বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বহু রক্তাক্ত অধ্যায় রয়েছে, কিন্তু জিঞ্জিরা গণহত্যা সেইসব অধ্যায়ের একটি, যা তার ভয়াবহতা ও সুপরিকল্পিত নির্মমতার দিক থেকে বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য—এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেকাংশে অবহেলিত। আমরা ২৫ মার্চের কালরাতকে যথাযোগ্য গুরুত্বে স্মরণ করি, কিন্তু তার ঠিক এক সপ্তাহের মধ্যেই সংঘটিত ২ এপ্রিলের জিঞ্জিরা গণহত্যা এখনও জাতীয় স্মৃতিতে প্রাপ্য স্থান পায়নি। অথচ এই হত্যাযজ্ঞ ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর এক সুস্পষ্ট ‘টার্গেটেড ম্যাস কিলিং’, যার উদ্দেশ্য ছিল ঢাকার হত্যাযজ্ঞ থেকে প্রাণে বেঁচে যাওয়া মানুষদেরও নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় শুরু হওয়া বর্বর অভিযানে হাজার হাজার নিরীহ মানুষ নিহত হন। সেই বিভীষিকা থেকে বাঁচতে অসংখ্য মানুষ বুড়িগঙ্গা নদী পেরিয়ে আশ্রয় নেন কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরা, শুভাঢ্যা ও কালিন্দী অঞ্চলের গ্রামগুলোতে। এই অঞ্চলগুলোতে শতাধিক গ্রামে ছড়িয়ে পড়া আশ্রয়প্রার্থীদের মধ্যে ছিলেন সাধারণ মানুষ, নারী-শিশু, এমনকি রাজনৈতিক কর্মী ও ছাত্রনেতারাও। তাদের ধারণা ছিল—শহরের তুলনায় গ্রাম নিরাপদ। কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করে, সেই ধারণাই ছিল এক মর্মান্তিক ভুল।
পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দারা দ্রুতই বুঝতে পারে যে এই অঞ্চলগুলো সম্ভাব্য প্রতিরোধ গড়ে ওঠার কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। ফলে কৌশলগতভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়—এই এলাকাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হবে। এটি ছিল কেবল প্রতিশোধ নয়; এটি ছিল ভবিষ্যৎ প্রতিরোধের সম্ভাবনাকে আগেভাগেই নির্মূল করার একটি পরিকল্পিত সামরিক পদক্ষেপ।
১ এপ্রিল রাত থেকেই শুরু হয় এই অভিযানের প্রস্তুতি। নদীপথে গানবোট, স্থলপথে সশস্ত্র বাহিনী, এবং ভারী অস্ত্রশস্ত্রসহ কেরানীগঞ্জকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা হয়। বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে ব্যবহার করা হয় সামরিক ঘাঁটি হিসেবে। ভোর হওয়ার আগেই সৈন্যরা অবস্থান নেয় জিঞ্জিরা, শুভাঢ্যা ও কালিন্দীর গ্রামগুলোতে, যেন কোনো মানুষ পালানোর সুযোগ না পায়।
২ এপ্রিল ভোরের অন্ধকার ভেদ করে একটি সংকেতের মাধ্যমে শুরু হয় অপারেশন। এরপরই শুরু হয় আগুন, গোলা আর গুলির এক বিভীষিকাময় তাণ্ডব। প্রথমে বাজার ও ঘরবাড়িতে আগুন লাগানো হয়—মানুষকে আতঙ্কিত ও ছত্রভঙ্গ করার জন্য। তারপর শুরু হয় নির্বিচারে হত্যা।
গ্রামের পর গ্রাম পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ঘরে ঢুকে ব্রাশফায়ার করা হয়। যারা পালাতে চেয়েছে, তারা খোলা মাঠে গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে পড়ে। কেউ পুকুরপাড়ে লুকিয়েও বাঁচতে পারেনি। কোথাও লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করা হয়েছে, কোথাও পুরো পরিবারকে ঘরের ভেতর হত্যা করা হয়েছে। নারী নির্যাতন, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ—সব মিলিয়ে এটি ছিল এক পূর্ণাঙ্গ ধ্বংসযজ্ঞ।
এই হত্যাযজ্ঞ চলে টানা প্রায় সাড়ে নয় ঘণ্টা—ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত। বিভিন্ন সূত্রে নিহতের সংখ্যা ২৫০০ থেকে ৫০০০ পর্যন্ত বলা হলেও প্রকৃত সংখ্যা সম্ভবত আরও বেশি। কারণ অনেক লাশই কখনো শনাক্ত করা যায়নি, অনেক পরিবার পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
এই গণহত্যার ভয়াবহতা শুধু সংখ্যায় নয়, বরং এর পদ্ধতিগত নির্মমতায়। চারদিক ঘিরে ফেলা, পালানোর পথ বন্ধ করা, তারপর ধাপে ধাপে হত্যা—এটি ছিল একটি সুসংগঠিত সামরিক অপারেশন, যার প্রতিটি ধাপ পরিকল্পিত।
এই বৃহৎ ইতিহাসের ভেতরে লুকিয়ে আছে অসংখ্য ব্যক্তিগত বেদনা, অজস্র হারানোর গল্প। সেইসব গল্পের একটি আমার নিজের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
