অ্যাডভোকেট আনসার খান :মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকায় তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের প্রভাবপ্রতিপত্তি ক্রমবর্ধমানভাবে বেড়ে চলেছে।বিশেষকরে, রিসেপ তাইয়েফ এরদোগানের তুরস্কের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে দেশটির বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম লক্ষ্য ছিলো আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর সাথে সুসম্পর্ক স্হাপনের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে তুরস্কের প্রভাব বৃদ্ধি করা এবং ওই অঞ্চলের আরব ও মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে তুরস্ককে আঞ্চলিক নেতা ও শক্তি হিসেবে অধিষ্ঠিত করা।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে তুরস্কের প্রভাব
তুরস্ক আন্ত-মহাদেশীয় একটি দেশ।এর ৯৭% ভূমি পড়েছে এশিয়া মহাদেশজুড়ে এবং ৩% ভাগ ভূমি ইউরোপ মহাদেশভূক্ত।দেশটি বলকান,ককেশাস, মধ্যপ্রাচ্য এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরের চৌমাথায় অবস্হিত।এর চারদিকে রয়েছে, উত্তর-পশ্চিমে গ্রীস,বুলগেরিয়া এবং উত্তরে ব্ল্যাক সি,উত্তর-পূর্ব জর্জিয়া,পূর্বে আর্মেনিয়া, আজারবাইজান ও ইরান, দক্ষিণ-পূর্বে ইরাক,দক্ষিণে সিরিয়া ও ভূমধ্যসাগর এবং পশ্চিমে এজিয়ান সাগর।
এইকারণে,”তুরস্ককে ইউরোপ ও এশিয়া মহাদেশের মধ্যে সংযোগ সেতুবন্ধ বা ক্রসরোড” হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে।তাই নি:সন্দেহে বলা যায়,ভৌগোলিক অবস্হান ও এর রাজনৈতিক ভূমিকার কারণে তুরস্ক বিশ্বপরিসরে গুরুত্বপূর্ণ একস্থান দখল করে আছে।উল্লেখ্য,তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য এবং ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সামরিক শক্তিতে দেশটির অবস্হান দ্বিতীয়। অর্থ্যা আমেরিকার পরেই তুরস্কের অবস্হান। এছাড়া, তুরস্কের রয়েছে সমৃদ্ধ এক অর্থনীতি।
তুরস্ক ভৌগোলিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের সাথে সংযুক্ত হলেও এটি মধ্যপ্রাচ্যের দেশ নয় এবং দেশটি আরব দেশও নয়।তবে ইতিহাস,সংস্কৃতি ও সামাজিক আচরণের দিক দিয়ে আরবদেশগুলোর সাথে তুরস্কের সাদৃশ্য রয়েছে। তুরস্ক এবং আরবদেশগুলো অনেক বিষয়ে অর্থনৈতিক যোগসূত্রের সাথে সংযুক্ত।এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলো পর্যটন।আরবদেশগুলো থেকে প্রতিবছর প্রচুর পর্যটক তুরস্কে যাতায়াত করে থাকেন।বৃহৎ অংশের আরবীয়রা প্রতিবছর তুরস্কে এসে মাথার চুল প্রতিস্হাপনের প্যাকেজ থেকে উপকার পেয়ে থাকে।এটি পর্যটনের আওতাভুক্ত এবং এর থেকে তুরস্ক বিশাল আর্থিক লাভবান হয়ে থাকে। এটি এখন তুরস্কের একটি দ্রুত অর্থনৈতিক বর্ধনশীল খাত।
রাজনৈতিক পণ্ডিতদের মতে, এরদোগানের আশুলক্ষ্য মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকায় তুরস্কের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা,তবে তাঁর চুড়ান্ত লক্ষ্য হলো অটোমান সাম্রাজ্য পূনরুদ্বার করা।কেননা,”এরদোগান নিজেকে মুসলিম বিশ্বের খলিফা হিসেবেই দেখে থাকেন,”- বলেছেন কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পিস বিল্ডিং ও রাইটস প্রোগ্রামের পরিচালক ডেভিড ফিলিপস।
মধ্যপ্রাচ্যে তুরস্ক ক্রমবর্ধমান নেতৃত্বের ভূমিকা গ্রহণ করছে এবং ওই অঞ্চলে তার শক্ত অবস্হান ও উপস্হিতিকে আরও সুসংহত করছে।গত একদশকে তুরস্ক তার নিকট প্রতিবেশী মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক গভীরতর করে তুলেছে।
