অসমাপ্ত গল্পের নায়কের মৃত্যুতে কি গল্পেরও অপমৃত্যু হবে ? –ফারুক আল ফয়সাল

সিরাজুল আলম খান দাদা ভাইয়ের একান্ত রাজনৈতিক ভক্ত অনুরক্তদের সামনে এটাই প্রশ্ন।
বাঙালী জাতীর জাতীয় জাগরণ ও পরাধীনতা মুক্তি স্বাধীনতা অর্জন এবং আর্থ সামাজিক সাংস্কৃতিক চূড়ান্ত মুক্তির যে গল্পটা প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ও সান্নিধ্যে অপ্রকাশ্যে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতাজী সুভাষ  চন্দ্র বসুকে অনুসরণ  করে
শুরু করেছেন দাদা ভাই সিরাজুল আলম খান পূর্বপাকিস্তান ছাত্রলীগের সাংগঠনিক অবকাঠামোর মধ্যে থেকে। সেগল্পের কি আজ তাঁর মৃত্যুর সাথে সাথে অপমৃত্যু ঘটবে ? এপ্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আসুন সংক্ষেপে জেনে নেয়া যাক, কে এই সিরাজুল আলম খান ? নোয়াখালীর ঐতিহাসিক পুরনো শহর সোনাপুরের দক্ষিন পশ্চিমাঞ্চলে শান্তাসীতায় ( মুঘল আমলে ষে স্থান ছিল বাংলার সোনার গাঁও এলাকার অধীন স্বাধীন সুলতান ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ্, পরবর্তীতে ঈশাখাঁর অধীন, ইংরেজ আমলে যেস্থানে ছিল ইংরেজদের বস্ত্র -সুতা ও লবনের কারখানা) তাঁর পুরনো আদি নিবাস। নোয়াখালীর নদীভাঙ্গা পুরান শহর (বর্তমান সোনাপুরে) ছিল নোয়াখালীর কৃতি সন্তান শহীদ ফ্লাইট সার্জেন্ট জহুরুল হকের পৈত্রীক নিবাস। যাঁদের সাথে পারস্পরিক আত্মীয়তার বন্ধন ছিল দাদা ভাই সিরাজুল আলম খানদের। দাদাদের আদিনিবাস শান্তাসীতায় হলেও নোয়াখালীর পুরান শহর নদী ভাঙ্গার কবলে পড়লে তাঁর বংশধর এসে বসতি গড়ে বর্তমান চৌমুহনী পৌরসভার আলীপুর গ্রামে।এই গ্রামেরই খাঁ বংশীয় খাঁন সাহেবের বাড়িতে পিতা সরকারী পদস্থ চাকুরীজীবী খোরশেদ আলম খান,মাতা-সুশিক্ষিতা গৃহিনী সৈয়দা জাকিয়া খাতুনের বাঙালী শিক্ষিত সাহিত্য সংস্কৃতিমনা মধ্যবিত্ত পরিবারে ১৯৪১ সালে সিরাজুল আলম খানের জন্ম।পারিবারিক জীবনে ৬ ভাই ৩ বোনের পিতা-মাতার সংসারে সিরাজুল আলম খান দ্বিতীয় সন্তান। তাঁর শৈশব কৈশরে শিক্ষা জীবনের প্রাথমিক পাঠ শুরু হয় বেগমগঞ্জের একলাশপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তিনি মাধ্যমিক শিক্ষার কয়েক ধাপ স্থানীয় বেগমগঞ্জ হাইস্কুলে পড়া শেষে পিতার কর্মস্থল খুলনা জিলা স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন সম্পন্ন করেন।এরপর উচ্চ মাধ্যমিকে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন।এসময় ছাত্রলীগের শিক্ষা শান্তি প্রগতির রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং আবাসিক ছাত্র হিসেবে অবস্থান গড়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলে।
স্কুল জীবন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে বরাবরই একজন মেধাবী ছাত্র হিসেবে ঢাকা কলেজে থাকাকালে তিনি ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রলীগের নেতৃত্বে আসীন হন।একই সময় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য পদ লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের আবাসিক ছাত্র হিসেবে ১৯৬২ সালে সিরাজুল আলম খান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদকের দায়ীত্বে আসীন হন। শৈশব কৈশরে বাংলা বাঙালীর স্বাধীকার থেকে স্বধীনতা আন্দোলনে ছাত্রলীগের শিক্ষা শান্তি প্রগতির রাজনীতির পাশাপাশি অপ্রকাশ্যে অবিভক্ত ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী অভিসংবাদিত রাজনীতিক নেতাজী সুভাষ  চন্দ্র বসুর আদর্শে বাংলা বাঙালীর চূড়ান্ত মুক্তির ভাবনা গড়ে উঠে সিরাজুল আলম খান দাদার মাঝে। তিনি পরিণত বয়সে ১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকায় অবর্তীর্ণ হওয়ার মধ্যদিয়ে তাঁর জীবনের নতুন পথ চলা শুরু হয়। এসময় তিনি পূর্বর্পাকিস্তান ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক থাকাবস্থায় তাঁর একান্ত রাজনৈতিক সহযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধের কেন্দ্রীয় সংগঠক কাজী আরেফ আহম্মেদ এবং কেন্দ্রীয় সংগঠক আবদুর রাজ্জাককে সাথে নিয়ে একগোপন বৈঠকে বসে গঠন করেন” স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ”-যাহা