মোদ্দা কথা, ইমাম হলেও মাফ নাই!

নির্বাচন শেষ, পুরানো সরকারই নতুন রুপে, নতুন মন্ত্রী সভাও গড়া হয়েছে। বলা যায় সরকারি ট্রেন এখন লাইনে উঠেছে, এখন শধু ট্রেন চালু হওয়ার অপেক্ষায় । অন্যভাবে বলা যায়, ট্রেন চালুও রয়েছে, এখন সময়ে বুঝা যাবে গতি কতটুকুন? সরকারের নতুন করে ট্রেন চলা সুন্দর হোক সেই প্রত্যাশা করেই নিজের মনে যে প্রশ্ন বা উত্তর উঁকিঝুঁকি মারছে, সেগুলোই কিছু আওরাবার চেষ্টা করবো।

১ ) নবীন মন্ত্রীসভা :  প্রথমেই স্বাগত জানাই। ধন্যবাদ জানাই প্রধানমন্ত্রীকে সাহসী পদক্ষেপ বটে। ঠিক বা বেঠিক, সেকথা বলার সময়, এখন নিশ্চয়ই নয়। বলা যায়, নবীন এই মন্ত্রীসভায় যারা আছেন, তাদের নিয়ে বাজারে দূর্ণীতির রেকর্ভ চালু নাই। অতীতে তাদের সেরকম ছিলো কিনা বা সুযোগ ছিলো কিনা , জানিনা। তবে এখন সেই সুযোগ তৈরি হবে। সাধারণ একজন নাগরিক হিসেবে শুধু প্রত্যাশা  করবো, সেই দিকে কেউ পা মারাবেন না। আরো আশা করবো, বিজ্ঞ প্রধানমন্ত্রী নবীনদের দিকে কড়া নজরদারি রাখবেন।

২ ) এই সরকার সংসদের প্রায় সকল আসনের মালিক।  বর্তমান আওয়ামী লীগ ৭৩ এর সংসদে ২৯৩ আসনের মালিক ছিলো বা প্রতিনিধিত্ব করেছে। বর্তমান সংসদে তার চেয়ে মাত্র ৫ আসন কম। যদিও মহা জোট নিয়ে। সহজভাবে বলা যায় , যাহা বাহান্ন তাহাই তিপ্পান্ন , যাহা মহাজোট তাহাই আওয়ামী লীগ। অবশ্য এই ৫ টি আসন দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল বিএনপি পেয়েছে বা ওদের দিয়েছে। দিয়েছে বললাম, এটা বিএনপির ভাষ্যনুযায়ী বলাই যায়। জনগণের ভাষ্য বাদই দিলাম।

* ৭৩ এ সংসদে কার্যত কোনো বিরোধীদল ছিলো না। আর এবার তো আরো নাই। কেন নাই, তার ব্যাখ্যার প্রয়োজন নাই বলেই মনে করি । তবে ছোট্ট করে বললে বলতেই হয়, ” উঠ ছেড়ি তোর বিয়া” এর মত। মানে যেমনে নাচামু তেমনি নাচের পুতুল। তা নাহলে , গলফ ক্লাব টু হসপিটাল বা  হসপিটাল টু সিঙ্গাপুর চলতেই থাকবে।

* একটি দেশের জবাবদিহিতার জন্য কার্যত বিরোধী দল সংসদে না থাকলে , দেশ কেমন চলতে পারে? তা এই দেশ ৭৩ সালেই দেখেছে ,এমনকি গতবারও । যদিও জাতীয় পার্টি দাবি করে, তারা সংসদে কত % অংশগ্রহণ করেছেন ইত্যাদি । ভালো কথা, তবে একটু মনে করিয়ে দেই, গত পাঁচ বছরে কতগুলো বৈদেশিক চুক্তি ভারত সহ অন্যান্য দেশের সাথে সম্পন্ন হয়েছিলো? আইন থাকা সত্বেও একটি চুক্তিও সংসদে উপস্থাপন করা হয়নি! তাই বলছি, যদি কার্যত বিরোধী দল সংসদে থাকতো এরকমটি হতে পারতো না। সেই চুক্তিতে কি কি ছিলো তা জনগণ জানতে পারতোই। মূলত গৃহপালিত তথাকথিত বিরোধী দল থাকার কারণে আজ অব্দি অধিকার থাকা স্বতেত জনগণ জানেনা , কি ছিলো সেই চুক্তিতে?

