সিদ্ধার্থ সিংহের ধারাবাহিক উপন্যাস’পাতাদের ঘরবাড়ি’‌ (নবম পর্ব)

রোকনের আর ভাল লাগছে না। প্রত্যেক বছর এই একই দল ‘মনসা পালা’ করে। প্রতিবার একটু-আধটু পাল্টালেও দেখে দেখে ওর প্রায় মুখস্থ হয়ে গেছে। ওর বেশ মনে আছে, একবার প্রবল ঝড়জলে এমন অবস্থা হয়েছিল যে, মাঝপথে মনসা পালা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আর একবার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল জ্যান্ত সাপ নিয়ে পালা দেখাতে দেখাতে সেই সাপের ছোবলেই বেহুলার অভিনয় করতে থাকা ক্যানিংয়ের এক মহিলা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ায়। এখন সেই বেহুলার জায়গায় নতুন একটা বউ এসেছে।

আগে ও ভাবত, যারা মেয়েদের অভিনয় করে, তারা বুঝি সবাই মেয়ে। কিন্তু পরে, অনেক পরে জেনেছে, এই ধরনের পালায় মেয়েদের পার্ট বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ছেলেরাই করে। এমনিতে সারা বছর এরা চাষবাস করে। কেউ কেউ পরের জমিতে জন খাটে। অনেকে আবার ঘরামির কাজও করে। তবে সারা দিন যে যে-কাজেই থাকুক না কেন, সন্ধ্যার পরে এক জায়গায় জড়ো হয়ে রিহার্সাল করে এবং নিজেরা তো বটেই, সুযোগ পেলে লোক মারফতও বায়না ধরে।

যে দলে যত বেশি মেয়ে থাকে, সে দলের কদর তত বেশি। তাই ওদের দলের মধ্যেই যারা বিয়ে-থা করে, তারা তাদের বউকেও শিখিয়ে পড়িয়ে দলে নিয়ে নেয়। সে সুন্দর হোক চাই না হোক। গায়ের রং যতই কালো হোক, ওরা রং-টং দিয়ে ঠিকই ম্যানেজ করে নেয়। তবে হ্যাঁ, যতই দরকার হোক না কেন, পারতপক্ষে কেউ নিজের বোনকে এ সবে টানে না। কেননা, এ পথে কেউ একবার নামলে, বেশি টাকা পণ দিতে চাইলেও তাকে নাকি আর কোনও ছেলেই সহজে সহজে বিয়ে করতে চায় না।

 

রোকনের আবার কাল সকালে স্কুল আছে। তাই একটু রাত গড়াতেই ওর চোখ যখন ঘুমে বুজে আসছিল, ও তখন বাড়ির দিকে হাঁটা দিল। মন্দির থেকে ওর বাড়ি হাঁটাপথে খুব বেশি হলে মিনিট পনেরোর। ভিতর দিয়ে গেলে আরও কম সময় লাগে। ও সেই শর্টকাট রাস্তাটাই ধরল। এই রাস্তার মাঝামাঝি জায়গায় একটা প্রকাণ্ড বেলগাছ আছে। আগে ওখান দিয়ে যেতে দুপুরবেলাতেও লোকেরা ভয় পেত। বলত, ওই গাছে নাকি ব্রহ্মদত্যি আছে। তাই গ্রামের লোকেরা সবাই মিলে পুজোপাঠ করে ওই গাছের তলায় বড় একটা পাথর বসিয়ে দিয়েছিল। বেলগাছের গুঁড়িটার চার পাশ গোল করে সিমেন্ট দিয়ে বাঁধিয়ে একটা বেদি মতো করে দিয়েছিল। এখন শিবরাত্রিতে আশপাশের মেয়ে-বউরা এই পাথরের মাথায় জল ঢালে। কেউ কেউ মনোবাঞ্ছা পূরণ করার জন্য মানত করে। লাল সুতো দিয়ে ইটের ঢেলা বেঁধে যায়।