১৯৭১ সালের ২ এপ্রিলের সেই সকাল আজও আমার স্মৃতিতে অমলিন। তখন আমি ছোট, কিন্তু সেদিনের প্রতিটি মুহূর্ত যেন আজও চোখের সামনে ভাসে। খুব ভোরে খবর এলো—পাকিস্তানি সেনারা নদী পার হয়ে কেরানীগঞ্জে নামছে। সূর্য তখনও ওঠেনি, কিন্তু ভয়ের ছায়া চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল।
আমার নানা বাড়ি ছিল স্থানীয় আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র , বড় মামা আমজাদ হোসেন ছিলেন আওয়ামীলীগ নেতা , আমি শৈশবকাল থেকে সেই বাড়ীতেই বড় হয়েছি । আমার নানার বাড়িতে নিয়মিত রাজনৈতিক সভা হতো। ২৬ মার্চের পর থেকে এলাকার মানুষ রাত জেগে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে পাহারা দিত—মিলিটারিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য। সেদিনও সেই সতর্কতার ফলেই আমরা আগাম খবর পাই।
ভোরবেলা আমার বড় মামা দৌড়ে এসে জানালেন—এখনই বাড়ি ছাড়তে হবে। সময় নেই। কোনো দ্বিধা না করে আমরা দ্রুত বাড়ি ছেড়ে পাশের এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিই , সেই দিন আমরা বাড়িতে থাকলে আমাদের সবাইকে মেরে ফেলত পাকিস্তানী আর্মি এটা নিশ্চিত ।
এর মধ্যেই শুরু হয়ে গেছে গোলাগুলি। চারদিকে মানুষের চিৎকার, আতঙ্ক, ছুটোছুটি। কেউ মাঠে পড়ে যাচ্ছে, কেউ রাস্তায় গুলিবিদ্ধ হচ্ছে। জীবন বাঁচানোর সেই মরিয়া চেষ্টা আর মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার সেই দৃশ্য—একটি শিশুমনের জন্য তা ছিল অকল্পনীয় ভয়াবহ।
বেলা বাড়ার পর যখন গুলির শব্দ কিছুটা থামে, আমরা বাড়িতে ফিরে আসি। এসে দেখি—আমাদের নানার বিশাল দোতলা বাড়িটি আগুনে পুড়ে গেছে। ঘরের পর ঘর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। শুধু একটি ঘর অক্ষত ছিল—যে ঘরে আমি থাকতাম, এবং যেখানে রাজনৈতিক সভা অনুষ্ঠিত হতো।
কিন্তু সেই অক্ষত ঘরও আমাদের নিরাপত্তা দিতে পারেনি। আমরা বুঝতে পারছিলাম, আবার আক্রমণ হতে পারে। তাই জীবন বাঁচানোর তাগিদে সবকিছু ফেলে রেখে আমরা সেদিনই কেরানীগঞ্জ ছেড়ে পুরান ঢাকার মালিটোলায় চলে আসি।
পরে জেনেছি, আমাদের বাড়ি এবং আশপাশের এলাকা পাকিস্তানি বাহিনীকে চিনিয়ে দেওয়া হয়েছিল। স্থানীয় কিছু সহযোগীর প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল এতে। এই বিশ্বাসঘাতকতার বেদনাও কম নয়—বরং এটি ইতিহাসের এক অন্ধকার বাস্তবতা, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে যুদ্ধের সময় শত্রু কেবল বাইরেই থাকে না।
সেদিন যদি আমরা ভোরে বাড়ি না ছাড়তাম—আমাদের পরিণতি কী হতো, তা ভাবতেই শিউরে উঠতে হয়।
জিঞ্জিরা গণহত্যার সবচেয়ে নির্মম দিক হলো—এটি ছিল আশ্রয়প্রার্থীদের উপর পরিচালিত হত্যাযজ্ঞ। যারা ২৫ মার্চের মৃত্যুকূপ থেকে বেঁচে গিয়েছিল, তারা আবার নতুন করে মৃত্যুর শিকার হয়। তাদের অনেকের নাম ইতিহাসে নেই, তাদের কবর নেই, তাদের শেষ ঠিকানাও অজানা।
এই গণহত্যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা কোনো সহজলভ্য অর্জন নয়। এটি অসংখ্য মানুষের ত্যাগ, রক্ত এবং অজস্র অশ্রুর বিনিময়ে অর্জিত।
আজ, স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পরে দাঁড়িয়ে, এই ইতিহাস স্মরণ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। শুধু আবেগ দিয়ে নয়, গবেষণা, দলিল এবং প্রজন্মান্তরে প্রচারের মাধ্যমে এই স্মৃতিকে জীবন্ত রাখতে হবে।
২ এপ্রিল তাই কেবল একটি তারিখ নয়—এটি একটি শোকগাথা, একটি সতর্কবার্তা, এবং একই সঙ্গে প্রতিরোধের প্রেরণা।
যারা সেদিন প্রাণ হারিয়েছেন—অনেকেই নামহীন, অচেনা—তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। তাদের আত্মত্যাগের উপরই দাঁড়িয়ে আছে আমাদের স্বাধীনতা।
এই ইতিহাস ভুলে যাওয়ার নয়। এই ইতিহাস মনে রাখার, জানানোর, এবং বাঁচিয়ে রাখার।
কারণ, স্মৃতি যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন ইতিহাসও বেঁচে থাকবে।
লেখক : হাবিব বাবুল, প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম ।

