বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল নূরুন্নবীর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য

গত ২২ মে নীরবে চলে গেলেন একাত্তরের রণাঙ্গনের সাহসী যোদ্ধা লে. কর্নেল (অব.) এস আই এম নূরুন্নবী খান বীরবিক্রম। ষাটের দশকের বিভিন্ন আন্দোলন, ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে তার ছিল সরব উপস্থিতি।

আমার সঙ্গে নূরুন্নবী ভাইয়ের পরিচয় হয়েছিল ১৯৮০ সালের পর। সে সময়ে একটি ব্যর্থ সেনা-অভ্যুত্থানে জড়িত থাকার অভিযোগে তিনি চাকরি থেকে বরখাস্ত হন। তখন নামের শেষে লিখতেন ‘বরখাস্ত’। এ অভিধায় বিশেষিত হওয়ার পেছনে ক্ষোভ ছিল, যন্ত্রণা ছিল। নানা অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে দেখা হতো, কথা হতো। এভাবেই পরিচয়, যোগাযোগ ও বন্ধুত্ব। সমকালসহ বিভিন্ন পত্রিকায় লিখতেন, অফিসে আসতেন। সদা হাস্যোজ্জ্বল মুখ। প্রাণখোলা হাসি। আড্ডা হতো। আলোচনায় ঘুরেফিরে আসত ষাটের দশকের বিভিন্ন আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ।

চিরসংগ্রামী মানুষ নূরুন্নবী। নোয়াখালীর রামগঞ্জে এক দরিদ্র পরিবারে ১৯৪২ সালে তার জন্ম। বাবা জামালপুর শহরে সামান্য বেতনে মসজিদের ইমামতি করতেন। তিনি লিখেছেন, ‘নিদারুণ অনটনের এই সংসারে নুন আনতে পানতা ফুরোবার দশা লেগেই ছিল। যেদিন ভাত রাঁধবার চাল জোগাড় হলো তো, তরকারি রাঁধবার কিছু নেই। তাই আমাকে খাল-ডোবায় নেমে মাছ ধরতে হতো। বলতে গেলে প্রতিদিনই। গরু-ছাগলও চরাতে যেতে হতো মাঠে। তাছাড়া ক্ষেতে কাজ করার লোকজনেরও জোগাড়যন্ত্র করতে হতো। পাওয়া না গেলে আমাকেই করতে হতো সে কাজ। ফলে সেই ১০-১১ বছর বয়েসেই লাঙল-জোয়াল নিয়ে হালচাষের কাজে আমি পুরোদস্তুর দক্ষ হয়ে উঠি। এরই ফাঁকে ফাঁকে পড়াশোনা কোনো রকম চালিয়ে যেতে থাকি।’ (যুদ্ধের জীবন, জীবনের যুদ্ধ; পৃষ্ঠা ১৫-১৬) পঞ্চম শ্রেণির ফাইনাল পরীক্ষার সময় তার জামা ছিল না। চাচাতো ভাইয়ের জামা ধার করে পরীক্ষা দিতে হয়েছে। তিনি বিনা চিকিৎসায় দুই

Download (1)

বোনের মৃত্যুও দেখেছেন, যা পরিণত বয়সেও তাকে কষ্ট দিত। পঞ্চম শ্রেণি পাস করে বাবার কর্মস্থল জামালপুর শহরে একটি হাই স্কুলে ভর্তি হন। মসজিদের হজুরায় স্বল্প পরিসরে থেকে পড়াশোনা করতে হতো। আবার টিউশনিও করেছেন। এমন প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পান। মাধ্যমিক পরীক্ষায় সম্মিলিত বোর্ডের মেধা তালিকায় ১২তম স্থান অধিকার করেন। এর পর আর তাকে পেছনে তাকাতে হয়নি। স্কলারশিপের টাকায়ই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। আর ‘আর্মি সিভিলিয়ান স্কলারশিপ’ নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেছেন। এই স্কলারশিপধারীদের সঙ্গে নূরুন্নবীর পার্থক্য ছিল, অন্য সবাই ভয়ে ভয়ে থাকতেন। পড়াশোনার বাইরে কিছুতেই জড়াতেন না। আর নূরুন্নবী ছিলেন উল্টো। তিনি ব্যস্ত থাকতেন মিছিল-মিটিংয়ে। এমনকি সেনাবাহিনীতে যোগদানের পরও পত্রিকায় প্রকাশিত ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের বিবৃতিতে তার নাম থাকত। এ জন্য তাকে কমান্ডারদের ভর্ৎসনা শুনতে হতো, শাস্তিও ভোগ করতে হতো।

