কোন পথে হাঁটবো

দিনের পর দিন অপরাধ বেড়েই চলছে। আমরা ভাবতে ভাবতে ভাবার শক্তিও যেনো হারিয়ে ফেলেছি। পত্রিকার পাতায় চোখ রাখতে ভয় পাই, বুক কেঁপে কেঁপে উঠে, টিভির সামনে দাঁড়ালে পা কাঁপে ঠকঠক করে। কোন না কোন ভীতিকর, বীভৎস, ঘৃণিত আশঙ্কায় ডুবে থাকি সবাই। রক্তের কোন দাম নেই, সম্ভ্রম যেন মাটির পুতুল। কোন পিতামাতা আজ স্বস্তিতে থাকতে পারে না যতক্ষণ তাদের সন্তানেরা স্কুল থেকে, মাদ্রাসা থেকে, কলেজ থেকে, চাকুরীস্থল থেকে, বাজার থেকে, মেলা থেকে কিংবা ভ্রমণ শেষে বাড়ি না ফেরে।

আবার; প্রতিদিন সড়কও কেড়ে নেয় একাধিক  প্রাণ, খুন হয় যেখানে সেখানে, ধর্ষিতা হয়ে কেউ জীবনের আশা ছেড়ে দিয়ে কোন রকম একলা ঘরে বেঁচে থাকে, কেউ কেউ গলাতে রশ্মি দিয়ে চিরমুক্তির সনদ নিয়ে চলে যায় নিরবে। আবার কেউ কেউ গুম হয়ে যায়- গলে যাওয়া, পঁচে যাওয়া, ঝুলন্ত লাশও মেলে। কারো কারো লাশটাও আর মেলেনা। এর সাথে বলৎকার!
আজ ছি! ছি! না বলে আমরা যেনো হো’হো’ করে যাই।

ইদানিং ধর্ষণ আর বলৎকারের ঘটনা খুব বেশি করে ঘটছে। কিছুদিন আগে ইভটিজিং আর এসিড নিক্ষেপের ঘটনা ছিলো ভয়াবহ। প্রেমের প্রস্তাবে ব্যর্থ হয়ে কিংবা ধর্ষণের ব্যর্থ হয়ে অথবা কোন কারণ ছাড়াই মেয়েরা ইভটিজিং এর স্বীকার হতো। ইভটিজারদের আচরণে মাত্রাতিরিক্ত অশ্লীলতা থাকার কারণে অনেক মেয়ে বাড়ি ফিরার সাথে সাথে আত্মহত্যা করতো।
আর এসিড এর ভয়াবহতার কথা আমরা সবাই জানি। কত মেয়ে এসিডে ঝলসে গিয়ে চেহারার বিকৃত রূপ নিয়ে বেঁচে আছে! তার হিসেব কে করে?
যাহোক, আইনের প্রয়োগে এসব অপরাধ সমাজ থেকে দূর করতে না পারলেও অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে; এতেই অনেকটা ভালো আছি।

কিন্তু, এই অবস্থাও বেশিদিন ধরে রাখা গেলো না। এরপর ঐসব অপরাধ নতুন রূপ ধারণ করে আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। বেড়ে গেলো আবার গুম, ধর্ষণ, খুন, বলৎকার এবং সবশেষে নিজেকে বাঁচাতে মানুষ হয়ে মানুষকে আগুনে পুড়িয়ে মারা শুরু হলো। মানুষ কত নিষ্ঠুর হয়ে যাচ্ছে দিনে দিনে তা ভাবতে গেলে নিজেকে মানুষ পরিচয় দিতে লজ্জা করে।

দিনের পর দিন এসব ঘটনা ঘটেই চলছে; আমরা যার এক অংশও ঠিকমতো জানতে পারি কি না তাও অনুমেয় নয়। শুধুমাত্র যে কয়টা ঘটনা পত্রিকার পাতায় কিংবা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রকাশ পায়, আমরা তা-ই জানি। এবং দুয়েকদিন কারো কারো রক্ত গরম হয়ে উঠলেও বা থাকলেও; প্রতিবাদের দুয়েকটা বাক্য মুখ ফসকে বের হলেও এরপর সব একাকার। মামলা হয়, তদন্তের নামে দিন-মাস-বছর পেরিয়ে যায়, কোন কোন লাশের দু-তিন বার ময়নাতদন্ত করতে হয় পঁচা গলা দেহ মাটির গর্ত থেকে তুলে— কে অত খবর রাখে? সবার তো নিজের জীবন, সংসার বা পরিবার রয়েছে।

আগে আগে এসব অপরাধ বেশি করে ঘটাতো বখাটে, নেশাখোর প্রভৃতি ধরণের মানুষ। কিন্তু আজ সব পেশার মানুষেরা এসব অপকর্মের সাথে জড়িত; কমবেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের, বিভিন্ন সমাজের, বিভিন্ন মর্যাদার মানুষ জড়িত; কিন্তু যে কোন ধর্মের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ধর্মের ধারক বাহকদের কারো দ্বারা এমন অপরাধ সংঘটিত হলে বিষয়টি চাউর হয় বেশি। কেননা, তখন সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে যে, তাদের আস্থার শেষ কলসটিও ফুটো।