তার পাশ দিয়ে যেতে যেতে হঠাৎই একটা গোঙানি শুনে থমকে দাঁড়াল রোকন। কে ওখানে! প্রথমটায় একটু ভয় পেয়ে গেলেও মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে সামলে নিল ও। তার পরেই টর্চ জ্বালল। ভাগ্যিস বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় মনে করে টর্চটা সঙ্গে নিয়েছিল। টর্চের আলোয় দেখল, এক মহিলা বটগাছের বেদিতে শুয়ে আছেন। তিনিই গোঙাচ্ছেন। পাশে একটা ছোট্ট বাচ্চা উপুড় হয়ে তাঁর বুকের দুধ খাচ্ছে। ও যে তাঁর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ওই মহিলাটি নিশ্চয়ই টের পাননি। কিন্তু এত রাত্রে এই মহিলাটি এখানে কী করছেন! দেখি তো গিয়ে… আরও কাছে যেতেই মহিলাটির মুখ দেখেই রোকনের মনে হল, খুব চেনা চেনা। কোথায় যেন দেখেছে! কোথায়! কোথায়! কোথায়! হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে, ইনিই তো একটু আগে মনসামন্দিরে ছিলেন, তাই না!

 

ঠিক মতো বসত গড়ে ওঠার আগেই সাপের উপদ্রপ থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য ওখানকার আশপাশে যে-ক’জন বাড়ি করেছিলেন, মূলত তাঁরাই চাঁদা তুলে কোনও রকমে গড়ে তুলেছিলেন টালির ছাউনি দেওয়া এই মনসামন্দির। যদি কোনও দিন অবস্থা ফেরে, তখন নাহয় মন্দিরের সামনে একটা নাটমন্দির বানিয়ে নেওয়া যাবে। সেই হিসেবে সামনে খানিকটা জমিও ছেড়ে রেখেছিলেন তাঁরা।

পরে, ধাপে ধাপে মন্দিরে লাইট আনা হয়েছে। ঝোলানো হয়েছে ইয়াব্বড় একটা পেতলের ঘণ্টা। মন্দিরের লাগোয়া আরও ঘর তোলা হয়েছে। মেঝেটায় সিমেন্ট করা হয়েছে। ছাদটাও ঢালাই করা হয়েছে এবং তার উপরে তোলা হয়েছে মন্দিরের চুড়ো। প্রত্যেক বছর বাৎসরিক পুজোর আগে পুরো মন্দির রং করা হয়। আশপাশের আগাছা নিড়োনো হয়। সব মিলিয়ে ওটা এখন পুরোদস্তুর একটা মন্দির।

এখানকার লোকেরা বলেন, এই মন্দির নাকি খুব জাগ্রত। তাই প্রথম কয়েক বছর পুজোর এক সপ্তাহ আগে থেকেই ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে এ-গ্রাম ও-গ্রাম সে-গ্রামে জানিয়ে দেওয়া হত— অমুক দিন হাঁড়ি বন্ধ। এখন অবশ্য লোকেদের আর মনে করিয়ে দিতে হয় না। এমনিই সবার মনে থাকে। তবু নিয়ম অনুযায়ী ঢ্যাঁড়া পেটানো হয়। সে দিন আশপাশের কোনও বাড়িতেই উনুন ধরানো হয় না। আগের দিন রাতেই ভাত রান্না করে জল দিয়ে রাখা হয়। যাতে পরদিন পান্তা খেতে পারেন। বাড়িতে কেউ উনুন না ধরালেও ওই দিন কিন্তু মন্দিরের আশপাশে রাস্তার ধারে ধারে তেলেভাজার দোকান বসে যায়। সেখানে আলুর চপ, ফুলুরি এবং বেগুনি পাওয়া গেলেও পিঁয়াজি পাওয়া যায় না।

মহা ধুমধাম করে পুজো হয়। সন্ধে হলেই মাইকে ঘোষণা করা হতে থাকে, প্রতিবেশীদের দলেদলে এই পুজোয় যোগদান করার জন্য। দেখতে দেখতে ভিড় উপচে পড়ে। শুধু স্থানীয় লোকেরাই নন, দূর-দূরান্ত থেকেও প্রচুর লোকজন আসেন। নাটমন্দির করার জন্য সামনের খোলা জায়গাটায় শামিয়ানা টাঙানো হয়। কারণ মনসা পুজো মানেই ছিটেফোঁটা হলেও একটু না একটু বৃষ্টি তো হবেই। কে বলতে পারে, জোরে হবে না! তাই এই ব্যবস্থা। ওই শামিয়ানার নীচেই মনসা পালা হয়। চার দিক ঘিরে চেয়ার পাতা থাকে। সেখানে বড়রা বসেন। তাঁদের সামনে বাচ্চাদের বসার জন্য ত্রিপল পেতে দেওয়া হয়।