কর্নেল নূরুন্নবীর মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের ঘটনা চমকপ্রদ। একাত্তরের ২৫ মার্চ যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তখন তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের কাকুল প্রশিক্ষণ শিবিরে। কমিশনপ্রাপ্ত অফিসার হিসেবে ‘ওয়ার কোর্স’ প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন। সেখান থেকে ২৭ মার্চ এক বাঙালি সুবেদারের সহায়তায় পূর্ব পাকিস্তানগামী পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে বিমানে ঢাকা ফেরেন। বিমান থেকে নেমে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে যান। সেখানে কিছু বাঙালি অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের বিদ্রোহ করতে উদ্বুদ্ধ করেন। ওইসব অফিসারের বৈরী মনোভাব আঁচ করতে পেরে তিনি ক্যান্টনমেন্ট ত্যাগ করেন। তারপর বুড়িগঙ্গা পার হয়ে নানা প্রতিকূলতার মুখে নড়াইল পৌঁছেন। সেখানে কিছুদিন মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাজ করেন। এর পর সীমান্ত পার হন। মুজিবনগর সরকার গঠনের পর জেনারেল এমএজি ওসমানীর সঙ্গে দেখা করেন। ওসমানী সাহেব তার এডিসি নিযুক্ত করেন; কিন্তু তাকে হাতছানি দিচ্ছিল রণাঙ্গন।

তখন খবর পেয়েছেন, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নূরুন্নবীর শ্বশুরকে (দিনাজপুরের সিভিল সার্জন) হত্যা করেছে। ভারতের মাটিতে আশ্রয় নেওয়া পিতৃশোকে মুহ্যমান ও সন্তানসম্ভবা স্ত্রীর মুখ ও সন্তানের আগমনী বার্তা তার যুদ্ধে যাওয়ার ইচ্ছা দমাতে পারল না। ইচ্ছা পূরণে সহায়তা করেন মেজর শাফায়াৎ জামিল। শাফায়াৎ তখন নবগঠিত তৃতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক। তিনি জেনারেল ওসমানীকে বুঝিয়ে নূরুন্নবীকে নিয়ে এলেন তৃতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে। সীমান্তে যুবকদের মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণসহ কয়েকটি যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন। তারপর শাফায়াৎ জামিলের অনুমতিক্রমে তিনি কুড়িগ্রামের রৌমারীতে মুক্তাঞ্চল গঠন করেন। সেখানে ছাত্র-যুবককে নিয়ে এক বিশাল মুক্তিবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। গড়ে তোলা হয়েছিল বিচার ব্যবস্থা, হাজতখানাসহ পূর্ণাঙ্গ বেসামরিক প্রশাসন।

নভেম্বরে যৌথ বাহিনীর সিলেট অভিমুখী অভিযানে থার্ড বেঙ্গল রেজিমেন্টসহ আরও মুক্তিযোদ্ধা দল শরিক হয়। এ সময় তিনি গোয়াইনঘাট, রাধানগর, সালুটিকর, গোবিন্দগঞ্জসহ নানা যুদ্ধে যে সাহস ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন, তা কিংবদন্তি হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। মিত্রবাহিনীর সদস্যদেরও তা মুগ্ধ করেছিল। তাই যৌথ বাহিনীর লে. কর্নেল রাজনাথ সিং তাকে ভারতীয় বাহিনীর সর্বোচ্চ খেতাব মহাবীর চক্রের মতো সম্মাননায় ভূষিত করার জন্য বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন-ÔThis officer has not only braught lauerls to the force that he belongs, but the nation should be proud of this brave son.

