গণঅভ্যুত্থানের পথ বেয়ে এসেছিল ’৭০-এর নির্বাচন। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ছয় দফার ম্যান্ডেট পায়। সে সময়ের পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের বৃহৎ অংশ একধাপ এগিয়ে স্বাধীনতার লড়াইয়ের প্রস্তুতিতে নিয়ে যাচ্ছিল। এ নির্বাচনের প্রাক মুহূর্তে সিরাজগঞ্জে এলেন আ ফ ম মাহবুবুল হক। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সহ-সাধারণ সম্পাদক। মেধাবী ছাত্রনেতা। এসে উঠলেন সিরাজগঞ্জ কলেজ ছাত্রাবাসে। লোকটাকে চিনি না। আগে কখনও দেখিনি।
পরিচিত ছাত্রনেতা হিসেবে যাদের চিনি তাদের দেখি এ লোকটাকে ঘিরে থাকত। তারা তাকে সমীহ করে। তার কথা শোনে। সবারই আগ্রহ এ লোকটার দিকে। কে এই লোকটি? কী করেন তিনি? বয়সে কিশোর হওয়ার কারণে বড়দের জিজ্ঞাসাও করতে ভয় করে। খোঁজ নিয়ে জানলাম লোকটি ঢাকা থেকে এসেছেন। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচার মিটিংয়ে যায় লোকটি। বক্তৃতা দেয়। আবার স্বাধীনতার কথাও বলে। কেউ কেউ খুশি হয়। কেউবা এতে বেজার হয়। তখনও জানতাম না নাম তার আ ফ ম মাহবুবুল হক।
স্বাধীনতা-পরবর্তী ছাত্রলীগ বিভক্ত হল। জাসদ গঠিত হল। গণকণ্ঠ বের হল। গণকণ্ঠের পাতায় একদিন চোখে পড়ল একটি ছবি। বায়তুল মোকাররমের ছাত্র-গণজমায়েতে বক্তৃতা দিচ্ছেন একজন ছাত্রনেতা। মাথাভর্তি চুল। সিংহের কেশরের মতো চুলগুলো ঘাড় অবধি ঝুলে আছে। মুখে দাড়ি। হাত তুলে বক্তৃতা দিচ্ছে। ক্যাপশনে লেখা ‘বক্তৃতা দিচ্ছেন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম মাহবুবুল হক’। খুঁজে পেলাম সেই লোকটিকে। সে সময় থেকেই ধীরে ধীরে ছাত্রলীগের প্রতি দুর্বলতা এবং আগ্রহ আরও বেড়ে গেল। আমি তখন ছাত্রলীগের স্কুল কমিটির কর্মী।
তখন বিপ্লব বুঝি না। কিন্তু প্রতিবাদ বুঝি। রব-সিরাজ আমার কাছে সাহসী ছাত্র-যুব নেতার আইকন। সেই সঙ্গে দাড়ি আর জুলফিওয়ালা ছাত্রনেতা মাহবুব ভাই। দূর থেকে আমার কাছে তিনি তখন বাংলাদেশের চে গুয়েভারা। ১৯৭৩ সাল। এলো ডাকসু নির্বাচন। মাহবুব-জহুর পরিষদ ছাত্রলীগের প্যানেল। মন বলছিল মাহবুব-জহুর পরিষদ জিতবেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রামী ছাত্রসমাজের ভোটে জিতে গেল মাহবুব-জহুর পরিষদ। কিন্তু ছাত্রসমাজের রায় প্রকাশিত হল না। পরিবারের অজ্ঞাতে আরও জড়িয়ে পড়লাম ছাত্রলীগের সঙ্গে।