বাঙালীর স্বধীনতার”নিউক্লিয়াস” হিসেবে পরবর্তীতে পরিচিতি লাভ করে। যেই নিউক্লিয়াসের গোপন কর্মকান্ড পরিচালিত হয় পর্দার অন্তরাল থেকে। ৬২’র শিক্ষা আন্দোলনে-শহীদ বাবুল, মোস্তফা, ওয়াজি উল্যাহর রক্তে রঞ্জিত রাজপথে প্রতিবাদ মিছিল শ্লোগানে লডাকু লড়াইয়ে এদেশের ছাত্র সমাজ এবং ছাত্রলীগের মধ্যে যে বিপ্লবী ধারার জন্ম লাভ করে তার একটি ধারা -গতানুগতিক গণতান্ত্রীক,আরেকটি ধারা – বাঙালী জাতীয়তাবাদী অসাম্প্রদায়ীক গণতান্ত্রীক-সমাজতান্ত্রীক ধারা, আরেকটি ধারা মার্কসীয় সমাজতান্ত্রীক বিপ্লবী ধারা। মধ্যবর্তী  ধারাটিই ছিল দাদা সিরাজুল আলম খানদের ধারা। যার আপোষহীন অগ্রসরমান অগ্রণী নেতৃত্বে শুরু হয় মহান মুক্তিযুূ্দ্ধ এবং অর্জিত হয় স্বাধীনতার বিজয়। সিরাজুল আলমখানদের মধ্যবর্তী ধারাই প্রথম শ্লোগান তুলে-জয়বাংলা,আমার সোনার বাংলা,তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা,তুমি কে আমি কে বাঙালী বাঙালী, তোমার দেশ আমার দেশ বাংলাদশ- বাংলাদেশ, বীর বাঙালী অস্ত্র ধরো বাংলাদেশ স্বাধীন করো, গ্রামে গ্রামে দূর্গ গড় বাংলাদেশ স্বাধীন কর
এবং মার্কসবাদ- লেনিনবাদের বিপরীতে শ্লোগান তুলে বিশ্বে আছে একইবাদ -মুজিববাদ-মুজিববাদ। এই শক্তির শ্রমিক কৃষক ছাত্র জনতার আপোষহীন সাহসী অগ্রবর্তী( ভ্যানগার্ড) দলই আওয়াম পন্থি পৌড় রক্ষণশীলদের বিরোধীতা এবং পিডিএম গঠন করে ৮দফার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির মুখে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ১৯৬৬ সালের ৬দফা ও ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের ১৯৬৮ সালের ১১ দফার স্বায়ত্ব শাসন ও স্বাধীনতার আন্দোলন তুঙ্গে নিয়ে যায়। সর্বোপরি জহুর, জোহা, আসাদ, মনুমিয়ার রক্তস্নাত রাজপথে ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে আইয়ুবের পলায়ন পরবর্তীতে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে নিঃশর্ত কারা মুক্ত শেখমুজিবর রহমানকে সর্বোচ্চ জাতীয়তাবাদী খেতাব বঙ্গবন্ধু উপাধী দেওয়া, ১৯৭০ সালে প্রথম বঙ্গবন্ধুর সাথে নিউক্লিয়াস নেত্রীবৃন্দের গোপন বৈঠকে বেঙ্গল লিবারেশন ফ্রন্ট -বিএলএফ গঠন করা। সিরাজুল আলম খান,শেখফজলুল হকমণি,আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহম্মদ বিএলএফ এর নেত্রীত্বে আসীন হন এবং সত্তরের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ প্রার্থীদের বিপুল ভোটে বিজয়ে ভূমিকা রাখেন। নির্বাচনে বিজয়ী দল বঙ্গবন্ধুর নেত্রীত্বাধীন আওয়ামীলীগকে ইয়াহিয়ার ক্ষমতা বুঝিয়ে দিতে গড়িমসিতে আর নয় ৬ দফা,১১দফা, মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতা ও মুক্তির ১দফা রণাঙ্গনে হবে চূড়ান্ত ফয়সালা। এ মর্মে নূরে আলম ছিদ্দিকী,আসম আবদুর রব,শাহজাহান সিরাজ,আবদুল কুদ্দুছ মাখন চার চাত্রনেতার( চারখলিফা খ্যাত) নেতৃত্বে স্বাধীনতার নিউক্লিয়াসের ছাত্রদের মধ্যে রাজনৈতিক শাখা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন। নিউক্লিয়াসের গোপন রাজনৈতিক ও সামরিক শাখা বিএলএফ বা মুজিব বাহিনী এবং জয়বাংলা বাহিনী গঠন। একাত্তরের ২ মার্চে তৎকালীন ডাকসু ভিপি আসম আবদুর রব কর্তৃক স্বাধীন বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকার অনানুষ্ঠানিক উত্তোলন,৩রা মার্চে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ কর্তৃক স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ,৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ,২৩ শে মার্চের পাকিস্তান দিবসে জয়বাংলা বাহিনীর সামরিক কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানের উদ্বোধনীতে আমার সোনার বাংলা জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্যদিয়ে জয়বাংলা বাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার হাসানুল হক ইনু কর্তৃক ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের লাল-সবুজের জাতীয় পতাকার আনুষ্ঠানিক উত্তোলন। জয়বাংলা বাহিনীর আরেক ডেপুর্টি কমান্ডার কামরুল আলম খান খসরু কর্তৃক গানফায়ার করে বাংলাদেশের শুভসূচনা জানান দেওয়া। জয়বাংলা বাহিনীর কুচকাওয়াজ সহকারে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে গিয়ে সামরিক কায়দায় জয়বাংলা বাহিনীর কমান্ডার আসম আবদুর রব কর্তৃক বঙ্গবন্ধুর হাতে জাতীয় পতাকা হস্তান্তর এবং বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ও গাড়িতে জাতীয়পতাকা উড়ানো। ২৬ মার্চে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা। ২৭শে মার্চ তৎকালীন ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজয় জিয়াউর রহমানকে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে জিয়ার অধীনস্ত সৈনিকদের মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশনা, বঙ্গবন্ধুকে মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধীনায়ক,কর্ণেল এমএজি ওসমানিকে অধিনায়ক করা, বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম,প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ, অর্থমন্ত্রী এএইচ এম কামরুজ্জামান,স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যাপটেন মনসুর আলী,পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মুশতাক আহম্মেদ এর নেতৃত্বে গঠিত হলে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, কমরেড মণিসিং,মনোরঞ্জন ধর,ও প্রফেসর মুজাফ্ফর আহমেদ  নিয়ে অস্থায়ী প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের প্রস্তাব ছিল নিউক্লিয়াসের।সিরাজুল আলম খান,শেখফজলুল হকমণি, আবদুর রাজ্জাক,তোফায়েল আহম্মেদ এর নেতৃত্বে গঠিত
বেঙ্গল লিবারেশন ফোর্স-বিএলএফ এর নেতৃত্বে  সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধ প্রস্তুতি হিসেবে ছাত্র ব্রিগেড, যুবব্রিগ্রিড, শ্রমিক ব্রিগেড,কৃষক ব্রিগেড,নারী ব্রিগেড গড়ে তোলা হয়। বিএলএফএর সদস্যদের দেশে গোপন ট্রেনীং হতো ঢাকার কেরানীগঞ্জের কলাতিয়া রতন-গগন-মাখনদের বাড়ি। এখানে সরবরাহ ও জমা থাকতো বিএলএফ এর অস্ত্রের ভান্ডার। যার দায়িত্বে  ছিলেন জয়বাংলা বাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার হাসানুলহক ইনু।
এসময় মুক্তিযুদ্ধ প্রশিক্ষণে নিউক্লিয়াসের সিদ্ধান্তে বিএলএফ এর সদস্যদের ভারতের হাফলং, দেরাদুন, মেলাঘরে গমন। ভারতীয় সামরিক জেনারেল ওবানের নেতৃত্বে হাসানুলহক হক ইনু, শরীফ নূরুল আম্বিয়া,আ ফ ম মাহবুবুল হক, মার্শাল মণিরুল ইসলাম মণিকে ক্যাম্প ইন চার্জ এংরাজনৈতিক সামরিক প্রশিক্ষকের দায়ীত্ব প্রদান। সারা দেশে বিএলএফ এর ৪টি জোনে যুদ্ধ পরিচালনা, উত্তর পূর্ব পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলীয় জোন গঠন করে সিরাজুল আলমখান নীজে উত্তরাঞ্চলীয় জোন কমান্ডিং দায়ীত্বে শেখফজলুল হকমণি আসম আবদুর রবকে পূর্বাঞ্চলীয় জোনের দায়ীত্বে, আবদুর রাজ্জাক তোফায়েল আহম্মেদ কে পশ্চিমাঞ্চলের দায়ীত্বে, মোস্তফা মহসীন মন্টু এবং কামরুল আলমখান খসরুকে ঢাকা শহর সহ মধ্যাঞ্চলীয় জোনের দায়ীত্বে
বিএল এফ এর মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়। এসময় কাজী আরিফ এবং শাহজাহান সিরাজকে ছাত্রলীগ পরিচালনার দায়ীত্ব দেওয়া হয়।
৭১এর মহান মুক্তিযুদ্ধেপাকহানাদার বাহিনীর “কিল এন্ড বার্ণ “(মারো-মরো) যুদ্ধের পৌরানিক কৌশলের বিপরীতে গেরিলা কৌশল “হিট এন্ড রান”(আঘাত করো পালাও)। তারপর স্বাধীন দেশে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনকারী সকল রাজনৈতিক দল সমাজশক্তি সমূহের সমন্বয়ে বঙ্গবন্ধুকে প্রধান করে জাতীয় গণতান্ত্রীক বিপ্লবী সরকার গঠনের প্রস্তাব সহ বঙ্গবন্ধুর নিকট নিম্নোক্ত দাবী পেস করা, যুদ্ধাপরাধের বিচার,যুদ্ধে অংগ্রহনকারী মুক্তিবাহিনীকে গণবাহিনীতে রুপান্তর করে জাতীয় উৎপাদনশীল প্রতিরক্ষাবাহিনী গঠন,সকল শত্রু সম্পত্তির জাতীয়করণ করা, পাক প্রায়োপনিবেশিক আমলাতান্ত্রীক শাস ন বদল, নিরক্ষরতা দূরীকরণ করে বিজ্ঞানমনষ্ক আধুনিক শিক্ষা ও সামাজিক অবকাঠানোর প্রবর্তন, পাক আমলের ঘুনেধরা রক্ষণশীল পুরাতন আর্থ সামাজিক সাংস্কৃতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে একটি শোষণ বঞ্চনা বৈষম্য মুক্ত উন্নত আধুনিক বিজ্ঞানমনষ্ক জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ বিনির্মানের প্রস্তাব, স্বাধীন দেশে অসাম্প্রদায়ীক মনোভাবে মানবে মানবে অহিংস মেলবন্ধন সৃষ্টির প্রস্তাবনা আকারে দাবীসমূহ প্রত্যাখ্যাত হলে প্রয়োজন হয়ে পড়ে স্বাধীন দেশে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি নতুন প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল গঠনের। যুদ্ধে বিধ্বস্ত সদ্যস্বাধীন দেশের উপযোগী বাংলা বাঙালী বাংলাদেশের সমাজ সংস্কৃতি আর্থ সামাজিক চিন্তাচেতনায় সকল ধর্মীয় বিশ্বাসের পরস্পর সহনশীল মনোভাবে আধুনিক বিজ্ঞান মনস্ক শিক্ষার প্রবর্তন। সকল জনগনের নূনতম অন্ন বস্ত্র -শিক্ষা -চিকিৎসা -বাসস্থানের নিশ্চয়তা বিধান, পরাধীন পুরনো শোষণ বঞ্চনা বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে সু-সমবন্টনে বিজ্ঞান ভিক্তিক আধুনিক রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলায় মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ১৯৭২ সালের ৩১ শে অক্টোবর সিরাজুল আলম খান তাঁর অনুসারীদের নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন জাতীয় সমাজতান্ত্রীক দল জাসদ। এরপূর্বে বঙ্গবন্ধু সরকারের জ্ঞাতসারে বায়াত্তরের ১৭ই সেপ্টেম্বর মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এমন একটি প্রগতিশীল গণতান্ত্রীক সমাজতান্ত্রীক রাজনৈতিক দলগঠনে গণরায় গ্রহন করা হয়। স্বাধীন দেশে প্রথম প্রকাশ্য রাজনৈতিক দল জাসদ শুরুতেই রক্ষিবাহিনীর রাজনৈতিক ভ্রাতৃঘাতি আক্রোশের মুখে পড়ে তখনকার একমাত্র রাজনৈতিক পতিপক্ষে পরিণত হয়। তখন তাহা থেকে আত্মরক্ষায় সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে জাসদ গণবাহিনী গঠন করে।এসময় প্রতিপক্ষের প্রতিহিংসা মূলক আচরণে রক্ষিবাহিনীর হাতে জাসদের হাজার হাজার নেতাকর্মী নির্যাতন ভোগ করে এবং খুন হয়। তবুও স্বীয় আদর্শিক লড়াই সংগ্রামের আপোষহীন পথ পরিহার করেনি জাসদ এবং সিরাজুল আলম খান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট স্বপরিবারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের মধ্যদিয়ে পূণরায় যখন স্বাধীন দেশ জাতির সামনে কতিপয় সামরিক সেনা অফিসারের ক্ষমতা দখলের নগ্ন প্রতিযোগিতা শুরু হলো, তখন তাহা থেকে সদ্য স্বাধীন দেশ ও জাতিকে রক্ষা করার মানষে ১৯৭৫ এর
৭ই নভেম্বর জাসদএবং সিরাজুল আলম খানের সিদ্ধান্তে শহীদ কর্ণেল আবুতাহেরের নেত্রীত্বে সিপাহী জনতার গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত হয়। তাহেরের উদারতায় সেদিন প্রাণে বেঁচে যাওয়া জেনারেল জিয়ার অবৈধ ক্ষমতা দখল এবং চরম বিশ্বাসঘাতকতার মধ্যদিয়ে কর্ণেল তাহের, সিরাজুল আলম খান, মেজর জলীল,আসম আবদুররব,শাহজাহান সিরাজ,হাসানুল হক ইনু, মেজর জিয়াউদ্দিন সহ জাসদ নেতাদের জেলে আটক করে জিয়ার অবৈধ সামরিক আদালতের প্রহসনের রায়ে কর্ণেল তাহেরকে১৯৭৬ সালের ২১শে জুলাই ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করে। অপরদিকে সিরাজুল আলমখান দাদা সহ জাসদ নেতাদের ১৫ বছর কারাদন্ড ও সকল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে। একই সাথে জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার বহু নিরপরাধ সৈনিককে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করাহয়। তাতেও আপোষের পথে পা বাড়ায়নি সিরাজুল আলমখান এবং জাসদ নেত্রীবৃন্দ। দমনপীড়নে যখন জাসদকে কাবু করা গেলনা তখন আশির দশকে জাসদের উপর নেমে আসে অভ্যন্তরীণ প্রতিবিপ্লবী ষড়যন্ত্র। জাসদ বাসদে বিভক্ত হয়ে পড়ে জাসদ। এতেও পিছপা হননি সিরাজুল আলম খান।দলীয় প্রবীণ নেতাদের সাথে নিয়ে বরাবরই অটল থেকেছেন নীতিতে। জন্মলগ্ন থেকে জাসদের আদর্শরূপে সিরাজুল আলম খান দাদার মনজগৎ থেকে প্রথম প্রকাশ লাভ করে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাঙালী জাতীয়তাবাদ, অসাম্প্রদায়ীকতা, গণতন্ত্র সমাজতন্ত্রের শ্লোগান।জাতি-দেশকাল সমাজ সংষ্কৃতির আলোকে মার্কসীয় বস্তুবাদিক সমাজতন্ত্রের নব্য রূপান্তর বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। কিন্তু এসময় দাদার বাঙালী জাতীয়তাবাদ,অসাম্প্রদায়ীক গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্রের আদলে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের চিন্তার ব্যাপক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ঘটেনি। দাদার চিন্তার আলোকে সমভাবে প্রচারিত প্রসারিত হয়নি দাদার বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের মতবাদ। জাসদ নেতানেত্রীত্বের কাছ থেকে জাসদের সাধারণ সংগঠক কর্মী সমর্থকরা সমভাবে জেনে বুঝে আত্মস্থ করতে পারেনি বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের তত্ব। আশির দশক পর্যন্ত দেখা গিয়েছে জাসদের অধীকাংশ নেতা নেতৃত্ব বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র বলতে মার্কসীয় সমাজতন্ত্রের বস্তুবাদিক দার্শনিক তত্বে -রাশিয়ার লেলিন,চীনের মাওসেতুং, ভিয়েতনামের হোচিমিন, কিউবার ফিদেল, কিংবা বিশ্ব সমাজতান্ত্রীক বিপ্লবী চে-গুয়েভারার বিপ্লবী চেতনার ধারাকেই আত্মস্থ করে চলেছিল। উদহারণ স্বরূপ বলতে পারি সত্তর দশকের শেষের দিকে আমি যখন স্কুল জীবনে জাসদ ছাত্রলীগের রাজনীতির প্রথম পাঠ শুরু করি তখন চৌমুহনীতে জাসদ রাজনীতির তাত্বিক নেতা বলতে স্থানীয় করিমপুরের মাহবুব ভাই এবং তাঁর নেতৃত্বে জাসদের কেন্দ্রীয় নেতা আ ফ ম মাহবুবল হক মাহবুব ভাই জাসদের রাজনৈতিক ক্লাস মাসিক ওয়ার্কসপে আসতেন। আমার সাথে পরিচয়ের প্রথম দিকে মাহবুব ভাই আমাকে চৌমুহনী ম্যাগাজিন হাউজ থেকে ছোটদের রাজনীতি ও অর্থনীতি, যে গল্পের শেষ নেই, মার্কসবাদের অ আ ক খ, তিনটি বই কিনে দিলেও জাসদের জাতীয় সমাজতান্ত্রীকধারায় গঠিত দলের গঠনতন্ত্র ও সংক্ষিপ্ত ঘোষণা পত্র ছাড়া দাদার
বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ব্যাপক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণমূলক
পৃথক বই তখনো হাতে পাইনি। সেদিক থেকে মাহবুব ভাইকে আমি আমার রাজনৈতিক জীবনের প্রথম শিক্ষক স্বীকার করি বটে তবে পরবর্তীতে আমি মাহবুব ভাইয়ের বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রীক দল-বাসদএর গঠনতন্ত্র ও সংক্ষিপ্ত ঘোষণাপত্র ছাড়া বাসদ রাজনীতির ব্যাপক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণমূলক বইও হাতে পাইনি। আশির দশকের মাঝামাঝি এসে দাদা ভাই সিরাজুল আলম খানের কিছু বই যখন আমাদের হাতে এলো তখন আমরা দেখলাম বিগত দিনের সব কিতাব মিথ্যা প্রমান করে দিয়ে তিনি এবার প্রকাশ্য বলতে চাইলেন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ব্যাখ্যা এবং বুঝানোর চেষ্টা করলেন তাঁর শাসনতন্ত্র ও শাসনতান্ত্রীক রূপরেখা এবং অংশিদারীত্বের গণতন্ত্র। যাহা তখন তিনি এককথায় বলার চেষ্টা করেছেন অংশীদারীত্বের গণতন্ত্র আনবে দেশে সমাজতন্ত্র। শ্রেণী পেশার প্রতিনিধিত্বমূলক ৫শত আসনের পেশাজীবী পার্লামেন্ট গঠনের দাবী। শাসন প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ -জেলা পরিষদ,উপজেলাপরিষদ, সিটি কর্পোরেশন, গ্রাম সরকার গঠন,সমবায় ভিত্তিক কৃষি উৎপাদন, শিল্প কারখানায় মালিক শ্রমিক শেয়ার হোল্ডিং কোম্পানী গঠন।হিন্দু -মুসলীম -বৌদ্ধ -খ্রীষ্টান একই অঙ্গে একপ্রাণ মোরা একদেশ এক মায়েরই গর্ভজাত সন্তান।এমন চিন্তায় বাংলা বাঙালী বাংলাদেশের অভিন্ন ভাষা সংস্কৃতির উন্নয়ন সমৃদ্ধ করণ। প্রতিবেশী সকল দেশের সাথে বৈরীতা নয় সুসম্পর্ক গড়ে তোলার মধ্যদিয়ে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রকাশ্য যে রাজনৈতিক দল জাসদ গঠন করেন। সে দলে তাঁরই সময়ের রাজপথের পরিক্ষিত সহযোদ্ধাদের হাতে কেন্দ্রীয় দায়ীত্ব অর্পন করে তিনি পর্দার অন্তরালে দলীয় প্রাণপুরুষ( নিউক্লিয়াস) রাজনীতির দাদা ভাই হিসেবে থাকেন। এসময় দাদাভাই কেবল মাত্র কৃষকলীগ ও শ্রমিক জোটের কেন্দ্রীয় সদস্য থেকেছেন।