তবে শুরুর সময় যত ভিড় থাকে, যতই রাত বাড়ে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পাতলা হতে শুরু করে সেই ভিড়। প্রত্যেক বার দেখা যায়, ভোরের দিকে মনসা পালা যখন শেষ হয়, তখন হাতে-গোনা মাত্র গুটিকতক লোক রয়েছেন। তার মধ্যে আবার বেশির ভাগই ঘুমে কাতর

এ বারও যাঁরা মনসা পালা শেষ হওয়ার আগেই মন্দির চত্বর ছেড়েছিলেন, তার মধ্যে রোকন একজন। তার মানে এই মহিলাটি তারও আগে বেরিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি গোঙাচ্ছেন কেন! কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করতেই তিনি আরও জোরে ডুকরে গোঙাতে লাগলেন। গোঙাতে গোঙাতেই সামনের দিকে আঙুল তুলে কী যেন একটা দেখাতে লাগলেন। রোকনের মনে হল, এই মহিলাটির কাছে নিশ্চয়ই টর্চ নেই। তাই অন্ধকারের মধ্যে কী দেখতে কী দেখেছেন! আর যা দেখেছেন, সেটাকেই হয়তো ভূতটুত ভেবে ভিরমি খেয়েছেন। এত ভয় পেয়েছেন যে। ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে এখানেই শুয়ে পড়েছেন। ওঠার আর ক্ষমতা নেই

কিন্তু কী দেখাচ্ছেন তিনি! টর্চ জ্বালিয়ে দেখতে গিয়ে রোকন একেবারে হতবাক হয়ে গেল। দেখল, সামনের শিরীষ গাছটার সঙ্গে একটা লোককে কে বা কারা বেঁধে রেখে গেছে। শুধু বাঁধেইনি, নিশ্চয়ই খুব মারধরও করেছে। জামাকাপড় সব ছেঁড়া। নাক মুখ থেকে রক্ত ঝরছে। মনে হচ্ছে হুঁশ নেই। কেমন যেন অচৈতন্যের মতো কাত হয়ে আছেন। দড়ি দিয়ে বাঁধা না থাকলে হয়তো পড়েই যেতেন

কয়েক মুহূর্ত মাত্র। প্রাথমিক ঘোর কাটতেই রোকন সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেল সেখানে। দড়িটড়ি খুলে তাঁর সমস্ত ভার নিজের কাঁধে নিয়ে ধীরে ধীরে লোকটাকে বেলগাছটার তলায় বাঁধানো বেদিটার উপরে বসিয়ে দিল, কারা বাঁধল আপনাকে? কারাই বা মারল

কিন্তু লোকটা তখন কথা বলার মতো অবস্থাতে নেই। তবু বিড়বিড় করে যা বললেন, তাতেই একেবারে তাজ্জব হয়ে গেল রোকন। লোকটার বয়ান অনুযায়ী, মাস দুয়েকও হয়নি তাঁরা ও দিকের ফাঁকা মাঠে বাড়ি করে এসেছেন। মনসাপুজো হচ্ছে শুনে বউ আর বাচ্চাকে নিয়ে দেখতে এসেছিলেন। কিন্তু এখানকার লোকজন কে কেমন তাঁরা এখনও জানেন না। এতক্ষণ খালি পড়ে থাকলে ঘরে যা আছে সেটুকুও যদি বেহাত হয়ে যায়! তাই তাঁরা বাড়ি ফিরছিলেন। তাড়াতাড়ি বাড়ি যাওয়ার জন্য এই পথটা ধরেছিলেন। কিন্তু এখানে আসতেই… হঠাৎ কোথা থেকে চার-পাঁচটা ছেলে হুড়মুড় করে এসে তাঁদের ঘিরে ধরল। তাঁদের এই ছোট্ট ছেলেটার গলায় ছুরি ধরে একজন বলল, যা বলছি কর। না হলে দেখতে পাচ্ছিস তো… এক্ষুনি টেনে দেব। বলেই, একজন তাঁর বউকে জাপটে ধরল আর বাকিরা তাঁকে ধাক্কা মেরে মেরে ওই গাছটার কাছে নিয়ে যেতে লাগল। তিনি যেই বাধা দিতে গেলেন, অমনি তাঁকে ওরা দু’-তিন জন মিলে রাস্তায় ফেলে চড়, থাপ্পড়, ঘুসি, লাথি যে যেমন ভাবে পারল বেধড়ক মারল। তিনি কাহিল হয়ে পড়তেই তাঁকে দড়ি দিয়ে ওই গাছের সঙ্গে বেঁধে ফেলল। তার পর তাঁর বউকে ওই বেদিটায় তুলে নিয়ে গিয়ে

