শাহাব উদ্দীন: আমার দেহটা আমেরিকা থাকলেও মন-প্রাণ দেশের জন্য থাকে উদগ্রীব। আজকের এই ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার যুগে প্রতি মুহূর্তের সংবাদই পাওয়া যায়। দেশের ভালো খবরে পুলকিত হই, আবার কোন খারাপ খবরে ব্যতিত হই। কারণ মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি, আর সে চেতনা বাস্তবায়নের জন্য জীবনের স্বর্ণযোগ রাজপথে, সংগ্রামে, জেলে কাটিয়েছি। সেখানেই আমার নাড়ির টান। দেশের মানুষগুলো অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান, মৌলিক কথা বলার অধিকার নিয়ে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে লাল সবুজের পতাকা নিয়ে এগিয়ে যাক নিরন্তর শুভ কামনা।
সেই মাটির স্বজনরা আমি দীর্ঘ প্রবাসী হলেও একটুও ভুলে যাননি। প্রতিদিনের প্রার্থনায় আমাকে স্মরণ করেন। বিভিন্ন জনের ভাবের প্রকাশ দেখে আমার হৃদয়ে দাগ কাটে। মনে শক্তি আর সাহস পাই। ভাবি আমি একা নই। আমার সাথে দীর্ঘদিনের স্বজন, শুভাকাঙ্খিরা আছেন। আমাকে পারতেই হবে। এই মনোভাবটা রোগীর জন্য খুবই দরকার। ৩০ মার্চ, মুক্তাদির আহমদ মুক্তা লিখেন,‘শাহাব উদ্দীন ভাই, সিলেটের পরিচ্ছন্ন, সংগ্রামী, আদর্শিক, জনপ্রিয় ছাত্রনেতা ছিলেন। বিদেশে থাকলেও প্রতিনিয়ত দেশ মাতৃকার টানে নিবদিত থাকেন। মৃত্তিকাশ্রয়ী, চিন্তা -চেতনা ও ইতিহাস সংস্কৃতি চর্চার জন্য তার প্রচন্ড প্রাণশক্তি, তিনি আত্মপ্রত্যয়ী একজন অনুরাগী। পরম করুনাময়ের কাছে প্রার্থনা এই ভাইকে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দেন।’ একই আদলে বলেন, দ্রোহকালের সাথি মারুফ আহমদ, আব্দুল হান্নান মুক্তা, আজহার চৌধুরী, মোঃ শাজাহান, লিটন চৌধুরী, আমিরুল চৌধুরী, সোলেমান আহমেদ, এম এ আনোয়ার হোসেন রনি, এনামুল মুনির, সিরাজুল ইসলাম, মোহাম্মদ মতিউর রহমান, মইদুল ইসলাম চৌধুরী, এড. আলী হায়দার, জুনাল আহমদ, সোহেল আহমদ, আলী আহমদ, নিয়াজ রহিম, বদর চৌধুরী, আফছর আহমদ, করিম আহমদ হেলাল, নজির আহমদ, আনছার হোসেন কোরেশি, নুরুল হক জাহাঙ্গীর, আবু জাফর, ইঞ্জিনিয়ার ইমাদ উদ্দিন, Aaz. Babul. ইকবাল হোসেন, আব্দুস সালাম প্রমুখ।
আমার বাল্যবন্ধু যার সাথে বহু জীবনের বহু সুখ দুঃখের বিষয় মিশে আছে জকিগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ শাব্বীর আহমদ প্রতিনিয়ত খোঁজ নিয়ে লিখেন শাহাব উদ্দীন আমার দীর্ঘদিনের সতীর্থ, করোনা ভাইরাসের আক্রান্তের খবরে দারুনভাবে উদ্বিগ্ন। মহান রবের দরবারে প্রার্থনা করি, এই সুন্দর মনের বন্ধুকে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দাও। একইভাবে প্রার্থনা করেছেন আমিরুল ইসলাম মাসুক, নুরুল ইসলাম, বাবুল মিয়া, মোহাম্মদ আলী সেলিম, আবদুল্লাহ সিদ্দিক, গোলাম মওলা দারা, শামীম আহমদ সিদ্দিকী, অধ্যাপক শাব্বীর আহমদ, আতিকুর রহমান মুক্তা, ডাক্তার মহি উদ্দিন আহমেদ, Fardous Arabi, Tarak