নেপালে সুড়ঙ্গে আটকে ৬ শতাধিক শ্রমিক, স্বজনদের হাহাকার

আটকে পড়া শ্রমিকদের কাছে পৌঁছানোর জন্য সেনাবাহিনী পাহাড়ের ঢালে বিস্ফোরক ব্যবহার করে বিস্ফোরণ আটকে পড়া শ্রমিকদের কাছে পৌঁছানোর জন্য সেনাবাহিনী পাহাড়ের ঢালে বিস্ফোরক ব্যবহার করে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। ছবি: রয়টার্স

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে গত সপ্তাহে ভয়াবহ বন্য আঘাত হানার পর, নেপালের ত্রিশূলী নদী-তীরবর্তী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলগুলোতে এখনও ৬০০-রও বেশি শ্রমিকের আটকে থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তারা বেঁচে আছেন এমন ক্ষীণ আশা নিয়েই প্রহর গুনছেন স্বজনেরা।

 

জীবিতদের উদ্ধারে সময়ের দৌড়ে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কায়, সোমবারও (৩১ আগস্ট) উদ্ধারকারীরা পাহাড়ের গায়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বাতাস পাম্প করে ত্রিশূলী-৩এ প্রকল্প এলাকায় পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

 

ত্রিশূলী-৩এ প্রকল্প নিখোঁজ ৩৩ বছর বয়সী প্রকৌশলী ঔরস ভান্ডারীর স্ত্রী অনুশিলা ভান্ডারী বিবিসিকে বলেন, “আমি শুধ চািই তাকে যেন খুঁজে পাওয়া যায়। সে যেন নিরাপদে বাড়ি ফিরে আসে।”

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে এই ভয়াবহ বন্যা দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯৩৯ জনে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে নেপালের দুযোর্গ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। সংস্থাটির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এখনও নিঁখোজ রয়েছেন ৩ হাজার ৯২৫ জন, যাদের মধ্যে ৫৯২ জন বিদেশি নাগরিক।

 

ধারণা করা হচ্ছে, নিখোঁজদের মধ্যে প্রতি সাতজনের একজনই বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মী। সোমবার নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জানান, এসব প্রকল্প স্থান থেকে এখন পর্যন্ত ২৭৯ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

 

চীন ও নেপালি সামরিক বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক দল এই উদ্ধার অভিযানের নেতৃত্ব দিচ্ছে। এতে ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার বিশেষজ্ঞরাও অংশ নিয়েছেন।

নিখোঁজ এক শ্রমিকের স্ত্রী সীতা পান্ডে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘কান্তিপুর’-কে বলেন, “আমার এখনও ৫০ শতাংশ আশা আছে যে সে বেঁচে আছে। কারণ ভেতরে অক্সিজেনের ব্যবস্থা রয়েছে।”

 

নেপালের রাসুয়ায় চিলিমে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি টানেলের প্রবেশপথে একজন উদ্ধারকর্মী কাজ করছেন। ছবি: রয়টার্স

 

নেপালের রাসুয়ায় চিলিমে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি টানেলের প্রবেশপথে একজন উদ্ধারকর্মী কাজ করছেন। ছবি: রয়টার্স

নেপাল মূলত জলবিদ্যুতের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। দেশটির পাহাড়ি নদীব্যবস্থা জুড়ে বছরের পর বছর ধরে এসব প্রকল্প গড়ে তোলা হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় অন্তত ১১টি প্রস্তুত ও নির্মাণাধীন প্রকল্প ব্যাপকবাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

উদ্ধারকারীরা গত সপ্তাহের শেষের দিক থেকে টানেলের ভেতরে বাতাস পাম্প করা শুরু করলেও, ভুক্তভোগী স্বজনদের দাবি- এই কাজটি আরও আগেই করা উচিত ছিল।

 

সোমবার ভোরের দিকে একটি দল হাইড্রোপাওয়ার প্ল্যান্টের দিকে যাওয়া একটি টানেলে প্রবেশ করতে পারলেও ভেতরে কাউকে না পেয়ে ফিরে আসে।

“যত বেশি সময় পার হচ্ছে, আমাদের আশাও তত ফিকে হয়ে আসছে। প্রতিটি সেকেন্ড আমাদের কাছে মূল্যবান, তাই এই অভিযান আরও দ্রুত করা দরকার।”, কান্তিপুরকে বলেন জিবন খডকা, যার এক আত্মীয় প্রকল্পের ভেতরে আটকে আছেন।

তবে উদ্ধার অভিযান ‘জোরদার’ করা হয়েছে উল্লেখ করে নেপালের প্রধানমন্ত্রী শাহ জানান, এই বন্যা ‘সাধারণ কোনো ঘটনা’ নয়।

