জাতীয় পতাকা ও শিব নারায়ণ দাস

 ১৯ এপ্রিল, ২০২৪–  সকাল সাড়ে নয়টায় ঢাকার পিজি হাসপাতালে স্বাধীন বাঙলার প্রথম পতাকাটির অঙ্কনশিল্পী বীর মুক্তিযোদ্ধা বাঙালি জাতির গৌরব সদালাপী সর্বজনপ্রিয় সদাহাস্যময় প্রিয়ম্বদ সর্বজনশ্রদ্ধেয় শিব নারায়ণ দাস অনন্তের যাত্রী হয়েছেন।
ইতিহাসের কোনাকাঞ্চিতে জায়গা খুঁজে ফেরা লোকদের নানা জনে জাতীয় পতাকার এটা ওটা করেছিলেন সত্য। সে সবের কৃতিত্ব দাবি করে নানা জনে নানা সময়ে নিজেদের কথা বলেছেন। তবে লাল সূর্যের মধ্যে সোনালী রঙে বাঙলাদেশের মানচিত্র এঁকে ওটার পূর্ণ রূপ দেয়ার একক কৃতিত্ব ছিল শিব নারায়ণ দাসের। যদিও তিনি সেটাকে আদৌ কৃতিত্ব মনে করতেন না বা এ নিয়ে নিজেকে জাহির করতেন না। তিনি আমাদের জাতীয় পতাকার রূপকার ছিলেন না। সে দাবি তিনি বা তার পক্ষ হয়ে কেউ কখনো করেনি। তবে তিনি জাতীয় পতাকার রূপায়ণকার ছিলেন। পতাকার অঙ্কনশিল্পীতো অবশ্য‌ই ছিলেন।
এ পতাকা কোনো এক ব্যক্তির সৃষ্টি নয়। সে অর্থে পতাকার রূপকার বলতে একজন কেউ ছিলেন না। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ছোট-বড় গ্রুপের আলোচনা ও পরামর্শ থেকেই জাতীয় পতাকার নকশাটি জন্মগ্রহণ করেছিল। সব চিন্তাকে জড়ো করে তার প্রথম চিত্ররূপটি দান করেছিলেন শিবু দা। সিরাজুল আলম খানের সামনে বসে, সিরাজুল আলম খানের নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে এ পতাকার খসড়াটি এঁকেছিলেন তিনি। তখন সেখানে আরো অনেকে উপস্থিত ছিলেন। পতাকা নিয়ে যেমন কোনো বিতর্ক বা সংশয় নেই, পতাকা তৈরিতে শিব নারায়ণ দাসের ভূমিকা নিয়েও কোনো বাদানুবাদ নেই। ছিলোও না কখনো।
ছাত্র লিগে তখন আঁকিয়ে বলতে কেউ ছিলো না। সবেধন নীলমণি ছিলেন কুমিল্লার ছাত্রলিগ নেতা শিব নারায়ণ দাস। ছবি বা ব্যানার ফেস্টুন ইত্যাদি আঁকার দরকার হলে শিবু দা’কে তলব করা হতো। তিনিও ঝটিতি কুমিল্লা থেকে চলে আসতেন এক বস্ত্রে। কাজ সেরে ফের কুমিল্লা চলে যেতেন। এটা বছরে কয়েকবার হতো।
পতাকার ডিজাইন নির্দিষ্ট হবার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যখন এটিতে সম্মতিজ্ঞাপন করলেন তখন শিবু দা’কে কুমিল্লা থেকে ঢাকা আসতে বলা হয় পতাকার একটা প্রোটোটাইপ তৈরি করার জন্য।
