কিছুদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টারের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক আ ব ম ফারুক বাজারে সহজলভ্য পাস্তুরিত দুধে দুই দফা পরীক্ষা চালিয়ে অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেন। পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে বিএসটিআইর লাইসেন্স পাওয়া পাস্তুরিত দুধের নমুনা পরীক্ষা করে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের ল্যাবরেটরি, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরি এবং বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট জানায়, এসব নমুনায় সিসা ও অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এসব প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে গত ২৮ জুলাই হাইকোর্ট ১৪টি কোম্পানির পাস্তুরিত দুধের উৎপাদন, সরবরাহ, ক্রয়-বিক্রয় পাঁচ সপ্তাহের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন।
এর পর থেকে নানা মহলের রোষানলে পড়েন অধ্যাপক। গবেষণা নিয়ে আলোচনা হয় সংসদেও। দুধের প্রতিবেদন নিয়ে নানা মহল থেকে তাকে চাপ দেয়া হয় বলেও গণমাধ্যমে অভিযোগ করেন অধ্যাপক ফারুক। গবেষণা প্রটোকল না মানায় তার (অধ্যাপক ফারুক) বিরুদ্ধে লিগ্যাল অ্যাকশন নেয়া হবে বলে জানান মৎস্য ও প্রাণি সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব কাজী ওয়াসি উদ্দিন। এরপর কৃষিমন্ত্রী এবং সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রীও অধ্যাপক ফারুকের গবেষণার সমালোচনা করেন। সে আলোচনায় পরে আসছি।
অ্যান্টিবায়োটিক (Antibiotics) হচ্ছে এক ধরনের জৈব-রাসায়নিক ঔষধ যা অণুজীবদের (ব্যাক্টেরিয়া ও ফাঙ্গাস) ধ্বংস করে বা বৃদ্ধিরোধ করে। ১৯২৭ সালে লন্ডনের সেন্ট মেরি হাসপাতালে কর্মরত অণুজীব বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ফ্লেমিং প্রথম আন্টিবায়োটিক আবিষ্কার করেন। ১৯৪১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রথম পেনিসিলিন মানুষের দেহে প্রয়োগ করা হয়। অক্সফোর্ডের একজন পুলিশ কর্মকর্তা Staplylococcus দ্বারা আক্রান্ত ছিলেন। পেনিসিলিনের প্রয়োগে তার অবস্থার নাটকীয় উন্নতি ঘটে। কিন্তু পাঁচ দিন পর পেনিসিলিয়ামের সরবরাহ শেষ হয়ে গেলে তিনি আবার আক্রান্ত হয়ে পড়েন এবং মারা যান। পরবর্তীতে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী হ্যারল্ড ডব্লিউ ফ্লোরে, এন.জি. হিটলি এবং আমেরিকার ছত্রাকবিদ চার্লস থম অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারকে এগিয়ে নিয়ে যান।
সাধারণত অণুজীবরা অন্য অণুজীবদের মধ্যে টিকে থাকতে অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি করে থাকে। বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিক অণুজীবের বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে কাজ করে। কিছু ব্যাক্টেরিয়া কিছু আন্টিবায়োটিকের আক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারে (Antibiotic resistant), কিছু ব্যাক্টেরিয়া ঐ একই আন্টিবায়োটিক দ্বারা আক্রান্ত (Antiobiotic sensitive) হয়।
একটি অ্যান্টিবায়োটিক যখন দিনের পর দিন ব্যবহৃত হতে থাকে তখন ব্যাক্টেরিয়াগুলো নিজেদের জিনে মিউটেশনের (Mutation) মাধ্যমে বিশেষ কিছু পরিবর্তন ঘটিয়ে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের ব্যবস্থা গড়ে তোলে। একে বলা হয় অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বা সুপার বাগ। পেনিসিলিন আবিষ্কারের দশ বছর না যেতেই এমনকি পেনিসিলিন আবিষ্কারের জন্য ফ্লেমিং নোবেল পাওয়ার আগেই পেনিসিলিন প্রতিরোধী ব্যাক্টেরিয়া আবির্ভূত হয় যেগুলো তাদের কোষ আবরণীর চার পাশে প্রোটিনের বিশেষ প্রাচীর তৈরি করে যা ভেদ করে পেনিসিলিন ভেতরে ঢুকতে পারে না। কিন্তু বিজ্ঞানও থেমে থাকেনি। নতুন নতুন প্রযুক্তির অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করে ব্যাক্টেরিয়াকে ধরাশায়ী করেছে। নতুন নতুন জেনারেশনের অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কৃত