দাম্পত্য ভাঙন ও তার পরিনতি

পরিবার ভেঙে যাওয়াটা এক সময় মাথায় বাজ পড়ার মত ঘটনা ছিল। ‘তালাক’ বা ‘ডিভোর্স’ ছিল একটা প্রায়নিষিদ্ধ শব্দ। মানুষ যে কোনো মূল্যে সংসার ধরে রাখতে চাইতো। একবিংশ শতাব্দিতে এসে পুরানো সব ধারণা, প্রথা ও সম্পর্ক ধীরে ধীরে তাদের মূল্য হারিয়ে ফেলছে। আগের দিনে ঘর ভাঙতো অভাব অনটন, পারিবারিক অশান্তি, নির্যাতন — এ সবের কারণে। বিবাহবিচ্ছেদের স্ংখ্যা ছিল কম। বেশিরভাগ ছাড়াছাড়ি হতো বিয়ের কয়েক বছর পর। একটা কি দুটো সন্তানের পিতা-মাতার। এ সময়টা উভয় পক্ষ চেষ্টা করতো যে কোন মূল্যে সংসারটা রক্ষা করার। তারপর না পারলে আলাদা হয়ে যেতো।
এ শতাব্দিতে এসে পরিস্থিতি ভিন্ন রূপ নিয়েছে। ডিভোর্সের হার দ্রুত বাড়ছে। মেয়েরা শিক্ষিত ও কর্মজীবী হচ্ছে। তাদের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা আসছে। সে কারণে পরিবারের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব বাড়ছে। তাদের ইচ্ছা, পছন্দ ও শর্তের বাইরে আগের মতো একপেশে সিদ্ধান্তের বলি তারা তেমন হচ্ছে না। দু’জনে উপার্জন করে বলে পরিবারগুলোতে আর্থিক স্বচ্ছলতা বেড়েছে। পরিবারে, সমাজে, কর্মস্থলে, ব্যবসায় ও রাজনীতিতে নারীর বিপুল মর্যাদাবৃদ্ধি ঘটেছে।
এক‌ই সাথে ডিভোর্সের হার‌ও ব্যাপকহারে বেড়ে চলেছে। পুরুষ শাসনামলে ডিভোর্সের প্রায় সবগুলোই ঘটতো পুরুষের পক্ষ থেকে। তিন তালাক দিয়ে স্ত্রীকে ঘর থেকে বের করে দেবার ক্ষমতা ছিল কেবল স্বামীর। পতি দেবতার মুখের কথাটিই ছিল শেষ কথা। তার উপরে কোনো আপিল চলতো না। কাঁদতে কাঁদতে বৌটি ছোট ভাইর হাত ধরে বাপের বাড়ি চলে যেতো।
আজ সে পরিস্থিতি নাই। ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নেবার জন্য বর্তমানের দম্পতিরা বছরের পর বছর ধরে অপেক্ষা করতে নারাজ। তাদের জীবনের গতি দ্রুত হয়েছে। ক্যারীয়ার তাদের কাছে অনেক বেশি সময় দাবি করে। চৌকাঠের বাইরে প্রতি পদে কম্পিটিশান। দম বন্ধ করে ছুটতে হয়। কে যে কাকে কখন কি করে টপকে যাবে তার নিশ্চয়তা নাই। প্রত্যেকে প্রত্যেকের প্রতিদ্বন্দ্বি। এ অবস্থায় চৌকাঠের ভেতরে কোন‌ও ধরণের টেনশন থাকলে তা নারী ও পুরুষ উভয়ের জীবনকে এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে তা আর কখনোই পূরণ করা সম্ভব না। কাজ এখন বস, কাজ এখন সব‌। জমির উপর নির্ভরতা নাই বলে অর্থই এখন আত্মরক্ষার একমাত্র উপায়, ততোদিন না তা বিতরণে রূপান্তরিত হচ্ছে। বিতরণে রূপান্তর করার মতো পরিমানের অর্থ অধিকাংশ পরিবারের পক্ষেই উপার্জন করা সম্ভব হয় না। তাই স্বামী-স্ত্রীতে মিলে সারাক্ষণ অর্থের পশ্চাদ্ধাবন করেন, কড়ি দেবতার উপাসনালয় মগ্ন বা মত্ত থাকেন।