তখন মফস্বলের কর্মীদের অনেকের মুখেই শুনি সিরাজুল আলম খানের যোগ্য শিষ্য আ ফ ম মাহবুব হক। মিছিলে যাই। দূর থেকে মনটা ব্যাকুল হয়ে ওঠে তাকে দেখার। তার কাছে যাওয়ার। অবশেষে তার দেখা পেলাম ’৭৮-৭৯-এর দিকে। সিরাজগঞ্জে জাসদের জনসভা। জনসভায় বক্তৃতা দিলেন মাহবুব ভাই। সে বক্তৃতায় ছিল না অন্য নেতাদের মতো রসালো কথা। কিছু বুঝলাম। কিছু বুঝলাম না। রাতে আরও কাছে এলাম। কাছে থেকে শুনলাম তার আলোচনা। মনে মনে ভাবলাম, বিপ্লবের কথা বুঝতে হলে, বিপ্লব করতে হলে, বিপ্লবী হিসেবে গড়ে উঠতে আরও পড়তে হবে। আরও জানতে হবে। তবেই না এরকম নেতার মতো বুঝনেওয়ালা হওয়া যাবে। বলনেওয়ালা হওয়া যাবে। মিছিল-মিটিংয়ের সঙ্গে বই পড়ার দিকে মনোযোগ বাড়িয়ে দিলাম। সেই সঙ্গে খোঁজ নিতাম ঢাকার। খোঁজ নিতাম মাহবুব ভাইয়ের।
৭ নভেম্বর, ১৯৭৫। কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে সিপাহি গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হল। পরদিন ৮ নভেম্বর। এদিন ৭ নভেম্বরের সমর্থনে বায়তুল মোকাররমের সামনে বক্তৃতা দেয়ার সময় গুলিবিদ্ধ হলেন মাহবুব ভাই।
’৮০ সালের নভেম্বরে গড়ে উঠল বাসদ। যুক্ত হলাম বাসদ রাজনীতির সঙ্গে। ’৮১ সালে ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হলাম। ’৮২ সালে সামরিক শাসন এলো। ’৮৩ সালে দফতর সম্পাদক। এ বছরই ১৪ ফেব্রুয়ারি শিক্ষানীতি, বন্দিমুক্তি আর গণতন্ত্রের দাবিতে ডাকসুসহ ১৪ ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে সামরিক আইন উপেক্ষা করে রাজপথে মিছিল। আগের রাতে শান্তিনগরে ‘কিশোয়ার নার্সিং হোমে’ মাহবুব ভাই ডাকলেন। গেলাম গোপন বৈঠকে। মাহবুব ভাই পরিষ্কারভাবে বললেন সামরিক শাসন উপেক্ষা করে কাল মিছিল হবে। মিছিলে গুলি হতে পারে। গুলিতে কে মারা যাবে আর কে বেঁচে থাকবে বলা যায় না। তিনি দলের পক্ষ থেকে মিছিলে আমাদের দায়িত্ব ভাগ করে দিলেন।
মাহবুব ভাইয়ের নির্দেশ- সামরিক আইন ভেঙে ঢাকার রাজপথে মিছিল নিতে হবে। তার নির্দেশ অনুযায়ী সামরিক আইন ভেঙে রাজপথে বের হলাম। মিছিল নিয়ে মেডিকেলে ফিরে এসে দেখলাম জয়নালের গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ। শুধুই ভাবছি এ রক্তের প্রতিশোধ নিতে হবে। সামরিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হবে। সেদিন রাতে মাহবুব ভাইয়ের নির্দেশনাই আমার মতো ভীতু মানুষকে করেছিল সাহসী।
ডাকসুসহ ১৪ ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আন্দোলনে গতি সঞ্চারিত হল। ৩ দফা থেকে সৃষ্টি হল ১০ দফা। আন্দোলন-সংগ্রাম আর সংগঠন। মাহবুব ভাই বললেন, নিজেকে সার্বক্ষণিক বিপ্লবী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি খুবই গুরুত্বপূর্ণ নয়। দিন নেই রাত নেই। পাঠ্যপুস্তক আর প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া বলতে গেলে লাটে উঠল। নিজেকে বিপ্লবী হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা আরও দৃঢ় হল। মনের ভেতরে দৃঢ় বিশ্বাসটা আরও সুদৃঢ় হয়ে উঠল। সময় পেলেই ছুটে যাই ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের মাহবুব ভাইয়ের বাসায়। সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউ পার্টি অফিস। কখনও সিদ্ধেশ্বরী আলী রিয়াজ ভাইয়ের বাসায়। রাত জেগে মান্না ভাইসহ আলোচনা। দল আর আন্দোলন। তাদের ব্যক্তিজীবনও আমার কাছে ছিল অনুসরণীয়।
