স্মৃতির পাতায় অগ্রজ মুক্তিযোদ্ধা শেখ আতাউর রহমান

কিছু সংবাদ মানুষকে বাকরুদ্ধ করে দেয়, স্তব্ধ করে দেয় হৃদয়ের সমস্ত ভাষা। কিছু মৃত্যু কেবল একজন মানুষের চলে যাওয়া নয়, বরং একটি সময়ের অবসান, একটি প্রজন্মের স্মৃতির ভান্ডারে গভীর শূন্যতার সৃষ্টি। অগ্রজ মুক্তিযোদ্ধা শেখ আতাউর রহমানের মৃত্যু সংবাদ আমার কাছে ছিল  এক বেদনাবিধুর ঘটনা , ২০২০ সালে ২৪ শে অক্টোবর  করোনায় অক্রান্ত তিনি মারা যান । আজও তাঁকে স্মরণ করতে গেলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে আমাদের তারুণ্যের দিনগুলো, স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের উত্তাল সময়, ছাত্ররাজনীতির ব্যস্ত দিন আর একে অপরকে ঘিরে গড়ে ওঠা এক নিবিড় ভালোবাসার পরিবার।

আতাউর ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয়ের সময়কাল প্রায় বাংলাদেশের বয়সের সমান। স্বাধীনতার পর ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সময় থেকেই তাঁকে কাছ থেকে জানার সুযোগ হয়। জগন্নাথ কলেজকেন্দ্রিক ছাত্ররাজনীতিতে তিনি ছিলেন আমাদের অগ্রজ নেতা। সেই সময়ের রাজনীতির সঙ্গে যাঁরা যুক্ত ছিলেন, তাঁদের কাছে কাজী জাহাঙ্গীর আমীর, শেখ আতাউর রহমান, সাইফুর রহমান, জগন্নাথ কলেজের ভিপি-জিএস আখতারুজ্জামান, কামাল সাইয়িদ মোহনসহ আরও অনেকের নাম আজও স্মৃতিতে উজ্জ্বল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ছাত্র গয়েশ্বর রায়ও ছিলেন আমাদের ঘনিষ্ঠজন। আতাউর ভাই, সাইফুর ভাই, গয়েশ্বর দা এবং আমরা অনেকেই তখন রাজনৈতিক সহযাত্রার পাশাপাশি ব্যক্তিগত স্নেহ, ভালোবাসা ও আন্তরিকতার বন্ধনে আবদ্ধ ছিলাম।

সত্তরের দশকের প্রথম দিকে আমাদের জীবন ছিল অনেকটাই একটি পরিবারের মতো। আমরা ছিলাম জাসদ ছাত্রলীগের সক্রিয় ও প্রভাবশালী কর্মী-নেতা। রাজনীতি ছিল আমাদের চিন্তা, স্বপ্ন ও দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মতাদর্শ, কর্মসূচি ও সাংগঠনিক তৎপরতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত সম্পর্কও ছিল গভীর। কারও বিপদে অন্যরা ছুটে যেত, কারও আনন্দে সবাই আনন্দিত হতো। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সেই সময়ের কথা ভাবলে মনে হয়, আমাদের জীবনের এক অমূল্য অধ্যায় আমরা পেছনে ফেলে এসেছি।

মুক্তিযোদ্ধা আতাউর রহমানের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের গৌরবময় ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধের সহযোদ্ধা ফজলুর রহমান ভুলু ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল ৬০ দশক থেকেই । ভুলু ভাইয়ের একটি ফেসবুক পোস্ট থেকেই আমি আতাউর ভাইয়ের মৃত্যুর সংবাদটি জানতে পারি। সংবাদটি পড়ে মুহূর্তের জন্য বিশ্বাস করতে পারিনি। মনে হচ্ছিল, এমন একজন মানুষ, যাঁর সঙ্গে জীবনের এত দীর্ঘ সময়ের স্মৃতি জড়িয়ে আছে, তিনি কীভাবে হঠাৎ আমাদের ছেড়ে চলে যেতে পারেন!

১৯৭৭ সালে দেশ ছেড়ে আসার পরও দেশের পুরোনো বন্ধু ও সহযোদ্ধাদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি। গয়েশ্বর দা ও সাইফুর ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। দেশ ছাড়ার প্রায় দশ বছর পর, ১৯৮৭ সালে প্রথম বাংলাদেশে ফিরে আতাউর ভাইয়ের সঙ্গে আবার দেখা হয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে জাসদ ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক একরাম ভাইও তখন তাঁর সঙ্গে ছিলেন। ঢাকা স্টেডিয়ামের কাছে লাল ভবনে তাঁদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা হয়। আমার চাচা শ্বশুর আবুল কাসেম তখন তাঁদের সঙ্গে যৌথভাবে ব্যবসা করতেন। একই ভবনের তিনটি কক্ষে তিনজনের বসার সেই দৃশ্য আজও আমার স্মৃতিতে অমলিন। পুরোনো দিনের মানুষদের আবার কাছে পেয়ে মনে হয়েছিল, দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর যেন ফিরে পেয়েছি ফেলে আসা জীবনের একটি অংশ।

এরপর দেশে গেলেই আতাউর ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হতো। ফেসবুকের যুগ শুরু হওয়ার পর যোগাযোগ আরও সহজ হয়ে ওঠে। মাঝেমধ্যে মেসেঞ্জারে ফোন করে তিনি আমাদের খোঁজখবর নিতেন। দূরত্বের কারণে প্রতিদিন দেখা না হলেও আন্তরিকতার ঘাটতি ছিল না। প্রবাসজীবনের দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার মধ্যেও এমন মানুষের যোগাযোগ আমাদের মনে করিয়ে দিত, দেশ থেকে দূরে থাকলেও শেকড় থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন নই।

আতাউর ভাইয়ের মৃত্যুর আগের দিনও তাঁর রোগমুক্তি কামনা করে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। সেখানে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে জাসদের ঢাকা মহানগরীর সাধারণ সম্পাদক মেসবাহ ভাই মন্তব্য করেছিলেন, আতাউর সুস্থ হয়ে উঠছেন। সেই আশ্বাসে মনে সামান্য স্বস্তি এসেছিল। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই ভুলু ভাইয়ের পোস্টে তাঁর মৃত্যুর সংবাদ জানতে পারি। পরে ঢাকার নয়াপল্টনের মর্তুজা আলী মিলন ভাইকে ফোন করে বিস্তারিত জানি। মিলন ভাইও আমাদের অগ্রজ ছাত্রনেতা। রায়হান ফিরদাউস মধু ভাই ইনবক্সে একই দুঃসংবাদ জানান। লন্ডনে বসবাসরত মুক্তিযোদ্ধা ও অগ্রজ ছাত্রনেতা খিজির ভাইকেও ফোন করে খবরটি জানাই।

বিকেলে নিউইয়র্ক থেকে কামাল সাইয়িদ মোহন ভাই ফোন করেছিলেন। কথা বলতে বলতে তিনি কেঁদে ফেললেন। ইতালি থেকে নাজির মোহাম্মদ খসরুও ফোন করে তাঁর শোকের কথা জানালেন। তাঁদের প্রত্যেকের কণ্ঠে ছিল একই বেদনা, একই শূন্যতা। আমরা সবাই যেন একই পরিবারের একজন প্রিয় মানুষকে হারিয়েছি। ভৌগোলিক দূরত্ব আমাদের আলাদা করে রেখেছে, কিন্তু স্মৃতি ও সম্পর্কের বন্ধন আমাদের আজও একসূত্রে গেঁথে রেখেছে।

এই প্রজন্মের অনেকেই ইতিমধ্যে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। সাইফুর ভাই অনেক আগেই চলে গেছেন, আজ আতাউর ভাইও নেই। একে একে পরিচিত মুখগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। সময়ের স্বাভাবিক নিয়মে একদিন আমাদের সবাইকেও চলে যেতে হবে। কিন্তু কিছু মানুষ তাঁদের কর্ম, সম্পর্ক ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকেন দীর্ঘকাল। আতাউর ভাই আমাদের কাছে তেমনই একজন মানুষ।

আজ তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে বারবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করে সেই সত্তরের দশকে, যখন আমরা ছিলাম কিশোর আর তরুন , স্বপ্ন দেখতাম নতুন বাংলাদেশ গড়ার, আর একে অপরের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিতাম আপনজনের মতো। সেই দিনগুলো আর ফিরে আসবে না, সেই মানুষগুলোও একে একে হারিয়ে যাচ্ছেন। তবু তাঁদের সঙ্গে কাটানো সময়, তাঁদের স্নেহ, আন্তরিকতা ও সংগ্রামের স্মৃতি আমাদের হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকবে।

প্রিয় আতাউর ভাই, আপনার চলে যাওয়া ছিল  আমাদের জন্য গভীর বেদনার। আপনি ছিলেন আমাদের অগ্রজ, সহযাত্রী ও আপনজন। আপনার স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে আপনার অবদান এবং আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আপনার স্মৃতি আমরা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করব। আমরা যত দিন বেঁচে থাকব, একে অপরকে ভুলব না। কারণ মানুষ চলে যায়, কিন্তু ভালোবাসা, বন্ধুত্ব ও স্মৃতি কখনো মুছে যায় না।

হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.