হচ্ছে ঠিকই কিন্তু তারচেয়ে বেশি গতিতে বাড়ছে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাক্টেরিয়া। যা মানব জাতির অস্তিত্বের প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সাইয়েদুর রহমান দি টেলিগ্রাফকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, সেখানে ২০১৮ সালে আইসিইউতে ৯০০ রোগীর ভেতর যে ৪০০ জন মারা গেছেন তার ৮০ শতাংশ ছিল ব্যাকটেরিয়াল ও ফাঙ্গাল ইনফেকশনের কারণে যেগুলো ছিল অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী (Antimicrobial Resistant Superbug)। এটি একটি বিরাট অশনি সংকেত।
২০১৫ সালে ইউরোপিয়ান জার্নাল অব সায়েন্টিফিক রিসার্চে প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশের বেশি রোগী রেজিস্টার্ড ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করে।
কিছুদিন আগে ঢাকা শিশু হাসপাতালে ৮ বছরের এক মেয়ের ইউরিন কালচারে ১৮টা অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে টেস্ট করা হয় যার মধ্যে ১১টাই রেসিস্ট্যান্ট আসে। যেগুলো রেসিস্ট্যান্ট নয়, সেগুলোর মধ্যে একটা ঠিকমতো কাজ করছে না। সম্প্রতি ঢাকার একটি হাসপাতালে এক নবজাতকের মেডিকেল পরীক্ষাতেও দেখা যায় যে শিশুটি প্রায় ১৮টি অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্ট। অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স বাংলাদেশের জন্য এখন নতুন আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অ্যান্টিবায়োটিক সহজলভ্য হওয়ায় বেড়েছে এর যথেচ্ছ ব্যবহার। প্রয়োজন ছাড়াই ওভার দ্যা কাউন্টার (প্রেসক্রিপশন ছাড়া ভোক্তার নিজের ইচ্ছায়) অ্যান্টিবায়োটিক সেবন, পুরো কোর্স শেষ না করা, গবাদি পশুর মাংস ও দুধ বৃদ্ধির জন্য অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো ইত্যাদি কারণে মানুষের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী সুবারবাগ বিস্তার লাভ করছে। আমরা যেসব প্রাণীর মাংস-দুধ বা শাকসবজি খাই- সেইসব প্রাণীর শরীরে বা সবজির উৎপাদনে যদি অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়, সেগুলো রেজিস্ট্যান্স তৈরি করে, যার প্রভাব মানুষের ওপর পড়ে। অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান যিনি দীর্ঘদিন ধরে সুপারবাগ নিয়ে কাজ করছেন, বিবিসি বাংলাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে জানান, বিশ্বে যে হারে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি করা হচ্ছে তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি হারে বাড়ছে অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স। যার ফলে অদূর ভবিষ্যতে সামান্য হাঁচি-কাশি-জ্বরেও মানুষের মৃত্যু ঝুঁকি হতে পারে।
তিনি আরও জানান, ‘একটা অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করতে লাগে ১৫ বছর, ওটার বিপরীতে ব্যাকটেরিয়া রেসিস্ট্যান্স হতে লাগে এক বছর। আগামী সাত বছরে দুইবারের বেশি অ্যান্টিবায়োটিক আসার সম্ভাবনা নেই। এক সময় দেখা যাবে, রোগের জীবাণুকে কোন ওষুধ দিয়েই ধ্বংস করা যাচ্ছেনা।’
সম্প্রতি অধ্যাপক আ ব ম ফারুকের গবেষণায় পাস্তুরিত তরল দুধে অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতির বিষয়টি উঠে আসে। খুব স্বাভাবিক নিয়মে এখন তাকে রাষ্ট্রযন্ত্রকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। কৃষিমন্ত্রী মো. আবদুর রাজ্জাক তার গবেষণার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের তার সহকর্মীরাও এই পরীক্ষাকে ব্যক্তিগত বলে দায়মুক্ত হয়েছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সুদূর বিলেত থেকে বলেছেন- ‘হঠাৎ করে একজন প্রফেসর সাহেব কী পরীক্ষা চালালেন, আর এই পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে আদালতে রিট হলো। একে একে সব কোম্পানির দুধ উৎপাদন বন্ধ কোনও কারসাজি এখানে আছে কিনা সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।’ বোঝা যাচ্ছে অধ্যাপক সাহেব বেশ চাপেই পড়ে গেছেন।