এরকম সময়ই একজন নেতার ব্যক্তি জীবনের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে নৈতিক-অনৈতিকতার প্রশ্ন মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ল। মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ার পদ্ধতিটি ভালো লাগল না। অল্পদিনের মধ্যে দল বিভক্ত হল। মাহবুব ভাইকে দেখলাম ব্যক্তিক-আর সামষ্টিক ভালোবাসার মাঝে দুলছেন। নবতর উপলব্ধি নিয়ে এক পক্ষে দাঁড়িয়ে গেলেন। আশাহত হলাম। নিজেকে দলের সব কর্মকাণ্ড থেকে নিষ্ক্রিয় করে দিলাম। চলে এলাম সিরাজগঞ্জে। আবারও সেই মাহবুব ভাই। এলেন সিরাজগঞ্জে। আলোচনা করলেন।
এখনও মনে আছে উনি বললেন যদি এতটুকু আস্থা থাকে, এ দল বিপ্লবী দল হিসেবে গড়ে ওঠার কিছুটা হলেও সম্ভাবনা আছে, তাহলে চল আমরা একসঙ্গে কাজ শুরু করি। একমত হলাম। আবার ঢাকা এলাম দলের কাজ শুরু করলাম। সম্মেলনে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হল। বছর না ঘুরতেই মনে হল সম্ভব নয়। অবশেষে ছেড়ে দিলাম দায়িত্ব। বিদায় হলাম বিপ্লব আর বিপ্লবী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে। কিন্তু তারপরও মনে হতো এ মানুষটি আপাদমস্তক বিপ্লবী এবং বিপ্লবী রাজনীতির বাইরে কিছু ভাবতে পারেন না।
দুর্ঘটনা, নাকি পরিকল্পিত হত্যাচেষ্টায় আহত হলেন তিনি? কেন জানি বারবার মনে হচ্ছিল ’৬৯ সালের আগস্টে রেসকোর্স ময়দানে ছাত্রলীগ আর ইসলামী ছাত্র সংঘের সংঘর্ষে নিহত ছাত্র সংঘের কেন্দ্রীয় নেতা এ মালেক হত্যার আসামি মাহবুব ভাইকে ওরা হত্যা করেছে পরিকল্পিতভাবে।
আহত মাহবুব ভাইয়ের চিকিৎসা চলল। মফস্বলে নিজে এবং নিজের কিছু আপনজনের কাছ থেকে সংগৃহীত সামান্য অর্থ পাঠালাম। কিন্তু মফস্বলে পেশাগত ব্যস্ততার কারণে আজ যাব কাল যাব করে আর যাওয়া হল না। দেখা হল না। একদিন শুনলাম বেবি আপা এবং ক্রান্তি মাহবুব ভাইকে নিয়ে গেছেন কানাডায়। ২০১৭ সালের নভেম্বরে বিজয় দিবসের প্রাক্কালে সুদূর প্রবাসে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন মুক্তিযোদ্ধা, আজন্ম বিপ্লবী মাহবুব ভাই। একটি স্বাধীন দেশ, যার জন্য তিনি লড়েছিলেন সেই দেশের মাটি থেকে অনেক দূরে কানাডার মাটিতে শায়িত হলেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা। একজন আজন্ম বিপ্লবীর এ বিয়োগান্তক বিদায়ের ঘটনার রহস্য উদ্ধারে কি আমরা এবং আগামী প্রজন্ম উদ্যোগী হব?
ইসমাইল হোসেন : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (বাসদ)

