“রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি,
ধর্মগুরুরা হত্যা করে ধর্মেরই জীবন ভুরি ভুরি।’
প্রথম চরণটি কবিগুরু রবি ঠাকুরের ‘দুই বিঘা জমি’ নামক কবিতার; আর পরের চরণটি! বর্তমান নিজ দেশের প্রেক্ষাপটে নিজের পেট থেকে বেড়িয়ে এলো।
পৃথিবী, মানুষ এবং বিশ্ব মণ্ডলের ইতিহাস থেকে জানা যায় এক ঐশ্বরিক শক্তি সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করে। আর মানুষের ইতিহাস রাজা এবং ধর্মগুরুদের কাছে সংরক্ষিত। আমার মতে ধর্মগুরুদের আবির্ভাব ঘটে রাজাদের বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্যই। কিন্তু ঈশ্বর আছেন। তিনি মানুষের মাধ্যমেই তার বাণী বা ভালোমন্দ, মানুষের মঙ্গল-অমঙ্গলের দিক নির্দেশনা পাঠিয়েছেন। এক ঈশ্বর থেকেই বহু ধর্মের উত্থান। ঈশ্বরকেও সংজ্ঞায়িত করা হলো বহু নামে; তার মানে এখানেও দূর্নীতি, ঈশ্বরের সাথে দূর্নীতি!
তবুও মানুষ রাজার পর ধর্মগুরুদের উপর আস্থাশীল। কারণ, চার ভাগের তিন ভাগ বা তারও বেশি মানুষ নানান ধর্মে বা ঈশ্বরে বিশ্বাসী। সেই সাথে বলা যায়; অল্প কিছু সংখ্যক মানুষের কাছে বৃহৎ জনগোষ্ঠী জিম্মি থাকে আমরণ। যারা এই জিম্মি দশা সৃষ্টি করে এসেছে পৃথিবীর শুরু থেকে তারা রাজা এবং ধর্মের ধারক বাহক।
রাজার রীতিনীতি না মানলে নির্যাতন অনিবার্য যেমন; তেমনি পারলৌকিক ভয় ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে মানুষকে তার নিজের জ্ঞানগরিমার আলো থেকে দূরে রাখে ধর্মগুরুরা। তবে ধর্মের আরেক নাম শান্তি। ধর্মের মাঝে মানুষকে শেখায় ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, পাপ-পূণ্য, সহানুভূতি, ধৈর্য্য সহ্য, ক্ষমা কিংবা ঘৃণা করার শিক্ষা; মানুষ ধর্মের কাছে শিখে সত্য-মিথ্যা, সততা, মানবিক-অমানবিক গুণাবলি।
মানুষ যুগে যুগে যুদ্ধের মাধ্যমে আর ধর্মের মাধ্যমে শান্তি খুঁজে এসেছে। তবে সাধারণ মানুষ ধর্মের মাঝে শান্তি খুঁজে। তাই সন্তানদের পাঠানো হয় খুব ছোট থেকে মসজিদ-মন্দির, মাদ্রাসা, গির্জা-প্যাগোডা বা স্ব স্ব ধর্ম উপাসনালয়ে; ধর্ম গুরুদের কাছে। কিন্তু, আজ এ কি দেখছি! রাজা আর ধর্মগুরুরা সব একাকার। আজ এমন কোন ধর্ম পাওয়া যাবে না যে ধর্মের ধর্মগুরুদের কেউ কোন অপকর্মে জড়িত নেই। তাহলে? আমি বা আমরা কার উপর আস্থা রাখবো? এবং ধর্মগুরুদের অপরাধে লজ্জিত হয়ে স্বর্গও কাঁদছে।
আমি একজন মুসলিম বা ইসলাম ধর্ম অনুসারী হয়ে বলছি বা লিখছি যে, আমার সন্তানদের ধর্মশিক্ষার প্রয়োজন আছে। কিন্তু তাকে যে আর কোন ধর্ম প্রতিষ্ঠানে দেওয়ার সাহস পাচ্ছি না; যদি কিছু হয়ে যায়! ঈশ্বর তুমি আমার ধর্মমতে ‘আল্লাহ’ নামে পরিচিত। আজ তোমাকেই একমাত্র বলতে পারি, শূণ্যে থেকে আমাদের রক্ষা করো। আর কেউ যেন নুসরাতের মতো, শিশু মনিরের মতো কিংবা চট্টগ্রামের অক্সিজেন এলাকায় কওমি মাদ্রাসার হাবিবুর রহমান এর মতো না হয়।
আমরা সবাই জানি নুসরাত ফেনির সোনাগাজি ফাজিল মাদ্রাসার আলিম ছাত্রী। সেই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলা তার শ্লীলতাহানি করার চেষ্টা করেছে। অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির প্রতিবাদ করায় তাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করলো দূর্বৃত্তরা। তার গায়ে আগুন দেয়া হলো ০৬-০৪-১৯ইং তারিখে। বেচারি পাঁচ দিন মৃত্যুর সাথে লড়ে ১০-০৪-১৯ইং তারিখে মৃত্যুর সনদ নিয়ে বিদায় নিলো অকালে। আজ অনেকে বলছে, ঘটনা সাজানো; সিরাজ উদ-দৌলার মুক্তির দাবীতে বিক্ষোভও হচ্ছে। ছি!ছি! আমরাও ছাত্র ছিলাম। কেউ কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন – কোন শিক্ষাগুরুর উপর ক্ষোভ ঝাড়তে মিথ্যে অপবাদ দেওয়া সাহস ছিলো আমাদের কারো?
