সিরিয়াস বিষয় তবুও একটু হালকা কথা দিয়েই বলছি। খিচুড়ি থেকে ডাল আলাদা করা যায় না। All the Prime Minister’s Men – Al Zajira এর রিপোর্টটি এখন হটকেক তো বটেই এমনকি পত্রিকাগুলো কাটতি কাঁটিয়ে উঠারও একটি সুবর্ণ সুযোগও বলা যায়। তবে দেশের পত্রিকাগুলো সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগাতে পারছে বা পারবে, সেটা ভিন্ন বিষয়। কেননা পত্রিকাওয়ালাদের ঘাড়ে যে ৫৭ নামক খড়গ ঝুলে আছে। তাই বলাই যায় ৫৭ কে সম্মান করে, কার্টিসি বজায় রেখেই পত্রিকায় বিষয়টি আসবে, এটা নিশ্চিত ছিলাম এবং দেখছিও তাই । তাছাড়াও ৫৭ থাকুক আর নাই বা থাকুক, বর্তমানে চাটুকারিতা আর দলাদলি বা দালালিতে পত্রিকাগুলো এতটাই পারদর্শী যে, ৫৭ ছাড়াই সংবাদ কর্মিরা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বলিদান হয়ে আত্মতৃপ্তিতে ভোগে । এমনকি গর্বের বুক ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দু’ পয়সা কামাতেও কম যান না। সুতরাং ৫৭ ধারা তাদের বেশিরভাগের ক্ষেত্রেই মূলত সুবিধেজনক একটি তর্কের বয়ান মাত্র। একবার ভাবুনতো কেন সুবিধেজনক বয়ান ? কেননা এই ৫৭ কে বাতিলে জন্য এই সাংবাদিক ভাইদের এককাট্টা হতে দেখিনি। উল্টো মোলায়েম বচনের স্বীকৃতি দেখেছি।
অমি সুবর্ণা সুযোগ বলাতে আবার কেউ ফুঁসে উঠবেন না, প্লিজ । আমি নিজেও বেশ অবগত আছি যে, বিষয়টি দেশের সর্বোচ্চ সম্মানের প্রতিষ্ঠান ও দেশের নির্বাহী বিভাগের সর্বোচ্চ চেয়ার প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে রিপোর্ট। দেশের মুখে ছাই দেবার রিপোর্ট । এমনকি ইজ্জত নিয়ে টানাটানি রিপোর্ট কেননা স্বীকার করুন আর নাইবা করুন, রিপোর্টটি করেছে আন্তর্জাতিক মানের হাতেগোনা কয়েকটি সংবাদ সংস্থার মধ্যে একটি । সুতরাং এই রিপোর্টের এসপাড় ওসপাড় হতেই হবে।
কেন এসপাড় ওসপাড় হতে হবে ? কারণটিও বেশ স্পষ্ট। এই রিপোর্টের উপর ভরসা করে জাতিসংঘ ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ আর্মি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ? তদন্তের দাবি জানিয়েছে । কেননা পিচ মিশনের বড় অংশ বাংলাদেশ আর্মি থেকেই রিক্রুটমেন্ট হয় । নাম যেহেতু পিচ মিশন সুতরাং নৈতিকতার প্রশ্নেই প্রশ্ন আসবে, এটাই স্বাভাবিক বটে। সেই নৈতিকতার প্রশ্নের বিপরীতে এখন দেশের সরকারকে তার সঠিক পদক্ষেপটি নিতে হবে, তা না হলে কোথাকার জল কোথায় গিয়ে পরে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। কেননা সুযোগের সন্ধানে সব দেশই ঈগল নজর রাখবে যে । একবার হাতছাড়া হলে ফিরে পাবার সম্ভাবনা ক্ষীণ থেকেও ক্ষীণ হবে, এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। সুতরাং সিরিয়াস বিষয়টি নিয়ে সরকার এখন সাপ- লুডু না খেলে, সাপ- লাঠি খেলায় মত্ত হলেই মঙ্গল। যেহেতু স্বয়ং জাতিসংঘ উদগ্রীব হয়ে উঠেছে, রিপোর্টের তথ্যের ভিত্তিতে, সুতরাং সঠিক জবাব বা সঠিক তদন্ত বা সঠিক পদক্ষেপ সরকারকেই নিতে হবে এবং প্রমাণও হাজির করতে হবে।
অদুর ভবিষ্যতে যদি সত্যি অর্থেই জাতিসংঘ অসন্তোষ প্রকাশ করে এবং আর্মি রিক্রুটমেন্ট কমিয়ে দেয়, তাহলে দেশের আর্মির ভিতরে যে অসন্তোষ দেখা দিবে, সেটার ফলাফল এই জাতির জন্য শতভাগ অমঙ্গলজনক হবেই হবে। আর্মি প্রতিষ্ঠানটি এখন অব্দি একমাত্র প্রতিষ্ঠান যেখানে দূর্ণীতি নামক ভুতটি তেমনভাবে চড়াও হতে পারেনি । আর্মি পার্সনরা অতিরিক্ত ইনকামটি এই পিচ মিশন থেকেই করে থাকে। এখন ভাতের পাতে ছাই পড়লে সেই ছাই উড়বেই বলে আশংকা করি ।
আল- জাজিরার রিপোর্টের ভিতরের অংশ ইতিমধ্যেই সবার জানা হয়ে গেছে। ইতিমধ্যেই ইংরেজি থেকে বাংলা হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পরেছে এবং রিপোর্টের ভিতরের বিষয় নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। চুলচেরা বিশ্লেষণ হবে এটাই স্বাভাবিক এবং হোক। আমরা সাধারণ জনগণ চাইবো সেই সব বিশ্লেষণের মধ্যে দিয়ে সত্য বের হয়ে আসুক। কেননা এটা এখন সত্যি অর্থেই জাতীয় বিষয়। সরকারকে অবশ্যই এর বিহিত করতেই হবে। হোক সেটা আন্তর্জাতিক দেশ বা জাতিসংঘের কারণে অথবা নিজ দেশের জনগণের কারণে। অবশ্য এটাও সত্য যে যদি সরকারকে আন্তর্জাতিকভাবে মোকাবিলা করতে না হয়, সেই ক্ষেত্রে নিজ দেশের জনগণের ভাবনাকে সরকার শূণ্যভাগও মূল্যায়ন করবে না । যদিও এটা দেশের জনগণের জন্য অপমান ও দুঃখের। তবে এই অপমান ও দুঃখের জন্য আবার জনগণ নিজেরাই দায়ী শতভাগ, সুতরাং ফলাফল তো ভোগ করতেই হবে ।
ভিতরের কনটেক্সট নিয়ে তাই আর লিখছি না। তবে এর পার্শ প্রতিক্রিয়া বা জ্বলন কিংবা উল্টোভাবে বলা যায়, বিরোধীদের জন্য ফলন ( যা বিরোধীদল আশা করে ) কি হচ্ছে বা চলছে, সেটা এখন মূল্যবান অবশ্যই। কেন মূল্যবান ? একটি সাম্প্রতিককালের উদহারণ দেই। সেটা হলো টিকা রাজনীতি। আমাদের দেশে রাজনীতি হয় না এমন বিষয় নেই বললেই চলে । হোক না সেটা মানবিক বা জাতীয় বিষয় কিংবা একান্তই ব্যক্তিগত, তাতে কি ? ছাড় দেবার পাত্র আমরা বাঙালিরা মোটেও না । উপরন্তু সব বিষয়কেই রাজনীতি করণ করে, কচলাতে কচলাতে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাই, সবকিছু অবশেষে তেতো হয়ে যায়। অতঃপর জনগণ ত্যাক্ত- বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নেয়। আল- জাজিরার রিপোর্টতো রীতিমতো রাজনৈতিক খাদ্য বটেই, সুতরাং এটা ছাড়ের প্রশ্নই উঠে না। তবে উপরে যে দূর্বলতার কথা বললাম, সেই কারণে ফলাফল যে খুব বেশি জনগণ, জাতী বা ভিন্ন রাজনৈতিক দলের ঘরে যাবে, সেটাও ভাবতে পারছি না। অতিত এমন অনেক রেকর্ড ও উদহারণ বরাবর খুঁজে পাওয়া যায়।
