ভাঙাচোরা হোক কিন্তু জাতীয় হয় কি করে?

জাতীয় পার্টি ভাঙছে না আরো বেশি গড়ছে, সেটার চেয়েও বড় প্রশ্ন, একটি রাজনৈতিক দল জাতীয় দল হয় কি করে ? এটা কি খুব বেশি ভুল প্রশ্ন? লক্ষণীয় যে, BNP= Bangladesh Nationalist Party. ( বাংলাদেশ জাতীয়বাদী দল) । বাংলাদেশে নানান দল আছে, বাংলাদেশ অমুক দল/ তমুক দল! সেখানে কোনো আপত্তি থাকার কথা না। কেননা দলগুলো এই দেশের এবং তাই বাংলাদেশ নামটি ব্যবহার হয়। কিন্তু JATIYA PARTY (জাতীয় পার্টি)  তো সরাসরি জাতীর হয়ে গেলো! মানে কি এটাই একমাত্র বাংলাদেশের দল?  লক্ষণীয় যে, BaKSAL (Bangladesh Krishak Sramik Awami League ) । এটা আওয়ামী লীগের  একটা কমপ্রমাইজ ( A political front comprising Bangladesh Awami League ) এর মাধ্যমে ১৯৭৫ সালের ২৪ সে ফেব্রুয়ারি থেকে জাতীয়ভাবে একটি এবং একমাত্র রাজনৈতিক দল হিসেবে, সংবিধান পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে ও সাংবিধানিকভাবে কার্যক্রম  শুরু করে বা গঠন হয়। সেই সূত্রে বলা যায় এটাই ছিলো  বাংলাদেশের একমাত্র জাতীয় রাজনৈতিক দল এবং যার একমাত্র নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু । এই জাতীয় দলটির ( বাকশাল) ভালো-মন্দ, ক্রিয়া- প্রতিক্রিয়া এবং ফলাফল? সেটা ভিন্ন আলোচনা, সেটা দীর্ঘদিন ধরে চলছে এবং ভবিষ্যতেও সেটা চলবে। কিন্তু তারপরেও স্পষ্টভাবে বলা যায়, স্বাধীন দেশের একমাত্র জাতীয় দল ছিলো বাকশাল।

বিএনপি এই দলটি ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮ সালে এক সময়কার মিলিটারি বস এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে গঠিত হয়। যারা চরিত্রগত দিক দিয়ে ” Center-right party “ বা মধ্যে-ডান পন্থী দল। বাংলাদেশের আরেক মিলিটারি বস, সুদর্শন, সুপুরুষ, নারী-প্রেমিক, সর্বোপরি বিশ্ব-বেহায়া এবং রাষ্ট্রপতি এরশাদের হাত ধরে ১ জানুয়ারি ১৯৮৬ সালে  জাতীয় পার্টি গঠিত হয়। এক মিলিটারি বসের দল বিএনপি প্রকাশ্যেই একটি মধ্যে-ডান পন্থী রাজনৈতিক দল। তবে আরেক মিলিটারি বসের জাতীয় পার্টি যে কোন পন্থী, সেটাই বুঝা মুশকিল । এই দলটি চরিত্র পড়া বড়ই কঠিন। এটা ডান/বাম/মধ্যে-ডান/ মৌলবাদী না চাটুবাদী সঠিক করে বলা যায় না ( আমার জানা নাই) । তাই প্রশ্ন করেছিলাম এইরকম একটি দল জাতীয় দল হয় কি করে ? আমার ক্ষুদ্র জ্ঞাণে এটা বুঝে আসে না বলেই বাংলাদেশ সংবিধানের আলোকে বাক স্বাধীনতার অধিকার বলেই এই প্রশ্ন । কেউ আবার প্রশ্ন করবেন না, বাক স্বাধীনতা আমি কোথায় পেলাম? এটা কিন্তু সংবিধানে স্পষ্ট লিখা আছে বলেই চর্চার সাহস পেলাম। শুধু আশা করি উপরে আমার প্রশ্নটি কোনো বীজ্ঞজন উত্তর দিবেন, তাহলে কূতজ্ঞ থাকবো।

আসুন এবার একটু জাতীয় পার্টির কীর্তিকলাপ দেখি। এই দেশে শতদল গড়ে এবং ভাঙে! এতে আমরা সাধারণ আমজনতা বেশ অভ্যস্ত বটে। দেশ যখন আছে ভবিষ্যতেও হয়তো বড় বড় দল গড়বে এবং ভাঙবে, সেটা জনমানুষের খুব বেশি কিছু আসে যায় না বলেই মনে হয়। কিন্তু জাতীয় পার্টি যেভাবে ভাঙে সেটা দেখে বিস্মিত হতেই হয়। যতটুকু মনে পরে, এই দলটির প্রধান এরশাদ যখন ২০০৪ সালে হঠাত্ করে আরেক মিলিটারির দল বিএনপির মঞ্চে উপস্থিত হয়, সেই সময়েই প্রথম দলটি ভাঙে। স্বরণ হয়, সেই সময়ে প্রথম আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এরশাদের চারদলে যোগদানকে কেন্দ্র করে দল ছেড়ে চলে যান এবং নতুন করে জাতীয় পার্টি গঠন করে। পরবর্তীতে যদিও অল্প কয়েকদিনের ব্যবধানেই এরশাদ নিজেই চারদল ছেড়ে আওয়ামীর ঘাড়ে চড়ে বসে বা আওয়ামী লীগ জোর করেই কাঁধে তুলে নেয়। তবে এটা সত্য যে সেই থেকেই এরশাদের  জাতীয় পার্টি লাঙল নিয়ে আওয়ামী ঘাড়েই সাওয়ার হয়ে আছে। এই জাতীয় পার্টি এমনভাবে ঘাড়ে বসেছে যে,  নামার চেষ্টা করেও নামতে পারেনি। জলজ্যান্ত প্রমাণ ২০১৪ এর বিনা ভোটের নির্বাচন । অবশ্য সেই সময়ে ২০১৪ সালের নির্বাচন কে কেন্দ্র করেই, এই দলের আরেক মহান নেতা , যিনি রাজপথ শুকেই রাজনীতির হালচাল বলে দিতে পারতেন বলে দাবী করতেন ” কাজী জাফর”  এক সময়কার “কেজি জাফর” ( চিনি কাহিনী, সবার জানা) বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের জোটে যোগদান করার কথা বলে আরো একবার জাতীয় পার্টির ভাঙন ধরান। এরকম জোটে যোগদান বা দলে আদর্শের চর্চা হচ্ছে না বলে, দল ছেড়ে নতুন করে দল গঠন করা, বলা যায় আমাদের দেশে একপ্রকার পান্তাভাতের মত। তবে জাতীয় পার্টির সবচাইতে আশ্চর্যজনক ও চমকপ্রদ ভাঙন ধরে গত বছর পার্লামেন্টের বিরোধী দল থাকা অবস্থায় । এই জাতীয় পার্টি সরকারি বিরোধীদল ( সংসদে বিরোধী দল ও মন্ত্রীত্বে থাকা )  থাকা কালীন এরশাদ এবং স্বয়ং তার স্ত্রী রওশন এরশাদের মাঝে দল  ভাঙাগড়া ছিলো সত্যি চমকপ্রদ । সমস্যাটি ছিলো সেই মন্ত্রীত্ব নিয়েই। দলের চেয়ারপার্সন এরশাদের হুকুমকে উপেক্ষা করেই দলের প্রধান বনে যান রওশন এরশাদ । তারচেও উপভোগ্য ছিলো জাতীয় পার্টি ভেঙেছে এবং দুই টুকরো হয়েও একই জাতীয় পার্টি ছিলো। কোথা থেকে এমনটি ঘটে ছিলো বা জাতীয় পার্টি কোথা থেকে এমনভাবে পরিচালনা হতো বা এখনও হচ্ছে, সেটা না বললেও সকলের কাছে নিশ্চিত বিষয়টি পরিষ্কার ।

যাক, এরশাদের পরকালের পরে যে জাতীয় পার্টির মধ্যে ভাঙনের শুরু হবে বা হতে পারে , সেটা মনে হয় এই দেশের আবাল-বৃদ্ধা সকলেরই অনুমানে ছিলো। তারই ফলাফল আজকে ” ভাবী-দেবরের দন্দ “ নামে বাংলা ফিল্ম চলছে।  আজকের পত্রিকায় দেখলাম একদিকে ভাবী আর অন্যদিকে দেবর দুজনেই দলে কোনো ভাঙন নাই বলছেন আবার দুজনেই দুজনের নেতৃত্বেই জাতীয় পার্টি সঠিক পথেই চলছে বলে দাবী করেছেন। এমনকি দুজনেই একই জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান! এটাকে অনেকেই বিছ্রি বা বাতলামো অথবা সার্কাস বলতে পারেন। তবে আমার কাছে মনে হচ্ছে এবং এটা একপ্রকার ভাবী-দেবরের রশিকতা মাত্র । কেননা এই দলের হুকুম তো নিশ্চয়ই ওনার কাছ থেকেই আসবে, যার হুকুম ছাড়া এই দেশের কিছুই হয় না। সুতারাং উপর থেকে অহী আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করাই ভালো, তাছাড়া এখনতো আর দেশে নির্বাচন নির্বাচন খেলাও নাই , যে হুকুম জরুরি আসতে হবে!

তাই বলছিলাম, জাতীয় অনেক কিছুই হয়। সেটা খাদ্য থেকে শুরু করে পশু-পাখি কিংবা গাছ-গাছালি। জনমানুষের জাতীয় দল প্রয়োজন আছে কিনা, তা জানিনা তবে অতিত অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই ভালো না ( বাকশাল )। দেশের সংবিধান অনুযায়ীও জাতীয় পার্টি নামে দল থাকতে পারে না ( অবশ্য ভবিষ্যতে এমনেও থাকবে না বলেই মনে করি)  সুতরাং দলটিকে জাতীয় রঙমঞ্চ নাম ঘোষনা করাই হবে যুক্তিযুক্ত ( ব্যক্তিগত মত)। সব শেষে বলবো, রাজনীতিতে , রাজনৈতিক দলে এবং সর্বোপরি দেশে গণতন্ত্র অতিব জরুরি, তা না হলে কোনো কিছুই সঠিকভাবে চলতে পারে না। রাজনীতিবিদদের বিবেকের ঘরে আলোর ছোঁয়া লাগুক ।

20190210_195317

বুলবুল তালুকদার 

সহকারী সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম 

 

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.