়াই কেয়ার করার সাহস অর্জন করেছে।
ফলে আমাদের অঞ্চল প্রশ্নে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি আসতে পারে চীনা জুজুর ভয় দরকার হবে না, ভারত নিজেরাই নিজেদের মত করে সিদ্ধান্ত নেবে। নিকট অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, সামনে হয়তো এমন অবস্থা আসতে যাচ্ছে আমেরিকা বা পশ্চিমাদেরকে ভারতের মর্জির দিকে শুধু তাকিয়েই থাকতে হবে, বাংলাদেশ নিয়ে কোন রা’টি করার জো থাকবে না।
সাঈদ তারেক , লেখক ও সাংবাদিক ।

