পুঁজিবাদ কেবলমাত্র মনিবের পাহারাদার কুকুর

Iftakhar Ahmed Babu বাবু ভাই, গতকাল ইনবক্সে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং রুজভেল্ট ইনস্টিটিউটের চিফ ইকোনমিস্ট  নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ যোসেফ ই স্টিগলিজের একটি লিংক পাঠিয়েছিলেন “নিউলিবালিরিজম” ( নব্যউদারনীতিবাদ) এর উপর তার একটি লেখা, অবশ্য লেখাটি ছিলো গতবছরের মে মাসের শেষের দিকের। অর্থাত এক বছরের উপর সময়কালের লেখা।  যদিও নব্যউদারনীতিবাদ গত এক বছরে চারিত্রিকভাবে তেমন কোনো পরিবর্তন বা পরিবর্ধন হয়নি, সেই সূত্রে বলাই যায় লেখাটি আগামী বছরও সমসাময়িকভাবে বর্তমান চরিত্র বহন করবে অর্থাত লেখাটি চলিত। লেখাটি পড়লাম এবং বুঝবার চেষ্টা করলাম, বুঝলাম তবে লেখাটি মার্কিন মূল্লুকের সমাজ ব্যবস্থায় গত ৪০ বছর বা তিন যুগের বেশি সময় ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য উন্নত অর্থনীতিগুলির পরিব্যবস্থায় ধনীকশ্রেনীর করের হ্রাস, নিয়ন্ত্রণ এবং মুক্তবাজার এজেন্ডা বা ইশুকেই অনুসরণ করে লেখা। যোসেফ ই স্টিগলিজের লেখার বিষয়টি আমার আজকের লেখার প্রতিপাদ্য বিষয়  নয়। কেউ চাইলে গুগলে সার্চ দিয়েই লেখাটি পড়ে নিতে পারেন , ধন্যবাদ বাবু ভাই।

ব্যক্তিগতভাবে ধারণা করি বড় লেখা কেউ পড়েন না বা পাঠকের মনে আকর্ষণ করে না । সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে  না পড়েই আঙুল উঁচিয়ে পাড় পাওয়ার কৌশলটিও বেশ মজাদার বটে। তাই চেষ্টা থাকবে প্রতিপাদ্য বিষয়ে ছোটো করে বলবার। গতকালের আমার ছোট্ট একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস ছিলো

” পুঁজিবাদের ক্রোনিক রূপ “।

পুঁজিবাদ কখন বা কবে শুরু হয়েছিলো ? প্রশ্নটির উত্তর সঠিকভাবে কারো পক্ষেই দেওয়া সম্ভব নয় । সত্যিকার অর্থে পুঁজিবাদের অর্থ বা মানে কি? সেটা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে যুক্তি তর্ক আছে। জার্মানিতে ১৩ বা ১৪ শতকের দিকে রক্ষণশীল অর্থনীতিবিদ ” ওয়ার্নার স্যামবার্ট” এই শব্দটিকে জনমানুষের নিকট সুপরিচিত করে তুলেন।  ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, ১৪ শতকের প্রথমদিকেই কার্ল মার্ক্স এই পুঁজিবাদের তত্বটিকে পরিহার করেন।  পুঁজিবাদ বুঝার সহজ পদ্ধতি হলো ক্রয় বিক্রয়কে ভালো করে বুঝা। যেমন একজন ডিম বিক্রেতা তার ভিম বিক্রি করার জন্য অন্য কেউ একজনকে খুঁজে নেয়। আবার ডিম ক্রেতা সেও বাজার অর্থনীতির ভিতর দিয়েই পুঁজির মাধ্যমেই ডিম ক্রয় করে। এ পর্যন্ত ঠিক আছে। তবে পুঁজিবাদী সংস্করণে অর্থের মালিক আরো বেশী অর্থের জন্য ব্যবসা করেন এবং উদগ্রীব থাকেন। কার্ল মার্ক্স তার বিখ্যাত বই ” ক্যাপিটাল- Capita” এ লিখেছেন ” The movement of Capital is thus excessive  ” অর্থাত কার্ল মার্ক্স এর ভাষায় অর্থনীতির এই পুঁজিবাজারের মূলধন পুঁজিকরার মাত্রা অত্যধিক ।

