গায়েবি মামলার শেষ কোথায়

  • গত আড়াই মাসে বহু মানুষ জামিন পেতে হাইকোর্টে
  • গায়েবি মামলায় আগাম জামিন চাইতে আসেন তাঁরা
  • তাঁদের কেউ পঙ্গু, কেউ বয়োবৃদ্ধ, কেউ চোখে কম দেখেন
  • আসামিদের মধ্যে আছেন স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা
  • সাধারণ কৃষক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীও আছেন প্রচুর

লালন অনুসারী জিন্দার ফকিরের (৫২) সঙ্গে দেখা হাইকোর্টের অ্যানেক্স ভবনের সামনে। এক চোখে দেখেন না, ছোটবেলাতেই সেটি নষ্ট হয়ে গেছে। গান, সাধুসঙ্গ আর গরুর দেখভাল নিয়েই থাকেন। ডিসেম্বরে হঠাৎ করেই জানলেন, তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে দৌলতপুর থানায়। অভিযোগ, ১৯ ডিসেম্বর নৌকার মিছিলে ককটেল ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা। এরপর কিছুদিন পালিয়ে থাকা।

ফেরারজীবন থেকে রেহাই পেতে গতকাল মঙ্গলবার অন্যদের সঙ্গে আগাম জামিন নিতে হাইকোর্টে এসেছিলেন জিন্দার ফকির। তাঁর ভাষ্য, ‘সারা দ্যাশে যেমন দিছে, আমাগের ওইহানেও দিছে। এগুলি গায়েবি মামলা, বুঝছেন? বংশের লোকেরা পার্টি করে তাগেরে দিল। কিন্তু আমারে ক্যান দিল, তা কতি পারি না।’

গত আড়াই মাসে জিন্দারের মতো সহস্র মানুষ এ রকম রাজধানীর হাইকোর্টে এসেছেন গায়েবি মামলায় আগাম জামিন চাইতে। তাঁদের কেউ পঙ্গু, কেউ বয়োবৃদ্ধ, কেউ চোখে কম দেখেন। মামলার আসামিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় আছেন স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা। এর বাইরেও খুব সাধারণ কৃষক, দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শ্রেণির লোকজনও আছেন প্রচুর। লুঙ্গি বা মলিন পোশাকের পোঁটলা-পুঁটলি নিয়ে হাইকোর্টের অ্যানেক্স ভবনের সামনে দল ধরে এই লোকগুলোর বসে থাকার দৃশ্য এখন প্রতিদিনকার।

আর বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিনই এসব গায়েবি মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার ও কারাগারে পাঠানোর খবর আসছে। গত এক মাসে আদালতে আত্মসমর্পণ করার পর কেবল চট্টগ্রামেই ৩০৪ জনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

সারা দেশে কত গায়েবি মামলা হয়েছে, তার কোনো সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না। তবে গত নভেম্বরে বিএনপি দুই দফায় ২ হাজার ৪৮টি গায়েবি মামলায় প্রায় দেড় লাখ আসামির তালিকা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা দেয়। ওই সব মামলায় অজ্ঞাত হিসেবে আরও আসামি করা হয়েছে প্রায় ৪ লাখ লোককে। কেবল সেপ্টেম্বর মাসে রাজধানীতে ৫৭৮টি গায়েবি মামলার তথ্য পাওয়া যায়। এই ভোগান্তির শেষ কোথায়, কীভাবে—সেটিই জানতে চান আসামিরা।

যদিও পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, গায়েবি মামলাগুলোকে ‘সফটলি হ্যান্ডেল’ করতে বলা হয়েছে থানাগুলোকে। মামলাগুলোর অভিযোগপত্র দেওয়ার সময় যেন নিরীহ লোকজনকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়, এমন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি)।

পিরোজপুরের নেছারাবাদ থানার ওসি তারিকুল ইসলাম ১৩ ফেব্রুয়ারি গায়েবি মামলার এক আসামি প্রসঙ্গে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আচ্ছা আচ্ছা, বুঝছি, পলিটিক্যাল মামলা তো। ওগুলো এখন শেষ হয়ে যাবে, চিন্তা করতে মানা করেন।’ ঢাকার বাইরের আরও চারটি থানার ওসিরা জানান, গায়েবি মামলায় নিরীহ লোকদের হয়রানি না করার নির্দেশনা পেয়েছেন তাঁরা।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক মো. সোহেল রানা বলেন, তিনি ‘গায়েবি মামলা’ প্রত্যয়টির সঙ্গে একমত নন। প্রতিটি মামলা গ্রহণ ও নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। তিনি বলেন, ‘কোনো মামলা নিয়ে যদি কারও কোনো অভিযোগ থাকে যে তাঁকে অহেতুক হয়রানি করা হয়েছে বা কাউকে ভুলভাবে মামলায় জড়ানো হয়েছে, সে ক্ষেত্রে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে মামলা রুজুর সময়কার ভুলত্রুটি সংশোধনের সুযোগ রয়েছে এবং আমরা সেদিকেই যাচ্ছি।’

মামলার ধাওয়া
গত আগস্টে নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্র আন্দোলনের পর সেপ্টেম্বরে দেশের বিভিন্ন থানায় ঘটনা না ঘটলেও বেশ কিছু মামলা করে রাখে পুলিশ। গত ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের আগ পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত ছিল। এখন পুলিশ মামলাগুলো সফটলি হ্যান্ডেল করার কথা বললেও বাস্তবচিত্র কিছুটা ভিন্ন। পুলিশের ধাওয়ায় এসব মামলার আসামিদের অনেকেই বাড়ি যান না বহুদিন। পালিয়ে থাকতে থাকতে ক্ষুদ্র চালের ব্যবসার পুঁজি নিঃশেষ হয়ে গেছে ঠাকুরগাঁওয়ের নজরুল ইসলামের। নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের দিনমজুর সবুজ মিয়া দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হয়েছেন। এলাকার লোকজন টাকা দিয়ে তাঁকে জামিনের জন্য ঢাকায় পাঠিয়েছেন।