সেনা অফিসার নূরুন্নবীকে ছাপিয়ে ছিল তার রাজনৈতিক পরিচয়। আগেই বলেছি, তিনি শিক্ষা ও স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনের অগ্রসেনাদের একজন। তখন তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (ইউকসু) সহসভাপতি। ১৫ ফেব্রুয়ারি সার্জেন্ট জহুরুল হকের মরদেহ নিয়ে মিছিলে যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তিনি তাদের অন্যতম। তিনি সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে স্বাধীনতার বৈপ্লবিক প্রক্রিয়ায়ও যুক্ত ছিলেন। তাই ১৫ ফেব্রুয়ারির মিছিলের ব্যানারে লিখেছিলেন- স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক। তখন তার কর্মকাণ্ড কেবল ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি শ্রমিকদের মধ্যেও কাজ শুরু করেন। ঢাকা শহর রিকশা শ্রমিক লীগ গঠন করা হলে তাকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়।

স্বাধীনতার পর তিনি সেনাবাহিনীতে ফিরে গেলেন। ‘৭৩ থেকে ‘৭৬- যুক্তরাজ্যের রয়েল মিলিটারি সায়েন্স কলেজ থেকে স্টাফ কোর্সসহ পরমাণু প্রকৌশলে ডিগ্রি লাভ করেন। তবে সেনাবাহিনীতে তার চাকরি স্থায়ী হয়নি। আগেই বলেছি, ১৯৮০ সালে একটি ব্যর্থ সামরিক অভিযানে জড়িত থাকার অভিযোগে তিনি চাকরি হারান এবং এক বছর কারাদণ্ডও ভোগ করেন।

চাকরিচ্যুত হওয়ার পর শুরু হয় তার জীবনের আরেক অধ্যায়। জীবিকার প্রয়োজনে ঠিকাদারি শুরু করেন। পাশাপাশি লিখতেও থাকেন। মুক্তিযুদ্ধের বই প্রকাশের লক্ষ্যে কলম্বীয়া প্রকাশনী গড়ে তোলেন। এ প্রকাশনী থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই প্রকাশিত হয়েছে। এক সময় প্রকাশনীর কার্যক্রম থেমে যায়। কিন্তু তার হাতের কলম সচল ছিল। তিনি আমৃত্যু লিখে গেছেন। এ পর্যন্ত তার ১২টি বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- জীবনের যুদ্ধ যুদ্ধের জীবন, রৌমারী রণাঙ্গন, অপারেশন বাহাদুরাবাদ, অপারেশন রাধানগর, অপারেশন সালুটিকর প্রভৃতি। তার আরও ৩টি পাণ্ডুলিপি অপ্রকাশিত। এসব বই ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ।

শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আন্দোলনসহ মুক্তিযুদ্ধের নানা অনুষ্ঠানে তাকে দেখেছি। যে সত্য প্রকাশে অনেকেই দ্বিধান্বিত, নির্ভয়ে, নিঃসংকোচে তা তাকে বলতে শুনেছি। তার কাজ ও ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মুক্তিযুদ্ধ।

তার বয়স হয়েছিল প্রায় ৭৭ বছর। এ বয়স যথেষ্ট নয়। তার পরও প্রকৃতির এ বিধান নিয়ে বলার কিছু নেই। আমার কাছে কষ্টকর- নূরুন্নবী ভাইয়ের এই নীরব প্রস্থান। সংবাদমাধ্যমে খবরটাও ভালো করে এলো না। কেউ জানল, কেউ জানল না। তাকে নিয়ে কারও কোনো বাণী চোখে পড়েনি। পত্রিকায় লেখালেখি বা কোনো টিভি চ্যানেল আলোচনার আয়োজন করেনি।

না, এখন কোনো কিছুই তার আর দরকার নেই। বরং দরকার আমাদের। তাকে যথাযোগ্য মর্যাদায় স্মরণ করার মধ্য দিয়ে জাতির ইতিহাস মহিমান্বিত হবে। নতুন প্রজন্ম পাবে একাত্তরের পথচলার প্রেরণা।

Download
সাংবাদিক ও লেখক : আবু সাঈদ খানের সমকালে প্রকাশিত লেখা ।

শুদ্ধস্বর / বি তালুকদার

 

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.