রোকন বলল, তার পর কী

লোকটা বললেন, আমার চোখের সামনেই

লোকটার কথা শেষ হওয়ার আগেই বউটা ফের ডুকরে কেঁদে উঠলেন

রোকন জানতে চাইল, আপনারা চিৎকার করেননি কেন? লোকজনকে ডাকেননি কেন

লোকটা বললেন, আমার মুখ চেপে ধরেছিল

তাঁর বউকে দেখিয়ে রোকন বলল, উনি তো ছিলেন

লোকটা বললেন, ওর মুখে কাপড় গুঁজে দিয়েছিল

— টাকাপয়সা সোনাদানা সব নিয়েছে? রোকন জিজ্ঞেস করতেই লোকটা কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, না। সে সব কিছু নেয়নি। থাকলে তো নেবে

— তা হলে

রোকনের কথা শুনে দু’জনেই হাউহাউ করে কেঁদে উঠলেন। বউটা ততক্ষণে কোনও রকমে উঠে বসেছেন। বউটার দিকে চোখ পড়তেই রোকন চমকে উঠল। দেখল, বউটার চেহারা কেমন যেন বিধ্বস্ত। শাড়ি-ব্লাউজ ছেঁড়া। পোশাক আলুথালু। হাতে-টাতে নখের আঁচড়। চোখেমুখে ভয়ংকর আতঙ্ক। এর আগে ও কোনও দিন এ রকম কোনও পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি। বুঝতে পারল না, ও কী করবে! কার কাছে নিয়ে যাবে! কাকে পাবে এত রাত্রে

ঠিক তখনই ওর মনে পড়ে গেল টুম্পার কথা। ক’দিন আগেই সোনারপুর স্টেশনের গায়ে অটোস্ট্যান্ডের সামনে টুম্পার সঙ্গে ওর দেখা হয়েছিল। বালিগঞ্জ স্টেশনের টিকিট কাউন্টারের সামনে লিফলেট লাগানোর কথা বলেছিল। ও কখন থাকে না থাকে ফোনে জেনে নিয়ে ওর বাড়ি এসে লিফলেট পৌঁছে দিয়ে যাবে বলে, ওর মোবাইল নম্বরটা চেয়েছিল। তখন ও-ও তার নম্বরটা মোবাইলে সেভ করে নিয়েছিল। সেই নম্বর তো তার কাছে আছে

সঙ্গে সঙ্গে রোকন ফোন করল টুম্পাকে। টুম্পা তখন বাড়িতে ঘুমোচ্ছিল। ধড়মড় করে ছুটে এল সেখানে। ওঁদের দেখে টুম্পার বুঝতে কোনও অসুবিধে হল না— বাচ্চাটার গলায় ছুরি ঠেকিয়ে, স্বামীটাকে মারধর করে গাছের সঙ্গে বেঁধে, তাঁর চোখের সামনেই তাঁর বউটাকে

টুম্পা আর একটুও সময় নষ্ট করল না। সঙ্গে সঙ্গে ফোন করল থানায়।

১৮

 

তিন দিন আগে থেকেই ঠিক ছিল বারুইপুরের শো-হাউজে অচিন আর রিচি ম্যাটিনি শো দেখতে যাবে। সেই মতো আগে থেকে ফোনে কথা বলে নিয়ে অচিন যে ট্রেনে উঠেছে, শুধু সেই ট্রেনেই নয়, সেই লাস্ট কামরাতেই উঠেছিল রিচি। উঠেই অচিনকে বলল, শো তো সেই তিনটেয়। এত তাড়াতাড়ি আসতে বললি কেন?

অচিন বলল, চলই না…

রিচি বলল, সিনেমায় যাবি না?

— যাব তো…

— তার আগে কি অন্য কোথাও যাবি?