প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে দলীয় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে অনড় ও আপোষহীন সিরাজুল আলম খানের পার্টি সভায় উপস্থিতি তাঁর একান্ত সম্মতি ও পরামর্শে আশির দশক পর্যন্ত পরিচালিত হয় জাসদ।১৯৭৪ সালে দলের সেন্ট্রাল অর্গানাইজিং কমিটি- সিওসি গঠিত হলে সিরাজুল আলম খান থাকেন তার আহবায়ক। আশির দশকে তিনি জাসদের মূলদলের সাংগঠনিক কাঠামোয় সদস্য হিসেবে থেকেছেন।এছাড়া দলীয় সভাপতি, সম্পাদকের দায়ীত্ব, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চেয়ার দখল কিংবা ব্যাক্তিগতভাবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের মনবাসনা কখনো ছিলনা তাঁর। ব্যাক্তিগত চিন্তা ও চেতনায় সদা উন্নত অহিংস অসাম্প্রদায়ীক, সর্বোচ্চ দেশপ্রেম জাতীয়তাবোধের ধ্যানধারণায় আচ্ছন্ন চিন্তাশীল এই বুদ্ধিভিত্তিক রাজনীতিকের গত ৯ জুন ২০২৩ পর্যন্ত আমৃত্যু ভাবনা ছিল কি করে বাংলার জনগনের চূড়ান্ত মুক্তি আনয়ন করা যায়।এবিষয়ে অন্যদের ভিন্নমত থাকলেও তাঁর লক্ষ্য বাস্তবায়নে তিনি ছিলেন আমৃত্যু সদা জাগ্রত ও আপোষহীন। ব্যাক্তিগত পারিবারিক জীবনে আমৃত্যু একাকীত্ব জীবনে মুক্ত স্বাধীন বন্ধনহীন নির্লোভ নির্মোহ চিত্ততায় জাগ্রত সিরাজুল আলম খান দাদা ভাই তাঁর প্রতিষ্ঠিত দল জাসদকে দিয়ে স্বাধীন দেশে বিজ্ঞান মনস্ক সমাজ তথা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় একাধীক রাজনৈতিক কর্মসূচী কৌশল প্রণয়ন করিয়ে ছিলেন নীজে পর্দার অন্তরালে থেকে। তার মধ্যে বায়াত্তরে প্রতিষ্ঠার শুরুতে আত্মরক্ষায় গণবাহিনী গঠন, ছিয়াত্তরে কর্ণেল তাহেরকে দিয়ে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা গঠন করে সিপাহী জনতার গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত করায় সশস্র লড়াই সংগ্রামের মধ্যদিয়ে জনগনের চূড়ান্ত মুক্তিই ছিল যাঁর মনোবাসনা। জাতীয় গণতান্ত্রীক বিপ্লব সম্পন্ন করে তারপর সমাজতান্ত্রীক সমাজবিপ্লবের দিকে অগ্রসর হবেন এমনই চিন্তা ছিল তাঁর। আশির দশকে মার্কসবাদী বস্তুবাদিক চিন্তাধারাকে সামনে এনে বাসদ সৃষ্টির মধ্যদিয়ে দলে প্রতিবিপ্লব সৃষ্টি করে একটি অতিবিপ্লবী দল। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষেই
 সত্তর দশকে গণঅভ্যুত্থানের পথে অগ্রসর হলেও আশির দশকে সেপথ পরিহার করে সামরিক স্বৈরশাসনের কাঁদে তাঁর অংশিদারীত্বের গণতন্ত্র, পেশাভিত্তিক উচ্চকক্ষ ও নিম্ন কক্ষের দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট পাঁচশত আসনের পার্লামেন্ট গঠনের প্রস্তাব, মেট্রোপলিটন গভর্মেন্ট সৃষ্টি, জেলা পরিষদ,উপজেলা পরিষদ,গ্রাম সরকার গঠন তাঁরই প্রস্তাবনা। সারাদেশকে ৯টি প্রদেশে বিভক্ত করে প্রাদেশিক শাসনকর্তা নিয়োগ করে ফেডারেল পদ্ধতির কেন্দ্রীয় সরকার গঠন, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন, জাতীয় ঐক্যমতের সরকার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবনা,উপ আঞ্চলিক জোট গঠনের প্রস্তাব সম্বলিত তিনি নতুন ধারার গণতান্ত্রীক রাজনৈতিক প্রস্তাবনা হাজির করেন নব্বই দশকে। একুশ শতকের বাংলাদেশে যাকে তিনি রাজনীতির দ্বিতীয় ধারা ও বাঙালীর তৃতীয় জাগরণ হিসেবে আখ্যা দেন। এসময় ক্ষমতাসীন সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদকে সমর্থন দেয়া নিয়ে তাঁর সাথে জাসদের মূলধারার অনেক কেন্দ্রীয় নেতার সাথে দ্বিমত সৃষ্টি হয়। জাসদ তার ঐতিহাসিক ঐতিহ্যগত ধারায় সমরিক স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও দাদা সিরাজুল আলম খান আসম আবদুর রবকে নিয়ে এরশাদের পক্ষাবলম্বন করেন এবং জেএসডি গঠন করে এসময় তিনি ধীরে ধীরে জাসদের সাথে দূরত্ব বজায় রেখে চলতে থাকেন।১৯৯৭ সালে জাসদ জেএসডি একীভূত হয়ে দাদার শ্রম কর্ম পেশাজীবীর অধিকার  ও ক্ষমতায়নের প্রস্তাবনা গ্রহন করলেও দাদা তাঁর রাজনীতির দ্বিতীয় ধারা নিয়েই ব্যাস্ত থাকেন। এরশাদের পতন পরবর্তী খালেদা জিয়া সরকারের আমলে আমিরিকার বেঙ্গল ষ্টাডিজ কনফারেন্সে বিশকোটি বাঙালীর সাংষ্কৃতিক ঐক্যের আহবান জানানোর কারণে তৎকালীন সংসদে বিরোধী দলীয় এমপির প্রতিবাদে বিএনপি সরকার তাঁকে বিমানবন্দর থেকে আটক করে তাঁর পাসপোর্ট নিয়ে গিয়ে তাঁকে ৮ মাস কারারুদ্ধ করে রাখে। পরবর্তীতে নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে কারা মুক্ত হন এবং পাসপোর্ট ফিরে পান। বিএনপি সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ারপর এক-এগারোর ক্ষমতার কুশীলভরাও অনেকাংশে পরিচালিত হয়েছিল দাদার রাজনৈতিক