যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধের নিন্দা জানিয়ে রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত মার্কিট সিনেটে একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে। এ প্রস্তাব অনুসারে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ করা বা সামরিক অভিযান চালানো আগে ট্রাম্পকে বাধ্যতামূলক কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হবে।
বুধবার (২৩ জুন) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, এই বিষয়ে মঙ্গলবার মার্কিন সিনেটে যে ভোটাভুটি হয়েছে সেখানে কয়েকজন রিপাবলিকান সদস্যও ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে যোগ দেন। যে কারণে ভোটের ফল দাঁড়ায় ৫০-৪৮ এ। চলতি মাসের শুরুর দিকে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদেও একই প্রস্তাব পাস হয়েছিল।
তবে এই প্রস্তাবটি মূলত প্রতীকী। কারণ কংগ্রেসের উভয় কক্ষে পাস হওয়ার পরও এটি বিবেচনার জন্য ট্রাম্পের কাছে পাঠানো হবে না এবং এর কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই।
ভোটের এই ফলাফল এমন এক সময়ে এলো, যখন কংগ্রেসে থাকা রিপাবলিকানরা ট্রাম্পের সঙ্গে ইরানিদের হওয়া শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন, বিশেষ করে যখন অজনপ্রিয় এই সংঘাত পঞ্চম মাসে পদার্পণ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৭৩ সালের যুদ্ধ ক্ষমতা আইন কার্যকর হওয়ার পর এই প্রথমবারের মতো মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষ দেশটির কোনো প্রেসিডেন্টকে সামরিক অভিযান বন্ধ করার নির্দেশ দিয়ে একটি প্রস্তাব অনুমোদন করল।
এই ধরনের একটি প্রস্তাব সাধারণত কংগ্রেসের মনোভাব বা ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হয়, যা আইন হিসেবে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের জন্য পাঠানো অন্যান্য ধরনের আইনের চেয়ে ভিন্ন।
২০১৯ সালে, এরকম একটি যৌথ প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছিলেন ট্রাম্প, যেখানে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ থেকে সশস্ত্র বাহিনীকে সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল।
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষক লরা ব্লুমেনফেল্ড এটিকে ‘হাতে হাতকড়া পরানোর চেয়ে গালে চড় মারার মতো’ বলে অভিহিত করেছেন, কারণ এর কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই।
তবে বিবিসিকে তিনি বলেন, তার মতে এটি ‘আমেরিকান জনগণের মনোভাবের প্রতিফলন’।
এই প্রস্তাব পাস হওয়া তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি হোয়াইট হাউজের ওপর ইরান যুদ্ধ শেষ করার চাপ বাড়িয়েছে, যা পেট্রলের দাম বেড়ে যাওয়ার পর জনগণের কাছে অত্যন্ত অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
চলতি মাসের শুরুর দিকে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদেও একই প্রস্তাব পাস হয়েছিল, যেখানে চারজন রিপাবলিকান সব ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে যোগ দিয়ে ২১৫-২০৮ ভোটে এটি অনুমোদন করেন।
তবে হোয়াইট হাউজের একজন কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেন, ৭ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর, আমেরিকান বাহিনী প্রত্যাহার না করার মতো কোনো শত্রুতার পরিস্থিতি এখন আর নেই।
ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, দুই রিপাবলিকান সিনেটর মিচ ম্যাককনেল এবং ডেভ ম্যাককরমিক অনুপস্থিত থাকার কারণেই কংগ্রেসে এই প্রস্তাব পাস হয়েছে।
চারজন রিপাবলিকান সিনেটর ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন- র্যান্ড পল, লিসা মুরকোভস্কি, সুসান কলিন্স এবং বিল ক্যাসডি।
অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর জন ফেটারম্যান তার দলের একমাত্র সদস্য হিসেবে এর বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন।
আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের নিজস্ব দল রিপাবলিকানদের মধ্যে বিভেদের এটি সর্বশেষ লক্ষণ। এই নির্বাচনটি নির্ধারণ করবে যে দলটি কংগ্রেসের উভয় কক্ষে তাদের সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারবে কি না।
কিছু রিপাবলিকান সম্প্রতি প্রেসিডেন্টের বিরোধিতা করেছেন, যার মধ্যে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের ‘অস্ত্র বিরোধী’ তহবিল তৈরির পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান এবং ইউক্রেন সহায়তা অনুমোদন উল্লেখযোগ্য।
মঙ্গলবারের এই ভোটটি ছিল ইরান যুদ্ধের শুরু থেকে সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের দ্বারা যুদ্ধ ক্ষমতা সংক্রান্ত ভোট গ্রহণের দশম ঘটনা।
একই দিনে পেন্টাগন কংগ্রেসের কাছে প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলার চেয়েছে, যার সিংহভাগই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের খরচ মেটানোর জন্য।
ফেডারেল আইন অনুযায়ী, ৬০ দিনের বেশি সামরিক কার্যক্রম চালানোর জন্য কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়।
ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তি দেখিয়েছে যে এপ্রিলে হওয়া যুদ্ধবিরতি- এই যুদ্ধের সময় গণনা নতুন করে শুরু করেছে, যদিও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলা ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু হয়েছিল।
জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে এই সময়সীমা আরো ৩০ দিন বাড়াতে পারে হোয়াইট হাউজ।
বর্তমানে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধবিরতি বজায় রাখতে সম্মত হয়েছে এবং গত সপ্তাহে দুই দেশের প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের অধীনে শত্রুতা অবসানের লক্ষ্যে কাজ করছে।
ওই সমঝোতা স্মারকের আওতায়, ওয়াশিংটন ও তেহরান ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধের বিষয়ে একটি বিস্তৃত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য ৬০ দিন সময় পাবে।

