ঈদযাত্রায় ৩৯৪ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪০২: যাত্রী কল্যাণ সমিতি

 

ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে সারা দেশে ৩৯৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪০২ জন নিহত এবং ১ হাজার ২৯৪ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে রেলপথে ৩১টি দুর্ঘটনায় ২৩ জন নিহত ও ৩০ জন আহত হয়েছেন। নৌপথে ১৭টি দুর্ঘটনায় ১৩ জন নিহত এবং ১৬ জন আহত হয়েছেন। সব মিলিয়ে সড়ক, রেল ও নৌপথে ৪৪২টি দুর্ঘটনায় ৪৩৮ জন নিহত এবং ১ হাজার ৩৪০ জন আহত হয়েছেন।

আজ রোববার সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানায় বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ঈদযাত্রা শুরুর দিন ২১ মে থেকে ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফেরা ৪ জুন পর্যন্ত ১৫ দিনে এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের ঈদুল আজহায় ৩৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৯০ জন নিহত এবং ১ হাজার ১৮২ জন আহত হয়েছিলেন। সে তুলনায় এবার সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে ৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ, প্রাণহানি ৩ দশমিক ০৭ শতাংশ এবং আহতের সংখ্যা বেড়েছে ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, বরাবরের মতো এবারও দুর্ঘটনার শীর্ষে রয়েছে মোটরসাইকেল। ঈদের সময় ১৫৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫৯ জন নিহত এবং ১৮০ জন আহত হয়েছেন, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

দুর্ঘটনায় জড়িত যানবাহনের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট দুর্ঘটনায় জড়িত যানবাহনের মধ্যে ২৮ দশমিক ৯০ শতাংশ মোটরসাইকেল, ২১ দশমিক ৪০ শতাংশ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান, ১৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ বাস, ১২ দশমিক ৩৪ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা, ৭ দশমিক ৮১ শতাংশ কার ও মাইক্রোবাস, ৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ নছিমন-করিমন এবং ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা।

দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট দুর্ঘটনার ৪৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষের কারণে ঘটেছে। এ ছাড়া ২৯ দশমিক ১৮ শতাংশ গাড়িচাপা বা ধাক্কা দেওয়ার ঘটনা, ১৭ দশমিক ২৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যাওয়া, ১ দশমিক ৫২ শতাংশ ট্রেন-যানবাহনের সংঘর্ষ এবং ৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ অন্যান্য বা অজ্ঞাত কারণে ঘটেছে।

সড়কের ধরন অনুযায়ী বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট দুর্ঘটনার ৫০ দশমিক ৫০ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ৩০ দশমিক ৭১ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে এবং ১৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ ফিডার রোডে সংঘটিত হয়েছে। এ ছাড়া ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ দুর্ঘটনা ঢাকা মহানগরীতে, শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে এবং ১ দশমিক ৫২ শতাংশ রেলক্রসিংয়ে ঘটেছে।

সংবাদ সম্মেলনে মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, প্রতিবছর দুই ঈদে বিপুলসংখ্যক মানুষ রাজধানী থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াত করেন। এ পরিস্থিতিতে কেবল ঈদকেন্দ্রিক ১০ থেকে ১২ দিনের তৎপরতা নয়, বরং মানুষের জীবন রক্ষা এবং যাতায়াতের ভোগান্তি কমাতে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ প্রয়োজন। গণপরিবহন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার জরুরি। উন্নত বিশ্বের আদলে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ধীরে ধীরে ছোট যানবাহন মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দিতে হবে। চালকদের উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে লাইসেন্স প্রদান নিশ্চিত করতে হবে এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহন উচ্ছেদ করতে হবে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কগুলোতে ‘স্টার’ মানের সড়ক নিরাপত্তা করিডর গড়ে তোলার দাবি জানান তিনি।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দেশের সড়ক-মহাসড়কের বড় অংশে বৃষ্টির কারণে ছোট-বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। এসব গর্তের কারণে বেপরোয়া গতির মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেড়েছে। ভাঙাচোরা সড়ক, অবকাঠামোগত ত্রুটি এবং চালকদের আইন অমান্য করার প্রবণতা দুর্ঘটনা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।

সংগঠনটির দাবি, ঈদযাত্রায় চালক সংকটের কারণে প্রায় ৮০ শতাংশ যানবাহন একজন চালক দিয়ে বিরামহীন ও বিশ্রামহীনভাবে পরিচালিত হয়েছে। এ ছাড়া কিছু বাসের মালিক অতিরিক্ত মুনাফার আশায় আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাওয়া ত্রুটিপূর্ণ বাস মেরামত না করেই ঈদ ট্রিপ পরিচালনা করেছেন। ফলে যাত্রীবোঝাই বহু বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খালবিল ও সড়কের পাশে পড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

সমিতির পর্যবেক্ষণে দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ, জাতীয় মহাসড়কে মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার অবাধ চলাচল, রোড সাইন ও সড়কবাতির অভাব, মিডিয়ান না থাকা, মহাসড়কের নির্মাণ ত্রুটি, ট্রাফিক আইন অমান্য, উল্টো পথে যান চলাচল, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, বেপরোয়া গতি এবং বৃষ্টির কারণে সড়কের গর্ত ও ভাঙাচোরা অবস্থা দুর্ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এ ছাড়া অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে নিম্নআয়ের মানুষের ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াতও দুর্ঘটনা বাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

প্রাণহানি ও যাত্রীভোগান্তি কমাতে যাত্রী কল্যাণ সমিতি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ, আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক ব্যবস্থাপনা চালু, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থা উন্নত করা, মহাসড়কে ফুটপাত ও সার্ভিস লেন নির্মাণ, চাঁদাবাজি বন্ধ, সড়ক নিরাপত্তা অবকাঠামো উন্নয়ন, নিয়মিত রোড সেফটি অডিট, ফিটনেস ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পরিবহন খাতে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বন্ধের সুপারিশ করেছে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.