নুসরাতের বিষয়টি নিয়ে যখন নিরবে ভাবছি; তখনই শিশু মনিরের হত্যা ঘটনাটি আরো অবাক করে দিলো— যার বয়স মাত্র আট বছর, রাজধানীর ডেমরা এলাকার নুর-ই মদিনা মাদ্রাসার শিশুশ্রেণির ছাত্র। ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আব্দুল জলিল হাদীর নেতৃত্বে মুক্তিপণ চেয়ে ০৭-০৪-১৯ইং অপহরণ করা হয় শিশু মনিরকে। এরপর শিশুটিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় এবং বস্তাবন্দি করে মরদেহ লুকিয়ে রাখা হয় স্থানীয় একটি মসজিদে। পরে পুলিশের তদন্ত মতে জানা গেলো মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আব্দুল জলিল হাদী, মো. আকরাম ও আহাম্মদ সফি ওরফে তোহা নামে তিনজন মুক্তিপণ আদায়ে মনিরকে অপহরণ করে এবং ঘটনাকে গুম করে দিতে হত্যা করে দুল্ফির ফুলের মতো নিষ্পাপ শিশুটিকে। ভাবা যায়, মানুষের মনে মসজিদের স্থান কোথায়! আর ধর্মগুরুদের মনে? ছি! ছি! বলতেও দ্বিধান্বিত বোধ করছি।
যাহোক, ‘নুসরাত বিদায় নিলো সবাই কে কাঁদিয়ে’- এমন খবরে যখন গোট দেশ নিরব; তখনই আরেকটা তাজাখবর! চট্টগ্রাম নগরীর অক্সিজেন ওয়াজেদিয়া এলাকায় হাবিবুর রহমান নামে এক শিশুর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার, যার বয়স মাত্র বারো বছর। ইসলামিয়া মাদ্রাসার সঙ্গে লাগোয়া মসজিদের চার তলায় গ্রিলের সঙ্গে কাপড় দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। শিশুটিকে উদ্ধারের পর দেখা যায় তার দেহে তাজা ক্ষত (ফেসবুকে আপলোড করা ফটো দেখে)। যা দেখে সাধারণ মানুষের অনুমান তাকে হত্যা করার পর কাপড় দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে যাতে ‘আত্মহত্যা’ বলে ঝামেলা চুকিয়ে দেওয়া যায়। এই ঘটনা ঘটার পর এলাকাবাসী তালা ঝুলিয়ে দেয় এবং প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলতে থাকে। এতোদিন তারা কেন এসব অভিযোগ করেনি তা বোধগম্য নয়।
এখানেই কি শেষ! নাহ্, আরো অনেক অপকর্ম ঘটে যাচ্ছে রোজ। হচ্ছে মসজিদ-মন্দিরসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভিতরেই অহরহ ধর্ষণ, বলৎকার, খুন। ওহ্, বলৎকার শব্দটি আমার বেঁচে থাকাতে লজ্জা দেয় প্রতিক্ষণ।
ছোট ছোট শিশুরাও (ছেলে কিংবা মেয়ে) এমনকি প্রতিবন্ধী (যারা জানলোই না জীবনে যৌবন বা যৌন ক্ষুধার সংজ্ঞা!) কিংবা বয়োবৃদ্ধ নারীরাও জঘন্য যৌন লালসার শিকার।
এমন ঘটনা বাসে ঘাটে-ঘটে থাকলে অনেক প্রতিবাদের ঝড় উঠে। কিন্তু যখন খোদ ধর্ম গৃহে ধর্মগুরুরা এসব ঘটায় তখন সব ধর্মের মানুষেরা নিরব থাকে। ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলা অধর্ম! ছি,ছি,ছি। ঈশ্বর আমাদের জাগ্রত করুন।
এখন ভাবুন, আমরা আমাদের সন্তানদের নিয়ে কোথাও দাঁড়াবো? হয়তো অনেকে ভাবছেন, সবাই তো আর খারাপ না। হ্যাঁ, আমিও তাই ভাবছি। কিন্তু সবাই যে ভালো নয় এটাও আমাকে ভাবাচ্ছে। আজ ধর্মের কথা বলতে গিয়ে আপনারা আপন সন্তানদের সামনে লজ্জাবোধ করেন কি না জানি না; আমি লজ্জায় মাথা তুলারও সাহস পাই না। আর এসব ঘটনার ঘনঘটায় আস্থাও পাই না কারো উপর।
আসুন প্রতিবাদ করি, কোন ধর্ম-বর্ণ, জাত-পাত হিসেব না করে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ হিসেবে, সব ধরণের অপকর্মের বিরুদ্ধে জেগে উঠি। তবে, যারা এইসব ঘৃণিত কাজ করে যায় দিনে রাতে, গোপনে বা প্রকাশ্যে তারা মানুষ হলেও মানুষ নয়, তারা পশুর থেকেও নীচ- একথা বলতে শিখি। হোক তারা রাজা কিংবা রাজার পোষ্যবর্গ কিংবা ধর্মের ধারক বাহক- সেইসব হীনমন্য মানুষদের মানুষ বানাতে, সত্য এবং সুন্দরের জন্য প্রয়োজনে রক্ত দেওয়াও পুণ্যের কাজ। যেভাবেই হোক এই শ্যামল ধরাকে শান্তিপূর্ণ করে রাখা আমাদেরই দায়িত্ব।।