মেধানুকূল্যে। বলাবাহুল্য আমি তখন নোয়াখালী জেলা জাসদ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এবং ১৯৯৭ সালে একীভূত জেলা জাসদের সদস্য। এসময় হঠাৎ একদিন দাদার এক ভক্ত অনুরক্ত আমাকে নিয়ে যায় ঢাকায় হোটেল শেরাটনে দাদার কাছে। সেদিনই দাদার সাথে আমার আনুষ্ঠানিক পরিচয়। বলে রাখা ভালো দাদা এবং তাঁর ভাইবোনেরা অনেকেই আমার বাবার ছাত্র ছিলেন। আমার বাবাআবদুল করিম মাষ্টার ছিলেন বেগমগঞ্জ পাইলট হাইস্কুলের বাংলা-ইংরেজীর সিনিয়র শিক্ষক এবং মওলানা ভাসানীর ন্যাপের একসময়ের জেলা সম্পাদক, ১৯৫৩সালে নোয়াখালী জেলার প্রথম ভাষা শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠার এবং ১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলনের বলীষ্ঠ সংগঠক। দাদার শৈশব কৈশরে প্রাথমিক শিক্ষা বেগমগঞ্জ একলাশপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে,তারপর মাধ্যমিকের কয়েক ধাপ বেগমগঞ্জ পাইলট হাইস্কুলে।সেই সুবাদে আমাকে দাদার ডাকে তাঁর সাথে দেখা করা। এরপর এক এগারোর ২০০৮ সালে পূণরায় দাদার ডাকে সাড়া দিয়ে দেখা করতে যাই ঢাকায়- ডিসিসি সুপার মার্কেট,কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, শাহবাগে। এসময় আমার সাথে সাংবাদিক নাসির উদ্দিন বাদল সহ নোয়াখালীর আরো অনেক রাজনৈতিক বন্ধু ছিল। সেদিন দাদার সাথে রাজনৈতিক আলোচনায় জাসদ নিয়ে কথা প্রসঙ্গে একপর্যায় তিনি বলেছিলেন, তাঁর ভাষায় আমরা পরাধীন আমলে স্বাধীনতা আন্দোলন ও লড়াই সংগ্রামে যে রাজনৈতিক কৌশলগত অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ করেছি একাত্তরে সেই একই অস্ত্রদিয়ে যুদ্ধ করিনাই।আবার একাত্তরে যে মারনাস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ করেছি স্বাধীন দেশে সেই অস্ত্র অচল মরিচা পড়া তাদিয়ে স্বাধীন দেশগঠনে যুদ্ধ করিনাই। আজকের নব্বই দশকের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন আজ প্রয়োজন রাজনীতির নতুনধারা অর্থাৎ দ্বিতীয় ধারার কর্মকৌশল। যাহা আগামী দিনে সমাজ বদলের পথকে উম্মুক্ত করবে। আমি দাদাকে সেদিন প্রশ্ন করেছিলাম, দাদা তাহলে এভাবে বারবার রাজনীতির কৌশলগত অস্ত্র বদল হলে তাতে প্রথম যা দিয়ে শুরু করেছেন শেষ পর্যন্ত সেটি টিকে থাকবে কিনা ? উত্তরে সেদিন দাদা শুধু বলেছিলেন সেটা সময় বলে দিবে। তিনি এসময় একটি বারের জন্যও কর্ণেল তাহেরকে নিয়ে কথা বললেননি।আমি বলতে চাইলে সেই সুযোগ তাঁর কাছে আমি আর পেলামনা। তিনি আর সময় ক্ষেপন নাকরে
আমার হাতে তাঁর লেখা বেশকিছু বই তুলে দিয়ে বললেন, “এগুলো ভালোভাবে পড় এবং অন্যদের পড়তে দাও”। দাদার বইগুলো যত্নসহকারে কিছুদিন আদ্যপান্ত পড়ে আমি দেখলাম অংশিদারীত্বের গণতন্ত্র পেশাজীবীর উচ্চকক্ষ নিম্ন কক্ষে বিভক্ত দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্ট গঠনের প্রস্তাবনায় কিছুটা নতুনত্ব মনে হলো বটে,কিন্তু তাতে কোথাও জাসদ এবং জাসদের হৃদপিন্ড শহীদ কর্ণেল আবুতাহেরকে নিয়ে একটি কথাও বলা নেই। বলা নেই বায়াত্তরে ঘোষিত বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের কথা। যাহা লেখা হয়েছে তাহার মধ্যে সম্পূর্ণ নতুন চিন্তাধারার সুত্রপাত ঘটলেও তাহা ঘুরে ফিরে ধনবাদী ব্যবস্থার এপিঠ ওপিঠ পুঁজি বিকাশের মধ্যদিয়ে সমাজ বিকাশেরই নবতর চিন্তাধারায় নতুন নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা পাওয়ার কথা,কিন্তু জাসদের আদর্শিক মূলমন্ত্র মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা – বাঙালী জাতীয়তাবাদ, অসাম্প্রদায়ীকতা,গণতন্ত্র, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের মিল কোথাও খঁজে পাওয়া গেলনা।
এতে মনে হলো দাদা বারবার কাকের বাসায় কোকিলের  ডিম ডুকিয়ে দিয়ে যে নতুনত্বের আশা করেছিলেন তাতে তিনি হতাশ যখন দেখলেন কাকের বাসায় ফুটন্ত কুকিল ছানা কাকা রবে না ডেকে বরং তার জাত-গোত্রীয় ধারা কুহু কুহু রবেই ডাক মেরে এডাল
