আমার এক প্রবাসী বাংলাদেশি বন্ধু সেদিন এক প্রকার ঝাড়ি দিয়েই বললো,
“আপনি দেখি বাংলাদেশের খবরাখবর ভালোই রাখেন ! মিঞা খাইয়া আর কাম পান না ! কি হইবো এগুলো লিখে ! থাকেন আপনে বাংলাদেশ নিয়া, আমি বরং ফুটবল নিয়া বিনোদনে আছি, বাংলাদেশের রাজনীতির চেয়ে আমার ফুটবলই ভালো”
এবার আমার এই বন্ধুর কিছু কথা বলা দরকার। আমার এই বন্ধুটি আমার চেয়ে কিছুটা বয়সে বড় বলেই জানি। আমি যতদিন যাবত্ প্রবাসে আছি, প্রায় সমপরিমাণ সময় সেও প্রবাসে । প্রথম দিকে সেই সময় থেকেই আমার এই বন্ধুটি আমাকে আপনি বলে সমন্বন করতো এবং আমিও । তবে এতদিন পরেও সে আমাকে আপনি বলেই সমন্বন করে। তবে আমি সেই আপনি থেকে ওকে তুমিতে রূপান্তরিত করেছি। মজার ব্যাপার হলো তার মাঝে এই আপনি সমন্বয়ে বিন্দুমাত্র সংকোচ নেই। আমিও তাকে সমপরিমান বা বেশি সম্মান করি। বর্তমানে আমরা এই আপনি আর তুমিতেই অভ্যস্ত । আমাদের মাঝে চমত্কার বোঝাপড়া এবং আন্তরিক সমন্বন ।
আমার এই বন্ধুটি বেশ বুঝদার এবং বেশ মিতব্যয়ী মানুষ । দেশে থাকতে রাজনীতির সাথে নয় তবে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং টুকিটাকি লেখালেখির সাথে জড়িত ছিলো। সেই হিসেবে কথাবার্তায় বুঝা যায় দেশে সাংস্কৃতিক জগত সমন্বয়ে তার বেশ ভালোই জানাশোনা আছে। রাজনীতি সমন্বয়েও বেশ জানাশোনা তবে দেশের বর্তমান রাজনীতিতে তার বেশ বিতৃষ্ণা । সেই বন্ধুর কথা হলো ছাড়েন মিঞা এইসব রাজনৈতিক প্যাচালের লেখা। তাই বন্ধুটির কথা রাখতেই আজকে একেবারেই ভিন্ন কিছু লিখতে ইচ্ছা হলো।
আমি রাজনৈতিক বিষয়ে লিখতেই বেশি পছন্দ করি। অনেক সময় মাথায় রাজনীতি ব্যতিরেকেও অনেক কিছুই আসে তবে লেখা হয়ে উঠে না। তবে মজার বিষয় হলো আজকে একজন তরুণ প্রজন্মের ফেসবুক বন্ধুর একটি স্ট্যাটাস দেখে ভাবলাম দেখি একটু ভিন্ন কিছু লিখে।
তরুণ প্রজন্মের ফেসবুক বন্ধুটির চমত্কার একটি নাম ” কামরুজ্জামান হীরা “ । আজকে তার স্ট্যাটাসটি তুলে দিলাম , সে লিখেছে
” একটি না শব্দ দুটি মানুষের মাঝে সর্বোচ্চ দূরত্ব তৈরি করতে সক্ষম “
বুঝাই যায় বেশ তরুণ। তার স্ট্যাটাস নিয়ে আমার কোনো ভাষ্য নেই। আমি আসলে যা বলতে চাচ্ছি তা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয় ।
আসুন একটু দেখি আমাদের বাংলা ভাষায় এই “না” এর ব্যবহার কিভাবে হয়। একটি উদহারণ দিলে পরিষ্কার হবে। আমরা দীর্ঘ দুশ বছরের বেশি ব্রিটিশদের শাসনে ছিলাম। তাদের সেই শাসনের অনেক ভালো বিষয় আমাদের মাঝে এখনও বিরাজমান, তবে সেটা ভিন্ন আলোচনা। তাদের সেই শাসন আমাদেরকে অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত করেছে বা আমাদের চালচলনে, কথাবার্তায় অনেক কিছু প্রভাব রেখে গেছে। যেমন : অনেক ধরনের ব্যবহারে আমরা বলি ” বেটা একটা ব্রিটিশ ” বা ” ওর রক্ত ব্রিটিশদের রক্ত “ ইত্যাদি । তবে এই ” না “ এর ব্যবহারে মারাত্মক একটি প্রভাব আছে।
এই ইংরেজি বাক্যটি লক্ষ্য করুন , ” I do not know “ যার বাংলা সবারই জানা ” আমি জানি না” । লক্ষ্য করুন, এই ইংরেজি বাক্যটিতে ” Not ” বা ” না” শব্দটি বাক্যের মাঝে। আর এই বাক্যেটির বাংলায় একটু লক্ষ্য করুন, ” আমি জানি না “ এই বাক্যের ” না ‘ শব্দটি বাক্যের শেষে ! এরকম আপনি যে কোনো বাক্যের ব্যবহার লক্ষ্য করলে দেখবেন , ইংরেজিতে No শব্দটি মাঝে আর বাংলায় না শব্দটি শেষে। যেমন , I do not go, I do not eat ইত্যাদি । এগুলুর বাংলায় , আমি যাবো না , আমি খাবো না ইত্যাদি । এক জায়গায় না মাঝে আর আরেক জায়গায় না শেষে। এর মূল কারণটি বিবেচ্য বিষয় । মূলত ইংরেজদের শাসনকালে আমাদের না বলার অধিকার ছিলো না। কোনো অধিকার আমরা চর্চা করতে পারিনি। ফলে এক সময় না বলার অধিকার হলেও , বুঝাই যায় সেটা নত মাথায় হয়তো কোনো ভাবে শেষের দিকে বলার শাহস হতো। অর্থাত বিশেষ ভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এই “না” না বলার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে ধীরে ধীরে এটা নিজেদের ভাষা চর্চায় প্রবেশ করে শেষের দিকে। ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আজ অব্দি আমাদের সমাজে “না” বলার সহজ ব্যবহার আমরা সরলভাবে করতে পারি না। আজও সমাজে সত্যের ক্ষেত্রেও না বলি না। হয়তো মাথা ঝুঁকিয়ে বা হু হা করে পার পাওয়ার চেষ্টা আমাদের সমাজে আজকেও বিরাজমান ।
তরুণ প্রজন্মের হীরা ” না “ দিয়ে যা বুঝিয়েছে সেদিকে না যেয়ে, বাংলার বর্ণমালা ন, ম, ব এই তিনটি দিয়েই বলি। বর্ণমালা ন এর সাথে আকাড় বা ম এর সাথে আকাড় কি ব এর সাথে আকাড় কত কঠিন, সুমধুর বা আশ্চর্যে রূপান্তর হয়। ন আকাড় না , এটা সত্যের সাথে বলতে পারা সব সময়ের জন্যেই মঙ্গলজনক। ম এর সাথে আকাড় কি সুমধুর মা শব্দ । আবার ব এর সাথে আকাড় সেটা একসাথে দুবার লিখলে বাবা, আহ্হা সেকি ডাক। না বাদ দিয়ে এখন মা এবং বাবা তে আসি। আজকাল প্রায়শই পত্রিকায় দেখি ওমুক বিরাট অফিসার বা বিরাট ধনসম্পত্তির মালিক মা কে রাস্তায় ফেলে গেছে !!! আজকের জাতীয় এক পত্রিকায় দেখলাম এক বাবার সে কি আক্ষেপ ছেলে বাবা কে প্রতিদিনই মারে !!! অথচ এই ছেলে মেয়েরাই এক সময় ছোট্ট শিশু হাটতে পারতো না, খেতে পারতো না। সেই মা বাবাই কত যত্নবান হয়ে , কত কস্ট করে বড় করে। কথায় বলে দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম বুঝে না। যাদের মা বাবা নেই ( আমার মত) তারা নিশ্চয়ই বুঝে কি হারিয়েছি। সকলের প্রতি শুধু বলবো, মা বাবাদের প্রতি যত্নবান হোন , জীবনে শান্তি নিশ্চিত ।

বুলবুল তালুকদার
সহকারী সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

