খুবই হৃদয়স্পর্শী, মন খারাপ করে দেয়া একটা ঘটনা

ঘটনাটা আজ সকালের। তারপর থেকে ভীষণ মন খারাপ হয়ে আছে। যদিও আমাকে যারা চেনেন তারা জানেন, খুব একটা আবেগপ্রবণ মানুষ আমি না। তবুও, ৩৫/৩৬ বছরের একজন যুবক মন খারাপ করে দিয়ে চলে গেল।
বোধহয় সকাল সাড়ে এগারোটা বাজে তখন। হালকা পাতলা গড়নের, বয়সে আমার থেকেও তরুন একজন যুবক আমাদের অফিসে এসেছে কথা বলার জন্য। ততক্ষণে আমাদের স্বেচ্ছাসেবক টিম চলে গেছে ২ নং ওয়ার্ডের আসমত আলী স্কুলে। আজ সেখানে ‘মানবতার বাজার’ বসবে।
আমি এগিয়ে গেলাম কথা শুনতে। গেটটা বন্ধ, গেটের দুপাশে দুজন। যুবকটি মাথা নীচু করে ছিল। কাছে গিয়ে যখন বললাম, ‘বলুন’। তারপর মাথাটা তুললো। চোখটা লজ্জা, অপমান, রাগ, ক্ষোভ সবকিছুর এক অদ্ভুত মিলনমেলা।
‘… আমি গত তিন দিন থেকে রোজা। গতকাল ইফতারের পর থেকে না খাওয়া। ঘরে চাল ডাল কিছুই নাই। হোটেলে চাকুরী করতাম, সব বন্ধ। কোন দোকানেও বাকি দেয় না..’ এতটুকু বলার পর আবার মাথাটা নিচু করলো।
দরজাটা খুলে ভেতরে নিয়ে আসলাম। আমাদের ‘মানবতার বাজার’ এর কিছু নিয়ম আছে। নিয়ম ভেঙে একটা ব্যাগে ৫ কেজি চাল, ২ কেজি আটা, ১ কেজি ডাল, আলু, একটা মিষ্টি কুমড়া, ৬টা ডিম, আধা লিটার তেল দিলাম। পুরো সময়টাতেই যুবক মাথা নিচু করে ছিল। হয়তো জীবনে প্রথম এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হলো। যুবকদের মাথা নোয়ানো দেখাটা সবসময়ই কষ্টের। তখনও বুঝিনি আরও কিছু অপেক্ষা করছে।
যুবক মাথা তুললো। ছলছল চোখে বললো, `ভাই, আমার একটাই মেয়ে। বড় আদরের। দেড় বছর বয়স। আমরা তো না খেয়েও থাকতে পারি। এখান থেকে খাবার কমিয়ে বাচ্চাটার জন্য একটু দুধ কিনে দিতে পারবেন!‘
এটা শোনার পর আমার ভেতরটাও কেমন মোচড় দিলো। দৌড়ে উপরে গেলাম। ফ্রিজটা খুললাম। আমাদের একজন সুহৃদ ফ্রিজ কেনার পর এই পুরাতন ফ্রিজটা আমাদের অফিসে দিয়েছিল। ফাঁকা ফ্রিজটাতে সাজানো ৩২ কেজি গরুর দুধের প্যাকেট। এক খামারি এই দুধ দিয়েছিলেন ঈদের সময় ‘মানবতার বাজার’ থেকে যেন আমরা দুধ আর সেমাই দিতে পারি দু:স্থ পরিবারগুলোকে।
অফিসে কেউ নেই। আমরা তো নিয়ম তৈরি করেছিলাম মানুষের জন্যই। সেই মানুষের প্রয়োজনেই তো নিয়ম ভাংতে হয়। আমার উপরে যাওয়ার কারণ বুঝতে না পারায় নিচে এসে দেখি যুবকটা চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কাছে গিয়ে তার হাতে ২ প্যাকেট দুধ তুলে দিলাম। যুবকটি দুই হাতে দুধের প্যাকেট দুটি নিয়ে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাকিয়ে দেখি যুবকের চোখ দিয়ে লোনা জল গড়িয়ে পড়ছে জমাট বাধা দুধের প্যাকেটের উপরে।
যেহেতু আমি আবেগী মানুষ না, আবার অনেক কাজও বাকি তাই তাড়াতাড়ি যুবকের সামনে থেকে চলে এসে কাজে বসলাম। ………………………………………………………………………………….
বন্ধুরা, আমরা যারা সরাসরি মাঠে কাজ করছি তাদের প্রতিদিনই এরকম অনেক ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়। তখন কতটা যে অসহায় লাগে সেটা বলে বোঝানো সম্ভব না। আমাদের সামর্থ্য সীমিত।
আর ‘মানবতার বাজার’ এ দিন দিন বাড়ছে মানুষের ভীড়। ‘মানবতার বাজার’ থেকে প্রতিদিন ২/৩ শ মানুষকে খাদ্য সহযোগিতা দিতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। প্রতিদিনের খাদ্য সহযোগিতার জন্য ৫/৬শ দরিদ্র মানুষের জমা দেয়া কাগজের মধ্য থেকে অর্ধেক মানুষকে বাছাই করার প্রক্রিয়া দিন দিন আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। সারাদিন ফোনে কত মানুষের যে কান্না শুনতে হয়..!
তবে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। মাঝপথ থেকে সরে আসার জন্য রাস্তায় নামিনি। শেষ পর্যন্ত লড়াইটা করবো। লড়াইটা করবো এই অধিকারবঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য, বিপদে সবটুকু দিয়ে তার পাশে দাঁড়ানোর জন্য।
আপনাদের সহযোগিতা নিয়েই তো টানা ৩২ দিন ধরে এই ‘মানবতার বাজার’ চালু রেখেছি আমরা। আসুন না, সবাই মিলে আরেকটু চেষ্টা করি। প্রয়োজনে আরেকটু মিতব্যয়ি হই। প্রয়োজনে ইফতারিতে কোন একটা আইটেম কমিয়ে ফেলি । আসুন, সবাই মিলে এই মাসটার জন্য আরেকবার আরেকটু সহযোগিতার হাত বাড়ায়…
আমাদের একটু সহযোগিতায় অসংখ্য বাবা-মা তার প্রিয় সন্তানকে একমুঠো খাবার মুখে তুলে দিতে পারবে। কেমন লাগতো যদি আমাদের প্রিয় সন্তান খাবারের কষ্টে আমাদের কাছে কান্নকাটি করতো! আসুন না, আমাদের সন্তানদের কথা ভেবে হলেও এই রমজানে আরেকজন সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেয়ার দায়িত্বটুকু নিই। বাঁচিয়ে রাখি মানবতা, বাঁচিয়ে রাখি ‘মানবতার বাজার’।

– ইমরান হাবিব রুমন, আহ্বায়ক, বাসদ, বরিশাল।

ইমরান হাবিব রুমনের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত ।

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.