ওডাল উড়ে বেড়াচ্ছে। অপরদিকে তার পালিতা কাক ও কাকের ছানারা তাকে আর বাসায় সহ্য করতে নাপেরে একদিকে কাকা রবে পিছু পিছু দৌড়াচ্ছে। আর অপরদিকে কোকিল ছানারাও কুহুকুহু রবে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে। এতে অনেকটা বিরক্ত ও হতাশ চিত্তে দাদা তাঁর প্রতিষ্ঠিত জাসদের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের পাঠ চুকিয়ে ইতিমধ্যে অন্য অধ্যায়ের অনুসন্ধান করছেন। যদিও আমি এবং আমরা ইতিমধ্যে
জাসদের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের পাঠ হৃদয়অঙ্গম করে বসে আছি শুরু থেকে। তাসত্বেও এসময় দাদার একান্ত অনুরক্ত ভক্ত ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শাহীআজম ও নোয়াখালীর চৌমুহনী কলেজে আমাদের সময়ের সহযোদ্ধা ছোটভাই মোশারফ হোসেন মন্টু সহ গড়ে তুললো সামাজিক শক্তি নামক দাদার আদর্শিক আরেকটি সংগঠন। যেখানে একরকম ব্যাক্তিগত সম্পর্কের অধিকার দিয়ে মন্টু আমাকে সংগঠনের কেন্দ্রীয় সংগঠক করে বসলো।তার আন্তরিকতায় আমি নোয়াখালী থেকে অ্যড,হুমায়ুন কবির ভাইয়ের সুযোগ্য সন্তান অ্যড, জাকির হোসেন সাহেবকে নোয়াখালী জেলা সামাজিক শক্তির সভাপতি করলাম আমী নীজে থাকলাম তাতে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে দাদার প্রস্তাবে সামাজিক শক্তির খসড়া ঘোষণা পত্রের প্রস্তাবনা পাঠাতে গিয়ে আমি লিখলাম “জাতীয় সামাজিক শক্তি”।তাতে দাদা অসন্তুষ্ট চিত্তে আমাকে তলব করে জিজ্ঞেস করলেন আমি কেন জাতীয় সামাজিক শক্তি উল্লেখ করলাম।উত্তরে আমি বললাম দাদা আমি ভাবছিলাম এই সংগঠনটা জাসদেরই একটি সহযোগী সংগঠন। উত্তরে দাদা স্পর্ষ্ট জানিয়ে দিলেন জাসদের সাথে সামাজিক শক্তির কোন সম্পর্ক নেই। আমি বললাম দাদা আমিতো এখনো জাসদ করি এবং কর্ণেল তাহেরের একজন আদর্শিক সৈনিক।দাদা কোন উত্তর করলেননা।
সেই থেকে ধীরে ধীরে আমিও সামাজিক শক্তির সাথে আমার সম্পর্ক ছিন্ন করে আস্তে আস্তে দাদার কাছ থেকে দূর সরে গেলাম এবং পূণরায় জাসদের রাজনীতির সাথে সম্পর্ক গড়েতুলে জাসদের মূলধারার বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের আদর্শিক ধারায় ফিরে এলাম। তবে বিদায় বেলায় স্বাধীনতাকে নিয়ে দাদার একটি কথা উল্লেখ করে যেতে চাই যাহা আজ স্বাধীন দেশে লক্ষনীয়” যে আইন ও বিধির দ্বারা বিদেশি শাসকেরা শাসন করে, সে আইন ও বিধিকে বদলিয়ে নীজেদের উপযোগী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করাই হলো স্বাধীনতার মূল কথা,বিদেশী শাসক বদলিয়ে দেশীয় শাসক ক্ষমতায় বসিয়ে উপনিবেশিক আমলের রাষ্ট্রকাঠামো ও শাসন ব্যবস্থা দিয়ে দেশ পরিচালনা করা জনগনের জন্য একধরণের পরাধীনতা ” যাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় বলা চলে অভ্যন্তরীণ পরাধীনতা বা ইন্টারনাল কলোনিয়ালিজম।। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমাজবদলের ভাবনায় আমরা যদি গণতান্ত্রীক ধারায় সু-শাসনের মধ্যিদয়ে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই তাহলে আমাদেরকেও এই কথাটির গুরুত্ব দিতে হবে। স্বাধীন দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কিংবা আশি নব্বই দশকের মতবাদিক দ্বিধা-দ্বন্দ্বের  মাঝে একজন সিরাজুল আলম খানকে নিয়ে রাজনৈতিক তর্ক আছে বিতর্ক অছে কিন্ত ষাট ও সত্তর দশকের সিরাজুল আলম খানকে নিয়ে কোন বিতর্কের অবকাশ নেই। তিনি তাঁর সমগ্র জীবন যৌবন জুড়ে এদেশ জাতির স্বাধীনতা ও মুক্তির চিন্তায় উৎসর্গ করে যে বাঙালী ও বাংলাদেশের চূড়ান্ত মুক্তির গল্প লেখা শুরু করে গিয়েছেন জীবনের মহামূল্যবান সময় উৎসর্গ করে, তাহার সাথে অনেকের এবং আমাদের ভিন্নমত থকলেও এবিষয়ে তাঁর দেশ জাতি প্রেম নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবীদার এবং গবেষণা তুল্য। এখন প্রশ্ন হলো সেই গল্লের নির্লোভ নির্মোহ চিত্তের মৃত্যুর পরকি গল্পেরও অপমৃত্যু ঘটবে ?
তাই চাই সকল দ্বিধা-দ্বন্দ্ব  ভুলে সবার মিলিত ঐক্যে যেমন আমাদের শহীদ কর্ণেল আবুতাহেরকে নিয়ে ভাবনা তেমনি এর পাশাপাশি দাদাকে নিয়েও আসুন জাতীয়ভাবে গড়ে তুলি সিরাজুল আলম খান গবেষণা কেন্দ্র।
শহীদ কর্ণেল আবু তাহের
চেতনা কেন্দ্র এবং প্রস্তাবিত সিরাজুল আলমখান গবেষণা কেন্দ্র নোয়াখালীর পক্ষে
লেখক :  সাংবাদিক ফারুক আল ফয়সাল।।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.