কাবুল থেকে দেশে ফিরতে নিউজিল্যান্ড সরকারের সঙ্গে লড়াই করছেন গর্ভবতী সাংবাদিক

আফগানিস্তানে টিকে থাকতে গর্ভবতী নারী এবং শিশুদের কত কঠিন সমস্যা মোকাবিলা করতে হয় তা নিয়ে প্রতিবেদন করতেন তিনি। এখন নিউজিল্যান্ডের এই প্রতিবেদক, যিনি নিজেও গর্ভবতী, কোভিড বিধিনিষেধে ফ্লাইট স্থগিত হওয়ায় নিজ দেশে ফিরতে না পেরে কাবুলে সাময়িক আস্তানা গেড়েছেন।

৩৫ বছর বয়সী শার্লট বেলিস এবং তার বেলজিয়ান সঙ্গী জিম হলবরেকের প্রথম সন্তান এটি। পেশায় ফ্রিল্যান্স চিত্রগ্রাহক জিম নিজেও দুই বছর আফগানিস্তানে থেকেছেন। ২৫ সপ্তাহের গর্ভবতী বেলিস কন্যাসন্তানের মা হচ্ছেন জানিয়ে বার্তা সংস্থা এপিকে বলেন, প্রতিটি দিন যেন একেকটা যুদ্ধ।

তিনি জানান, এখন পর্যন্ত তিনটি ভ্যাকসিন গ্রহণ করেছেন এবং নিউজিল্যান্ড ফিরে আইসোলেশনে থাকবেন তিনি।
“খুবই হাস্যকর ব্যাপারটা। নিউজিল্যান্ড ফিরতে পারা আমার নাগরিক অধিকার। সেখানে স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা রয়েছে, আমার পরিবার রয়েছে। আমার সবকিছু সেখানে”, বলেন বেলিস।

শনিবার নিউজিল্যান্ড হেরাল্ডে লেখা একটি কলামে নিজের এই সমস্যার কথা জানান বেলিস।

নিউজিল্যান্ডর কোভিডবিষয়ক মন্ত্রী হেরাল্ডকে বলেন, তার মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই কর্মকর্তাদের বেলিসের ব্যাপারে সঠিক নিয়ম মেনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দিয়েছে, “যেটা আপাতদৃষ্টিতে আরও ব্যাখ্যার দাবি রাখে বলে প্রতিয়মান হয়েছে।”

বেলিস কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার আফগানিস্তানের প্রতিবেদক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। কাতারের আইন অনুযায়ী অবিবাহিত অবস্থায় সন্তানধারণ নিষিদ্ধ হওয়ায় গত নভেম্বরে তিনি আল জাজিরা থেকে ইস্তফা দেন। এ ব্যাপারে আল জাজিরার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো মন্তব্য করেনি।

এরপর বেলিস বেলজিয়াম যান এবং সেখানে বসবাসের আবেদনের চেষ্টা করেন। কিন্তু আবেদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ততদিনে তার ভ্রমণ ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যেত বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, “তিনি চাইলে এক দেশ থেকে আরেক দেশে ভ্রমণ ভিসা নিয়ে ঘুরতে পারতেন। কিন্তু নিউজিল্যান্ডে ফেরার চেষ্টা করতে করতে হোটেলে থেকে টাকা তো খরচ হতই তার ওপর কোনো অবলম্বন বা স্বাস্থ্য সুবিধাও থাকত না।”

শেষমেশ আগে থেকে ভিসা থাকায় বেলিস এবং তার সঙ্গী আফগানিস্তানে ফিরে আসেন এবং দেশে ফেরার চেষ্টা করতে শুরু করেন। আফগানিস্তানে তাদের বাড়ি রয়েছে এবং সব দিক বিবেচনা করেই তারা কাবুল ফিরেছেন বলে জানান বেলিস।

