আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে গত ২১ ফেব্রুয়ারি রামমোহন লাইব্রেরি-র রায়া দেবনাথ মেমোরিয়াল হলে আয়োজিত হল ছায়ানট (কলকাতা)-এর বিশেষ অনুষ্ঠান ‘আমি বাংলায় কথা কই’। শতাব্দী প্রাচীন এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের পরিমণ্ডল বাংলার বহু মনীষীর পদধূলিধন্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম-সহ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অসংখ্য বরেণ্য ব্যক্তিত্ব এই মঞ্চে বিভিন্ন সময়ে উপস্থিত থেকেছেন। সেই পুণ্যভূমিতে দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের অনুভূতি ছিল সত্যিই অনন্য।

সমগ্র অনুষ্ঠানটির পরিকল্পনা ও পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন ছায়ানট (কলকাতা)-এর সভাপতি সোমঋতা মল্লিক। তাঁর সুচারু সঞ্চালনা অনুষ্ঠানকে এক বিশেষ মাত্রা দেয়। গত ১৮ বছর ধরে চেতনার কবি নজরুলের সৃষ্টি প্রচার ও প্রসারে নিরবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে চলেছে ছায়ানট। প্রতি বছরের মতো এবছরও যথাযোগ্য মর্যাদায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন করেন সংগঠনের শিল্পীবৃন্দ।
গান ও কবিতার মাধ্যমে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। দুই বাংলার বিশিষ্ট কবিদের লেখা একুশের কবিতা বাচিকশিল্পীরা কণ্ঠে ধারণ করেন। দেশাত্মবোধক গানে মুখরিত হয়ে ওঠে প্রেক্ষাগৃহ। একক ও দলীয়ভাবে প্রায় ৫০ জন শিল্পী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন।
একক কবিতা পরিবেশন করেন সুকন্যা রায়, স্বাতী ভট্টাচার্য, অনিন্দিতা ঘোষ, আশিসবরণ মল্লিক, সায়ন্তনী বসু, দেবীমিতা বসু বেরা, পুষ্পিতা মজুমদার, ববিতা গাঙ্গুলি ও জয়া ব্যানার্জী। একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন কৃষ্ণকলি মজুমদার, গোপা গুপ্ত ও কাকলি দেব।
তন্ময় দে বিশ্বাস রচিত ‘অথঃ পাঞ্চালি কথা’ শ্রুতিনাটক পরিবেশন করেন কাকলি ব্রহ্মচারী ও তন্ময় দে বিশ্বাস। সৌম্যদেব দাশ ও তানিয়া দাশের দ্বৈত উপস্থাপনাও দর্শকদের বিশেষভাবে মুগ্ধ করে।
শৌভিক দত্তের পরিচালনায় কাঁকুড়গাছি শ্রুতিনিকেতন-এর শিল্পীবৃন্দ দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করেন। তাঁদের কণ্ঠে ‘ধনধান্য পুষ্প ভরা’ গানে দর্শকরাও কণ্ঠ মেলান এবং আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন।
এছাড়া কৃত্তিক ঘোষের পরিচালনায় শ্রুতিবিতান, সোনালী দাসের পরিচালনায় অনির্বাণ এবং সৌম্যশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়ের পরিচালনায় সৌম্যশ্রী কবিতা চর্চা কেন্দ্র-এর শিল্পীবৃন্দ দলীয় কবিতা আবৃত্তি করেন। সকলের পরিবেশনা দর্শকদের মন ছুঁয়ে যায়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট বাচিকশিল্পী উৎপল চৌধুরী। শেষ পর্যায়ে তাঁর সুচিন্তিত বক্তব্য অনুষ্ঠানে গভীরতা ও তাৎপর্য যোগ করে। যন্ত্রানুসঙ্গে ছিলেন অপূর্ব অধিকারী ও সমর কুমার মল্লিক।
অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে সোমঋতা মল্লিকের কণ্ঠে সঙ্গীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে। মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে তিনি পরিবেশন করেন— ‘আমি বাংলায় গান গাই’, ‘মোদের গরব, মোদের আশা/আ-মরি বাংলা ভাষা’ এবং ‘ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি আমার দেশের মাটি’। ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসায় ভরা এই অনুষ্ঠান উপস্থিত সকলের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে যায়।