Yusuf, Saiful Islam, Syed Ansar Ali, Ala Uddin, ফাহিম মজুমদার, ফয়েজ আহমেদ চৌধুরী, মোহাম্মদ আং হানিফ কুটু, নুরুজ্জামান টিপু, মোহাম্মদ আং কাদির, কানাইঘাট সরকারি কলেজের অর্থনীতি বিভাগীয় প্রধান মোহাম্মদ হাবিব আহমদ, যাকে আমি তার ছাত্রজীবন থেকেই চিনি, শান্তশিষ্ট, ভদ্র লোক। তিনি লিখেন, বাসদ ছাত্রলীগের একজন আদর্শবাদী, সংগ্রামী, প্রিয় শ্রদ্ধাভাজন পরিচিতমুখ, কোভিড ১৯ আক্রান্ত হয়েছেন শুনে আমি বাকরুদ্ধ, উদগ্রীব হয়ে যাই তার সাথে কথা বলার জন্য। আমার বুক ফেটে যাচ্ছিল, বহু কষ্টে তিনি ফোন ধরেন, তার কন্ঠ শুনে আমি সাথে সাথে আল্লাহকে বলি, হে আসমান ও জমিনের মালিক তুমি আমাদের তওবা কবুল করো, মাফ করো, তুমি ছাড়া এই মহাবিপদে সাহায্যর কেউ নাই। আল্লাহ তোমার সাহায্য চাই, শাহাব ভাইকে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দাও।’ একইভাবে আমার জন্য শুভ কামনা করতে ভুলেননি আমার যৌবনের স্মৃতি বিজড়িত মদন মোহন কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ আতাউর রহমান পীর, অধ্যক্ষ ডক্টর আবুল ফতেহ ফাত্তাহ, উপাধ্যক্ষ আমার প্রিয় ভাজন মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, অধ্যক্ষ সিরাজুল ইসলাম, অধ্যক্ষ আতিকুল ইসলাম চৌধুরী, মদন মোহন কলেজের সাবেক ভি. পি শেখ মকলু মিয়া, কুষ্টিয়া থেকে মীর হারুন, আমার ভাগিনা শাহীন দীর্ঘদিন সৌদি প্রবাসী। সে মামার অসুখের খবর পেয়ে কান্নাকাটি শুরু করে এবং ওমরাহ মানত করেন।
বর্তমানে RAB এ কমর্রত সম্মুখযোদ্ধা প্রিয়ভাজন লোকমান হোসেন লিখেন, ‘আমার দেখা পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ, ভালো মানুষ, এই ধরনের পরোপকারী ভালো মানুষের আমাদের খুব দরকার, হে রব, আমাদের মাঝে শাহাব ভাইকে সুস্থ করে ফিরিয়ে দিন।’
সাংবাদিক Taj Uddin Taj আমার ছোট বোন সালমার সহপাটি। মরনব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে অল্প বয়সে না ফেরার পথে চলে গেলেন শত চেষ্টা করেও বোনটাকে বাঁচানো গেলো না।
তাজের ভূমিকা পড়ে মনের অজান্তেই চোখের কোনে পানি জমে গেল। তিনি লিখেন, আশি- নব্বই দশকের সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গনের দাপোটে ছাত্রনেতা, সৎ, সংগ্রামী, আপোষহীন ভালো মানুষের অসুস্থতার খবরে দারুন উদ্বিগ্ন। করুনাময়ের কাছে কায়মনো বাক্যে প্রার্থনা আমাদের ভাইকে ফিরিয়ে দিন।’
Mohammad K. Ahmed. যে কি না মদন মোহন কলেজের ছাত্র জীবন থেকে আমার স্নেহ ভাজন, ফেসবুকযোদ্ধা। তিনি লিখেন, ১৯৮০ সনের কলেজের তুখোড় নেতা, বহু সংগ্রাম, আন্দোলনের আপোষহীনযোদ্ধা, বড় ভাই কোন দিন তার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। অন্য দলের লোকজন, শিক্ষার্থীদের আপন করে নেওয়ার সম্মুহনীশক্তি ছিল প্রবল। দলীয় সংকীর্ণতার উর্ধ্বে থেকে সব সময় কাজ করতেন। যে কারণে আমরা সবাই তাকে এখনো ভালোবাসি। হে আল্লাহ আমাদের ভাইকে ভালো করে দাও।