অচিন বলল, সে রকমই তো ইচ্ছে আছে।

— আমি কিন্তু তোর কোনও বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়স্বজনের বাড়ি যাব না। আগেই বলে দিচ্ছি…

— কেন?

— আমার ইচ্ছে।

অচিন বলল, এ ভাবে কথা বলছিস কেন?

রিচি বলল, তুই কাল রাতে কার সঙ্গে অতক্ষণ ধরে কথা বলছিলি?

— আমি? রাত্রে? কোথায়! তোর সঙ্গেই তো রাত সাড়ে বারোটা অবধি কথা বললাম…

— তার পরে?

অচিন অবাক, তার পরে!

— ন্যাকামি করিস না। আমি তো ফোন করেছিলাম…

— কেন?

রিচি বলল, ঘুম আসছিল না দেখে… দেখলাম, যত বারই তোকে ফোন করলাম তত বারই শুধু বিজি বিজি আর বিজি…

— কিন্তু তোর সঙ্গে কথা বলার পরে আমি তো আর কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলিনি!

— দেখি তোর ফোনটা…

অচিন প্যান্টের পকেট থেকে ফোনটা বের করে রিচির দিকে এগিয়ে দিল। রিচি সেটা নিয়ে কয়েক মিনিট কী সব ঘাঁটাঘাঁটি করে বলল, কল লিস্ট থেকে ওই নম্বরটা ডিলিট করে দিয়েছিস, না?

— কী যা তা বলছিস…

রিচি ওকে ফোনটা দিতে দিতে বলল, না। কাল তো প্রথম নয়। মাঝে মাঝেই দেখি তোর নম্বরটা বিজি।

— তুই কি আমাকে সন্দেহ করছিস?

রিচি বলল, তুই হলে কী করতিস?

— এই, মুডটা নষ্ট করে দিস না তো… চল…

— কোথায়?

— কেন? না বললে যাবি না, না কি? চল।

স্টেশন চত্বর ছাড়িয়ে গুটিগুটি পায়ে ওরা বড় রাস্তায় এসে দাঁড়াল। ও পারে একটা লস্যির দোকান দেখে অচিন বলল, লস্যি খাবি?

রিচি বলল, না।

— খুব ভাল বানায়।

— তুই জানলি কী করে? এ দিকে আসিস নাকি?

— এটাও দোষের?

— না। খাব না। চল, কোথায় যাবি, চল…

বাঁ দিকে খানিকটা এগিয়ে বারুইপুর থানার সামনে একটা ট্রেকারকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অচিন জিজ্ঞেস করল, এটা কি কুমোরহাট যাবে?

ট্রেকারওয়ালা বলল, এখান থেকে পাবেন না। রেল গেটের ও-পারে চলে যান। ওখান থেকে অটো পেয়ে যাবেন।

রিচি জিজ্ঞেস করল, ওখানে কার বাড়িতে যাবি?

অচিন বলল, কারও বাড়িতে না।

— তা হলে!

— এত প্রশ্ন করিস কেন? দ্যাখ না কোথায় যাই।

আর কোনও কথা বলল না রিচি। অচিনের পাশে পাশে ছায়ার মতো হাঁটতে হাঁটতে রেল গেট পেরিয়ে কুমোরহাটগামী একটা অটোয় উঠে পড়ল। না। কেউ কারও সঙ্গে কথা বলল না। মিনিট দশেক অটো যাওয়ার পরে অটোওয়ালাকে অচিন বলল, দাদা, আমাদের একটু কুমোরহাট পোস্ট অফিসে নামিয়ে দেবেন তো…

অটো থেকে নামতেই রিচি দেখল, ডান হাতে মসজিদের বিশাল বড় একটা গেট। অচিন ওকে নিয়ে সেই গেটের ভিতর দিয়ে ঢুকতেই রিচি দেখল, সেটা কোনও মসজিদ নয়। ফাঁকা রাস্তা। সেই রাস্তা ধরেই হাঁটতে লাগল ওরা।

রিচি বলল, যেখানে নামলাম, সেখান থেকে আর কিছুটা গেলেই কুমোরহাট হাইস্কুল…

— তুই এ দিকটা চিনিস?

— চিনব না কেন? এখানে আসবি বললে তো ওই লক্ষ্মীকান্তপুর লোকালে করেই আমরা কৃষ্ণমোহনে নামতে পারতাম।

অবাক হয়ে অচিন বলল, কৃষ্ণমোহন!

— হ্যাঁ, রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহনের নামে স্টেশন…

— ও বাবা, এত জানিস!

রিচি বলল, এই, একদম ইয়ার্কি মারবি না তো…

— ওই দ্যাখ, ওই বটগাছটা দেখতে পাচ্ছিস?

— বাবা, কত বড় বটগাছ রে! এ তো গাছ নয়, একেবারে মহীরুহ!

অচিন বলল, এটাই তোকে দেখাতে এনেছি।

— এই বটগাছ দেখাতে এনেছিস? তুই যে বললি শো হাউজে নিয়ে যাবি?

— যাব তো, এখানে কিছুক্ষণ থেকে তার পরে যাব।

রিচি বলল, দেরি হয়ে যাবে না?

অচিন বলল, এখান থেকে শো হাউজ মাত্র তিন কিলোমিটার। অটোয় গেলে বেশিক্ষণ লাগবে না।

— তো, হঠাৎ করে এখানে এলি কেন?

— এটা দেখতে…

রিচি অবাক হয়ে বলল, একটা বটগাছ দেখতে!

— শুধু বটগাছ নয়, একটা ইতিহাস দেখতে…

— ইতিহাস?

অচিন বলল, হ্যাঁ, ইতিহাস…

ওরা বটগাছটার একদম কাছে যেতেই রিচি বলল, এ কী রকম বটগাছ রে! বাবা, এত ডালপালা-ঝুরি! বহু পুরনো বলে মনে হচ্ছে…

— বহু পুরনো তো বটেই। এটা কত বছরের পুরনো, সেটা নাকি এখন আর কেউই বলতে পারে না। কেউ বলে এটা দুশো বছরের পুরনো, কেউ বলে তিনশো বছরের, আবার কেউ বলে তার চেয়েও বেশি পুরনো…

রিচি বলল, ওই দ্যাখ, গাছটার গুঁড়ির মধ্যে একটা ঘর মনে হচ্ছে না!

— মনে হওয়া-টওয়ার ব্যাপার নেই। ওটা ঘরই।

— ঘর! গাছের গুঁড়ির মধ্যে ঘর বানাল কে!

অচিন বলল, কেউ গাছের গুঁড়ির মধ্যে ঘর বানায়নি। আমার মনে হয়, ঘর বানানোর বহু বছর বাদে সেই ঘরের কার্নিস থেকে নিশ্চয়ই বটগাছের চারা বেরিয়েছিল। কিন্তু কেউ ছেঁড়েনি। তাই ওটা বাড়তে বাড়তে আজ এই মহীরুহের আকার নিয়েছে।

— মাথার উপরে এত বড় একটা গাছ হল, অথচ তার ভারে এই ঘরটা ভেঙে পড়ল না!

— না। কারণ, গাছের শিকড়বাকড় আর ঝুরি এই ঘরের প্রত্যেকটা ইটকে এমন ভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জাপটে ধরে আছে যে, চেষ্টা করলেও ভাঙা তো দূরের কথা, হাজার চেষ্টা করলেও একটা ইটও কেউ খুলতে পারবে না।

রিচি একটু অবাক হয়ে বলল, কিন্তু এ রকম একটা ফাঁকা জায়গায়… দুশো-তিনশো বছর আগে তো নিশ্চয়ই আরও ফাঁকা ছিল, তখন হঠাৎ করে এখানে এমন একটা ঘর বানাতে গেল কে!

— আমার মনে হয়, তখনকার দিনের বর্ধিষ্ণু কোনও জমিদার এটা বানিয়েছিলেন।

— কেন? হঠাৎ করে এখানে কেন?

অচিন বলল, যাতে স্নান করে উঠে মেয়ে-বউরা নিশ্চিন্ত মনে ওখানে জামাকাপড় ছাড়তে পারে, সে জন্যই এই নদীর ঘাটে এটা বানিয়েছিলেন।

— নদী! সেটা কোথায়?

— ওই তো, সামনেই। মাটির ঢিপিটার জন্য দেখতে পাচ্ছিস না। ঢাকা পড়ে গেছে। চল চল, এগিয়ে চল… দেখতে পাবি।

কয়েক পা যেতেই চোখের সামনে যেটা ভেসে উঠল, তা দেখে রিচি বলে উঠল, এটা নদী!