লক্ষণীয় যে, আল- জাজিরা বোমা ফাটালো। সেই শব্দ বিশ্বের নানানপ্রান্ত শুনতে পেলো। আমাদের সরকার কতটুকু শুনতে পেলো সেটা অবশ্য আরো অপেক্ষা করতে হবে । তবে শোধ- প্রতিশোধের খেলা নয়, হকচকিয়ে উঠে সরকারের উচ্চপর্যায়ের থেকে মধ্যেম পর্যায়ের কিছু লোক সব ল্যাজেগোবরে করে বসলো। কথায় বলে, কিসের মাঝে কি, পান্তাভাতে ঘি। স্পিন বলে ব্যাটিং করতে টুপির বদলে হ্যামলেট পরেই ঘামলো । ৭১, মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধাপরাধী বিচারকে ঢাল করে , বল না বুঝেই শূণ্যে হিট, বল বাতাসে এবং উল্টো ছক্কার বদলে ক্যাচআউট। সরকারপন্থী বলে চিহ্নিত সাংবাদিকেরা প্রথম দিকে ফিল্ডিং করলো বটে, তবে বলের দিক না বুঝেই দৌড়ালো, ফলাফল হলো বাউন্ডারি । এদিকে জোরালো হলো আল- জাজিরার প্রতিবেদনের ভার্সান। ইংরেজি থেকে বাংলা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে ইউ টিউবে ছড়াছড়ি। এমনকি BBC এর মতন গণমাধ্যম আল- জাজিরার রিপোর্টকেই প্রকাশ করে সূত্র উল্লেখ করে। বলা যায় আল- জাজিরার ভিত্তি আরো মজবুত তো হলোই, পাশাপাশি ঘোষণা এলো আরো অনেকগুলো রিপোর্ট অপেক্ষামান ( সত্য- মিথ্যা জানিনা)। অবস্থা এখন এমন যে, একেতে রাস্তা ভিজা তার উপর কলার ছিলকা । সামনে দেখার বিষয় সরকার পিছল খায় না ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে ?
তবে আল- জাজিরা যে যেনতেন আন্তর্জাতিক মাধ্যম নয়, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না । বিশ্বজুড়ে আল- জাজিরার গ্রহণযোগ্যতা একেবারেই কম নয় । নির্ভরযোগ্য সংবাদ মাধ্যম বলেই পরিচিত। মালয়েশিয়ার নাজির রাজার কেলেঙ্কারির ঘটনা এই আল- জাজিরাই প্রথম প্রকাশ করেছিলো এবং অতঃপর জেলে। আল- জাজিরার রিপোর্টের কল্যাণেই মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট আব্দুল্লাহ ইয়ামিন এখনও জেলের রুটি খাচ্ছে। আল- জাজিরার রিপোর্টকে প্রত্যাখ্যানের সরকারের যুক্তিও একেবারেই ফেলে দেবার মতন নয়। ৫ ই মের হেফাজতের তাণ্ডবে মৃত্যুরসংখ্যা এবং যুদ্ধাপরাধীর বিচার নিয়ে আল- জাজিরার রিপোর্ট যে পরিষ্কার জল ছিলো না, এমনকি ঘোলা জলে মাছ শিকারের প্রয়াশ ছিলো, সেটাও কিন্তু অস্বীকার করা হবে সত্যের অপলাপ। তার মানে আবার এই নয় যে, সরকার বাহাদুর ঘুম থেকে উঠে আল- জাজিরার রিপোর্ট দেখে কেবলমাত্র জানলো দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের লোকেরা দূর্ণীতিতে জড়িয়ে আছে । আল- জাজিরার রিপোর্টের কি এতটাই প্রয়োজন আছে উচ্চ পর্যায়ের দূর্ণীতির খবর পেতে ? সেগুলো তো দেশের পত্রিকাগুলোই প্রতিনিয়ত দিয়েই যাচ্ছে।
আল- জাজিরা দেখালো শেখ হাসিনার লোক বলে, সেটাই কি দেশবাসী সর্বপ্রথম দেখলো সন্ত্রাসীরা উচ্চ পর্যায়ের ক্লাশমেম্বর ? দেশের পত্রিকাগুলো কি এত চাটার পরেও, প্রেসিডেনট সহ মন্ত্রী- মিনিস্টার বা এমপি মহাদয়দের সাথে খুনি- গুণ্ডা- সন্ত্রাসীদের ছবি লাল রিং করে ছাপে নি ? অনেক ছেপেছে তবে প্রতিকার হয় না । সুতরাং আল- জাজিরা বলেছে বলেই যে আসমান থেকে পড়তে হবে, তা কিন্তু মোটেও না।
