ভোদাই শব্দটি সত্যি বলতে খারাপ কোনো শব্দ নয়। সবাই জানি এটা গ্রাম্যভাষায় বহুল ব্যবহার্য্য শব্দ , যা শহুরেভাষায় সরল বা বোকা জাতিয়। তবে আমরা অনেকেই জানি না গাছভোদাই কি ? এটা আসলে গ্রাম্যভাষার ভোদাইয়ের এক্সটেনশন মাত্র , যা অতিবোকা বা অতিসরল বলেই ধরা হয় । উৎপত্তি কোথা থেকে বলতে পারবো না । তবে এটা টাঙ্গাইলে বহল ব্যবহারিক শব্দ বটে। আমি ছোটো বেলায়, বলা যায় অনেক ছোটো বেলায় এই শব্দটি শুনেছি টাঙ্গাইলে । সত্যি বলতে আমাকেই আমার চাচাতো ভাই বলেছিলেন, থাক সে কাহিনী ।
আসুন একটু বুঝতে চেষ্টা করি গাছভোদাই কেন বলা হয় । আমরা বিজ্ঞানের সূত্রে জানি গাছের প্রাণ আছে এবং মানুষের মত নিঃশ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ করে । তবে মানুষ আর গাছের এই দম নেওয়া ও ছাড়ার মাঝে বড় পার্থক্যেটি হলো উল্টোধারার । গাছ অক্সিজেন ছাড়ে এবং কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে, যা মানুষের ক্ষেত্রে উল্টো। লক্ষণীয় যে, বিনা গাছে আমরা মৃত। আরো লক্ষণীয় যে, গাছ এত বড় কাজটি করে এবং মানুষের মত প্রাণ আছে, গাছ বস্তুর বৈশিষ্ট্যনুযায়ি জায়গা দক্ষল করে থাকলেও, নিজের জায়গা ত্যাগ করতে পারে না । সহজ বাংলায় বললে বলা যায়, গাছ একপ্রকার ধরা , মানে কট । সেই ধরাকেই প্রখরতার সাথে বুঝাতেই বলা হয় , গাছভোদাই ।
সাধারণ জনগণ হিসেবে আমরা বেশ ওয়াকিবহাল আছি যে, আদালতের বিষয়ে বেশি বলা যাবে না । কেননা পান থেকে চুন খসলেই আদালতহানীর মামলা গলায় ঝুলে যাবে। তবে আমরা এও জানি আদালতের দেওয়া বা প্রকাশিত রায় জনগণের সম্পদ। সেই সূত্রে আদালতের রায় নিয়ে প্রকাশ্যে বা নিরবে যত খুশি তত আলোচনা করার অধিকার জনগণের আছে । আজকের লেখা সেই অধিকারের চর্চাই করছি মাত্র ।

মূল প্রতিপাদ্য বিষয়ে আসি । আদালত রায় দিয়েছে , রাষ্ট্রিয় সকল অনুষ্ঠানে জয় বাংলা স্লোগান ব্যবহার করতে হবে, ভালো কথা । তবে আমার বুঝে আসে না, জয় বাংলা তো বাঙালির রক্তের স্লোগান । এই স্লোগানের বিশেষত্ব আছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, মহা সত্য হলো, এই স্লোগানের উদ্ভাবকেরাই এই স্লোগানকে জনমানুষের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে নিজেদের সম্পত্তিতে পরিণত করেছে । এই স্লোগান তাদের কর্মকাতেই বিতর্কিত হয়েছে এবং এর মান হারিয়েছে। আর সে কারণেই এই স্লোগান এখন রাজনৈতিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে । আর আমার প্রশ্নটি ঠিক সেখানেই , আদালত কেন রাজনৈতিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেয় ? ফলাফল তো ভালো হয় না ! উদাহরণ আছে । একটু বলি, আমাদের দেশের চিরাচরিত বিতর্কিত বিষয় স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে তো আছেই। আর ইতিপূর্বে আদালত সেই রাজনৈতিক বিষয় স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে একটি রায় দিয়েছিলো ! আমরা জানি রাষ্ট্রের আইন কানুন অনুযায়ী আদালতের রায় মানা হলো ফরজ । এখানে আবার সেই গাছভোদাই এর কথায় আসতে হয়। আদালতের রায় অতিসরল ভাবেই মানা ভালো , কেননা কোনো উপায় থকে না । অর্থাৎ ভুল/শুদ্ধতার কোনো বালাই নিয়েই বলা বা করার নাই, শুধু মানা ছাড়া, বেশ । সহজভাবে ভাষ্য হলো, জনগণকে গাছভোদাই হওয়া ছাড়া উপায় নাই, মানলাম।
কিন্তু সমস্যা হলো রাজনৈতিক দলের লোকেরা জনগণ হলেও এক ডিগ্রী বড় জনগণ বলেই প্রতীয়মান হয়। আর এটার কারণ হলো দলের প্রতি বিশ্বাস এবং দলের সিম্বলিক শক্তিকে সামনে রেখে দলকে সংঘবদ্ধ রাখা , সাথে আরো শক্তির সঞ্চয় করার জন্য সিম্বলিক শক্তিকে কোনো অবস্থাতেই হারাতে নারাজ এবং কর্মটি সঠিক বলেই ধরা হয় । তবে এও বলা ভালো যে ইতিহাস তার নিজস্ব শক্তিতেই সময়ে ঠাঁয় সত্য নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়, প্রতিষ্ঠিত হয় । ঠিক সেখানেই আমাদের আদালত রাজনৈতিক বিষয়ে রায় বা নির্দেশ দিয়েছিলো, ” জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক বলা যাবে না” । যেহেতু এটা বিএনপির রাজনীতির জন্য নিয়ামক শক্তি, সুতরাং এটা না মানাই বিএনপির জন্য স্বাভাবিক বটে। বিএনপির একজন লোকও আদালতের এই রায়ে বিন্দুমাত্র সম্মান দেয় না এবং ঘূর্ণাবর্তেও মানে না । আদালতের ভুলটা হলো, একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক দলের কর্মী সমর্থকদেরকেউ গাছভোদাই ভাবা ! এই রায়ে আদালতের সম্মান বাড়ার বিপরীতে কমতে কমতে একেবারেই তলানিতে ঠেকেছে ( অন্তত বিএনপির নিকট তো বটেই )। সেই গাছভোদাই সূত্রেই বলা যায় আদালত একবার স্বাধীনতার ঘোষক রায়ে নিজেরাই গাছভোদাই হয়েছিলো এবং এবার এই জয় বাংলা স্লোগানের রায়েও না আগামীর ভিন্ন সরকারের ( যদি কখনো আসে ) আদালত আবার গাছভোদাই হয় ?
এবার শেষে ছোট্ট করে বলি, জয় বাংলা স্লোগান এমন একটি স্লোগান যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় জনগণকে তাদের মুক্তিসংগ্রামে প্রবলভাবে প্রেরণা যুগিয়েছিলো। এর পূর্বে বাঙালি কখনো এত তীব্র, অগ্নিশর্মা, সংহত, ও তাৎপর্যপূর্ণ স্লোগান দেয় নি । এই এক স্লোগানই জাতীয় সকল আবেগকে একত্রিত করতে সক্ষম হয়েছিলো । সুতরাং স্লোগানটি হেন তেন বিষয় মোটেও নয়। মুক্তিযোদ্ধারা সকল অপারেশন শেষে যুদ্ধ জয়ের পর হৃদয় থেকে জয় বাংলা স্লোগান দিয়েই উদযাপন করত। কখন, কিভবে এই স্লোগানটির উৎপত্তি হয়েছিলো, ইতিহাসের পাতায় পাওয়া যায় । তবে এ বিষয়ে চাক্ষুষ সাক্ষ্য যারা দিতে পারবেন, তাঁরা এখনও জীবিত আছে, তাদের জন্যেই তুলে রাখলাম। তাই বলছিলাম, ইতিহাসের বিষয়ে আদালত দ্বারা নয়, বরং জনগণের দ্বারাই ঠিক হওয়া বাঞ্ছনীয় ।

বুলবুল তালুকদার
সহকারী সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডট কম ।