নিজের এবং সন্তানের স্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে গর্ভধারণের ৩০ সপ্তাহ অতিক্রম করার আগেই আফগানিস্তান ছাড়বেন বলে প্রতিজ্ঞা করে বেলিস বলেন, “ফেব্রুয়ারির শেষ নাগাদ সময় রয়েছে আমার।” তখনো তার বেলজিয়ামের ভিসার এক মাস মেয়াদ থাকবে। নিউজিল্যান্ডে ফিরতে ব্যর্থ হলেও তিনি তখন বেলজিয়ামে যেতে পারবেন।

নিউজিল্যান্ডের কোয়ারান্টাইনের প্রথার বিষয়ে রীতিমতো কাগজের যুদ্ধে নেমেছেন তিনি। নিজেকে শান্ত রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, তার দুশ্চিন্তা হচ্ছে যে এ রকম মানসিক চাপ তার অনাগত সন্তানের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

বেলিস একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের খোঁজ পেয়েছেন এবং তিনি বেলিসকে রাতে কোনো শারীরিক সমস্যা দেখা দিলে ফোন করারও পরামর্শ দিয়েছেন। বেলিস তার ক্লিনিক পরিদর্শন করেন। হাসপাতালটিতে মৌলিক সরঞ্জামাদি রয়েছে এবং একটি ইনকিউবেটরও রয়েছে। যদিও ওই স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ তাকে জানিয়েছেন, ইনকিউবেটরটি বেশির ভাগ সময় অধিকৃত থাকে।

বেলিস একজন আইনজীবীও খুঁজে পেয়েছেন, যিনি জনস্বার্থে বেলিসের কেসটি লড়ছেন। এখন পর্যন্ত তিনি নিউজিল্যান্ড সরকারের কাছে ৬০টির বেশি কাগজপত্র জমা এবং কয়েক শ প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। তারপরও দুবার নিজ দেশে প্রবেশে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন বেলিস।

গত রোববার সরকারের পক্ষ থেকে সর্বশেষ ই-মেইল পেয়েছেন তিনি। তারা বেলিসকে “বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি” হিসেবে পুনরায় আবেদন করতে বলেছেন এবং এতে করে তিনি দেশে ফিরতে পারবেন বলেও জানিয়েছেন তারা। বেলিস জানান, আগে তার আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয় এই বলে যে, “অতীব ঝুঁকিপূর্ণ সময়” হিসেবে যে মানদণ্ড নির্ধারিত রয়েছে গর্ভবতী হিসেবে সে মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে পারেননি তিনি।

“গর্ভবতী নারী হিসেবে যদি আমি ‘ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার’ জন্য উপযুক্ত বিবেচিত না হই, তাহলে আর কে হবে?” প্রশ করেন বেলিস।

বেলিস বলেন, আফগানিস্তানে ফেরার আগে তিনি তালিবানের অনুমতির আবেদন করেন। অবিবাহিত অবস্থায় গর্ভধারণ করা নিয়ে তাকে সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে বলে আশঙ্কা করছিলেন তিনি। যদিও তালিবানেরা ত্বরিত এবং ইতিবাচক সাড়া দেয়।

“আমি স্বাগত জানাই যদিও এটা তালিবানের প্রাতিষ্ঠানিক নীতি নয়। তবে তারা আমার সঙ্গে ভদ্রচিত এবং সদয় আচরণ করেছে। তারা বলেছে, ‘আপনি এখানে নিরাপদ। স্বাগতম আপনাকে’”, বেলিস বলেন।

বেলিস জানান, নিউজিল্যান্ড সরকারের নতুন প্রস্তাবটি গ্রহণ করবেন কি না ভাবছেন তিনি। তার মতে বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি হিসেবে আবেদন করলে তাকে দেশে ফিরতে না দেওয়ার পূর্ববর্তী দায় থেকে সরকারকে অব্যহতি দেওয়া হবে।

“এতে করে নিজেদের দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলার সুযোগ পাবে তারা। সেটা কিছুতেই হবে না”, বেলিস বলেন। সরকারের কোভিড বিধির ফলে কত শত নাগরিক বিভিন্ন দেশে আটকা পড়েছে তার হিসাব নেই, তিনি যোগ করেন।

সূত্র: ভয়েস অব আমেরিকা

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.