লক্ষণীয় যে, দেশের পত্রিকাগুলো সরকারের বিভিন্ন সংস্থা সহ নেতাদের প্রতিবাদ বা ভাষ্য অনায়াসেই ছাপাচ্ছে তবে কোনো অবস্থাতেই আল- জাজিরার রিপোর্টের ভিতরের কনটেক্সট ছাপাবার হীম্মত দেখাতে পারলো না । ডেইলি স্টারের বিখ্যাত সম্পাদক তো আফসোস করে লিখেই দিয়েছেন, ৫৭ এর প্যাঁচে পরে মূল রিপোর্টের বিষয় উল্লেখ করে লাইন বাই লাইন বিশ্লষণের করার অধিকার হারিয়েছেন। বলাই বাহুল্য ৫৭ এর কড়া ধমক কর্ণগুহরে ভালোই ইকো করে । ওই যে কথায় বলে না, বেড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে ? আপনারা সাংবাদিকরাই ৫৭ এর জন্য দরজা- জানালা খুলে রেখেছিলেন । এখন দম নেন ।
সরকার অবশ্য বলতেই পারে আমরা তো আল- জাজিরা বন্ধ করিনি। অবশ্যই এই বিষয়ে সরকারকে প্রশংসা করতেই হবে। সরকার অন্তত অনুধাবন করতে পেরেছে, ডিজিটাল যুগে বন্ধ করা ভালো কোনো কাজ নয়। সরকার তো নিজেই জানে ডিজিটালের কল্যাণে কত দরজা- জানালা খোলা থাকে। সুতরাং বন্ধ করলেও লাভের গুর পিঁপড়ে খাবে। তবে এটাও সত্য যে সরকার যে একবারে উন্মুক্ত সাংবাদিকতার কল্যাণেই বন্ধ করেনি, এমনটাও বলা হবে সত্যের অপপ্রচার। আল- জাজিরা কাতার ভিত্তিক মাধ্যম। সরকার ভালো করেই জানে আল- জাজিরা বন্ধ ঘোষণা করা মানে,টাকার কুমির শেখদের গরম মাথায় তাপ দেওয়ার সমান। শেখদের অপমান বোধ পশ্চিমাদের নিকট না থাকলেও, নরমের উপর ভালোই প্রভাব খাটায়। কেননা শ্রম বাজার বিষয় নিয়ে বরাবরই নাক উঁচিয়ে চলে । এটা কিন্তু বলার জন্য বলছি না, বাস্তবতা তাই ।
আল- জাজিরা এত্তবড় রিপোর্ট করলো অথচ দেশের সেই সেনা প্রধান এখনও আমেরিকার মতন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান নিয়ে, আমেরিকার আর্মির সর্বত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে। তেলে জলে একেবারেই না মিশার কথা থাকলেও, ভালোই চলছে। ওই যে বললাম শেখরা আবার পশ্চিমাদের বিষয়ে অপমানিত হয় না । এদিকে আজকের জাতীয় পত্রিকায় দেখালাম কথিত সামির নামে বিরাট ফিরিস্তি। ডেভিট বার্গম্যানের বিষয়ে এতদিন শোনা গেলেও এবার সামির অপকর্মকা বেশ ভালোই সামনে চলে এসেছে। ঢিলের বিপরীতে পাটকেল ভালোই পড়ছে। তবে যত কথাই সরকার বলুক না কেনো, আপন ঘরের ভিতরে যে ফাংগাস ছেঁয়ে আছে, সেটা অস্বীকার করা আর অবৈধ টাকায় হালাল মাংস খোঁজা সমান। লেখার শেষে একটি প্রশ্ন রেখেই শেষ করবো। আচ্ছা, আল- জাজিরা এই উপমহাদেশের অনেক কেলেঙ্কারি বড়শি ফেলে ধরে ফেলে, বেশ ভালো । আল- জাজিরা কি শেখদের কোনো কেলেঙ্কারি কখনো ধরতে এতটা সক্ষম ? নাকি অন্ধকারের বাদুড় এক চোখা ?

বুলবুল তালুকদার
যুগ্ম সম্পাদক শুদ্ধস্বর ডটকম