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, ‘গবাদি পশুকে রোগমুক্ত রাখতে অনেক সময় অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো হয়। সেক্ষেত্রে দুধে কিছুটা অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি থাকতে পারে।’ কিন্তু এই কিছুটার প্রভাব কতটা হতে পারে, তা উপরের আলোচনায় স্পষ্ট। ইতোমধ্যে ভারত থেকে দুধ পরীক্ষা করে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্লিনচিট দিয়ে দেয়া হয়েছে। আ ব ম ফারুক স্যারের পরীক্ষার পেছনে কোন কারসাজি আছে কিনা- সেটা নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, অধ্যাপক সাহেব পরীক্ষা করেই অন্যায় করেছেন। ঠিক একইরকম একটি অন্যায় করতে দেখেছিলাম গত রোজার ঈদের আগে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ারকে। মাত্র ৬ দিনের ব্যবধানে একই পাঞ্জাবি দ্বিগুণ দামে বিক্রির অভিযোগে তিনি আড়ংকে সাড়ে চার লাখ টাকা জরিমানা ও ২৪ ঘণ্টার জন্য উত্তরা আউটলেট বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে তার বদলির আদেশের প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়। যদিও সামাজিক যোগাযোগ এবং সংবাদ মাধ্যমের চাপের মুখে বদলির ১২ ঘণ্টার মধ্যে তাকে স্বপদে বহাল করা হয়। এক্ষেত্রে অবশ্য প্রজ্ঞাপন জারির আগেই ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানী বদলির স্থগিতাদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। আমাদের দেশে ক্রনি ক্যাপিটালিজম যে কতটা প্রভাব বিস্তার করেছে তা এই দুটি ঘটনায় আমরা বুঝতে পারি।
অর্থের জন্য রাজনৈতিক দল, মন্ত্রী, আমলারা ব্যবসায়ীদের ব্যবহার করার বিনিময়ে তাদের নৈতিক-অনৈতিক সুযোগ সুবিধা দিতে বাধ্য থাকে।? দেশে সুশাসনের অভাব হলে ক্রনি ক্যাপিটালিজম বা স্বজনতোষী অর্থনীতির বিস্তার ঘটে। কখনো কখনো এমন অবস্থা তৈরি হয় যে এই বৃত্তের মধ্যে থাকা ব্যবসায়ীরা সরকারের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে যায়। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো তখন এই ব্যবসায়ী শ্রেণী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। বিশ্বের প্রতিটি দেশে অতি ধনী বৃদ্ধির পেছনে ক্রনি ক্যাপিটালিজম কাজ করে যা আমরা ইন্দোনেশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট সুহার্তোর পরিবার বা মেক্সিকোর কার্লোস স্লিমের অতি ধনী হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ার দিকে তাকালে বুঝতে পারব। ওয়েলথ এক্স-এর প্রতিবেদন ‘ওয়ার্ল্ড আলট্রা ওয়েলথ রিপোর্ট-২০১৮’ এর হিসেবে বিশ্বে অতি ধনী বৃদ্ধির হার বাংলাদেশে সর্বোচ্চ। আর এ কারণে আমাদের দেশের ধনিক শ্রেণী এতটা অতি ক্ষমতাধর গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে যে অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি অনেক সিদ্ধান্ত তাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। অধ্যাপক আ ব ম ফারুক এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার যে ক্রনি ক্যাপিটালিজমের প্রচলিত ধারাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয়-ব্যয় জরিপ-২০১৬ অনুযায়ী, ২০১০ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে দেশে সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ পরিবারের আয় প্রায় ৫৭ শতাংশ বেড়েছে। একই সময় সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ পরিবারের আয় কমেছে ৫৯ শতাংশ। অধ্যাপক আ ব ম ফারুকের ভাগ্যে কি ঘটবে তা আমরা জানি না। তবে ক্রনি ক্যাপিটালিজমের চক্র থেকে বেরিয়ে না আসতে পারলে ভবিষ্যতে আর কেউ স্ব উদ্যোগে দেশের মানুষের কথা ভেবে কিছু করবার সাহস করবে না এবং দেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন কখনোই সম্ভব হবে না। জিডিপি এবং পার ক্যাপিটা ইনকাম দেখিয়ে আমরা হয়তো উন্নয়নের অনেক মানদন্ডে এগিয়ে যাব কিন্তু সেই উন্নয়নের সুফল থেকে দেশের মধ্যবিত্ত এবং প্রান্তিক জনগণ বঞ্চিত হবে এবং বৈষম্যমূলক অর্থনীতির ধারা অব্যাহত থাকবে ।
সাকিব আনোয়ার,ছাত্রনেতা এবং রাজনীতি বিশ্লেষক ।
mnsaqeeb@gmail.com

