নতুন সংসদ পুরনো বিতর্ক

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং বিরোধী দল-মতের ওপর নিপীড়ন সমানভাবেই চলে আসছে। বিরোধী দলের ওপর সব সরকারের শাসনামলেই দমন-পীড়ন হয়েছে। আর নির্বাচন নিয়ে বিতর্কও অনেক দিনের পুরনো। এসব বিতর্ক, নানা নেতিবাচক উদাহরণ এবং নির্বাচন বর্জনের আহ্বান সত্ত্বেও গত ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন বৈশিষ্ট্য ও দৃষ্টান্ত হাজির করেছে। নির্বাচনের নতুনত্ব ছিল নির্বাচনটিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক দেখানোর জন্য সরকারি দল অভূতপূর্ব কলাকৌশল নিয়েছিল, যা বাংলাদেশে আগে কেউ দেখেনি। আওয়ামী লীগের প্রার্থী যারা দলের মনোনয়ন পেয়েছেন তাদের মার্কা ছিল নৌকা, যারা পাননি তারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। জোটের প্রার্থীরা নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করেছেন, মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা ২৬ আসনে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করেছেন, বাকি আসনে নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচন করেছেন। নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক ছিল এবং ১৯৭০ ও ৮০-এর দশকে সামরিক শাসকদের আমলে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং কথাটি বহুল প্রচারিত ছিল। নির্বাচনে কে জিতবে, কে হারবে, কে বিরোধী দল হবে, তা সামরিক ঠিক করত শাসকরা আর গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে ব্যবহার করা হতো দল গঠন ও ভাঙনের কাজে। কিন্তু তখনো ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকাশ্যে হয়নি, এবার যেটা হয়েছে।

এবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা, আসন নিয়ে দর-কষাকষি, আর্থিক লেনদেন, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং এবং কলাকৌশল কোনো রাখঢাক ছাড়াই হয়েছে, যা বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। নির্বাচনের আগেই নির্বাচনের ফলাফল, বিশেষ করে কোন দল ক্ষমতায় যাবে, তা নিয়ে কোনো সংশয়ই ছিল না। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, তারাও দাবি করেছেন, প্রচার করেছেন যে তারা আওয়ামী লীগ অনুসারী বা সমর্থিত। ফলে নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়াটাই ছিল পরিকল্পিত এবং প্রত্যাশিত ফলই ঘোষণা করা হয়েছে। যে কারণে দেশের আপামর জনসাধারণও নির্বাচনটিকে সুষ্ঠু, অবাধ, গ্রহণযোগ্য বলে মনে করে না এবং এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী হয়েছে এমন মনে করার কোনো কারণ নেই।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, সর্বগ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে একটি দল বারবার নির্বাচিত হয়, সরকার গঠন করে, তাতে কি কোনো সমস্যা নেই, নাকি আছে? পৃথিবীর অনেক দেশে একাধিকবার নির্বাচিত হওয়ার এমন নজির আছে। নির্বাচন যদি গ্রহণযোগ্য হয় তাহলে তো কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সমস্যা শুধু গভীর, তাই নয়, এটি এখন সর্বব্যাপক রূপ নিয়েছে। পরপর তিনটি নির্বাচন ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সর্বজন গ্রহণযোগ্য হয়নি বলে এখন নির্বাচনগুলোর প্রক্রিয়া ও ফলাফল নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। ন্যূনতম গণতন্ত্র যদি চর্চা করতে হয় এবং টিকিয়ে রাখতে হয় তাহলে সবার আগে নির্বাচনব্যবস্থার ওপর আস্থা ও নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার জরুরি। সারা পৃথিবীতেই নির্বাচন নিয়ে জটিলতা বাড়ছে। তা সত্ত্বেও ক্ষমতা পরিবর্তনের পথ হিসেবে এখন পর্যন্ত নির্বাচনই গ্রহণযোগ্য। দক্ষিণ এশিয়ায় আমাদের প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ সব দেশেই নিয়মিত নির্বাচন হচ্ছে। এসব দেশে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে, তিক্ততা সৃষ্টি হচ্ছে, সংঘাত-সংঘর্ষও হচ্ছে। কিন্তু তারপরও তারা নির্বাচনব্যবস্থার বহাল রেখে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। আপত্তি সত্ত্বেও নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিচ্ছে। এই অঞ্চলে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, যারা স্বাধীনতার ৫২ বছর পরও সব দলের কাছে গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচনব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি।

১৯৯৪ সালের মাগুরা উপ-নির্বাচনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন গড়ে ওঠে। এরপর সংঘাত, সংঘর্ষ, মৃত্যু, রক্তপাতের মধ্য দিয়ে ১৯৯৬ সালে সব দল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনব্যবস্থাকে গ্রহণ করেছিল। এই আন্দোলনে আওয়ামী লীগের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। এরপর নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত তিনটি নির্বাচনে সবাই অংশগ্রহণ করেছিল। এসব নির্বাচনে যে দল হেরেছিল, তারা নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুললেও শেষ পর্যন্ত ফলাফল মেনে নিয়েছিল। এবং লক্ষণীয়, এসব নির্বাচনে প্রত্যেকবার শাসনক্ষমতার পালাবদল হয়েছিল।  কিন্তু দেখা গেল, ২০১১ সালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পর আর কোনো সর্বদল গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী ব্যবস্থা বলে কিছু থাকল না। ফলে ক্ষমতায় থেকে যারা নির্বাচন করেছেন তারা প্রতিবারই নির্বাচিত হয়েছেন। আর নির্বাচন ও সংসদ ক্ষমতাসীন দলের একচেটিয়া দখলে থেকে গেল। দায়িত্বশীল দলগুলো এই নির্বাচনগুলোতে অংশ না নেওয়ায় নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়নি আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকায় এবং নির্বাচনের ফল আগে থেকেই নির্ধারিত হয়ে যাওয়ার ফলে জনসাধারণ ক্রমাগত ভোট দিতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে।

এবারের নির্বাচনটাকেও যদি বিবেচনা করে দেখা যায়, তাহলে দেখা যাবে, এই নির্বাচনেও ভোটের হার প্রশ্নবিদ্ধ; নির্বাচন কমিশনের হিসাব মেনে নিলেও দেশের প্রায় ৫৮ শতাংশ মানুষ ভোট দিতে যায়নি। যদি সর্বজন গ্রহণযোগ্য নির্বাচন না করা যায়, তাহলে গণতন্ত্রের ন্যূনতম শর্ত পূরণ করা যাবে না, জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকবে। কিন্তু প্রশাসন, পুলিশ ব্যবহার করে, প্রতিপক্ষকে কৌশলে পরাজিত করে পরপর তিনটি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখার পর সরকার যদি আত্মতৃপ্তিতে ভোগে যে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার, দলীয় শক্তি প্রয়োগ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কলাকৌশল দিয়ে তারা প্রতিপক্ষের সব চ্যালেঞ্জ ভবিষ্যতেও মোকাবিলা করতে পারবে তাহলে রাজনৈতিক অস্থিরতা কমবে না। বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে বড়াই করার সঙ্গে সঙ্গে গণতন্ত্রের দুর্বলতা আর রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশকে অগ্নিগর্ভ করেই রাখবে। দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, আইনের শাসন ক্রমাগত দুর্বল হতে থাকবে। সমাজ ও রাজনীতিতে বিভাজন বেড়েই যাবে। বড় বড় ব্যবসায়ী, কালো টাকার মালিক যেভাবে রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, মুষ্টিমেয় ব্যক্তি ও গোষ্ঠী সরকারের নীতিনির্ধারণ ও প্রয়োগ প্রক্রিয়ার ওপর অশুভ প্রভাব দৃঢ় করছে। এটা গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য হুমকি বাড়িয়ে তুলছে। বর্তমান নির্বাচন নিয়ে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির বক্তব্য এবং জনসাধারণের বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে কোনো মিল নেই। ক্ষমতাসীন দলের দায়িত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা বলছেন, সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে; গণতন্ত্র সুদৃঢ় হয়েছে, নির্বাচন বর্জনকারীরা ব্যর্থ হয়েছে, জনগণ তাদের লালকার্ড দেখিয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এই বক্তব্য কি জনসাধারণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে? বরং ক্ষমতাসীনদের বক্তব্য এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে তফাতটা এত বেশি যে, তা একটা বড় আস্থার সংকট সৃষ্টি করেছে, যা সরকারের সঙ্গে জনসাধারণের দূরত্ব ক্রমাগত বৃদ্ধি করে চলেছে। এই ভাবনা আরও শক্তিশালী হয়েছে যে, সরকার যা বলে তার সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই, সরকারের ঘোষণার সঙ্গে জনগণের আকাক্সক্ষার সঙ্গতি নেই।

নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হতে পারছে না বলে দেশের জনগণ একটি সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। আবার নির্বাচনগুলো বিতর্কিত হওয়ায় বৈশ্বিক মানদণ্ডে বাংলাদেশের গণতন্ত্র প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। ফলে আশঙ্কা নিয়ে এই কথা বলা যায় যে, নির্বাচন নিয়ে যত দিন বিতর্ক চলবে, তত দিন দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে না।

নির্বাচন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অঙ্গ। বলা হয়ে থাকে, একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাধারণত সংসদের বিরোধী দল, মিডিয়া কিংবা নাগরিক সমাজ সরকারের পরিকল্পনা বিশ্লেষণ করে, ভুলভ্রান্তি নিয়ে সমালোচনা করে; সঠিক পথ বা পদ্ধতি কি হতে পারে তা নিয়ে আলোচনা করে, জনগণের মধ্যে প্রচার করে। যে কারণেই সভা-সমাবেশ, মিছিল করার অধিকার গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরেই সংসদে বিরোধী দল কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখছে না বা রাখতে পারছে না। একতরফা নির্বাচন কার্যত একদলীয় সরকারের শাসনে পরিণত হচ্ছে। ডামি, স্বতন্ত্র, জোট, মহাজোট যে নামেই নির্বাচন হোক না কেন, এবারের সংসদে কার্যত কোনো বিরোধী দল নেই। সবাই সরকারের অনুসারী কিংবা সমর্থক। সংসদে কার্যকর বিরোধী দলের অবর্তমানে সংবাদমাধ্যম, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজ সরকারের কাজের পর্যালোচনা, সমালোচনা করে এসেছে, জনমত গড়ে তুলেছে। কিন্তু নতুন মন্ত্রিসভার মন্ত্রীরা ইতিমধ্যে মতপ্রকাশ সম্পর্কে, দায়িত্বপূর্ণ সমালোচনার নামে যেসব বক্তব্য দিচ্ছেন তাতে সংবাদমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজও শঙ্কিত। আর এটা তো সবাই জানে যে, আশঙ্কা ও আতঙ্কের মধ্যে গণতন্ত্র বাঁচে না।

বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে কিংবা প্রচারমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ওপর ভিত্তি করে যদি কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়, তাহলে সরকার যদি বলে এসব সংবাদ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, সরকারের ভাবমূর্তি বিনষ্টের চক্রান্ত তাহলে হয়রানির হাত থেকে রেহাই পাওয়ার পথ কী হবে? উল্লিখিত সমস্যাগুলোর সমাধান না করে বরং প্রতিবেদন বা সংবাদগুলোকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যা দিয়ে সমস্যা আড়াল করার দৃষ্টান্ত অনেক। সংসদে এবং রাজপথে সরকারের কাজ, সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনা নিয়ে কোনো আলোচনা, সমালোচনা করার স্থান বা পরিবেশ না থাকে, তাহলে সরকারের পক্ষে যেমন ভিন্নমত শোনার সুযোগ থাকবে না, তেমনি সংশোধনের কোনো পথও খোলা থাকবে না। এর ফলে রাজনৈতিক বিভাজন, সংঘাতমূলক সম্পর্ক নিরসন করার যত গালভরা কথাই বলা হোক না কেন, বাস্তবে পরিবেশের উন্নতি হবে না। সংসদকে রাজনৈতিক ব্যক্তিবিহীন করার দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা প্রবণতা এবার প্রকট হয়ে ধরা পড়েছে। রাজনীতি এখন আর রাজনীতিবিদদের হাতে নেই। নির্বাচন এবং রাজনীতি চলে গেছে ব্যবসায়ীদের হাতে আর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এখন আমলাতন্ত্রের হাতে। জনগণ কোথাও নেই। রাজনীতি সচেতন মানুষেরা হাহাকার করে বলেন, রাজনীতি কি সঠিক পথে ফিরে আসবে না? সংসদকে প্রাণবন্ত আর রাজনীতিকে জনমুখী করার দায়িত্ব তো নিতে হবে রাজনীতিবিদদেরই।

উপদলীয় কোন্দল ও সহিংসতা ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাপ্রত্যাশী দলগুলোর একটি প্রধান সমস্যা। এবারের নির্বাচন প্রক্রিয়া ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ সংকট বাড়িয়ে তুলেছে। ৭ জানুয়ারির নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দেখাতে আওয়ামী লীগ বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় নিজ দলের মনোনীত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে দলের অন্য নেতাদেরও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ দিয়েছিল। যারা ভোটে হেরেছেন, তারা বলছেন বিভিন্ন কারচুপি বা শক্তি প্রদর্শন করে তাদের হারানো হয়েছে। দলের মনোনীত এবং দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগটি যদিও ভোটের অংশ বাড়ানোর বা প্রতিদ্বন্দ্বিতার আমেজ সৃষ্টি করার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু এটি ক্ষমতাসীন দলের সংহতি ও শৃঙ্খলাজনিত দুর্বলতাকে বাড়িয়ে তুলেছে। তবে নির্বাচন করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ধরে রাখলেও নির্বাচন নিয়ে দেশে-বিদেশে বিতর্ক শেষ হয়নি। সরকারের সামনে সর্বদল গ্রহণযোগ্য নির্বাচনব্যবস্থার উদ্ভাবন করার চ্যালেঞ্জটা এখনো রয়ে গেছে। ঘোষিত ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, ৫৯ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী দলের মনোনীত প্রার্থীকে পরাজিত করে বিজয়ী হয়েছেন। এতে কী এই প্রশ্ন উঠছে না যে, দলটির নেতৃত্ব তৃণমূলে দলটির কোন নেতা বা নেত্রী বেশি জনপ্রিয়, তা প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ আসনে সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পারেননি। এবং এটা দৃশ্যমান হয়েছে যে, দলের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও সহিংসতাকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনা কঠিন। এ পরিস্থিতি থেকে রেহাই পেতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক বরাদ্দ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

১৯৯০-এর অভ্যুত্থান এবং সামরিক শাসন অবসানের পর দেশে নির্বাচনী রাজনীতি শক্তিশালী ভিত্তি পাবে এই সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনে জয়ী হতে হলে যে প্রচুর টাকাপয়সা, পেশিশক্তি এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োজন সেই মানসিকতা ছড়িয়ে দিয়ে নির্বাচনের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অবনমন ঘটছে ক্রমাগত। ফলে নীতি-আদর্শ প্রধান কথা নয়, যাদের টাকাপয়সা, কর্মীবাহিনী বা পেশিশক্তি নেই, তারা নির্বাচনী রাজনীতিতে তেমন সাফল্য অর্জন করতে পারছে না। বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলন করলেও ভোটের রাজনীতিতে তারা সফল হতে পারছে না, যা নীতিহীন রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ করা, প্রতিহত করাও সম্ভব হচ্ছে না। যার বিষময় ফল ভোগ করতে হবে শুধু বর্তমানে নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও। রাজনীতিকে খেলা বানিয়ে আপাতত ক্ষমতাসীন দল রাজনৈতিক খেলায় জিতেছে। মানুষের মধ্যে অসন্তোষ এবং বিক্ষোভ থাকলেও তা দানা বাঁধার মতো রাজনৈতিক শক্তির  পেছনে তারা সংঘবদ্ধ হয়নি। কিন্তু পরিস্থিতি যেভাবে জটিল রূপ নিচ্ছে তাতে গণবিস্ফোরণের সম্ভাবনা যে আছে, সে আশঙ্কা ক্ষমতাসীনরা অনুভব করে। সে কারণে সরকার দমন-পীড়নের পথ পরিত্যাগ করবে না আর রাজনৈতিক সংকটও পুরনো পথেই ঘুরপাক খেতে থাকবে।

রাজেকুজ্জামান রতন

রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.