বাবা তুমি কান্না করতেছ যে! সাদা পোশাকের কেউ বাবাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর মেয়ের সঙ্গে বাবার কথোপকথনের একটা অংশ ছিল এই সংলাপ। এরপর গুলির শব্দ, আহত মানুষের যন্ত্রণার শব্দ এবং মৃত্যু। টেলিফোনের অপর প্রান্ত থেকে শুনছে কন্যা এবং স্ত্রী। ঘটনার নাম ক্রসফায়ার, ঘটনার কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল মাদক দ্রব্য ইয়াবা, ঘটনার সঙ্গে জড়িত আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী। এলাকায় এবং দলে পরিচিত ও জনপ্রিয় বাবাকে এর পর গুলিবিদ্ধ লাশ হিসেবে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেদিন মেয়ের সঙ্গে টেলিফোনে বাবার কথা এবং বাবাকে করা মেয়ের এই প্রশ্ন অনেককে বিচলিত করেছিল, কাউকে কাঁদিয়েছিলও। কিন্তু ক্ষমতায় থেকে যারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করেন তাদের কতটা ভাবিয়েছিল তা বলা মুশকিল। কারণ এটাই প্রথম ঘটনা ছিল না আর ঘটনা এখানেই থেমে থাকেনি। ক্ষমতাসীন দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের কেউ কেউ এটাকে ভুল বলে আখ্যায়িত করলেও ভুল সংশোধনের কোনো পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়নি। কক্সবাজারের একজন প্রবীণ সাংবাদিক জার্মানির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘২০১৮ সালের ৪ মে থেকে গত ৩১ জুলাই পর্যন্ত কক্সবাজারে ক্রসফায়ারে ২৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পুলিশের গুলিতে ১৬৯ জন, বিজিবির গুলিতে ৬০ জন ও র্যাবের গুলিতে ৫১ জন মারা গেছেন।’
একরামের মতো অনেকের মৃত্যুর কথা মানুষ ভুলে গেছে, তাদের প্রিয়জনদের কান্নার শব্দ মিলিয়ে গেছে কিন্তু ইয়াবা চোরাচালান যে বন্ধ হয়নি তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
অতীতের অনেক ঘটনা, মানুষের ক্ষোভ এবং দেশে-বিদেশে সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ক্রসফায়ারের সাজানো গল্পের কারণে বিরোধী জনমত প্রবল হয়ে উঠতে থাকে। ২০০৭ এর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পর নির্বাচিত সরকার কি পুরনো এই পথ অনুসরণ করবে কি না, পুরনো গল্পের কাঠামো একই রেখে শুধু নাম পাল্টে দেবে কি না এ ধরনের প্রশ্ন উঠতে থাকে। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ ঘোষণা করেছিল, ‘দল ক্ষমতায় গেলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা হবে।’ নির্বাচনী ইশতেহার হলো জনগণের কাছে দেওয়া রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ কর্মকান্ডের অঙ্গীকারনামার মতো। নির্বাচনে জনগণের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় গেলে সে তা বাস্তবায়ন করবে অথবা ক্ষমতায় যেতে না পারলে জনগণের কাছে দেওয়া অঙ্গীকারের পক্ষে জনমত গঠনের আন্দোলন করবে। কিন্তু নির্বাচনে জিতে গেলে আগের প্রতিশ্রুতি যে শুধু শ্রুতিকথায় পর্যবসিত হয় তা আবার প্রমাণ হতে সময় লাগল না।
ক্ষমতায় যাওয়ার পর ২০০৯ সালে প্রথম আট মাসে র্যাব ও পুলিশের হাতে ৬০ জনের মৃত্যু হয়েছিল, এরপর তা আর থামেনি। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে ক্রসফায়ারে ২০১৬ সালে ১৭৭ জন, ২০১৭ সালে ১৪১ জন, ২০১৮ সালে ৪২১ জন এবং ২০১৯ সালে ৩৮৮ জন নিহত হয়েছে। আর ২০২০ সাল তো চলমান। পথের শেষে কী দেখা যায় দেখি!