মাহবুবুর রহমান বাবু ফেঞ্চুগঞ্জ সরকারি কলেজের সাবেক ভি পি ও সিলেট Law কলেজের জি. এস.। তিনি লিখেন, ‘শাহাব উদ্দীন ভাই প্রান্তিক রাজনীতি থেকে উঠে আসা কেন্দ্রীয় সভাপতি হওয়ার যোগ্যতা সম্পন্ন মেধাবী, সৎ পরোপকারী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের অগ্র সেনানী শাহাব ভাইয়ের খবর শুনে শংকিত। তার সুস্থতা কামনা করি।’ Golam Subhan Chowdhury. জাসদ সভাপতি ছিলেন। আমার ঘনিষ্টজন, প্রতিবেশী ছত্তার ভাইয়ের ছেলে। এরশাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সময় বহু দিন, বহু রাত এক সাথে কাটিয়েছি। একই থালার ভাত ভাগ করেও খেয়েছি। আমাকে ছোট ভাই হিসাবে খুব স্নেহ ও সম্মান করতেন। আমাদের দু’জনের উপরই হুলিয়া থাকায় গ্রাম-গঞ্জে তাদের সব আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে থেকেছি। ভাতিজা দীপন ছোট ছিল তার সব মনে আছে। অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় আমাকে ঘিরে তার বাবার আত্ম ত্যাগের রাজনীতির তুলে ধরে আমার রোগ মুক্তি কামনা করেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা ম. আ. মুক্তাদির স্মৃতি কল্যাণ ট্রাস্টের আহবায়ক ডাক্তার মইনুল ইসলাম মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল হক, লোকমান আহমদ, এমাদ উল্লাহ শহীদুল ইসলাম শাহীন, আব্দুল মান্নান, শাব্বির আহমদসহ কমিটির সবাই বিভিন্নভাবে যোগাযোগ করে দোয়া করেছেন। কারণ এই মহতি উদ্দোগের সাথে ট্রাস্টি হিসেবে আমিও সর্ম্পৃক্ত।
মৌলভীবাজার থেকে সাবেক মেয়র বন্ধু ফয়জুল করিম ময়ুন, দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্র জাসদ সভাপতি রাজনীতিবিদ আব্দুল মোচ্ছাব্বির, সৈয়দ মুহাদ্দিসসহ অনেকেই যোগাযোগ ও দোয়া করেন।
সুনামগঞ্জের আমার বিপ্লবী জীবনের সাথীরাও ছিলেন উতকন্ঠা ও উদগ্রীব। দেওয়ান এমদাদ রাজা তার ফেসবুকে লিখেন, ‘আমার দেখা রাজনৈতিক জীবনে শাহাব ভাই একজন আদর্শবাদী, সংগ্রামী, সৎ ও ভালো মানুষ। তার অসুস্থতার খবরে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। তার দ্রুত সুস্থতা কামনা করি।’
একইভাবে লিখেন এবং যোগাযোগ করেন আ. ত. ম. মিছবা, বিনোদ রঞ্জন তালুকদার, সিরাজুর রহমান সিরাজ, পাগলা উপজেলা চেয়ারম্যান ফারুক আহমদসহ অনেকে।
কোভিড ১৯- এই অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই চলছে। পৃথিবীব্যাপী সম্মুখযোদ্ধারা সর্বোচ্চ সেবা দিতে গিয়ে প্রাণ দিচ্ছেন। বিজ্ঞানিরা ভ্যাকসিন আবিষ্কারের জন্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দিন, রাত কাজ করে যাচ্ছেন মানব জাতিকে এই মহাবিপদ থেকে রক্ষা করার জন্য। সারা দুনিয়ার মানুষ সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করেছেন যার হাত পছন্দ হয় তার মাধ্যমে আল্লাহ মানবজাতিকে এই মহাবিপদ থেকে রক্ষা করো। কাজ চলছে কিন্তু আমরা কেউ জানিনা কবে আমদের মুক্তি, বিশ্বের কোন প্রান্ত থেকে আওয়াজ আসবে ইউরেকা ইউরেকা। আমরা সে সময়ের অপেক্ষায়।