সোমবার শেষ রাতে দিকে ফেসবুকে এক পোস্টে শাহ লিখেন, “এই ঘটনা আমাদের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, জলবায়ু পরির্তনের ফলে হিমালয় অঞ্চলে আমাদের ঝুঁকির মাত্রা বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আমরা যেসব দুর্যোগের সম্মুখীন হচ্ছি, তা নিয়ে এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আমাদের জোরালো দাবি তোলার সময় এসেছে।”

ত্রিশূলী-১ প্রকল্প নিখোঁজ প্রকৌশলী মিলন আপার ভাই প্রিয়া খরেল ভান্ডারী বিবিসিকে বলেন, “তারা সাইট থেকে ফিরে এসেছে তারা বলেছে টানেলের ভেতরে লোক ছিল। তাই এখনো আশা আছে যে, সেনবাহিনী যদি দ্রুত তাদের কাছে পৌঁছাতে পারে, তাহলে তাদের বাঁচানো সম্ভব।”

নেপালের রাসুয়ায় ত্রিশূলী ৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলের কাছে উদ্ধার অভিযান। ছবি: রয়টার্স

নেপালের রাসুয়ায় ত্রিশূলী ৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলের কাছে উদ্ধার অভিযান। ছবি: রয়টার্স

নেপালি কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দেওয়ার মাধ্যমে এই ভূগর্ভস্থ অনুসন্ধান অভিযানে সাহায্য করা অস্ট্রেলীয় প্রকৌশলী আর্নল্ড ডিক্স বিবিসে জানান, টানেলগুলোর অবস্থান চিহ্নিত করতেই উদ্ধারকারীদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, “টানেলগুলোর প্রকৃত চিহ্নই মুছে গেছে- সবকিছু যেন গায়েব হয়ে গেছে। চারপাশটা যে চাঁদের পৃষ্ঠের মতো দেখাচ্ছে।”

ইন্টারন্যাশনাল টানেলিং অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক প্রধান ডিক্সের মতে, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর অবস্থান নিশ্চিত হতে পারলে উদ্ধারকারীরা প্রবেশের সেরা উপায় নির্ধারণ করতে পারবেন, যার মধ্যে মাটি খোড়া ও ‘বিশাল সব পাথরখণ্ড বিস্ফোরণ করে উড়ানো’ অন্তভুক্ত।

তিনি বলেন, “সেখানে বাড়ির চেয়েও বড় বড় পাথরখণ্ড পড়ে আছে। আমি আমার জীবনে এমন দৃশ্য কখনও দেখিনি। এটা সত্যিই এক কঠিন অভিযান।”

তিনি আরো জানান, ভূগর্ভস্থ পরিবেশ প্রলয়ঙ্করী বন্যা থেকে সুরক্ষা দিতে পারে- এই বিবেচনায় আটকে পড়া মানুষদের নিয়ে তিনি এখনও আশা ছাড়ছেন না।

নেপালের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বিবিসিকে জানান, এ পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া ৯০০টি মরদেহের মধ্যে মাত্র ৪ শতাংশ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

বন্যার উৎপত্তিস্থল থেকে অনেকটাই ভাটিতে অবস্থিত চিতওয়ান জেলায়, নদীর টানে ভেসে আসা প্রায় ৩০০ মরদেহ তীরের বালুচরে এসে জমা হওয়ার পর সেগুলোর অস্থায়ী দাফন সম্পন্ন করা হচ্ছে।

সপ্তাহান্তে শহরের বাইরের বনের এক বিশাল অংশ খুঁড়ে সমাধিস্থান তৈরি করা হয়। স্বাস্থ্যকর্মীরা অজ্ঞাত মরদেহের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

প্রধান জেলা কর্মকর্তা গণেশ আরিয়াল বিবিসিকে বলেন, “পরবর্তীতে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব হলে স্বজনেরা তাদের প্রিয়জনের দেহাবশেষ উত্তোলন করে নিয়ে যেতে পারবেন।

তিনি বলেন, “আমাদের এখানে পর্যাপ্ত ফ্রিজার নেই… তাই বাধ্য হয়ে আমাদের এই শেষ বিকল্প হিসেবে অস্থায়ী কবর দেওয়ার ব্যবস্থা বেছে নিতে হয়েছে। পরিস্থিতি সত্যিই আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।”

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতে সরকারিভাবে মৃতের সংখ্যা ১৬ এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তবে চীনে এই বন্যার ফুটেজ ও খবরাখবর কঠোরভাবে সেন্সর করা হচ্ছে।

প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি বলে যারা অনলাইনে জল্পনা-কল্পনা, তাদের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা ও জরিমানা থেকে শুরু করে সাময়িকভাবে আটকের মতো ‘প্রশাসনিক শান্তি’ আরোপ করছে চীনা কর্তৃপক্ষ।

অন্যদিকে নেপালেও, বন্যা সংক্রান্ত যেসব তথ্যকে কর্তৃপক্ষ ‘ভুল তথ্য’ বা গুজব বলে মনে করছে, তা ইন্টারনেট থেকে সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.