পতাকাটি ঢাকার ছাত্রলিগ কর্মীরা যে তৈরি করতে পারতো না তা হয়তো নয়। কিন্তু সমস্যা ছিলো লাল সূর্যের মাঝখানে সোনালী রঙে বাঙলাদেশের মানচিত্র আঁকাটা। বাঙলাদেশের মানচিত্র আঁকাটা আসলেই একটা কঠিন কাজ। ঢাকার কেউ সে ছবি আঁকতে পারবে না। রঙ তুলির জ্ঞান‌ই নাই কারো। আমরা হলাম মিটিং মিছিল স্লোগান ও পুলিশের সাথে হাতাহাতি করা কর্মী বাহিনী। আমরা স্ট্রীটফাইটে উৎসাহী ও পারঙ্গম ছিলাম। গান বাজনা ছবি আঁকা এসব ছিল ছাত্র ইউনিয়ন মতিয়া গ্রুপের কাজ। কিন্তু পতাকা বানানোর কাজটা যেহেতু আমাদের, মানে ছাত্রর লিগের, কাজেই এ কাজে একমাত্র ভরসা শিব নারায়ণ দাস।
তিনি এসে তখনকার ইকবাল হলের (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) দোতলার এক কক্ষে (কক্ষের নম্বর মনে করতে পারছি না) একটা গোটা দিন ধরে ছুরি-কাঁচি রঙ-তুলি সুতলি কাগজ গাম টেপ কাপড়-ন্যাকড়া নানা কিছু মিলিয়ে মিশিয়ে পতাকার একটা প্রোটোটাইপ তৈরি করলেন।
গত কয়েক বছর ধরে পতাকা তৈরির যে কাহিনীটি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে এটা তার অনেক আগের ঘটনা। সেদিনই সবার সামনে পতাকার দৃশ্যমান একটা রূপ স্পষ্ট হয়। বলাকা বিল্ডিং-এর বিহারী দর্জিকে দিয়ে পতাকা সেলাই করার ঘটনাটি ঘটে এর বেশ কিছুদিন পরে। বলাকা বিল্ডিং-এর সেই পতাকাটি পরে তৎকালীন ডাকসুর ভিপি আ স ম আব্দুর রব কলাভবনের সামনে উত্তোলন করেছিলেন। তবে ওটা প্রথম পতাকাটি নয়। প্রথম পতাকা (নকশা) বানানো হয়েছিল আরো আগে এবং কোনো বিশেষ দিনকে উপলক্ষ্য করে নয়। স্বাধীন বাঙলাদেশের পতাকা দেখতে কেমন হবে সেটা চাক্ষুস করার জন্য তার একটা নকশা বানানো হয়েছিল, তার ধারণাটি তৈরি হয়েছিল আগেই, তবে তার প্রথম প্রোটোটাইপটি তৈরি হয়েছিল শিব নারায়ণ দাসের হাতেই। এই হলো আমাদের প্রথম জাতীয় পতাকাটির জন্ম কাহিনী।
এর বাইরে কে কি বলেছিল, কে কোন দিকটা টেনে ধরেছিল, কে উপর থেকে উঁকি মেরে দেখেছিল, কে হাত দিয়ে ছুঁয়েছিল — এগুলো সবই সত্য, তবে গুরুত্বহীন অনুষঙ্গ। মূল কথা হলো পতাকার ধারণা ও নকশা কোনো ব্যক্তি বা গ্রুপের ছিলো না। এটা ছাত্রলিগের স্বাধীনতাকামী ও অগ্রবর্তী অংশের সদস্যদের বিভিন্ন সময়ের আলাপ আলোচনা তর্কবিতর্ক ও ঐকমত্যের ফল, কারো ব্যক্তিগত প্রতিভায় সৃষ্ট কিছু নয়।
আরেকটা কথা, সে সময়ের সার্বক্ষণিক গণগণে আগুনে ফুটতে থাকা সর্বকর্মে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী আ ফ ম মাহবুবুল হক, স্বপন কুমার চৌধুরী ও আফতাব উদ্দিন আহমদ — এর নামোচ্চারিত হতে দেখছি না।
-শামসুদ্দিন পেয়ারা ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.