আজ বুরুঙ্গা গণহত্যা দিবস

মহান    মুক্তিযুদ্ধের নয়মাস জুড়েই সারা দেশে চলেছে গণহত্যা। বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নির্বিচারে বাঙালিদের হত্যা করেছে। চালিয়েছে ধংসযজ্ঞ। ২৫ মার্চ ১৯৭১, অপারেশন সার্চ লাইটের মাধ্যমে শুরু হয় তাদের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তাদের লক্ষ্য ছিলো গোটা জাতিকে নিশ্চিন্হ করে এবং বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নসাধ স্তব্ধ করে দেওয়া। যেখানেই তারা হামলা চালিয়েছে, সেখানেই বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে, নির্বিচারে চালিয়েছে হত্যাকাণ্ড। এমন কি সাধারণ মানুষ চলার পথেও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। এ কারণে এত কম সময়ের একটি যুদ্ধে এত অধিক নিরস্ত্র ও সাধারণ মানুষকে হত্যার নজির বিশ্বে বিরল। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এই হত্যাকাণ্ড বিশ্বমানবতার বিরুদ্ধে এক জঘণ্যতম করুণ দৃষ্টান্ত। বাড়িঘর ভষ্মিভুত করা, সম্পদ লুটতরাজ, মা-বোনের সম্ভ্রমহানির সাথে সাথে তারা যখনই পেরেছে বাঙালিদের সারিবদ্ধ করে চালিয়েছে আধুনিক মারণাস্ত্রের গুলি। প্রায় প্রতিদিনই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পরিকল্পিতভাবে এসব গণহত্যা চালিয়েছে। দেশ জুড়ে প্রকৃতপক্ষে কত মানুষকে হত্যা করেছে তার সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও সংখ্যাটি নিঃসন্দেহে ৩০ লাখের বেশি। এ কারণেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১০ই জানুয়ারি ১৯৭২ সালে স্বাধীন দেশে ফিরে জনতার উদ্দেশে বলেছিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আর কোন যুদ্ধে এত সাধারণ মানুষের প্রাণহাণির ঘটনা ঘটেনি। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে দেশের নানা স্থানে পাওয়া যায় গণকবর। দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে এসব গণকবর ও গণহত্যার বিষয়ে চালানো হয় অনুসন্ধান। এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ সহস্রাধিক গণকবর ও গণহত্যা ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। চিহ্নিত করা হয়েছে এক সহস্রের অধিক বধ্যভূমি। ২৬ মে ১৯৭১, ঘটে বুরুঙ্গা গণহত্যা ।
একাত্তরের ২৬ মে পাকবাহিনী ওসমানীনগর থানার বুরুঙ্গা হাই স্কুল মাঠে শান্তি কমিটি গঠনের নামে আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের নারী-পুরুষদের একত্র করে স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগীতায় তাদের নির্মমভাবে হত্যা করে । ক্যাপ্টেন নুরউদ্দিন খানের নেতৃত্বে সেদিন নারকীয় এই গণহত্যায় নিহত হন শতাধিক নিরীহ মানুষ। এলাকাবাসীর সূত্রে জানা যায়, গোলাবাজারের কুখ্যাত রাজাকার সাদ উদ্দিনের সহযোগিতায় বালাগঞ্জ উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ চালায় পাক বাহিনীরা। গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী ও মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে জানা যায়, ২৫শে মে দুপুরবেলা, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আসার খবরে বুরুঙ্গা এবং তার আশপাশের পামের লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিকাল ৪ টার দিকে তারা স্থানীয় চেয়ারম্যান ইনজাদ আলীর সাথে দেখা করে। এরপর তারা বুরুঙ্গা এবং তার আশপাশের গ্রামে ঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করে যে ২৬শে মে, বুরুঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে একটি শান্তি কমিটি গঠন করা হবে এবং ‘পিস কার্ড’ বিতরণ করা হবে। মনে আতঙ্ক নিয়ে , সকাল ৮ টা থেকে বুরুঙ্গা এবং তার আশপাশের গ্রামের মানুষ বুরঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এসে জমা হতে থাকে। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রায় এক হাজারেরও বেশি মানুষ এসে সমবেত হয়। সকাল ৯টায় পাকিস্তানের চর আব্দুল আহাদ চৌধুরী এবং ডঃ আব্দুল খালেক, ক্যাপ্টেন নূর উদ্দিনের তত্বাবধানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাথে জীপে করে বিদ্যালয় মাঠে আসে। তাদের হাতের তালিকা দেখে উপস্থিত মানুষের হিসাব মিলিয়ে খুশী হয়। এরমধ্যে পাক হানাদারদের সহযোগীদের অন্য একটি দল গ্রামের ঘরে ঘরে গিয়ে পুরুষদের বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে উপস্থিত হতে রীতিমত আদেশ দেয়। সকলে এসে উপস্থিত হলে সকাল ১০টার দিকে, তারা উপস্থিত গ্রামবাসীদেও মধ্যে হিন্দু এবং মুসলিমদের পৃথক পৃথকভাবে দলবদ্ধ করে। যারা হিন্দু ছিলো তাদের অফিস কক্ষে একত্র করা হয় এবং মুসলিমদের বিদ্যালয়ের অন্য একটি শ্রেণীকক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীতে কালেমা পাঠ করতে এবং পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত গাইতে বলা হয় এবং তাদেও বেশীরভাকে ছেড়ে দেয়া হয়। বাকি মুসলিমদের বলা হয় চারগাছি দড়ি দিয়ে হিন্দুদের বেঁধে দিতে। সসময় উপস্থিত হিন্দুরা চিৎকার করতে শুরু কওে ও পালাবার চেষ্টা করে। শ্রীনিবাস চক্রবর্তী নামে একজন আটককৃত ঘরের একটি জানালা খুলে ফেলে। প্রীতি রঞ্জন চৌধুরী, বুরুঙ্গা উচ্চ বিদ্যালযয়ের প্রধান শিক্ষক, রানু মালাকার, একজন হিন্দু যুবকসহ বন্দীদের সাথে ছিলেন, তারা জানালা দিয়ে বেড় হয়ে প্রান বাঁচাতে দৌড় দেয় ।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের উপর গুলি চালায়, কিন্তু তারা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। দুপুরের দিকে, বিদ্যালয় ভবন থেকে আটককৃত সকল হিন্দুদের বাইরের মাঠে নিয়ে আসা হয়। তাদের নব্বই জনকে তিনটি সারিতে দাঁড় করানো হয়। এরপর ক্যাপ্টেন নূর উদ্দিনের নির্দেশে তিনটি লাইট মেশিনগান থেকে তাদেও একসাথে বার্স্ট ফায়ার করা হয়। সাথে সাথে তারা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। জালিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তখন তাদের মৃতদেহের উপর কেরোসিন ঢেলে দিয়ে তাতে আগুন জ¦ালিয়ে দেয়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে আটক সিলেট জজ কোর্টের একজন নামকরা এবং প্রভাবশালী উকিল রাম রঞ্জন ভট্টাচার্যকে তারা দেয় ও চলে যেতে বলে। তিনি তার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াতেই তাকে পিছন থেকে গুলি করা করে পাক হানাদারেরা । তিনি তৎক্ষণাৎ সেখানে মারা যান। এই হত্যাকান্ডের পর, আব্দুল আহাদ চৌধুরী এবং ডঃ আব্দুল খালেকের নেতৃত্বে আট থেকে দশ জন দোসরের একটি দল বুরুঙ্গা গ্রামে লুটপাট চালায় এবং নারীদের নির্যাতন করে। পরের দিন ২৭ মে, পাকিস্তানি হানাদাররা আবার বুরুঙ্গায় আসে। সেদিন তারা চেয়ারম্যান ইনজাদ আলীর সহযোগিতায় তারা কিছু শ্রমিক দিয়ে বুরুঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশে একটি গর্তে দগ্ধ এবং অর্ধদগ্ধ অবশিষ্ট হিন্দু মৃতদেহগুলোকে মাটি চাপা দেয় । শ্রীনিবাস চক্রবর্তী, জিতেন্দ্র বাইদ্যা এবং অধির মালাকার সহ খুব কম লোকই, অনেকগুলো বুলেটে আহত হবার পরও প্রাণে বেঁচে যায়। এই গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নিবাস চক্রবর্ত্তী বলেন, বর্বর গণহত্যার মঞ্চে দাঁড়িয়ে চোখের সামনে বাবা, ভাইসহ অগণিত মানুষকে গুলি করে এবং পুড়িয়ে হত্যা করতে দেখেছি। ভাগ্যক্রমে গুলিবৃদ্ধ হয়েও বেঁঁচে গিয়েছিলাম। সে দিনের স্মৃতি আজও শরীর শিহরিত করে। ১৯৮৪ সালে, বাংলাদেশ সরকার গণহত্যার এই স্থানটিকে ইটের দেয়ালে পরিবেষ্টন করে দেয়। পরবর্তীতে, এই নৃশংস হামলায় নিহতদের স্মৃতি রক্ষার্থে একটি স্মৃতিসৌধ স্থাপন করা হয়।
দেশ জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এসব বধ্যভূমি এবং গণহত্যার ঘটনাগুলো বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে৷ তাদের জানাতে হবে আমাদের পূর্বপুরুষেরা কতটা বিপদ, কতটা কষ্ট করে এদেশের স্বাধীনতা করেছে৷ স্বাধীনতা অর্জনে কত জীবন দিয়েছে এ জাতি, কত রক্ত ঝড়িয়েছে দেশের মানুষ৷ রক্তে কেন এই স্বাধীনতা রক্ষায় শপথ নিতে হবে৷ শহীদদের মর্যাদা দিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নিতে হবে৷
কাজী সালমা সুলতানা, লেখক এবং গণমাধ্যম কর্মী ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.