তার্কিস-আরব কোঅপারেশন ফোরাম(টিএএফ), তার্কি- জিসিসি হাই লেভেল কৌশলগত ডায়ালগ ইত্যাদি হচ্ছে মাল্টিলেটারাল প্লাটফর্ম, যার মাধ্যমে তুরস্ক ও মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিমদেশশুলোর সম্পর্ক গভীরতা পেয়েছে। এছাড়া দ্য হাই লেভেল কৌশলগত কোঅপারেশন কাউন্সিল(ওয়াইডিএসকে),যেটি তুরস্ক, ইরাক,সিরিয়া ও লেবাননের মধ্যেকার বহুপাক্ষিক চুক্তির দ্বারা পরিচালিত হয়ে রাষ্ট্র গুলোর মধ্যে সম্পর্ক প্রসারিত হচ্ছে ও এই অন্জ্ঞলে তুরস্কের প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তুরস্কের বৈদেশিক নীতি অন্যান্য শক্তির তুলনায় এর নীতিটিকে এক অনন্য উচ্চতা দিয়েছে,যা প্রায়শই সাধারণ মানুষের ভাগ্যের চেয়ে কৌশলগত লক্ষ্য এবং রাজনৈতিক স্হিতিশীলতা স্হাপনের উদ্দেশ্যেই পরিচালিত হচ্ছে বলে বিবেচনা করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ।
তুরস্ক যে গণতন্ত্র, ইসলাম এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে শামিল হতে সক্ষম হয়েছে তা এটিকে একটি আকর্ষনীয় মডেল হিসেবে তোলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষকরে,২০১১ সালের আরব বসন্তের পর থেকে তুরস্ককে একটি মূল আন্জ্ঞলিক শক্তির ভূমিকায় উন্নীত করেছে।এখনও পর্যন্ত আন্কারা প্রমাণ করে দিয়েছে যে,ওয়াশিংটন বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোনো দেশ নয়,বরং তুরস্কই আন্জ্ঞলিক উন্নয়ন,শান্তি,নিরাপত্তা ও স্হিতিশীলতা রক্ষার সাথে সামন্জস্যতা বজায় রাখছে।
তুরস্কের বহুমাত্রিক বৈদেশিক নীতি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি, স্হিতিশীলতা স্হাপন করা ও আন্জ্ঞলিক সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য সহায়তা করে যাচ্ছে এবং দৃঢ়তার সহিত এর প্রতি সক্রিয় সমর্থন দিয়ে চলেছে।
তুরস্কের বহুমাত্রিক বৈদেশিক নীতি গ্রহণ,বিশেষকরে, আরব রাষ্ট্রগুলো তথা মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি গৃহিত নীতির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো -” সৌদিআরবের পরিবর্তে তুরস্ককে আরব ও মুসলিম বিশ্বের নেতা হিসেবে অধিষ্ঠিত করা”- অভিমত রাজনৈতিক পণ্ডিতদের।
তাই তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগানের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য সম্প্রসারণবাদী নীতির প্রয়োগ জোরদার করা।এ প্রসঙ্গে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পিস-বিল্ডিং অ্যান্ড রাইটস প্রোগ্রামের পরিচালক ডেভিড ফিলিপস বলেন,এরদোগান তাঁর লক্ষ্য অর্জনের জন্য “-তুরস্কের বাইরেও,- “সম্প্রসারণবাদী নীতি”অনুসরণ করে চলেছেন।”সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রেক্ষিতে, “এরদোগান সিরিয়া ও ইরাকে কুর্দিদের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালিয়েছিলেন এবং তাঁর সামরিক বাহিনীকে লিবিয়ায় তুরস্কের প্রভাব বিস্তারে ব্যবহার করেছেন,”-
বলেন ফিলিপস।
বিধ্বস্ত সিরিয়া থেকে উত্তর ইরাকের ভূমিহীন কুর্দি অঞ্চল,তেল সমৃদ্ধ কাতার থেকে পূর্ব এবং পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলি,বলকান থেকে শুরু করে একটি বলকানাইজড লিবিয়া পর্যন্ত, তুরস্কের সামরিক হস্তক্ষেপের বৃদ্ধি পাওয়াকে পর্যবেক্ষকরা দেখছেন তুরস্কের অটোমান সাম্রাজ্যের পূনরুদ্বার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে।
তুরস্ক অন্যান্য মুসলিম ও আরব দেশগুলোতে নিজের অবস্হানকে একীকরণ ও তথায় প্রভাব বৃদ্ধির জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এর মধ্যে কাতার একটি লক্ষ্য হিসেবে পরিণত হয়েছে এবং দেশটি তুরস্কের একটি সুরক্ষিত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। এই লক্ষ্যে ২০১৫ সালে কাতারে একটি সামরিক ঘাঁটি স্হাপন করেছে তুরস্ক।অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর মধ্যপ্রাচ্যে এইজাতীয় প্রথম সামরিক ঘাঁটি এটি।
