বিএনপির অফিস কর্মীদেরও বের করে দিয়েছে ছাত্রদলের বিক্ষুব্ধরা, মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে দেওয়ায় নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় অবরুদ্ধ করে রাখা ছাত্রদল নেতা-কর্মীরা ভেতর থেকে কর্মচারীদেরও বের করে দিয়েছে।
ছাত্রদল ঢাকা মহানগর পূর্ব শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক রবিউল ইসলাম নয়ন এ সময় বিক্ষুব্ধদের মারধরের শিকার হয়েছেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। অসুস্থতার কারণে শয্যাশায়ী বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এখনও ওই ভবনের তৃতীয় তলায় রয়েছেন। দুইজন অফিস কর্মী এবং চিকিৎসক সেখানে তার সঙ্গে রয়েছেন। মঙ্গলবার বেলা ১১টা থেকে বিএনপি কার্যালয়ে তালা দিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকা ছাত্রদল কর্মীরা এক পর্যায়ে কার্যালয়ের বিদ্যুত সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেন। কয়েক ঘণ্টা পর আবার বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করা হয়।

ছাত্রদলের সাবেক কয়েকজন নেতা সকালে কার্যালয়ে এসে বিক্ষুব্ধদের বাধার মুখে ভেতরে ঢুকতে ব্যর্থ হন। পরে তারা গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে গিয়ে লন্ডনে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বিক্ষুব্ধ ছাত্রদল নেতাদের একটি প্রতিনিধি দলও বিকালে গুলশানের কার্যালয়ে যান। সেখান থেকে তাদের সঙ্গে তারেকের কথা হবে বলে বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন।
ছাত্রদলের সর্বশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছিল ২০১৪ সালের ১৪ অক্টোবর। রাজীব আহসানকে সভাপতি ও আকরামুল হাসানকে সাধারণ সম্পাদক করে গঠিত ওই আংশিক কমিটিতে তখন ১৫৩ সদস্য ছিলেন।গত ৬ জুন ঈদের আগের দিন ছাত্রদলের ওই মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে দেয় বিএনপি। সে সময় দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নতুন কাউন্সিলে প্রার্থী হওয়ার জন্য তিনটি যোগ্যতা নির্ধারণী শর্তও ঠিক করে দেওয়া হয়।
বিক্ষোভ, কার্যালয়ে তালা
ছাত্রদলের সর্বশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছিল ২০১৪ সালের ১৪ অক্টোবর। রাজীব আহসানকে সভাপতি ও আকরামুল হাসানকে সাধারণ সম্পাদক করে গঠিত ওই আংশিক কমিটিতে তখন ১৫৩ সদস্য ছিলেন।দীর্ঘদিন পর সেই কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা হলে তাতে ৭৩৬ জনকে পদ দেওয়া হয়। তবে ওই কমিটি নিয়েও সংগঠনে ক্ষোভ-বিক্ষোভ দেখা গিয়েছিল। গত ৬ জুন ঈদের আগের দিন ছাত্রদলের ওই মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে দেয় বিএনপি। সে সময় দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নতুন কাউন্সিলে প্রার্থী হওয়ার জন্য তিনটি যোগ্যতা নির্ধারণী শর্তও ঠিক করে দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, প্রার্থীকে ছাত্রদলের প্রাথমিক সদস্য হতে হবে, তাকে অবশ্যই বাংলাদেশের কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী হতে হবে এবং ২০০০ সালের পরে এসএসসি/সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।
নতুন কাউন্সিল অনুষ্ঠানে সংগঠনটির সাবেক নেতাদের নিয়ে সোমবার তিনটি কমিটি করে দেওয়া হয় বিএনপির পক্ষ থেকে। কিন্তু কমিটি ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা এবং প্রার্থিতার ক্ষেত্রে বয়সের শর্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়ে মঙ্গলবার সকালে বিএনপি অফিসের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা ‘সরকারের দালালেরা হুঁশিয়ার, সাবধান’, ‘আমাদের অধিকার দিতে হবে দিতে হবে’- ইত্যাদি স্লোগান দিতে শুরু করলে উত্তেজনা তৈরি হয়।
রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে কমিটি ভেঙে দেওয়ার বিষয়টি জানানো হয়েছিল বলে তার বিরুদ্ধেও স্লোগান দেন ছাত্রদলের বিক্ষুব্ধরা। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে তারা কার্যালয়ের বিদ্যুতের লাইন কেটে দিলে পুরো অফিস বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। ওই অবস্থায় বিএনপি নেতারা রিজভীকে সরিয়ে হাসপাতালে নেওয়ার প্রস্তুতি নেন। সেজন্য একটি অ্যাম্বুলেন্সও আনা হয়। কিন্তু সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কার্যালয়ের তৃতীয় তলায় নিজের কক্ষেই ছিলেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব।
বাধার মুখে ‘বড় ভাইয়েরা’
ছাত্রদলের সাবেক নেতা শামসুজ্জামান দুদু, আমানউল্লাহ আমান, আসদুজ্জামান রিপন, ফজলুল হক মিলন, শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, এবিএম মোশাররফ হোসেন, মীর সরফত আলী সপু, শফিউল বারী বাবু, আবদুল কাদের ভুঁইয়া জুয়েল, হাবিবুর রশিদ হাবিব বেলা ১১টার দিকে কার্যালয়ের সামনে আসেন। কিন্তু বিক্ষোভের মধ্যে তারা ভেতরে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হন। সাবেক নেতাদের মধ্যে খায়রুল কবির খোকন ও আজিজুল বারী হেলাল সকালে বিক্ষোভ শুরুর আগেই কার্যালয়ে ঢুকে পড়েছিলেন। বেলা সাড়ে ১২টা দিকে তারা অফিস থেকে বেরিয়ে এলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ‘ভুয়া’ ‘ভুয়া’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন।
কিছু সময় নয় পল্টনে হোটেল ভিক্টোরিয়া সামনে দাঁড়িয়ে থাকার পর ছাত্রদলের সাবেক এই নেতারা গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে যান। সেখান থেকে তারা লন্ডনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন বলে দলের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা জানান। এর আগে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু, বিশেষ সম্পাদক শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস আদালতে হাজিরা দিয়ে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কার্যালয়ের সামনে এলে বিক্ষুব্ধদের সামনে পড়েন। তাদের দাবির কথা শুনে সেখান থেকে চলে যান তারা।
আপত্তি বয়সসীমায়
ভেঙে দেওয়া কমিটির সহসভাপতি আজমল হোসেন পাইলট সাংবাদিকদের বলেন, “এটা আমাদের প্রতিবাদ কর্মসূচি। হঠাৎ করে ঈদের আগে এই কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আমরা ঢাকা শহরের ১২টা ইউনিট ও আমাদের সদ্য বিলুপ্ত কেন্দ্রীয় সংসদ ঐক্যবদ্ধভাবে একটা আবেদননামা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে পাঠিয়েছিলাম। সেখানে তিনটা বিষয়ের উল্লেখ ছিল।”
বয়সের সীমারেখা না রাখা, আপাতত ছয় মাস মেয়াদী এবং পরে এক বছর মেয়াদী কমিটি গঠন এবং কেন্দ্রীয়, বিশ্ববিদ্যালয়, মহানগর ও কলেজের সমন্বয়ে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছিল ওই তিন দবিতে। পাইলট বলেন, “এখানে ভুল বোঝার কোনো অবকাশ নেই। আমাদের দাবি একটা, আমাদের ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি একটা- আমাদের দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি। আমরা এখানে এসেছি ঈদে যারা বাড়িতে ছিলাম সবাই কোলাকুলি করব বলে। কিন্তু ঈদের আগের দিন আমরা দেখতে পেলাম রাতের বেলা প্রেস রিলিজের মাধ্যমে আমাদের কেন্দ্রীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। আমরা এতে আহত বোধ করছি।” সাবেক কমিটির সহ সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী ইফখাইরুজ্জামান শিমুল সাংবাদিকদের বলেন, “আমাদের যে দাবি বা প্রস্তাব ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কাছে দিয়েছি, তার বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আমাদের অবস্থান কর্মসূচি চলবে।”