পুঁজিবাদে নিউলিবালিরিজন বা উদারনীতিবাদ, এটা একটা ভিন্ন মনোবিজ্ঞান বা দর্শন যা কিনা পুঁজিবাদেরই সম্পূরক নীতির ভিতর দিয়েই প্রবাহিত হয় । এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে আক্ষরিক অর্থে না হলেও আপেক্ষিক অর্থে পুঁজিবাদ সব সময়েই বিরাজমান ছিলো। যেকোনো সময়ের বিবেচনায় দেখা যায় পুঁজিবাদ কার্যত বহাল ছিলো। যেহেতু ৮০ দশকে ইউরোপ জুড়ে মূলত রুশ প্রজাতন্রে সমাজতন্ত্রের একটি ধস নামে এবং গণতন্ত্রের একটি বিশাল জয় হয়, আর এই গণতন্ত্রের অর্থনৈতিক ভিতিমূল থেকেই পুঁজিবাদ বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পায়, তাই পুঁজিবাদের সঙ্কটটি ৮০ দশক থেকেই বেশি ঘনীভূত হয়। যদিও পুঁজিবাদের বিকাশ ও ব্যাপ্তির জায়গাটি নিয়ে প্রশ্ন তোলা জায়, তবে একথাও সত্য যে পুঁজিবাদ তার স্বধর্ম ও পুঁজিবাদী চরিত্র  অনুসরণ করেই বিকাশ ও ব্যাপ্তি ঘটায়। যার ফলাফল আমাদের মত দরিদ্র দেশগুলো ভুগতে বাধ্য হয়।