তুরস্ক সিরিয়া ও লিবিয়ায় আইএসআই সন্ত্রাসবাদী ও ইসলামি উগ্রবাদীদের মাধ্যমে সহিংসতা এবং অস্হিতিশীলতার পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দেশটি পশ্চিমা বাহিনীর হামলার পরে সিরিয়া ও ইরাক থেকে পালিয়ে আসা হাজার হাজার আইএসআই সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দিয়েছে। এরদোগান তাঁর ভূ-রাজনৈতিক ও ধর্মীয় এজেন্ডা প্রসারের জন্য শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে আইএসআই সন্ত্রাসীদেরকে দক্ষতার সাথে ব্যবহার করে আসছেন বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।কূটনীতির চেয়ে বেশি শক্তি প্রয়োগ করে তুরস্ক আরব বিশ্বে তার প্রভাব ও উপস্হিতি প্রসারিত করে চলেছে। গত এক বছরে দেশটি উত্তর-পূর্ব সিরিয়াকে দখল করেছে,ইরাকের গভীরে পৌঁছে গেছে এবং লিবিয়ার গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করেছে।
২০১৬ সালের পর থেকে দেশটির সামরিক ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে।এর সামরিক বাজেট ২০১৯ সালে ছিলো ২০.৪ বিলিয়ন ডলার।আর ২০২০ সালে দেশটির সামরিক বাজেট বৃদ্ধি পেয়ে দাড়িঁয়েছে ২৯.৪ বিলিয়ন ডলার।( সূত্র: স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইন্সটিটিউট)।
সিরিয়ায় তুরস্কের সেনা উপস্হিতি সম্পর্কে এরদোগান মন্তব্য করেছিলেন,” আমাদের হাজার বছরের প্রতিবেশী ও ভাই,সিরিয়ার জনগণ স্বাধীনতা, শান্তি ও সুরক্ষা না পাওয়া পর্যন্ত আমরা সিরিয়ায় অবস্হান করবো।”
লিবিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপের মধ্যদিয়ে মিশর,সৌদিআরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সমর্থিত হাফতার বাহিনীর বিরুদ্ধে জাতীয় সমঝোতা সরকারের (জিএনএ)পক্ষে অবস্হান নিয়েছে তুরস্ক। তুর্কি লেখক ক্যাগাপ্টের মতে,সিরিয়াতে তুরস্কের একাধিক উদ্দেশ্য রয়েছে।” “তুরস্ক নিশ্চিত করতে চাইছে যে,রাজধানী ত্রিপোলীতে আন্কারা-বান্দ্বব সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা সঙ্গত হবে না,কারণ তুরস্ক গাদ্দাফির যুগের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঋণ সংগ্রহ করে তুরস্ক ও লিবিয়ার পূণর্গঠনের বিষয়ে অংশ নিতে চায়।”
আফ্রিকাতে,এরদোগান ২০০৫ সাল থেকে,”ওপেন টু আফ্রিকা নীতি” শুরু করেছিলেন,যা এখনো অব্যাহত আছে।তখন থেকেই তুরস্ক এই মহাদেশের অনেক দেশের সাথে সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে শুরু করেছিলো। দেশটি আফ্রিকার দেশগুলোতে কয়েক ডজন দূতাবাস খুলেছে।বর্তমানে ৪২টি দূতাবাস রয়েছে আফ্রিকান দেশগুলোতে।অথচ ২০১৩ সালে এই সংখ্যা ছিলো মাত্র ১২টি।
আফ্রিকান দেশগুলোর সাথে সামরিক সম্পর্ক ছাড়াও বাণিজ্যিক সম্পর্কও গড়ে তোলেছে তুরস্ক। ২০১৮ সালের সর্বশেষ হিসেবে জানা গেছে ওই দেশগুলোর সাথে বাণিজ্যিক লেনদেনের পরিমাণ ছিলো তেইশ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
মূলতঃ মধ্যপ্রাচ্যের আরব ও মুসলিম রাষ্ট্রগুলোসহ বিশ্বের মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর ওপর প্রভাব বৃদ্ধির মাধ্যমে আঞ্চলিক নেতা হিসেবে বিশ্বনেতৃত্বের আসনে মুসলিম রাষ্ট্রসমুহের প্রতিনিধিত্ব করতে চাইছেন এরদোগান এবং এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে তিনি তাঁর পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করেছেন বলে পর্যবেক্ষকদের অভিমত।
লেখক: আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