অর্থ, ক্যারিয়ার ও প্রতিষ্ঠার বেদিতে নিবেদিতপ্রাণ মানুষদের পক্ষে এর বাইরে আর কোনো ধরণের চাপ সহ্য করা সম্ভব নয়। ফলে এক জেনারেশন আগে রিকশা ভাড়াটা কে দেবে, বা কোন সপ্তাহে কাঁচা বাজারের পয়সা কে দেবে — এগুলো যেমন একেবারেই ধর্তব্যের মধ্যে ছিলো না, এখনকার সংসারে এসব‌ই হয়ে গেছে বিরোধের প্রধান বিষয়। এ ছাড়া একের কর্মস্থল নিয়ে অপরের নানা সন্দেহ, স্বামী অফিসের পরে আর কোথাও যায় কি না, অফিসে বসের সাথে স্ত্রীর কোন আপত্তিকর সম্পর্ক গড়ে উঠলো কি না — এসব সন্দেহ তো ঘুনপোকার মতো অন্তর্করাত চালিয়ে যাচ্ছেই। সর্বশেষ গোদের উপর বিষফোঁড়া হয়ে দেখা দিয়েছে ফেইসবুকে গোয়েন্দাগিরির ফলে সৃষ্ট নতুন সমস্যা। এত কিছু মানিয়ে চলা সম্ভব না। আগে ঝগড়া করার অনেক সময় ছিল। এখন তা’ও নাই। অত‌এব যা করতে হবে কুইক, যা সিদ্ধান্ত নেবার এখনই। নেক্সট টাইম বলে কিছু নাই।
আগে দাম্পত্য ছিল চুম্বকের বিপরীত মেরুর মতো। স্বামী-স্ত্রী একে অন্যকে নিজের দিকে টানতো। আকর্ষণ করতো‌। এখনকার দাম্পত্য হয়ে গেছে চুম্বকের সমমেরুর মত। একে অন্যকে বিকর্ষণ করে। শুধু দরকারের সময়টায় কাছে টানা। বাকি সব সময়েই একটা নির্দিষ্ট দুরত্বে ঠেলে রাখা। এতে সম্পর্ক হয় বটে, একাত্মতা হয় না। প্রয়োজন ছাড়াও একে অন্যকে নিবিড় করে পাবার যে আগ্রহ বা ভালবাসা, তা জন্মায় না। তাই একসাথে থেকেও তারা একে অন্যের মনের খবর জানে না। একে অন্যের সুখ-দুঃখের সাথী হতে পারে না। এদের মধ্যে একে অন্যের ভুল-ভ্রান্তি সহ্য করার ধৈর্য্য ও ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে তাদের পূর্বপুরুষদের চেয়ে অনেক কম। এদের সম্পর্কটা গ্লু’র মতো না হয়ে হয়েছে ডিটার্জেন্টের মতো। স্টিক করে না, রিমুভ করে। এ্যাডহেসিভ নয়, রিপালসিভ।
সব মিলিয়ে দাম্পত্য পরিস্থিতি এক কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে চলেছে। আমরা অধীর আগ্রহ ও আশা নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের দিকে তাকিয়ে আছি। ওরা তো কয়েক জেনারেশন আগেই এ অবস্থার মুখোমুখি হয়েছিল। ওরা যেহেতু টিকে গেছে, আমরাও নিশ্চয় টিকে যাবো। তবে সেই টিকে থাকার জন্য পরিবার, দাম্পত্য ও ভালবাসার কতটুকু বিসর্জন দিতে হবে তা আমরা এখনো জানি না।
পশ্চিম আমাদের গণতন্ত্র দিয়েছে, তৃতীয় বিশ্বের কোথাও তা কার্যকর হয়নি। ধনতন্ত্র দিয়েছে, যা তৃতীয় বিশ্বের চরম দারিদ্রের মূল কারণ। উন্নয়ন দিয়েছে, যার পরিনতি আজকের শ্বাসরুদ্ধকর আরবান এয়ার পল্যুশান। ঢাকা আজ পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত মহানগর। সবচেয়ে বসবাস অযোগ্য শহর।
এ ছাড়াও পশ্চিম আমাদের বিয়ের বদলে ‘লিভিং টুগেদার’, ‘লিভ-ইন পার্টনার’, ‘আন‌ওয়েড মাদার’ ও ‘সিঙ্গেল মাদার’ দিয়েছে। এর কোনো কিছুই আমাদের সাথে খাপ খায়নি। খাবে বলেও মনে হয় না। অপেক্ষা ছাড়া আমাদের মনে হয় আর কিছুই করার নাই।
– শামসুদ্দিন পেয়ারার ফেসবুক থেকে সংগৃহীত ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.