মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখা একজন কূটনীতিক কেএম শিহাব উদ্দীন

মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখা একজন কূটনীতিক- কেএম শিহাব উদ্দীন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সরকারী কর্মকর্তাদের মধ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে পাকিস্তান সরকারের চাকরী পরিত্যাগকারী প্রথম ব্যক্তি কে. এম. শিহাব উদ্দিন আহমেদ। ত্যাগ, সাহস ও জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের জন্য নিজের পরিবারের ভবিষ্যৎকে উপেক্ষা করে লোভনীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চাকুরী পরিত্যাগ করেন। ত্যাগ ও সাহসের মাধ্যমে একরকম নিজের জীবনকে বাজী রেখেছিলেন এই মানুষটি। তিনি তখন দিল্লীর পাকিস্তান দূতাবাসের প্রথম সেক্রেটারী ছিলেন। তাঁর সঙ্গে প্রেস কাউন্সিলর সাহেবও চাকুরী পরিত্যাগ করে পাকিস্তান দূতাবাস থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। তাঁরা দু’জনই ছিলেন সারা বিশ্বে চাকরী পরিত্যাগকারীদের পথিকৃৎ।

মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর নির্মম গণহত্যার প্রতিবাদে সর্বপ্রথম পাকিস্তান ফরেন সার্ভিস থেকে পদত্যাগ করেছিলেন কেএম শিহাব উদ্দিন। ১৯৩৭ সালে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার মুহাম্মদপুর গ্রামে তাঁর জন্ম। পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে যোগদান করেছিলেন ১৯৬৬ সালে। নয়াদিল্লী পাকিস্তান হাই কমিশনে প্রথম সচীব হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন ১৯৭১ সালে। মুক্তিযোদ্ধের শুরুতে পাকিস্তানী সামরিক জান্তার হিংসাত্মক আক্রমণকে কূটনৈতিকভাবে মোকাবেলা করার দীক্ষা নিয়ে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করেন। সময়ের বিচারে এটি একটি ঐতিহাসিক সাহসী সিদ্ধান্ত। মুক্তিযোদ্ধের পক্ষে কূটনৈতিক কর্মকান্ডের অংশ হিসেবে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লীতে বাংলাদেশ কূটনৈতিক মিশন স্থাপন করেছিল।

এছাড়াও তাঁর সহধর্মীনি বেগম খালেদা(বর্তমানে তিনি গুরুতর অসুস্থ রোগসজ্জায় আছেন, তার সেঝ মেয়ে সারাহ্ শিহাব উদ্দিন তার মায়ের জন্য দোয়া চেয়েছেন) কে সাথে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিভিন্ন কর্মকান্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। কে. এম শিহাব উদ্দিনের দু’জন ছোট মেয়ে, একজন ইলোরা শিহাব উদ্দিন ও অন্যজন ফারহানা শিহাব উদ্দিন। দেখতে পরীর বাচ্চাদের মতো। ফুটফুটে দু’জন ছোট মেয়ে প্রতিদিন দিল্লীর প্রচন্ড রোদকে উপেক্ষা করে বাংলাদেশের প্ল্যাকার্ড হাতে পাকিস্তান দূতাবাসের সামনে দাড়িয়ে থাকতো। বিক্ষোভ দেখাত প্রতিদিন। প্রচন্ড রোদ্রতাপে মেয়ে দু’টির সোনালী বর্ণ লাল হয়ে ঘাম ঝরে পড়তো। কিন্তু নিত্যদিন ওরা দাড়িয়েই থাকতো রাজপথে। সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বহু মানুষ সেই দৃশ্য দেখার জন্য ছুটে যেত।

দিল্লীতেই ভারতীয় রাজনীতির চাবিকাঠি। তাছাড়া নয়াদিল্লীতে রয়েছে পৃথিবীর নানান দেশের দূতাবাস। নয়াদিল্লীর কুটনৈতিক পাড়ায় কাজের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। তিনি ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে বিভিন্ন দূতাবাসের মাধ্যমে কাজ করে ছিলেন। এছাড়াও তিনি পোল্যান্ড, হাঙ্গেরী, কুয়েত, ইয়েমেন, ফ্রান্স এবং স্পেনেও রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ সরকারের সচিব পদে নিযুক্ত হন। ১৯৯৬-২০০০ সাল পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এসময়ে তার বড় কূটনৈতিক সাফল্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর এবং রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফর। ২০০১ সালে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য কে এম শিহাব উদ্দিনকে ২০০৬ সালে চট্টগ্রাম সমিতি পদক প্রদান করা হয়।২০১৬ সালে কে. এম শিহাব উদ্দিনকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করা হয়।

পরিশেষে আমরা কি মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখা কেএম শিহাব উদ্দিন, তার স্ত্রী ও কন্যাদের কথা ভবিষ্যতে স্মরণ রাখবো? নাকি হাজার হাজার মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা মানুষের মতো স্মৃতি-বিস্মৃতির অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে?

রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাক

সাবেক ছাত্রনেতা এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.