‘ওরা আমাদের ছোট ভাই’
দুপুরে গুলশানে যাওয়ার আগে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সাবেক ছাত্রদল সভাপতি ফজলুল হক মিলন পার্টি অফিসের সামনে সাংবাদিকদের বলেন, “বিক্ষোভ থাকতেই পারে, এটা অস্বাভাবিক কিছু না। তাদের দাবি থাকতে পারে, যৌক্তিকতাও থাকতে পারে। এটা সমন্বয় করে বাস্তবায়নের দিকে আমরা যাচ্ছি। তাদের বেদনা-ক্ষোভ আমরা শুনব। সকলের সাথে আলোচনা করে আমরা কাজ করব।” দলীয় কার্যালয়ের সামনে এই বিক্ষোভ নিয়ে উদ্বিগ্ন নন বলে দাবি করেন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মিলন।
বিএনপির প্রচার সম্পাদক সাবেক ছাত্রদল সভাপতি শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি বলেন, “যারা আজকে এখানে বিক্ষোভ করছেন, তারা আমাদের ছোট ভাই। ওদের যদি সুন্দরভাবে মূল্যায়ন করতে পারে বিএনপি, অথবা তাদের সাথে যদি আলাপ-আলোচনা করতে পারি, তাহলে সমাধানে আমরা আসতে পারব। আমরা সেই কাজটি অবশ্যই করব। অবশ্যই তাদের সাথে ধীরে ধীরে আলোচনা করব।” বয়সসীমা না রাখার যে দাবি বিক্ষুব্ধরা করেছে- সে বিষয়ে প্রশ্ন করলে এ্যানি বলেন, “এটা তো আমার একার বিবেচনার বিষয় নয়, এটা তাদের সাথে আলোচনা করেই সমাধান ও সমন্বয় হতে পারে।”
মারমুখী ছাত্রদল
সকাল থেকে বিএনপি কার্যালয়ের বাইরে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার পর বিকালে মারমুখী হয়ে ওঠেন ছাত্রদলের বিক্ষুব্ধরা। বিকাল ৩টা ৫৫ মিনিটে কার্যালয়ের তালা খুলে ভেতরে ঢোকে বিক্ষোভরতদের একটি অংশ। বিলুপ্ত কমিটির আজমল হোসেন পাইলট, আসাদুজ্জামান, ওমর ফারুক মুন্না, মফিজুর রহমান আশিক, আবুল হাসান, মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক, বাইজিদ আরেফিন ছিলেন তাদের নেতৃত্বে। তালা খোলার পর বিক্ষুব্ধরা ভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করে দেন। বিএনপির দপ্তরের কর্মী দলিল উদ্দিনকে এ সময় কার্যালয় থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। আরও কয়েকজন ভবন থেকে অফিস কর্মীকে বের করে দেন ছাত্রদলের কর্মীরা। এ সময় ভেতরে থাকা ছাত্রদল ঢাকা মহানগর পূর্ব শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক রবিউল ইসলাম নয়ন বিক্ষুব্ধদের রোষের শিকার হন। তাকে মারধর করে তৃতীয় তলা থেকে নামিয়ে একটি অটোরিকশায় তুলে দেওয়া হয়।
পরে বিক্ষুব্ধ নেতাদের একজন সাংবাদিকদের বলেন,“আমরা ৯/১০ জনকে বের করে দিয়েছি। আমরা দীর্ঘদিন ছাত্রদল করি, কোনো পদবী নাই। যাদেরকে বের করে দেওয়া হয়েছে তাদেরকে আমরা চিনি না। তারা টোকাই ও বহিরাগত।”
প্রতিনিধি দল গুলশানে
অফিস কর্মীদের কয়েকজনকে বের করে দেওয়ার পর আবার বিএনপি কার্যালয়ে তালা দিয়ে বাইরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন ছাত্রদলের বিক্ষুব্ধরা। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের নেতৃত্বে কয়েকজন নেতা বিকাল সোয়া ৫টার দিকে কার্যালয়ে এলে তালা খুলে তাদের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়। বিএনপির সহ সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুস সালাম আজাদ, স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মীর সরফত আলী সপু, ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) যুবদলের সভাপতি রফিকুল ইসলাম মজনুও ছিলেন আব্বাসদের সঙ্গে।
বিএনপি নেতারা নয়া পল্টানে আসার আগেই বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয় থেকে বিক্ষুব্ধদের নেতাদের ডাকা হয়। ভেঙে দেওয়া কমিটির এজমল হোসেন পাইলট, আসদুজ্জামান, বয়েজিদ আবেদীন, ওমর ফারুক, জহিরউদ্দিন প্রিন্স, গিয়াসউদ্দিন মানিক ও মিয়া মো. রাসেল আলোচনার জন্য গুলশানের পথে রওনা হন।
শুদ্ধস্বর/ বিটি