বিনাবিচারে হত্যার সংস্কৃতি যে দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দেয় তার নজির কম নেই। ক্রমাগত এর পক্ষে প্রচারণা চালাতে থাকলে এমন এক মানসিক জগৎ গড়ে ওঠে যে কেউ কেউ এমনকি সংসদে দাঁড়িয়েও পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে বলতে থাকেন এমন পরিস্থিতিতে ক্রসফায়ার ছাড়া যেন অপরাধ দমনের বিকল্প উপায় নেই। প্রকৃতপক্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তারই ধারাবাহিকতায় অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা রাশেদ খান হত্যার শিকার হলেন। সিনহার বদলে যদি অন্য কোনো সাধারণ নাগরিক একইভাবে হত্যার শিকার হতেন বা অতীতেও যারা হয়েছেন তাদের মতো হতো তাহলে ঘটনাটি আড়ালেই থেকে যেত। একটা বিষয় কিন্তু খুবই তাৎপর্যপূর্ণ, মেজর রাসেদ সিনহার হত্যার সঙ্গে যে পুলিশ কর্মকর্তাদের নাম জড়িয়ে আছে তাদের নামে এবং বেনামে বিপুল সম্পত্তির খবর পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত হলো ঘটনার পর পরই। এত বিপুল সম্পদ তো হঠাৎ করে হয়নি, যে বেতন তারা পেতেন তা থেকে সঞ্চয় করেও এত সম্পত্তির মালিক হওয়া সম্ভব ছিল না। তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সব জেনেও যথাযথ ভূমিকা পালন করেনি কেন, এই প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়।
আদালত হচ্ছে জনগণের শেষ আশ্রয় এবং অপরাধীদের আতঙ্ক। মানুষ আদালতের কাছে ভরসা পায় আর অপরাধী পায় ভয়। ব্যাপারটা এখন আর তেমন থাকছে না। বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড বলে ক্রসফায়ারের ঘটনায় উচ্চ আদালতে গিয়েও লাভ হচ্ছে না। ২০০৯ সালের ১৭ নভেম্বর ক্রসফায়ার নিয়ে সুয়োমোটো রুল জারি করে হাইকোর্ট। ১৪ ডিসেম্বর শুনানি শুরুর কথা ছিল এ রুলের। তবে ওই দিন হাইকোর্ট বেঞ্চে সময় আবেদন নিয়ে হাজির হন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। ক্রসফায়ার বন্ধ রাখার মৌখিক নির্দেশ দিয়ে ওই সময় পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করে হাইকোর্ট। বার্ষিক অবকাশ শেষে ২০১০ সালের ৩ জানুয়ারি উচ্চ আদালত খোলার পর দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। ভেঙে দেওয়া হয় বিচারপতি এ এফ এম আবদুর রহমান ও মো. ইমদাদুল হক আজাদের বেঞ্চ। এখন পর্যন্ত এ সুয়োমোটো রুলের শুনানি হয়নি। ‘জাস্টিস ডিলেইড জাস্টিস ডিনাইড’, বিচার বিলম্বিত না করার এবং বিচারপ্রার্থীর অধিকারের সুরক্ষা নিয়ে বহুল কথিত এই নীতি যেন মুখ থুবড়ে পড়ল এক্ষেত্রে। এছাড়াও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে হাইকোর্টে আরও তিনটি রিট রয়েছে। এগুলো রাষ্ট্রপক্ষের হস্তক্ষেপে আর এগোয়নি। এসব দেখে এবং শুনে এখন সাধারণ মানুষও ভাবছে, ও আর কিছু হবে না।
রাষ্ট্র পরিচালনায় যারা আছেন তারা তো প্রতি মুহূর্তে সংবিধানের দোহাই দেন, সংবিধানকে সমুন্নত রাখার প্রতিজ্ঞা করেন, সংবিধানের বাইরে কিছুই করার নেই বলে কখনো কখনো অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন। অথচ সংবিধানের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘আইনের চোখে সব নাগরিক সমান এবং প্রত্যেকে আইনের সমান সুযোগ পাবেন।’ অনুচ্ছেদ ৩১ অনুসারে, আইন অনুযায়ী এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না, যাতে কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে।’ অনুচ্ছেদ ৩২ বলছে, জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে কোনো ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাবে না। আর অনুচ্ছেদ ৩৫(৩) অনুযায়ী ফৌজদারি অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচার লাভের অধিকারী হবেন। ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার-সহ বিভিন্ন নামে যা চলছে তাতে সংবিধান ও নাগরিক অধিকার কি সমুন্নত থাকছে? তাহলে এভাবে সংবিধান ও আইন পদদলিত, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিচারের পথ রুদ্ধ করে এবং ব্যক্তিবিশেষকে আইন হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ দিয়ে লাভটা কার হচ্ছে এ বিষয়টি গভীরভাবে ভেবে দেখা উচিত। বলা হয়ে থাকে রাষ্ট্র ও সরকারের কাজ অপরাধীর বিচার করা, বিচারবহির্ভূত যেকোনো কাজ বন্ধ করা এবং কেউ তা করতে চাইলে তার লাগাম টেনে ধরা। রাষ্ট্র নিজে যদি এ কাজ করতে থাকে তাহলে বুঝতে হবে রাষ্ট্র কার স্বার্থে এই কাজ করছে। তা ছাড়া এ ধরনের অপরাধের বিচার এবং অপরাধীদের শাস্তির জন্য দ্রুত বিচার আইন তো আছেই। ৬০ দিনের মধ্যে সেই আইনে বিচার করার আইনি সুযোগও আছে। তাহলে এক দিনের মধ্যে ক্রসফায়ারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণের জন্যও খুব গুরুত্বপূর্ণ।
কাউন্সিলর একরামের কন্যা কিংবা মেজর (অব.) সিনহার মায়ের কান্না মনে দাগ কেটেছে অনেকেরই। কিন্তু এত বেশি ও ঘন ঘন এ ধরনের ঘটনা ঘটছে যে তা সাময়িক আলোড়ন তুলে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। অনেকটা পুকুরে ঢিল ছোড়ার পর তরঙ্গের মতো। কিন্তু ঘটনা ভুলে গেলেও যে রেশ থেকে যাচ্ছে তা হলো আতঙ্ক। ক্ষমতাসীন দল ও বিভিন্ন বাহিনীর প্রতি আতঙ্ক। আতঙ্কের সমাজে গণতন্ত্রকে খুঁজে পাওয়া যায় না। গণতান্ত্রিক সমাজ হবে আতঙ্কমুক্ত। যাদের ক্ষমতা বেশি আতঙ্ক ছড়ানোর ক্ষমতাও তার বেশি। বিচ্ছিন্নভাবে দুর্বৃত্তরাও সাময়িক আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে কিন্তু গণতান্ত্রিক আইন ও গণতান্ত্রিক আইনের শাসন বহাল করেই দুর্বৃত্ত দমন করা উচিত। এতে জনগণের মনে আস্থা ও বিশ্বাস সৃষ্টি হয়। মতের বিরুদ্ধতাকে সহ্য না করা এবং বিরোধী মতকে দমন করার অনেক বেদনাময় ইতিহাস আমাদের জানা আছে। এতে শুধু ব্যক্তি নিশ্চিহ্ন হয় তা নয় পঙ্গু হয় গণতান্ত্রিক চেতনা। রাজনৈতিক কাজে তো বটেই সামাজিকভাবেও কোনো আন্দোলনে যুক্ত হলে শুভানুধ্যায়ীরা বলেন, ‘এসব বাদ দাও! কখন যে ক্রসফায়ারে মরে পড়ে থাকবে তার ঠিক কি আছে?’ এই ধরনের আতঙ্ক তো গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের অন্তরায়।
এভাবে যে চলছে সবকিছু তাতে সমাজ কি বাসযোগ্য থাকবে? শুধু খেয়ে-পরে বেঁচে থাকা মানুষের কোনো সামাজিক জীবন নয়। সেই কারণে জেলখানা কোনো আদর্শ সমাজের চিত্র হতে পারে না। সমাজকে মানুষের বিকাশের উপযোগী করতে হলে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে মুক্ত করার দায়িত্ব পালন করতে হবে।
লেখক, রাজেকুজ্জামান রতন
রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট ।