সময়ের সাথে সাথে পানি অনেক গড়িয়েছে, এখন দেখা যাক কার্যত বিরোধী দল ছাড়া ভবিষ্যতে কি হয়। অনেকেই তর্ক করতে পারেন , আমাদের দেশে কার্যত বিরোধী দল কোন কালে ছিলো ? সেটা মেনে নিয়েই বলছি, তারপরেরও পর থাকে। মানে, ” নাই মামার চেয়ে কাঁনা মামা নাকি ভালো” । যাকগে, এখন পরিস্থিতি যা আছে, সেখানে মামা নিয়ে টানাটানি না করে, সময়ের অপেক্ষায় থাকি।

৩ ) মাননীয় শেখ হাসিনা এবার চাল বাছতে বড় পাথর আর একটিও বাদ রাখেননি। এক্কেবারে সব পরিষ্কার । কত্ত বড় বড় নেতা! সবাই যে আওয়ামী লীগের মত গণতান্ত্রিক (!)দলে পান্তাভাত, সেটা তিনি ভালোই বুঝিয়ে ছাড়েন। মনে পরে, শেখ হাসিনা ২০০৮ সালেও এই বড় বড় নেতাদের তাদের কর্মকার জন্য ফল দিয়েছিলেন। আবার পরবর্তীতে মন্ত্রী করে ভেঁজা বেড়ালও বানিয়ে রেখেছিলেন। এত্ত বড় বড় নেতাগণ ২০০৮ সালে মন্ত্রী হতে না পেরে, কি অমায়িক শুরেই না বলতেন, ” আমি  বা আমরা সাড়া জীবন আওয়ামী লিগের কর্মি হয়েই গর্ব করি “ শুনতে কি ভালো লাগতো, আহ্হা ! আবার যখন মন্ত্রী করলো, সেই অব্দি থেকে সরকারের মেয়াদ শেষ হবার পর্যন্ত, শুধু নেত্রী নেত্রী তজবিই গুনে গেলো। এত্ত বড় ঝানু ঝানু নেতাগণ, কোনো  দিন নেত্রীকে ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তও নিতে পারেননি। সোজাসুজি বলা যায়, সবাই নেত্রীর পানেই চেয়ে থাকতেন। এত আর বেশি পুরোনো কথা নয়। সত্য  না মিথ্যা আপনারাই বিবেচনা করে দেখুন।

* এবার কিন্তু ভিন্ন একটি ঘটনাও শেখ হাসিনা দেখিয়েছেন। অনেকর চোখ এড়িয়ে গেছে হয়তো। তিনি কিন্তু কেবল বাম,  বড় বড় বা ঝানু নেতাদেরকেই বাদ দেননি! নিজের পরিবারের কাউকেই কিন্তু রাখেন নি। অবশ্য শেখ হাসিনা একবার নিজের পরিবারের সংজ্ঞায়ন করতে বাধ্য হয়েছিলেন। সব কিছু বিবেচনায় নিলে বলাই যায়, শেখ হাসিনা কোন দিকে হাটছেন, সেটা কোনো চাক্ষুষ যোতিষও বলতে পারবেন না।  তবে এ কথাও জোর গলায় বলা যায়, আওয়ামী গণতান্ত্রিক (!)দলে  শেখ হাসিনাই একমাত্র ক্ষমতাশালী এবং প্রয়োগকারী। ওনার এই ক্ষমতা চর্চায় একটি বিষয় সচ্ছ জলের মত পরিষ্কার, উনি কাউকেই বিশ্বাশ করেন না এবং ওনার চারিদিকের সব শক্তিকে নিঃস্ব করে দিয়েছেন। এটার ফলাফল কি? সেটা বিরাট আলোচনার বিষয় ।

৪ ) লক্ষ্যণীয় যে, এবার মন্ত্রীসভায় এখনও ৯টি মূল মন্ত্রীর পদ খালি আছে। হয়তো শেখ হাসিনা সামনের কোনো সময় এই পদগুলো বড় বড় ঝানু নাড়কেল জাতীয় নেতাদের পদে বসাবেন। তবে এ কথাও অগ্রিম বলা যায়, সেই ঝানু নাড়কেল জাতীয় নেতাদের ঝানু নাড়কেলের মতনই পানি থাকবে না।

৫) এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি। বর্তমানে দেশের প্রায় সকল জ্ঞাণীগুণীরাই এই সরকারের কি কি করা উচিত বা কেমনে দেশ চালানো উচিত ইত্যাদি ইত্যাদি বিশদ আলোচনা করেই চলছেন। যেমন : সরকারকে দূর্ণীতির দিকে নজর রাখতে হবে, সু- শাসন আনতে হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি । এদের কারো বুকে সাহসের কোনো লক্ষ্ন নজরে আসে না, নির্বাচন নিয়ে সত্ ভাবে দুটি কথা বলার। এদের মুখে অবশ্য কেউ আশাও করে না। তাদের কথার ভাবসাবে মনে হয়, হয়ে যাওয়া জাতীয় নির্বাচনটি শতভাগ সুষ্ঠু  হয়েছে এবং সেই সুস্থ পথেই আওয়ামী লীগ বিরাট জয় লাভ করেছে এবং বিএনপির ধ্বস্ নেমেছে ! এদের কথার কোনো মূল্য যে সাধারণ মানুষের কাছে নাই , এমনকি শেখ হাসিনার কাছেও নাই । এই কথা যদি স্বয়ং শেখ হাসিনা নিজেও এদের কে বলে , ধারণা করি এরা তারপরেও  বিশ্বাস করবে না। এরা একেবারেই ভিন্ন প্রজাতির , তাদের কথাতেই তা পরিষ্কার হয়ে উঠে। এরাই আবার এই দেশ বা সমাজের বুদ্ধিদাতা !
লেখার শেষ অংশে ইমামের কথায় আসি। সব প্রকার খারাপ কর্মকা ভুলে গিয়ে যদি কেউ হঠাত্ করে ইমামও হয়ে যায়, সেই ইমামের পিছে যদি হাজার মানুষ নামজও আদায় করে, তারপরেও সেই ইমামকে সাড়া জীবন পূর্বের খারাপ কর্মকার কথা শুনেই যেতে হয়। মানুষের মুখ বলে কথা, ইমামের প্রশংসা হয়তো করবে, তবুও সেই পূর্বের কথা শুনাবেই।

বর্তমানের নতুন সরকার ভালো কিছু করুক , সত্যি সত্যি সেই প্রত্যাশা করেও বলছি , এই সরকারকে আগামীতে অনেক কথা শুনতে হবে। ধরেই নিচ্ছি, এই সরকার দেশ থেকে দূর্ণীতির চির বিদায় করে দিবে ,যদিও সম্ভাবনা দেখি না। অনেক কারণ বলা যাবে, তবে আশা করি অবশ্যই । কিংবা দেশকে সিঙ্গাপুর বানিয়ে দিবে, সাড়াদেশে বিদুৎ দিবে, নিজের পয়সায়  আরো একটি পদ্মা সেতু দিবে, উড়াল রেল/ পাতাল রেল দিবে, গভীর সমুদ্রে পোর্ট দিবে, নতুন বিমান / বিমানবন্দর দিবে, আরো দুটি স্যাটেলাইট দিবে, দেশে শতভাগ সু-শাসন দিবে কিংবা উন্নয়নের জোয়ার দিবে।

তারপরেও নির্ঘাত বলা যাবে, পূর্বে আওয়ামী লীগের কর্মকা নিয়ে যেমন, * ৭৩ এর নির্বাচন  * বাকশাল * ৮৬ প্রতিশ্রুতি দিয়েও  নির্বাচনে অংশগ্রহণ * ২০১৪ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ক্ষমতায়, প্রতিজ্ঞা করেও আগাম নির্বাচন না দেওয়া, গুম/খুনের নতুন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দেওয়া, প্রশ্নমূলক নির্বাচন চাই না বলেও এবারে ভয়ভীতির সাথে ৮০% উপরে ভোটের নির্বাচন  ইত্যাদি ইত্যাদির কথা আওয়ামী লীগকে আজীবন শুনে যেতে হবে। এর পিছনে মূল কারণটি  সম্ভত আওয়ামী লীগের কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি বলেই। সমতা, সেকুলারিজম বা গণতন্ত্র মানুষ আওয়ামী লীগের কাছেই বেশি আশা করে। একথাও সত্যি যে, যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য মানুষ যেমন আওয়ামী লীগ কে মাথায় তুলে সম্মান করে, ঠিক দেশের প্রধান বিচারপতিকে ঝেঁটিয়ে দেশ থেকে বিদায়কেও মানুষ সমভাবে ঘৃণা করে।

এটা শুধু আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেই নয়, সকল দল সহ বিএনপির ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রযোজ্য । বাম রা যেমন যুগ যুগ ধরে রাজনীতি করে, জনমানুষের কল্যাণে এখন অব্দি কিছু করে উঠতে পারেনি, ওনারা আছেন, বিরাট বিরাট তত্ব নিয়ে এবং তাত্বিকতার ফসল ফলাতে  নিজেদের মাঝে ক্ষেত কে ভাগ করেই চলছে ( দল ভাঙা) । জনমানুষও ওনাদের এখন বাম না ভেবে রাম ভাবতেই বেশি সাচ্ছল্য বোধ করে।

বিএনপি নামক দলকেও মানুষ সাড়া জীবন ক্যান্টনমেন্টের দলই বলবে এবং মহা সত্য । লক্ষ্যণীয় যে, দলের প্রধান এত বড় একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং দলও প্রায় তিন যুগ পাড় করেছে, ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় বসেছে,  তারপরেও এই স্বৈরাচার নামকে মুছতে পারেনি এবং পারবেও না। ঠিক তেমনি পেট্রলবোমার রাজনীতি, এই দলকে রাজাকার আলবদর বা যুদ্ধাপরাধীদের দোসর হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকতে হবে, জামায়াত ছেড়ে দিলেও । জামায়াত কে নিয়ে আওয়ামী লীগেরও দহরম মহরম অনেক আছে, তাতে কি ? যে মাছই ময়লা খাক, নামটি ঘেউড়া মাছকেই বহন করতে হয়( একটি গ্রাম্য স্লোক) । দূর্ণীতির চরম শিখরে আওয়ামী লীগের নাম খঞ্চিত হয়ে আছে , সেটা সেন্ট্রাল ব্যাংক থেকে নিয়ে অন্যান্য ব্যাংক সহ। তাতে কি , হাওয়া ভবন চলছে চলবেই, এর কারণও বেশ সহজ, করেছেন শুনতে হবেই। ২১ এ আগস্ট থেকে চিরজীবনেও মুক্ত হওয়ার উপায় নেই। ক্ষমতায় থেকে এরকম জঘন্য কাজকে প্রশ্রয় দিলে এমনটিই হওয়ার কথা। তুলনায় কম বা বেশি, এই আর কি।

তাই বলছিলাম, কেউ খারাপ কর্মকার অধিকারী হঠাত্ করে ঈমাম হয়তো নিয়ত করে হতে পারে, পরিবর্তন আসলেও আসতে পারে । সেই ঈমামকেও পৃর্বের কর্মকার জন্য প্রার্থনা করা উচিত, তবেই যদি রক্ষা হয়, নতুবা চলবেই। হিটলার ইউরোপ মহাদেশের জন্য অনেক করে গেছেন, যার প্রমাণাদি এখনও বর্তমান । তাতে কি, হিটলারের ভালো কাজের কোনো মূল্যায়ন হয় না এবং হবেও না। খারাপ কাজ গুলোই বিদ্যমান । মানুষ এখনও হিটলার বলে, আর হিটলার মানে কি? সেটাতো বিশ্বব্যাপী পরিচিত ।
20181221_172132

বুলবুল তালুকদার
সহকারী সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম ।

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.