— হ্যাঁ রে বাবা নদী, এটা গঙ্গা। আদি গঙ্গা। গড়িয়া, সোনারপুর, রাজপুর, বারুইপুর, কীর্তনখোলা হয়ে এটা সোজা বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশেছে।

— তা বলে এত সরু! মনে হচ্ছে একটা নালা…

অচিন বলল, এখন শীর্ণ দেখালেও আগে কিন্তু এ রকম ছিল না। অনেক অনেক চওড়া ছিল। কিছু দিন আগেও এই গাছের গুঁড়ি থেকে ওই নদীর দূরত্ব ছিল দুশো মিটারেরও কম। এখন পলি পড়ে পড়ে এতটাই মজে গিয়েছে যে, দূরত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে তিনশো মিটারেরও বেশি। মানে নদীটা এ পাড় থেকে একশো আর ও পাড় থেকে একশো, মোট দুশো মিটার সরু হয়ে গিয়েছে।

রিচি বলল, এখানে বসবি?

— বাবা, অটো করে তো এলি। ওই গলির মুখ থেকে এটুকু আসতেই পা ব্যথা হয়ে গেল!

— না রে, পা ব্যথা হয়নি। এই জায়গাটা বেশ ভাল লাগছে। কেমন ঠান্ডা ঠান্ডা, না! মনে হচ্ছে চারপাশটা দু’চোখ ভরে দেখি… কী সুন্দর, না…  বস না…

— বসতে চাইছিস যখন… চল। ওইখানটায় গিয়ে বসি।

অচিন আর রিচি বটগাছটার সামনে অন্য একটা গাছের তলায় পাশাপাশি বসে পড়ল। আর বসামাত্রই অচিনের মোবাইল বেজে উঠল। পকেট থেকে ফোনটা বের করে ধরতে যাওয়ার আগেই অচিন দেখল, রিচি তার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে। তাই লাইনটা কেটে আবার পকেটে রাখতে গিয়েই দেখল, ফের ফোনটা বাজছে। সঙ্গে সঙ্গে আবার কেটে পকেটে রাখতে যেতেই আবার বেজে উঠল তার ফোন। অচিন ঠিক করল, ফোনটা মিউট করে দেবে। সেটা করতে যাওয়ার সময় রিচি বলল, ধর ধর ধর। ফোনটা ধর। কথা বল। তোকে অনেকক্ষণ ধরে চেষ্টা করছে। আমার সামনে কথা বলতে অসুবিধে হলে বল, আমি ও দিকে গিয়ে দাঁড়াচ্ছি…

— তোকে যেতে হবে না, বস।

— তা হলে ফোনটা ধর।

— ধরছি। বলেই, অচিন ফোনটা ধরে খুব আস্তে আস্তে কথা বলতে লাগল। সে কী বলছে শোনার জন্য কান খাড়া করল রিচি। হু-হু করে হাওয়া বইছে দেখে ঠিক মতো শুনতে পাচ্ছে না ও। তাই অচিনের গা ঘেঁষে বসল। অচিন আগের থেকেও আরও আস্তে আস্তে, একেবারে ফিসফিস করে কথা বলতে লাগল। সেটা দেখে রিচি একেবারে অচিনের গায়ের সঙ্গে লেপটে গেল। এ বার আর ফিসফিসও নয়, রিচি দেখল অচিনের ঠোঁট দুটো শুধু নড়ছে। থাকতে না পেরে বাধ্য হয়ে জিজ্ঞেস করল, কে?

মুচকি হেসে রিচির দিকে মোবাইলটা এগিয়ে দিল অচিন। সেটা নিয়ে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রিচি দেখল, তাতে ইংরেজি ক্যাপিটাল অক্ষরে বড় বড় করে লেখা— ছোটকা।

সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা অচিনের হাতে দিয়ে ও বলল, তুই না সত্যি… পারিসও বটে… ভীষণ ইয়ে… যাঃ। এ রকম কেউ করে! বলবি তো… আর আমি… ছিঃ!

অচিন আবার মোবাইলটা কানের কাছে নিয়ে আগের মতোই খুব আস্তে আস্তে কথা বলতে লাগল। কথা বলতেই লাগল।

চলবে………

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.