আমিও কথা বলতে ছাড়ি না। কারণ, আমি নিজেও একজন মুসলিম। আমার ধর্মে ধর্ষণ, যিনা বা বলৎকারের মতো অপরাধের কঠিন সাজা প্রদানে বিন্দু পরিমাণ অনুকম্পা দেখানোও নিষেধ রয়েছে। তারপরও এমন অপরাধ দিনে দিনে বেড়েই চলছে। আসলে এমন অপরাধী কেনো; আমি যে কোন ধরণের অপরাধীর কোন ধার্মিক পরিচয় দিতে চাই না। অপরাধীর একটাই পরিচয় যে, সে অপরাধী।  এবং আমাদের দেশটাও একটা ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। তাই, একজন ধর্ষক বা খুনি কিংবা দুর্নীতিবাজ, সুধখোর, ঘুষখোর, চোর, ডাকাত, লুটতরাজ_ এদের কে কোন ধর্মের বা কে শিক্ষক, কে শয়তান তা আমলে না নিয়ে বিচার কার্য করাই হলো উত্তম কাজ।

আসলে দিনের পর দিন এসব অপরাধ বেড়ে চলার মূল কারণ আইনে দূর্বলতা বা যথাযথ প্রয়োগের অভাবে কিংবা বিচার বিলম্বিত হওয়ার কারণে পূর্বে ঘটে যাওয়া বা এমন অপরাধ করে কারো পার পেয়ে যাওয়া। উদাহরণ স্বরূপ বলতে পারি, তনু হত্যা মামলার কোন কিছুই আজও প্রকাশ হলো না, বিশ্বজিৎ হত্যা মামলার রায় হলো কিন্তু কার্যকর কবে হবে তা সাধারণের জানার বাইরে, পুলিশ সুপার বাবুলের স্ত্রী মিতু হত্যা মামলারও কোন কিছুই হলো না, ভিকারুননিসা স্কুলের লম্পট শিক্ষক পরিমল জ্বয়ধরের যাবতজীবন সাজা হলো চার বছর পর, সাগর-রুনীর ছেলেটাও বুঝি ভুলে গেছে যে, তার বাবা আর মা কে কী নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয়েছে!

—–এমন আরো শতশত ঘটনা রয়েছে। আমরা সাধারণ মানুষ, আইনের উপরই তবুও আমাদের শতভাগ আস্থা। কেনোনা এদেশে শুধু নয় বিশ্বের প্রায় ৮৫% ভাগ দেশেই ধর্মীয় আইন অকার্যকর।  ইসলাম ধর্মমতে একজন ধর্ষক নয় যিনাকারীদের নুন্যতম সাজা হলো অর্ধেক শরীর মাটিতে পুঁতে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করা। একবার ভাবুন যিনাকারী বলতে কিন্তু সেচ্ছায় এমন কাজ করেছে যারা তাদের বুঝানো হয়। তাদের জন্য যদি এমন সাজা হয় তাহলে একজন ধর্ষক বা বলৎকারের কেমন সাজা হওয়া উচিৎ! অথচ; সেখানে আজ যারা ধর্মের এসব মত প্রচার করে তারাই এমন হীন কাজ করে যাচ্ছে (এ যে শুধু মুসলিমরা করে যাচ্ছে তা নয়, অন্যান্য ধর্মের ধারক বাহকরাও এবং শুধু বাংলাদেশে নয় অন্যান্য দেশেও এমন অপরাধীর সংখ্যা কম নয়)। আর এর মূল কারণ, তারা জানে যে, ধর্মীয় কঠিন সাজার প্রয়োগ আর নেই; সব দেশ এখন ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। আইন বা আদালতের বিচারের মাধ্যমে যা হয়; তাই। তার উপর রয়েছে অনেক ফাঁকফোকর।

আজ আমরা কোন দিকে যাবো। ধর্মের মধ্যে থেকে এইসব মানুষেরা বিভিন্ন ধর্মের মান মর্যাদা সব ধ্বংস করে দিচ্ছে, সাধারণ মানুষের আস্থাকেও হত্যা করে যাচ্ছে। আর আইনের মন্থর গতিতে আমরা দিনে দিনে বিচারের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরে ঘুরে হয়ে যাচ্ছি নিঃস্ব। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও তনু, মিতু, বিশ্বজিৎ এর মতো কেউ না কেউ হারিয়ে যাচ্ছে, কঠিন আফোসের সাথে- হায়েনার মতো দাঁত কেলিয়ে তৈরী হচ্ছে সিরাজ উদ-দৌলা, পরিমল জ্বয়ধরের মতো নীচ মনের মানুষেরা।

আজ আমরা কোন পথে হাঁটবো, কোন পথে আস্থা বা নিরাপত্তা- এই সিদ্ধান্ত কেউ-ই নিতে পারি না, সন্তানদের জন্য কোন নিরাপত্তার চাদর কোথাও নেই। নৈতিকতাও দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে; হারিয়ে যাচ্ছে ধর্মের রীতিনীতি কিছু ভন্ড ধার্মিকদের অসামাজিক কাজে। আজ দেশে দেশে মসজিদ, মন্দির, মাদ্রাসা, গির্জা, সমাজ ব্যবস্থা, নগর-সভ্যতা, গ্রাম-বন্দর, সব জায়গায় শয়তানের রাজত্ব। তবুও এমন অবস্থা থেকে আমাদের একমাত্র ভরসা আইন বা বিচার ব্যবস্থার উপর আর স্ব স্ব ধর্মের নিরাকার সৃষ্টিকর্তার করুণার দিকে আজন্ম চেয়ে থাকা।।
20190412_074204

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.