এদিকে বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর দেশ আমেরিকাও দিশেহারা। একমাস আগে একটু কমে আসছিলো কিন্তু আমাদের প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের কারণে এবং অতিমাত্রায় বাহবা ও রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য কারণ (সামনে নির্বাচন) তিনি সব অঙ্গরাজ্য থেকে লকডাউন তুলে দিয়ে মানুষকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার কঠিন ফরমাইস জারি করেন। যা ছিল কোভিড ১৯ এর স্বাস্থ্যবিধি বিরোধী। তার দলের গভর্নর, মেয়র, যেসব অঙ্গরাজ্যে আছেন তারা তাঁর কথা মত কাজ করেন। অন্যান্যরা হুমকির মধ্যেও বিধি মেনে চলার চেষ্টা করেন। যার ফলশ্রুতিতে নিউইয়র্ক, কানেকটিকা ও নিউজার্সি ছাড়া Taxes , Florida, Arizona, California সহ প্রায় ৩৭টি রাজ্য সাথে সাথে রোগীর ও মৃত্যুর সংখ্যা তিন, চার গুণ বেড়ে যায়। মার্চ এপ্রিল মাসে নিউইয়র্কে যে অবস্থা ছিল, কয়েকটি রাজ্যে এখন সেরকম অবস্থা। গভর্ণর ঘোষণা দিয়েছেন সংক্রামিত রাজ্য থেকে নিউইয়র্কে কেউ আসলে ১৪ দিনের কোরায়েন্টাইন বাধ্যতামূলক নতুবা জরিমানা। যেটা এপ্রিলে করেছিলো নিউইয়র্কের ক্ষেত্রে কয়েকটি রাজ্য তাদের জনগণের স্বার্থে।
বর্তমানে আমেরিকার আক্রান্তর সংখ্যা ৩০৯৭০৮৪ আর মৃত্যুর সংখ্যা ১৩৩৯৭২। এর মধ্যে নিউইয়র্কে মোট আক্রান্ত ৩৯৮২৮৭। মৃত্যুর সংখ্যা ৩২২৪৩। আমরা এক অজানা অন্ধকারে আছি জানি না এই মিছিল কবে থামবে। সকলের মতো শংকায় আমারও দিন যাচ্ছে। হাসপাতাল থেকে আসার তিন সপ্তাহ কোয়ারেন্টানের পর যখন ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী শরীরের অবস্থা জানার জন্য একটি ল্যাবে যাব তখন করোনা রোগী শুনে উত্তর আসে আমরা এখনো রেডি নই। কারণ তখনও সবাই ভীত সন্ত্রস্ত। এরকম করে প্রায় একমাস পর একটু কৌশলে ফুকফুস, করোনা ব্লাড টেস্টের রেজাল্ট নিয়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হই। সব দেখে ডাক্তার সাহেব বললেন, করোনা নাই কিন্তু ফুসফুসের টিস্যুগুলো নস্ট হয়েছে, শরীর দুর্বল এবং গলার কন্টনালীতেও সমস্যা হয়েছে। সুতরাং এগুলো টিক হতে অনেক সময় লাগবে এবং বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে পাঠালেন। এখন চিকিৎসা দেখে মনে হচ্ছে দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এদিকে কথা বলতে এখনো খুব কষ্ট হচ্ছে, ডাক্তারের পরামর্শ হলো পারতপক্ষে কথা না বলে থাকা! এভাবেই করোনার পার্শ প্রতিক্রিয়া নিয়ে ডাক্তার, ঔষধ, টেস্ট, বিশেষজ্ঞ নিয়ে উৎকন্ঠা, উদগ্রীবের মধ্যে দিয়ে দিন অতিবাহিত হচ্ছে। চলবে………।

লেখক: বাংলাদেশের স্বৈরচার বিরোধী আন্দোলনের তুখোড় ছাত্রনেতা ও ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি।