পুঁজিবাদে নিউলিবালিরিজন বিষয়টি এক ধরণের ধান্দায় ফেলে দেয়। বিষয়টি বুঝতে সেই ব্রিটিশ শাসন থেকে কিছুদিন পূর্বের আরব বসন্তের দিকে খেয়াল করলেই পরিষ্কার হবে  এবং বর্তমানের আরব সাগরের উত্তপ্ত অবস্থানও সেই নিউলিবালিরিজন বা নব্যউদারনীতিবাদেরই কার্যক্রম । ব্রিটিশ আমলে আমাদের দেশেই মানুষকে চা খাইয়ে হাতে সাবান , এমনকি টাকাও দেওয়ার কাহিনী শোনা যায় । আরব বসন্তে অনেকটাই এরকম ছিলো। অনেকের মনে থাকার কথা তিউনিসিয়ার বেন আলীকে ক্ষমতাচ্যুত করতেই কিছু ছাত্র রাজপথে প্রথম নেমে আসে যা পরে আরব বসন্ত নাম পায়। সেখান থেকেই মূলত উৎপত্তি শেষ এসে ঠেকেছিলো ইরাকে। মাঝে ইজিপ্টে মোবারক আর লিবিয়ায় গাদ্দাফি। কি ছিলো না লিবিয়ায়? যেখানে এক টাকায় গাড়ি ভর্তি করে তেল পাওয়া যেতো, নতুন বিয়ে করলে সরকার থেকে ৫০ হাজার ডলার ( লিবিয়ান) পাওয়া যেতো, মাসে সামান্য কিছু খরচে বিদুৎ ছিলো। সেই লিবিয়াও আজকে পুঁজিবাদের নব্যউদারনীতিবাদের দ্বারা ধ্বংসিত। এতো গেলো কেবলমাত্র আরব দেশের কথা। আরো একটু আগে ফিরে তাকালে দেখা যায়, ৯০ দশকে গলফ যুদ্ধের ভিতর দিয়েই নব্যউদারনীতিবাদ উঁকি দিয়েছিলো । কে না জানে সবুজ পাগরির ওসামা বিন লাদেনের কথা ? আফগানিস্তানের যুদ্ধ কি ওসামাকে ধরতে হয়েছিলো ? উত্তরটি নাই দিলাম। তবে এটুকু শুধু বলি , সেই সময়ে আফগানিস্তানে ভালো একটি দোতলা বাড়িও ছিলো না । ওসামা ওসামা যুদ্ধ  খেলা চালিয়ে চার হাজার মাইল পাইপলাইন আফগানিস্তানে উপর দিয়ে তৈরি হলো ! তাহলে কি পুঁজিবাদের অর্থ অযথাই পাইপলাইন তৈরি করলো ? কিসের সেই পাইপলাইন ছিলো ? ফলাফল মূলত ছিলো ইরাক যুদ্ধ বাকি সব ছিলো পুঁজিবাদের উছিলা মাত্র । মনে পরে কি ডঃ বুসের কথা । জাতিসংঘের ভেটো কে বৃদ্ধা আঙুল দেখিয়ে ( ভেটো কে নাকি বৃদ্ধা আঙুল দেখানো যায় না !!!) ইরাক যুদ্ধ । ডঃ বুস তখন বলেছিন ” আয়দার ইউ আর উইথ আচ অর ইউ আর উইথ টেররিজম ” কি চমত্কার বাণী দিয়ে  , কি কেমিক্যাল বোমার কথা বলে পৃথিবীর ৬৪ % ভাগ জমাকৃত তেল উধাও। এখানেই সেই আফগানিস্তানে যুদ্ধের কারণ ও পাইপলাইন কাহিনী । সব কিছু হয়েছে সেই পুঁজিবাদের নব্যউদারনীতিবাদের বুলি শুনিয়ে। এই বিষয়গুলো একটু বিবেচনায় নিলেই  টের পাওয়া যায় পুঁজিবাদের নব্যউদারনীতিবাদের ঠেলা। এখন সেই সব কিছু শেষ , তো বসে কি খই ভাঁজবে ? চলে এলো আইএস!!! বাকি আলাপ আজকে নয়।

আমার এত কিছু বলার কারণ সেই নব্যউদারনীতিবাদকে ঘিরেই। পুঁজিবাদের চরিত্রই এমন  যা কার্ল মার্ক্স ক্যাপিটালে বলে গেছেন , মূলধন পুঁজি করার মাত্রা অত্যাধিক । সব বলতে আনেক অনেক বলতে হবে, তাই একটু একটু টাচ্ করে যাওয়া । এখনে আমাদের দেশের কথা ছোট্ট করে বলেই শেষ টানবো। আমদের দেশটি যুদ্ধ জয়ী স্বাধীন দেশ। সেই মহান যুদ্ধ কেন এবং কি কারণে হয়েছিলো মোটামুটি সবার জানা। তাহলে আমাদের দেশে কেন পুঁজিবাদের এমন আক্রমণ? এটাও বড় আলাপ বলে আজকে বিরতি  দিলাম।  তবে সেই পাহারাদার কুকুরের কথায় আসি। পাহারাদার কুকুর কেবলমাত্র মনিবকেই চেনে। অন্যসবাই তার চোখে শত্রু , সব  সুযোগেই কামরায় । আবার উল্টোভাবে বলা যায় অন্য সবার শত্রু এই পাহারাদার কুকুর। এখন আমাদের নিজেদের ভাববার বিষয় কুকুরের কামর খাবো না কুকুর তাড়াবো ? দেশটি কেন স্বাধীন হয়েছিলো? সেটা ভাবনায় নিলেই উত্তর মিলে যাবে ।

20190210_195317

বুলবুল তালুকদার

সহকারী সম্পাদক , শুদ্ধস্বর ডটকম  

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.