কাউয়া মুক্ত আওয়ামীলীগ চাই

করোনা ভাইরাসের সতর্কতায় বাসায় অনেকটা ‘অবরুদ্ধ’ আছি। বার বার চা খেয়ে, টিভি দেখে কর্মহীন সময় পার করছি। মনে পড়ছে এই দীর্ঘ জীবন পার করার কথা, বিশেষ করে ছোটবেলার কথা। টাঙ্গাইলের একটা রাজনৈতিক পরিবারে আমার জন্ম ও বেড়ে উঠা। পাকিস্তানের শেষের দিকের কথা। আমি তখন পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ি। বাবার (শরীফ মাস্টার , টাঙ্গাইল সদরের ঘারিন্দা ইউনিয়নের আওয়ামীলীগের আজীবন সভাপতি) মুখে ৬ দফা, ১১ দফার আলোচনা শুনে ক্লাসের সহপাঠীদের বলতাম, এইযে আমরা সাদা কাগজে লিখছি, সেই কাগজ উৎপাদন হয় আমাদের দেশে। পশ্চিম পাকিস্তানের ছাত্ররা সেই কাগজ ক্রয় করে ৬ আনা দিস্তা, আর আমরা ক্রয় করি ১১ আনা দিস্তা (উল্লেখ্য ৬ পয়সায় ১ আনা ছিল)। বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণ দিলেন, আব্বা বললেন এটা মুখস্থ করে তোমাকে বলতে হবে। এটা শুধু আমাদের জন্য নয়, সারা বিশ্বের এমনকি পশ্চিম পাকিস্তানের নির্যাতিত মানুষের জন্য একটা ‘মুক্তির সনদ’। অনেক ত্যাগের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশ হল। মনে হল এবার চাওয়া-পাওয়ার একটা সমাধান মিলবে। কিন্তু ফল হল উল্টো। ‘৭৫ এ বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলেন। আমাদের পরিবারেও সেই ঝড়ের ঝাপটা লাগল। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার ২ মাসের মধ্যে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য জাসদ গণবাহিনী আমার বাবাকে হত্যা করল। আজ বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশ শাসন করছেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের মাধ্যমে দেশ কলঙ্কমুক্ত হয়েছে। আজ আমার এই অলস মস্তিষ্কে বারবার প্রশ্ন জাগছে, মুক্তিযুদ্ধের পর আমাদের টাঙ্গাইলে ‘কাদেরীয়া বাহিনী’ বঙ্গবন্ধুর নিকট অস্ত্র জমা দিল যা সচক্ষে দেখেছি। এখনও বিভিন্ন সময়ে জলদস্যু, বনদস্যুরা অস্ত্র জমা দিয়ে আইনের আওতায় আসছে। কিন্তু এই গণবাহিনীর অস্ত্রগুলো গেলো কোথায়? তারা তো আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র জমা দেয় নি বা জাতির কাছে ক্ষমাও চায়নি। যে স্টেনগানটির গুলি আমার বাবার বুক ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল, সেটি একবার ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছা করে। আরেকটি কথা, যারা মুক্তিযুদ্ধ করলেন তারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, যারা যুদ্ধে নিহত হলেন তারা শহীদের মর্যাদা পেলেন, যেসকল মা-বোন নির্যাতিত হলেন তারা বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু যে ৩৩ হাজার নেতা-কর্মী শুধুমাত্র আওয়ামীলীগ করার দায়ে গণবাহিনীর হাতে জীবন দিলেন, তাদের স্ট্যাটাসটা কি হবে? আমার এই প্রশ্নের জবাব কোন নেতা বা আপনাদের দিতে হবে সেটা প্রত্যাশা করছি না। কেননা, আজ জাসদ-গণবাহিনী আর আওয়ামীলীগ অনেকটা একাকার হয়ে গেছে। এজন্য উক্ত হত্যার বিচারও দাবী করছি না। এই ভুক্তভুগী পরিবারের সন্তানদের এই অসমতার মধ্য দিয়েই জীবন পার করতে হবে- এটাই নির্মম বাস্তবতা। এছাড়া ‘৭২-‘৭৫ পর্যন্ত এই অপরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সৃষ্টিকারীদের বিষয়ে আওয়ামীলীগের কোন গবেষণা হয়েছে বা হবে কিনা তা আমার জানা নেই, কেননা তাদের সময় এখন ভাল যাচ্ছে। চাকরী করার সুবাদে দীর্ঘদিন রাজনীতিমুক্ত অবস্থায় ঢাকায় বাস করছি, এলাকা থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন। মাঝেমাঝে খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারি আমার বাবার প্রাণপ্রিয় সংগঠনটিতে এখন ‘কাউয়ায়’ ভরে গেছে। যাদের পরিবারের লোকজন ‘৭০ সালেও নৌকায় ভোট দেয় নি, ‘৭৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে মেনে নেয় নি, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর মিষ্টি বিলিয়েছে, আমার বাবার হত্যার পর মিছিল করে উল্লাস প্রকাশ করেছে, তাদের আজ আমার বাবার প্রাণপ্রিয় সংগঠনে দাপুটে উপস্থিতি, নেতৃবৃন্দের সাথে প্রেমময় সখ্যতা। এসব দেখেশুনে মন্তব্য করতে ইচ্ছা করে, এখনই সতর্ক না হলে কোন গুলির শব্দ নয়, সামান্য পটকার শব্দেই এসব কাউয়ারা কা-কা করতে করতে উড়ে পূর্বের অবস্থানে ফিরে যাবে। আবারও সবিনয়ে বলছি, কর্মহীনভাবে বাসায় বসে আছি বলেই এ লেখার অবতারণা করলাম। মুক্তিযুদ্ধের মত করোনা প্রতিরোধের যুদ্ধেও আমরা বিজয়ী হব- এই প্রত্যাশা করছি। –

91398481_923361061442485_8077902614039101440_n

জাহীদ হোসেন,

সাবেক ছাত্রলীগ নেতা,সরকারি সা’দত কলেজ, করোটিয়া,টাঙ্গাইল।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.