নির্বাচন এলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশ ভরে যায় প্রতিশ্রুতির মিছিলে। উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি, স্মার্ট রাষ্ট্র—শব্দগুলো ঝলমলে পোস্টারের মতো চোখে পড়ে। কিন্তু সেই শব্দমালার ফাঁকে একটি প্রশ্ন কেমন যেন নীরবে চাপা পড়ে যায়: আমাদের সন্তানেরা কি তবে জন্মগতভাবেই পরবাসী ? কেন তাদেরকে ভূমধ্যসাগরের নোনাজলে ভেসে মরতে হবে, কেন পাহাড়-জঙ্গল পেরিয়ে অজানার পথে নিখোঁজ হতে হবে, কেন রুটির আশায় বিদেশে গিয়ে অন্যের যুদ্ধে বন্দুক ধরতে বাধ্য হতে হবে? এই প্রশ্নের কোনো দলীয় ভাষ্য আমরা আজও স্পষ্টভাবে শুনতে পাইনি।
সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ায় চাকরির প্রলোভনে গিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া তরুণদের গল্প আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে—কর্মসংস্থানের সংকট কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি মানবিক সংকট। যে মায়ের ছেলে ভূমধ্যসাগরে ডুবে গেছে, শুধুই ইউরোপে যাওয়ার আশায়, সেই মায়ের কান্না কোনো পরিসংখ্যানের পাতায় ধরা পড়ে না। যে মা আজও ভাতের থালা হাতে বসে আছেন—পাহাড়-জঙ্গল ডিঙিয়ে বিদেশ যেতে গিয়ে নিখোঁজ ছেলেটা হয়তো আজ ফিরবে—তার অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাস কোনো উন্নয়ন সূচকে জায়গা পায় না।
এই দেশ তরুণে ভরা। জনমিতিক লভ্যাংশের কথা আমরা বহুবার শুনেছি। কিন্তু লভ্যাংশ তখনই সম্পদ হয়, যখন রাষ্ট্র তার তরুণদের দক্ষতা, মর্যাদা আর নিরাপত্তার সঙ্গে কাজে লাগাতে পারে। তা না হলে এই তরুণ শক্তিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি—অনিশ্চয়তা, অবৈধ অভিবাসন, মানবপাচার, আর পরবাসে মৃত্যুর ঝুঁকি। প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক দলগুলো কি এই বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে স্পষ্টভাবে বলছে—আমরা আমাদের সন্তানদের দেশেই কাজ দেবো?
নির্বাচনী ইশতেহারে আমরা দেখি অবকাঠামো, মেগা প্রকল্প, ডিজিটাল রূপান্তরের কথা। কিন্তু গ্রাম থেকে শহর, শহর থেকে বিদেশ—এই বাধ্যতামূলক যাত্রার চক্র ভাঙার কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা খুব কমই চোখে পড়ে। কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন, স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা তৈরি, কারিগরি শিক্ষার সঙ্গে বাজারের বাস্তব চাহিদার সংযোগ—এসব কথা হয় বটে, কিন্তু তা যেন আলাদা আলাদা বাক্য। একটি সমন্বিত মানবকেন্দ্রিক কর্মসংস্থান পরিকল্পনার ভাষা অনুপস্থিত।
অথচ সম্ভাবনা আছে। বাংলাদেশের মাটি উর্বর, মানুষ পরিশ্রমী। কৃষি ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে স্থানীয় ভ্যালু চেইন গড়ে তোলা যায়। মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, হালকা প্রকৌশল, নির্মাণ, পরিবহন, পর্যটন—প্রতিটি খাতে দক্ষতা উন্নয়ন ও ন্যায্য মজুরির নিশ্চয়তা দিলে কর্মসংস্থান দেশের ভেতরেই তৈরি হতে পারে। আইটি ও সৃজনশীল অর্থনীতিতে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হলে কেবল প্রশিক্ষণ নয়, প্রয়োজন কাজের নিশ্চয়তা, ফ্রিল্যান্সিংয়ের নিরাপত্তা, বৈদেশিক আয়ের বৈধ ও সহজ পথ।
কিন্তু এসবের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার। দরকার এমন একটি নৈতিক অবস্থান, যেখানে বলা হবে—আমরা মানবপাচারকে শূন্যে নামাবো, অবৈধ পথে বিদেশযাত্রা বন্ধ করবো, আর সেই সঙ্গে দেশে সম্মানজনক কাজ সৃষ্টি করবো। শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নয়, বিকল্প তৈরি করে। শুধু স্বপ্ন দেখিয়ে নয়, বাস্তব সুযোগ দিয়ে।
রাষ্ট্র যখন তার নাগরিককে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন নাগরিক নিজের নিরাপত্তা নিজেই খোঁজে—পরবাসে। এই সত্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাই নির্বাচনের মাঠে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আজ মানুষের দাবি খুব সরল : আমাদের সন্তানেরা যেন যুদ্ধের ময়দান বা সমুদ্রের কবরে না যায়। তারা যেন নিজের দেশে, নিজের ভাষায়, নিজের মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করতে পারে।
নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়; এটি সামাজিক চুক্তির নবায়ন। সেই চুক্তিতে যদি কর্মসংস্থানের মানবিক অঙ্গীকার না থাকে, তবে উন্নয়নের সব হিসাবই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। মায়ের অশ্রু দিয়ে কোনো দেশের ভবিষ্যৎ লেখা যায় না। ভবিষ্যৎ লেখা যায় ন্যায়ভিত্তিক কর্মসংস্থান দিয়ে, যেখানে রাষ্ট্র তার সন্তানদের বলে—তোমাদের যেতে হবে না, দেশই তোমাদের কাজ দেবে।
লেখক: হাবিব বাবুল প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

