জঙ্গি আর সৈনিক সাথে ঘর করতে করতে মনরোগী হয়ে পড়ছেন কাশ্মীরবাসী

নিজের বাড়ির সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে স্ত্রীর শত অনুরোধেও ভিতরে ঢুকতে চাইছেন না মাঝবয়সি লোকটি। তাঁর স্ত্রী তখন পথচারী এক তরুণীকে বলছেন, রাস্তাঘাটে প্রতি মুহূর্তে পরিচয়পত্র দেখাতে দেখাতে এই অবস্থা হয়েছে স্বামীর। হঠাৎ মাটি ফুঁড়ে উদয় এক আগন্তুকের। প্রথমে হাত তুলতে বললেন লোকটিকে, তার পর সারা শরীর চাপড়ে দেহতল্লাশির ভান সেরে বললেন, ‘‘আইডি দিখাও।’’ লোকটি যান্ত্রিক ভাবে পকেট থেকে নিজের পরিচয়পত্র বার করে দিলেন। আগন্তুক সেটিতে চোখ বুলিয়ে বললেন, ‘‘ভেতরে যাও।’’ লোকটি বাড়িতে ঢুকে পড়লেন বাধ্য ছেলের মতো।

শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট’-কে অশান্ত কাশ্মীরে এনে ফেলে পরিচালক বিশাল ভরদ্বাজ বানিয়েছিলেন ‘হায়দার’। উপরের ঘটনাটা সেই হিন্দি ছবিরই এক দৃশ্য। যেখানে দেখা যাচ্ছে, জঙ্গি আর নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে নিত্য ঘর করতে করতে মনোরোগী হয়ে পড়ছেন আম কাশ্মীরবাসী। বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও সম্মাননীয় ডাক্তারি পত্রিকা ‘দ্য ল্যানসেট’-ও বলছে, এ সব নিছক কাহিনি নয়। দীর্ঘদিন চোখের সামনে হিংসা দেখতে দেখতে উপত্যকাবাসীর মানসিক স্বাস্থ্য সত্যিই গভীর ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।

গত ১৭ অগস্টের সংখ্যায় ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল নিয়ে একটি উত্তর-সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছে পত্রিকাটি। শিরোনাম— ‘কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ ঘিরে ভয় ও অনিশ্চয়তা’। সেই প্রবন্ধে লেখা হয়েছে, ‘‘প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রত্যয়ী, এই সিদ্ধান্ত কাশ্মীরের মঙ্গল করবে। কিন্তু তার আগে দরকার কাশ্মীরবাসীর (মনের) গভীর ক্ষত নিরাময়। দশকের পর দশক ধরে চলা সংঘর্ষ সেই ক্ষত তৈরি করেছে। কাজেই তাঁদের হিংসা ও বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দেওয়া যায় না।’’

 

চিকিৎসা বিষয়ক আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘মেদসঁ সঁ ফ্রঁতিয়ের (এমএসএফ)-এর একটি সমীক্ষার কথা উল্লেখ করেছে পত্রিকাটি। কাশ্মীরের সংঘর্ষে ক্ষতিগ্রস্ত দু’টি গ্রামীণ জেলায় চালানো ওই সমীক্ষার ভিত্তিতে এমএসএফ বলেছে, প্রায় অর্ধেক সংখ্যক কাশ্মীরি কদাচিৎ নিজেদের নিরাপদ মনে করেন। আর হিংসাত্মক ঘটনায় পরিবারের মানুষকে হারানো প্রতি পাঁচ জন মানুষের মধ্যে এক জন স্বচক্ষে মৃত্যু দেখেছেন। এই পরিসংখ্যান তুলে ধরে প্রবন্ধটিতে বলা হয়েছে, ‘‘আশ্চর্যের কিছু নেই যে, এই অঞ্চলের মানুষেরা উদ্বেগ, অবসাদ এবং ‘পোস্ট-ট্রম্যাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার’ (ভয়াবহ ঘটনার ছায়া থেকে আর বেরোতে না-পারা)-এর শিকার।’’

আশার আলো একটিই। পত্রিকাটির ওই সংখ্যারই একটি সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, বহুদিনের অস্থিরতা সত্ত্বেও কাশ্মীরিদের গড় আয়ু এখনও ভারতবাসীর সার্বিক গড় আয়ুর চেয়ে বেশি। পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ৬৮.৩ বছর, মহিলাদের ৭১.৮ বছর।

৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের সিদ্ধান্তকে ‘বিতর্কিত’ বলেছে ‘ল্যানসেট’ পত্রিকা। সাম্প্রতিক অতীতে ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা বেড়ে যাওয়া, শ্রীনগরে যোগাযোগ-সহ যাবতীয় পরিষেবা স্তব্ধ হয়ে যাওয়া, ১৯৮৯ থেকে কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদ মাথাচাড়া দেওয়া ইস্তক প্রায় ৫০ হাজার মৃত্যুর কথা বলেছে তারা।

সেই সঙ্গে রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের গত মাসে রিপোর্টের উল্লেখ করে লিখেছে, ‘‘দেশের নিরাপত্তা বাহিনী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলি মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে যথেষ্ট। যার মধ্যে সীমান্তের গুলিগোলা, যৌন হিংসা, সন্ত্রাসবাদী কাজকর্ম থেকে শুরু করে কাউকে গায়েব করে দেওয়া— সবই আছে।’’

এখানেই কিছুটা সমালোচনা কুড়িয়েছে পত্রিকাটি। অনেকে টুইটারে লিখেছেন, ‘ল্যানসেট বরং রাজনীতির বদলে স্বাস্থ্য আর ওষুধে নজর দিক।’ তাদের পর্যবেক্ষণকে ‘একপেশে’ বলে পত্রিকাটিকে বয়কটের ডাকও দিয়েছেন কেউ কেউ।

শুদ্ধস্বর/এইচ বি

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Discover more from শুদ্ধস্বর ডটকম

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading