#রিংগিং_টেলিফোন_ধরো_হ্যালো_বলো
ফোন বাজলেই কি ধরা যায়?
এমন কিছু কল আসে যা’
সবার কল সবখানে সবসময় ধরা যায়না।
এমনকিছু কথা আছে যা’
সবকথা সবার সাথে সবসময় বলা যায়না।
এই যেমন সেদিনের এক ঘটনা……..
পাবলিক বাসে করে অফিস থেকে বাসায় ফিরছি। ঢাকা সিটির পাবলিক বাস আর থানা-হাজতের আসামীদের কভার্ড ভ্যান একই জিনিষ। প্রচণ্ড ভিড়ের সময় এই জিনিষের ভিতরের যাত্রীরাও আসামীদের মত বাইরের জগতের একটু আলোবাতাসের শেষ দেখা দেখার আশায় প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালাতে থাকেন।
আসামী পরিবহনের তবুও একটা সুবিধা আছে, গন্তব্য ছাড়া তারা যেখানে সেখানে গাড়ী থামিয়ে যাত্রী উঠাননা। কিন্তু পাবলিক বাসের সারা রাস্তায় স্টপেজ। কন্ট্রাক্টর সাহেব মুড়ির টিনের মত বাসের ভিতর শুধু যাত্রী ভরতেই থাকেন। বাসের সিটও মাশাল্লাহ্! বাস-কোম্পানির লাভের কথা মাথায় রেখেই বোধহয় বডি বিল্ডাররা ছত্রিশ সিটের বাসকে ছেচল্লিশ সিট বানাইয়া রাস্তায় ছাড়ছেন। এইজাতীয় চিকনবুদ্ধির কেরামতিতে আমাদের দেশীয় কারিগররা বিরাট উস্তাদ। তারা সিটগুলিরে সাইজে এমন ছোট করেন যে, লম্বা ঠ্যাং এর যাত্রীদের সামনের সিটের পাছার টিনে ঘষায় ঘষায় হাঁটুর চামড়া ছিলে যায়।
অপরদিকে, বাসের মধ্যে আবার কিছু দামড়া টাইপের যাত্রী থাকেন। তাদের দেহ যেমন মোটা, মাথাও তেমন মোটা। সেইসব বলদরা তাদের দুই ঠ্যাং এমনভাবে মেলাইয়া বসেন, যেন দশটাকা ভাড়া দিয়া বাসের ভিতরে সোফাসেট কিইন্না লইছেন। তাদের চিপাই পড়লে পাশের যাত্রীর অবস্থা হয় যেমন ‘শীল পাটাই ঘষাঘষি মরিচের জান শেষ’। তবে শুভলক্ষণ হলো, বাসের সোফায় বসে সেইসব বলদদের এখন একটা জিনিস আয়েশ করে টানা বন্ধ হয়েছে, সেটা হলো বিড়ি সিগারেট।
এতো চিপাচিপির পরেও, পাশের সিটে যদি সুন্দরী মহিলা বসে তখন কিন্তু সিটের সাইজ এতো ছোট লাগেনা। তখন মনে হয়, উস্তাদ কারিগরদের চিকনবুদ্ধি থাকাটা খারাপ না। মনে হয়, নারী-পূরুষ মিলেমিশে বসার জন্য পাবলিক বাসের সিটের সাইজ ছোট রাখার দরকার আছে 😀
সেইরকম একটা ছোট সিটেই আমি ভিজাবেড়ালের মত গুটিশুটি মেরে বসে আছি। কারণ, আমার পাশের সিটে বসে আছে একটা মেয়ে। মেয়ে না মহিলা ঠিক বোঝা যাচ্ছেনা। সে টাইটফিট থ্রীপিছ পরে আছে। পাশে বসা মহিলা যাত্রীর মুখের দিকেতো আর ঘাড় ঘুরিয়ে তাকানো যায়না। আবার মুখ নাদেখে আজকাল মহিলাদের বয়স বুঝাও দায়। আগেরদিনে বিবাহিত মেয়েরা শাড়ী পরতো। তখন শাড়ীপরা মেয়েদেরকে দেখলে মনে হতো মহিলা। এখন সবাই সৌন্দর্য সচেতন। ফ্যাশানেবল্ আধুনিক যুগ। পঞ্চাশোর্ধ মহিলারাও এখন টাইট ফিট্ থ্রীপিছ, জিন্সের প্যান্ট পইরা, মুখে ম্যাচিং করা লিপ্ষ্টিক মাইরা ঘুইরা বেড়ান। কেযে মেয়ে আর কেযে মহিলা, মুখ দেখেও এখন আর কিছু বোঝন যায়না।
মেয়ে না মহিলা সে যাইহোক, সে যে মারাত্মক সুন্দরী সেটা বেশ বুঝা যাচ্ছে। সুন্দরী বুঝার জন্য বেশী কিছু দেখার লাগেনা। সুন্দরীরা হলো গনগনে আগুনের মতো, পাশে থাকলে আঁচেই বুঝা যায়। ‘স্বর্ণকারে স্বর্ণ চেনে, কামারে চেনে লোহা’ বলে একটা কথা আছে। এইসব জিনিস চোখ দিয়ে দেখার লাগেনা, টাচ্ করলেই বোঝন যায়। আমি তার মুখ না দেখেই সেটা বেশ বুঝতে পারছি। দৈবাৎ এমন সুন্দরী সহযাত্রী হলে তখন বলতে ইচ্ছা করে, এই পথ যেন শেষ না হয়।
পথের দিকে এখন আর আমার কোন খেয়াল নেই। বাসের দু’চোখ যেদিকে যায় সেদিকে সে যাক। আমার নজর এখন সুন্দরীর কোলের উপর। তার কোলের উপর রাখা টসটসে সাদা ফর্সা আঙ্গুল আর মোবাইলের দিকে। সে বোধহয় কারও সাথে চুটিয়ে চ্যাটিং করছে। তার দুইহাতের দুই বুড়ো আঙ্গুল মোবাইলের স্ক্রিনের উপর যেন চড়বড় করে খই ফুটার মত খই ফুটছে। আঙ্গুল চালাতে দেখেছি, কিন্তু এতো দ্রুত আমি কোন মেয়ে ছাড়া ছেলেদের আঙ্গুল চালাতে দেখিনি।
ডেটিং, চ্যাটিং ফ্যাটিং এইজাতীয় আঙ্গুল চালানো কাজে বোধহয় মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে অনেক এগিয়ে গেছে।
তার মোবাইলের সাইজ দেখে ভেবেছিলাম, ওয়াল্টন। আমি মনে মনে একটু গ্যাস নিয়ে আমার পকেট থেকে স্যামসুং এর মোবাইলটা বের করলাম। অমনি সে তার মোবাইলটা উপুড় করে উল্টাপিঠের এপোল্’র আইফোনের মনোগ্রামটা দেখিয়ে দিলো। যা’ ভাবছি তা’ নাও হতে পারে। ওয়াল্টন না আইফোন সেটা সে দেখাতে যাবে কেন! আমারই মনের দোষ! অথবা মোবাইলের উল্টাপিঠ দেখানো এখনকার মেয়েদের একটা ষ্টাইলও হতে পারে। যাইহোক, সে আবার চ্যাটিং করা শুরু করলো। এতক্ষণ ভেবেছিলাম সে বোধহয় বাংলিশ, মানে ইংরেজি অক্ষর দিয়ে বাংলা চ্যাটিং করছে। সবাই যেটা করেন, না বাংলা না ইংলিশ। কিন্তু না, সে ফুল ইংরেজিতেই সমানে চালিয়ে যাচ্ছে।
এমন সময় আমার মোবাইল বেজে উঠলো। স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখি,
Calling – #Samantha_Hodges.
সর্বনাশ! এইডা আবার কেডা! এইটাতো আননোন্ নাম্বারও না। কিন্তু এই নামতো আমি জীবনেও সেভ করিনি। নিশ্চয় এটা আমার মেয়ে পরীর কারবার। দেশ-বিদেশে তার অনেক বন্ধু-বান্ধব আছে। এইসব আন্তর্জাতিক যন্ত্রণার হাত থেকে বাঁচার আশায় আমি তার মোবাইলের সিমকার্ড খুলে নিয়েছি। এখন সে আমারটা দিয়ে তাদের সাথে কথা বলা চালিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু এখন উপায়! শামান্থা হজেজ্ তো বাংলাদেশী চিজ্ না। আমেরিকান টামেরিকান কেউ হবে। এখন ফোন ধরে এই সুন্দরীর পাশে ভুলভাল ইংলিশ বললেতো প্রেস্টিজ পাংচার।
আমি আবার ইংরেজিতে কথা কইতে পারিনা। কথা পেটে আছে কিন্তু মুখে নাই। বাংলাদেশে আজকাল ইংলিশ ছাড়া লোকের কোন দাম নাই। দামের আশায় শটকার্টে ইংরেজি শেখার জন্য ফুটপথে যেসব ‘একসপ্তাহে ইংরেজি শিখুন’ বই পাওয়া যায়, সেগুলা কিনে পড়া শুরু করলাম।
এক বন্ধু বললো, ‘দোস্ত, এসব ভুয়া বই। এই বই পড়ে তুই একসপ্তাহ কেন্ ইহজনমেও ইংরেজি শিখতে পারবিনা। তুই সাইফুর’স এ ভর্তি হ। একমাসের মধ্যে দেখবি মুখ দিয়ে শুধু ইংরেজির গুলি বের হচ্ছে’।
তার কথামত সাইফুর’স এ ভর্তি হলাম। একমাসের যায়গায় পরপর দুইবচ্ছর ক্লাস করলাম।
এখন মুখ দিয়ে ইংরেজি গুলিতো দুরের কথা, পেটে বোম মারলেও একটা ইংরেজি শব্দ বের হয়না। বাপ-দাদার আসল মাতৃভাষা বেরিয়ে পড়ে।
আঞ্চলিক মাতৃভাষা বেরিয়ে পড়ার ভয়ে আমি আর কল রিসিভ করলামনা। রিং হয়ে হয়ে কেটে গেল। মিনিট খানেক পর আবার একটা কল এলো নাম,
#হাসিমুকো_নাকানিচুবা
কাম্ সারছে! এইটা বোধহয় জাপানী বেটা। বেটা না বেটি কে জানে। নাম দেখে সেটাও বুঝার উপাই নাই। ইংলিশ হলে তবু কিছু বুঝা যায়, হাই ম্যাডাম, হ্যালো মিষ্টার বলা যায়। জাপানীতে কী বলে কিছুইতো জানিনা। রিং হতেই আছে, আমি ধরছিনা। রিংয়ের শব্দে পাশের অগ্নি সুন্দরীর বোধহয় চ্যাটিংয়ের ডিসট্রার্ব হচ্ছে। সে বিরক্ত হয়ে বললো,
– আংকেল আপনার মোবাইল বাজছে।
ধুস্ শালা! আমারে আংকেল বললো! মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। ফোন দিলাম কেটে। তারপর সাথে সাথে আবার ফোন। এবার দেখি-
Calling – #Skype_VNC
মাই গড্! এইটা আবার কোন দেশী। রিং হচ্ছে, হোক। আমি সুন্দরীর ডিস্ট্রার্বের কথা ভেবে ইতিমধ্যে ফোনের রিংটোন সাইলেন্ট করে দিয়েছি। এখন পৃথিবীর বাইরে থেকে কল আসলেও কোন সমস্যা নাই। কত আসবি আয়!
এরপরের কল দেখি, অরিন’স মাদার।
এই নাম আমিই সেভ করেছি। মেয়ের ক্লাস মেটের মা। আমি এবার ফোন ধরলাম কিন্তু ব্যাপার কী! কথা বলতে পারছিনা কেন! এতো দেখি মহা যন্ত্রণা! গলা দিয়ে এখন আর বাংলা ইংলিশ কোন কথাই বের হচ্ছেনা। বহুকষ্টে আরবীতে দুইটা শব্দ বের করলাম,
– আসসালামু আলাইকুম।
সেই শব্দটাও শোনালো ঠিক আমার মেয়ের গলার মত। এটা বোধহয় জেনেটিক কারণেও হতে পারে। কিম্বা অনেকক্ষণ মনে মনে নানান কথা বলার জন্যও হতে পারে। ঠিক তখনিই ফোনের অন্য প্রান্ত থেকে ১৮০ মাইল বেগে কথার ঝড় বইতে শুরু করলো,
‘অলাইকুম আসসালামের বাইচ্চা! মাই ফুট্, লেডী ডাইনী। তোরে আমি খাইছি। সেই তখন থেইক্কা তরে আই ফোন দিতাছি, ফোন ধরচ্ না। মাদার টেরী। তোর নাম পরী না হইয়া উচিত আছিল টেরী হওয়া। টেরীরে চেনস্? ট্রয় থেইক্কা টেরী। যার লাইগ্যা ট্রয় নগরী ধ্বংশ হইছিল। তোর যা’ শ্রী, তুই টেরীও না পরীও না। তুই হইলি কালকূটি ডাইনী, লেডী ডাইনী………… ‘
আমি কোন কথা না বলে বোবার মত মোবাইল কানে ধরে বসে আছি। অপর প্রান্তে বোধহয় স্পিকার ফোনে তিনচার জন মিলে কথা বলছে।
কিছু কিছু কমদামী মোবাইলে ইনকামিং কথাবার্তাও পাশ থেকে শোনা যায়। আমার শুধু মনে হচ্ছে, পাশের সুন্দরী বোধহয় ওদের সবকথা শুনতে পারছে। মান-ইজ্জতের কথা! তাছাড়া কথা না বলে কানে ফোন ধরে বসে থাকাও খারাপ দেখায়। আবার কেটে দিতেও পারছিনা। কাটলে সাথে সাথে আবার কল দেবে।
নিরুপায় হয়ে আমি বাসের কন্ট্রাক্টরকে বললাম,
– মামা গাড়ী থামাও, আমি নেমে যাবো।
আমার ষ্টপেজে আসার আগেই আমি বাস থেকে নেমে পড়লাম। নামার পরে ফোন আবার কানে ধরে শুনলাম
ওদের একজন বলছে,
– ওই ডাইনী, কথা কস্ না কিল্লাই?
আমি ফোনটা কেটে দিতে চেয়েছিলাম কিন্তু ওরা বার বার কল করবে ভেবে না কেটে এবার বলেই ফেললাম,
– মামুনিরা, আমি পরী না। আমি তোমাদের আংকেল।
ওরা ‘সরি আংকেল’ বলেই সাথে সাথে নিজেরাই ফোনটা কেটে দিলো।
অন্যদিন বাস থেকে নেমে রিকসায় করে বাসায় যাই। আজ এতো দুরে নেমেও রাগের চোটে রিকসায় চড়া ভুলে গেলাম। অত্যাধিক টেনশন ও রাগের সময় পায়ে হাটা রাস্তা খুব আগাই।
বাসায় ঢুকেই রাগে রাগে জিজ্ঞেস করলাম,
– পরী কোথায়? পরীর মা বললো,
– সে অরিনদের বাসায় গেছে। আজ অরিনের বার্থডে। ওরা কি তোমার কাছে ফোন করছিলো?
এতক্ষণে বুঝলাম মেয়ের বান্ধবী অরিনের জন্মদিনে আগেভাগে সব বান্ধবীরা এসে পরীর যেতে দেরী হচ্ছে দেখে তারা সবাই একের পর এক ফোন করেছে। এইসব আজগুবি নামও মেয়ের বান্ধবীদের এক একজনের নামের টাইটেল। আমাদের ছাত্রজীবনেও ক্লাসমেটদের আমরা আসল নাম বাদ দিয়ে গরু, ছাগল, গাধা ইত্যাদি জীব জন্তুর টাইটেল দিয়ে ডাকতাম। এখনকার ছেলেমেয়েরা গরু ছাগলের যায়গায় দেশ-বিদেশের নামীদামী সব তারকা টাইটেল দিচ্ছে।
ছাত্রজীবনের সেইসব দিনগুলির কথা মনে পড়ে হঠাত একটু নষ্টালজীক হয়ে পড়েছি। পরীর মা সামনেই বসা ছিল। এবার তোমার ফোন এলো। একান্ত তোমার…….কী করে ধরি বলো?
পরীর মা বললো,
– কী ব্যাপার! তোমার ফোন বাজছে। ধরো, হ্যালো বলো!
আহসান হাবীব
|
|
|
|
|
|

