তিন শূন্য’র পৃথিবী গড়ে তুলতে ড. ইউনূসের আহ্বান

 

ইতালির তুরিনে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম কফি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান লাভাজা’র সম্মেলন কেন্দ্রে ১২তম বৈশ্বিক সামাজিক ব্যবসা শীর্ষ সম্মেলনের উদ্বোধন করেছেন নোবেল লরিয়েট প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বিশ্বের ৫টি মহাদেশের ৪৫টি দেশের ৫০টি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ৫০০ জন অংশগ্রহণকারী সশরীরে এই সম্মেলনে যোগ দেন। বিভিন্ন সামাজিক ব্যবসা, বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে আগত অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৩০০ জন ছিলেন সামাজিক ব্যবসা উদ্যোক্তা। অন্যদের মধ্যে ছিলেন রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ছাত্র এবং বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ও প্রতিনিধিগণ। এছাড়াও আরো প্রায় ১,০০০ জন অংশগ্রহণকারী বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনলাইন প্লাটফরমে এই সম্মেলনে যোগদান করেন।

উল্লেখ্য যে, বৈশ্বিক সামাজিক ব্যবসা শীর্ষ সম্মেলন সামাজিক ব্যবসা বিষয়ক পৃথিবীর দুটি বৃহত্তম বার্ষিক আয়োজনের একটি যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নেতৃবৃন্দ, সমর্থক, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিগণ অংশগ্রহণ করে থাকেন।

সম্মেলনে ড. ইউনূস তার উদ্বোধনী বক্তব্যে বর্তমান “টাকা তৈরীর পৃথিবীর স্থলে একটি “তিন শূন্য’র পৃথিবী” গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি তার তিন শূন্য’র পৃথিবীর ধারণা সম্মেলনে উপস্থিত অংশগ্রহণকারীদের নিকট বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন। এই পৃথিবী হলো শূন্য নীট কার্বন নিঃসরণ, শূন্য সম্পদ কেন্দ্রীকরণ ও শূন্য বেকারত্বের একটি পৃথিবী।

তুরিন নগরীর মেয়র মি. স্টেফানো লো রুশো তার অভ্যর্থনাসূচক বক্তব্যে বৈশ্বিক সামাজিক ব্যবসা শীর্ষ সম্মেলনের অনুষ্ঠানস্থল হিসেবে ঐক্যবদ্ধ ইতালির ঐতিহাসিক রাজধানী তুরিনকে বেছে নেয়ার জন্য সম্মেলনের আয়োজকদের ধন্যবাদ জানান।

সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন তুরিন চেম্বার অব কমার্সের সেক্রেটারী জেনারেল ড. গুইদো বোলাত্তো, সান পলো ফাউন্ডেশন কোম্পানীর প্রেসিডেন্ট মি. ফ্রান্সেসকো প্রফুমো, লাভাজা গ্রুপের ভাইস প্রেসিডেন্ট মি. গিউসেপ্পে লাভাজা, ওয়ান ইয়ং ওয়ার্ল্ড-এর প্রতিষ্ঠাতা মিস কেট রবার্টসন এবং লুক্সেমবার্গের গ্রান্ড ডাচেজ মারিয়া টেরেসা। তারা প্রত্যেকেই বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামো কর্তৃক সৃষ্ট বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করতে সামাজিক ব্যবসার প্রয়োজনীয়তার উপর বিশেষভাবে জোর দেন।

এ বছরের শীর্ষ সম্মেলনে বিশ্বব্যাপী শান্তির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় সামাজিক ব্যবসার ভূমিকার উপর বিশেষভাবে আলোকপাত করা হয়।

শীর্ষ সম্মেলনের আলোচনা ও অনুষ্ঠানসমূহ কেন্দ্রীভূত ছিল প্রধানত দারিদ্র বিমোচন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন থেকে পৃথিবীকে রক্ষা, সমাজ ও মানুষের উপকারকারী বিভিন্ন প্রযুক্তি নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা এবং একই সাথে মানুষের জন্য ক্ষতিকারক প্রযুক্তিগুলি বর্জনের উপর। অ্যাকাডেমিয়া কর্তৃক সৃষ্ট ধারণা ও আইডিয়াপ্রসূত প্রতিষ্ঠানগুলি সমাজের যে ক্ষতি করছে সে বিষয়ে তাদেরকে সচেতন করা, সামাজিক ব্যবসার চর্চাকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং বিশ্বব্যাপী তরুণ সমাজের দ্বারা সৃষ্ট “থ্রি জিরো” ক্লাবগুলির শক্তি ও সক্ষমতা পরীক্ষা করাও সম্মেলনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল।

সম্মেলনের প্রথম দিনে তুরিন বিশ্ববিদ্যালয় ইউনূস সেন্টারের সাথে যৌথভাবে সামাজিক ব্যবসা অ্যাকাডেমিয়া ফোরামের আয়োজন করে।

উল্লেখ্য যে, ২০২০ সালে কোভিড মহামারী শুরুর পর সামাজিক ব্যবসা উদ্যোক্তা, সামাজিক ব্যবসার সমর্থক, শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গবেষক ও ছাত্রদের সশরীর উপস্থিতিতে এটিই প্রথম সামাজিক ব্যবসা সম্মেলন।

প্রফেসর ইউনূস তুরিনে পৌঁছানোর পর “সেরমিগ”  এর প্রতিষ্ঠাতা মি. আর্নেষ্টো অলিভেরো তাকে অভ্যর্থনা জানান এবং তিনি ও তার সহকর্মীরা সামাজিক ব্যবসা নিয়ে যে কাজ করছেন তা প্রফেসর ইউনূসকে অবহিত করেন।

উল্লেখ্য যে, আর্নেষ্টো অলিভেরো, তার স্ত্রী মারিয়া সেরাতো এবং তাদের কয়েকজন বন্ধু মিলে সেরমিগ প্রতিষ্ঠা করেন যার লক্ষ্য ছিল ক্ষুধা দূর করা এবং আলোচনা, আতিথেয়তা ও শান্তি উৎসাহিত করা। তারা প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত একটি অস্ত্র কারখানাকে “শান্তি ও ভালোবাসার কারখানায়” রূপান্তরিত করেন।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.