আর জামিন না নিলে কী হয়। তা বলছিলেন ঠাকুরগাঁওয়ের চিলারং ইউনিয়নের নজরুল ইসলাম। তিনি জানান, যে নাশকতার অভিযোগে মামলাটি দিয়েছে, এ রকম কোনো ঘটনাই ঘটেনি। কিন্তু যাঁরা গ্রেপ্তার হয়েছেন, তাঁদের পুলিশ অনেক মারধর করেছে বলে তিনি শুনেছেন। আর তিনি নিজেও ৪০ দিন বাড়ির বাইরে খড়ের গাদা, মেশিনঘর এমনকি কবরস্থানে পর্যন্ত থেকেছেন। তাঁদের খুঁজতে পুলিশ একাধিকবার বাড়িতে এসেছে।

পিরোজপুরের নেছারাবাদের আবদুল হামেদ চোখের ছানি কাটানোর টাকা খরচ করে জামিন করাতে এসেছেন কেবল পুলিশের ধাওয়া খেয়ে। তিনি জানান, তিনি যেখানে লুকিয়ে ছিলেন, তিন দিনের মাথায় সেখানে পৌঁছে যায় পুলিশ।

আর সিলেটের গোয়াইনঘাটের পাথরশ্রমিক মোহাম্মদ আলীর ভাষ্য, একই মামলায় পুলিশ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছিল। তাঁদের ‘মারিয়া চ্যাফটা করিয়ালাইছে’ বলে তিনি শুনেছেন।

এক মাসে ৩০৪ জন কারাগারে
গতকাল চট্টগ্রামে বিএনপির আরও ২৬ নেতা-কর্মীকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। গত বছরের অক্টোবর মাসে নাশকতার অভিযোগে পুলিশের করা গায়েবি মামলায় আত্মসমর্পণ করেন তাঁরা। ঘটনার দিন বিদেশে থাকার পরও মামলার আসামি হওয়ায় দুজনের জামিন মঞ্জুর করেন আদালত। এর আগে গত সোমবার ৫৭ নেতা-কর্মীকে কারাগারে পাঠিয়েছিলেন একই আদালত। জাতীয় নির্বাচনের পর চট্টগ্রামে পুলিশের ধরপাকড় বন্ধ হলেও গত এক মাসে এভাবে কারাবন্দী হলেন বিএনপির ৩০৪ নেতা-কর্মী।

হাইকোর্টের জামিনের মেয়াদ শেষে কারাগারে
সংসদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র দখল ও হামলার অভিযোগের চার মামলায় গত ২০ জানুয়ারি উচ্চ আদালত থেকে চার সপ্তাহের আগাম জামিন পান বিএনপির নেতা জি কে গউছসহ কয়েকজন। এই জামিনের মেয়াদ শেষ হওয়ায় গতকাল তাঁরা হবিগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালতে হাজির হলে আদালত গউছসহ ১৪ নেতা-কর্মীকে কারাগারে পাঠিয়েছেন। তিনি হবিগঞ্জ পৌরসভার মেয়র পদে ছিলেন। সংসদ নির্বাচনের আগে পদত্যাগ করে হবিগঞ্জ-৩ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী হন। এখন কারাগারে।

৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের পরদিন পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতারা বাদী হয়ে হবিগঞ্জ সদর মডেল থানায় চারটি মামলা করেন।

একইভাবে টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলা বিএনপির সাত নেতা-কর্মীর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ ইকবাল বলেন, নির্বাচনের আগে দায়ের হওয়া ওই গায়েবি মামলায় তাঁরা হাইকোর্ট থেকে ছয় সপ্তাহের আগাম জামিন নিয়েছিলেন। জেলা জজ আদালতে গতকাল তাঁরা জামিনের আবেদন করলে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়।

টাঙ্গাইলের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) এস আকবর খান বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে নাশকতার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকায় আদালত তাঁদের জামিন নামঞ্জুর করেছেন।

পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় নাশকতার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় বিএনপির ২০ নেতাকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী রুহুল আমিন বলেন, ‘নির্বাচনের আগে মাঠছাড়া করতে আমাদের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে এই গায়েবি মামলা দিয়েছিল পুলিশ।’

মানবাধিকারকর্মী নূর খান প্রথম আলোকে বলেন, এ রকম মামলার একটি অস্ত্র যখন পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়, তখন সেটিকে তাদের অনেকে অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। সারা দেশে কয়েক লাখ মানুষ এ ধরনের মামলার শিকার হয়েছে। সাম্প্রতিককালে যে ছবিগুলো গণমাধ্যমে দেখেছি, সেটি একটি ক্ষুদ্রাংশ মাত্র। সারা দেশের পরিবেশ আরও ভয়াবহ। তিনি বলেন, এই ধরনের মামলাগুলোর তালিকা করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এক্ষুনি প্রত্যাহার করে নেওয়া উচিত। না হলে সমাজে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হবে, স্বাভাবিক গতি থমকে যাবে।

নূর খান বলেন, ‘প্রত্যেকটি ক্রিয়ারই একটি বিপরীত প্রতিক্রিয়া থাকে। এই মামলার প্রতিক্রিয়া ভবিষ্যতে কী হতে পারে, সেটি আমি ভাবতেও পারি না।’  সূত্র  :প্রথম আলো

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.