রাই আর শ্যাম। মানে রাধা কৃষ্ণের প্রেম কাহিনী কে না জানে। যুগ যুগ ধরে শ্রেষ্ঠ প্রেমের নিদর্শন হিসেবে উপমা দেয়া হয় রাই আর শ্যামের প্রেমলীলার। কথিত আছে রাই আর শ্যামের প্রেমে গোটা বৃন্দাবন নাকি সুবাসিত হয়ে উঠতো। প্রেম,পরকীয়া,শরীর সব কিছুর উর্ধে জগত জুড়ে রাই আর শ্যামের পবিত্রতার কথাই কিন্তু প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যুগে যুগে অনেক রাই দের জন্ম হয়।তারা যেখানেই জন্ম নেন সেটাই হয়ে যায় বৃন্দাবন। আর সেই বৃন্দাবন রাই’দের সৌন্দর্যে সুবাসিত হয়ে স্বর্গের মতোন সুন্দর।আর সেই রাই’দের সবার গল্পগুলো প্রায় একই রকম হয়। বেশ কয়েক বছর আগের কথা! সবুজের নগরী রাজশাহীর পদ্মাপাড়ে এক ঝুম বৃষ্টির দিনে দস্যি একটা পিচ্চি ছেলে বৃষ্টি বিলাস হেতু গিয়েছিল। বৃষ্টি ঝড়ছে অঝোর ধারায়। জনশূণ্য চারদিক। মহানন্দে ভিজতে ভিজতে দস্যি ছেলেটি আবিষ্কার করলো সে ছাড়াও এই নীরব পদ্মার চড়ে আরেকজন মানুষ মনের আনন্দে ভিজছে। সাদা সালোয়ার আর জামা পরিহিত মেয়েটিকে পরীর মতোন লাগছিল দেখতে। সেই মেয়েটির সাথে পরিচয় হয়েছিল ছেলেটির। মেয়েটি ছেলেটিকে বলেছিল একদিন,তুমি শ্যাম আমি রাই।গাধা ছেলেটি বোঝেনি সেদিন মেয়েটির কথা। কিন্তু এতটুকু সে বুঝেছিল শহর রাজশাহী তার কাছে স্বর্গের মতো সুন্দর। বৃন্দাবনে রাই যমুনায় ডুবে মরেছিল। আর রাজশাহীর সেই মেয়েটি মরেছিল এক ঝড়ের রাতে অ্যাক্সিডেন্ট এ। বড় হওয়ার পর সেই ছেলেটি বুঝেছিল রাই আর শ্যাম এর কথা। যখনি পবিত্র প্রেমের কথা আসে তখুনি রাই আর শ্যামের কথা মনে ভাসে। সেই ছেলেটি আবার যখন স্কুল জীবনের শেষ দিনগুলো পার করছিল তখন আবার তার জীবনে এক রাই আসে। আবার বিবর্ণ নগরী তার কাছে বৃন্দাবনের মতো সুন্দর হয়ে ধরা পড়ে। বছর দশেকের বড় প্রাইভেট টিউটর আপা যখন এক ভরা সন্ধ্যায় সিড়ির ঘরে আধো অন্ধকারে বুকে জড়িয়ে বলেছিল তুই শ্যাম আমি রাই। ভালবাসায় কোন জাত পাত বর্ণ বিদ্বেষ থাকতে নেই। রাই’য়ের মতোন সেই মেয়েটিও আত্মহনন করেছিল। কেন তার কারণ তখন বোঝেনি ছেলেটা। এখন বড় হওয়ার পর বোঝে। পবিত্র কোন ভালবাসাকে স্বীকার করে নেবার ক্ষমতা বর্তমান সমাজের নেই। ছেলেটি এখন ঘুরে ঘুরে রাই’দের খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু সবাই কি আর রাই হতে পারে?তবুও মাঝে মাঝে ক্ষনিকের তরে রাই’দের দেখা পায় ও। দূর থেকে দেখে চলে আসে। রোজ সন্ধ্যার পর যখন বিজয় স্মরণীর ওই রাস্তার পাশে সবুজ ঘাসের পাশে মুখে রঙ মেখে যে ভ্রাম্যমান পতিতারা শরীর বিনিময় করার জন্য দাঁড়িয়ে থাকে তখন অদ্ভতু সুন্দর লাগে তাদের। সব পাপ পঙ্কিলতা দূরে ঠেলে শুধু তাদের প্রণয়ের সৌন্দর্যটাই চোখে পড়ে। আর শহরটাকে তখন বৃন্দাবনের মতোই সুন্দর আর পবিত্র মনে হয়। এই সমাজ প্রণয়নীদের পাপী আর বেশ্যা বলে সম্বোধন করে কিন্তু আদতে তারাই তো সকল পবিত্রতার ধারক। যেদিন সমাজের মন পবিত্র হবে সেদিন রাই’দের যমুনায় ডুব দিয়ে মরতে হবে না। তারা হবে নগরের সৌন্দর্য,স্বর্গের বিকল্প। এখন আর প্রেমিকাদের রাই বলে ডাকা হয় না। রাই’রা কখনোই প্রেমে বিনিময় দেখেনা। কলঙ্ক’র ভয় করে না। তারা শুধু প্রেম ধারণ করে থাকে। অপার প্রেম। আমাদের গল্পের ছেলেটি আজও নিয়ম করে রাই খুঁজে বেড়ায়। প্রেম নয়। রাই। বৃন্দাবন বিলাসিনী রাই।

জাকওয়ান হুসাইন

