যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের পরিকল্পনা নিয়ে বিশ্ব রাজনীতি আবার একঝাঁক উত্তেজনা ও সমালোচনার মুখে। অনেকেই এই ইস্যুকে “একটা ফাঁকা বুলি” বা রাজনৈতিক শোরগোল হিসেবে দেখলেও বাস্তবে এর পেছনে রয়েছে জোরালো কৌশলগত, ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব। ২০১৯ সালে প্রথম এ ইস্যু গুঞ্জন ওঠার পর ২০২৫–২০২৬ সালে ট্রাম্প আবারো একই মন্তব্য করেছেন এবং এবার তা কেবল ভাব বা শব্দভরা বাক্য নয়, বরং বাস্তব আন্তর্জাতিক উত্তেজনা ও কূটনীতিক চাপের বিষয় হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
ট্রাম্পের দৃষ্টিতে গ্রিনল্যান্ড শুধু একটি ভূখণ্ড নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা, শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি এবং রাশিয়া–চীন প্রতিযোগিতায় একটি কৌশলগত পথে। তিনি বারবার বলেছেন যে, গ্রিনল্যান্ড সম্পূর্ণরূপে আমেরিকার অংশ হওয়া উচিত, যা আর্কটিক অঞ্চলের কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগাতে সাহায্য করবে। ওই অবস্থানটি উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের মাঝামাঝি অবস্থান করে এবং মহাসাগরীয় নিরাপত্তা, ক্ষেপণ অস্ত্র নজরদারি ও সামুদ্রিক নৌপথ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি হল, গ্রিনল্যান্ডে উঁচু প্রযুক্তির সেন্সর, রাডার, ক্ষুদ্র ভূখণ্ডীয় সামরিক ঘাঁটি এবং প্রাকৃতিক সম্পদ—বিশেষ করে খনিজ, তেল ও গ্যাস—যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বিশ্বাস করেন, আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনা আগ্রাসন বাড়ছে এবং তাই ঐ অঞ্চলে আমেরিকার প্রতিস্থাপন অপরিহার্য। যদিও ট্রাম্পের এই বক্তব্য অনেক সময় ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ বা ‘নিউ আয়ার্কটিক কৌশল’ দ্বারা সমর্থিত, বিশেষজ্ঞেরা মনে করছেন এর পেছনে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক স্বার্থ, মার্কিন জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ ও দেশের রাজনৈতিক বিভাজনও একটি বড় ভূমিকা রাখছে।
তবে বাস্তবে গ্রিনল্যান্ড দখল করা আন্তর্জাতিক আইনের এক দুর্বল ও প্রায় অসম্ভব পদক্ষেপ। গ্রিনল্যান্ড ১৯৭৯ সাল থেকে স্বায়ত্তশাসন ভোগ করছে, যদিও পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতি ডেনমার্কের হাতেই থাকে। এখন এটি ড্যানিশ রাজ্যের অন্তর্গত হলেও দ্রুত স্বাধীনতা পেতে পারে এমন সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা চলছে।
ট্রাম্পের আগ্রহ কখনও সরাসরি “দখল” বা সামরিক আক্রমণের আকারে প্রকাশিত হয়নি বলে প্রশাসন দাবি করেছে, বরং তারা একটি বার্তায় বা কথ্য আকারে ব্যবসা/চুক্তির মাধ্যমে এটি অর্জনের কথা বলে থাকে। প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডকে ‘দখল করতে নয়’, বরং গ্রিনল্যান্ডের মানুষের সঙ্গে বিনিয়োগ, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আলোচনা করতে চায়।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও ডেনমার্কের প্রতিক্রিয়া এই ধরনের মন্তব্য ও পরিকল্পনার বিরুদ্ধে শক্ত ও ঐক্যবদ্ধ। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন স্পষ্ট করে বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অধিকার নেই অন্য দেশের কোনো ভূমি দখল করার।” তিনি ট্রাম্পকে সতর্ক করেছেন যে, এমন কোনো হুমকির পুনরাবৃত্তি করলে তা ন্যাটো ন্যাটওয়ার্ক ও যুক্তরাষ্ট্র-ডেনমার্ক সম্পর্কের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”
গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেন বলেছেন, “গ্রিনল্যান্ড তার নিজের জনগণের।” তিনি আরও জোর দিয়েছেন যে কোনো আলোচনা আন্তর্জাতিক আইন ও গ্রহণযোগ্য চ্যানেল অনুসরণ করেই হতে হবে, এবং সৈন্যতা বা দখলের কোনো ইঙ্গিত অনুমোদনযোগ্য নয়।
ইইউ এবং পশ্চিমা মিত্রর প্রতিক্রিয়া সাধারণত একই ধরনের প্রত্যাখ্যান। ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কাজকর্মী উল্লেখ করেছেন যে, ইইউ “গ্রিনল্যান্ড সম্পর্কে কোনো দরদাম বা আলোচনায় নেই” এবং তারা ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দিকেই সমর্থন জানায়।এছাড়া ন্যাটোর অবস্থানও স্পষ্ট করেছে যে, সদস্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণের কোনো অবস্থান নেয়া হবে না এবং ঐক্যবদ্ধ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এমন পদক্ষেপ বিপজ্জনক ও বিপর্যয়কর হবে।
আন্তর্জাতিক সম্মতিক্রমে স্পষ্ট যে, গ্রিনল্যান্ডকে জোরপূর্বক দখল করা বা এমন কোনো গঠনমূলক পরিকল্পনা বাস্তবে ঘটানো অসম্ভবের কাছাকাছি। বর্তমান ইস্যুটির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান, খনিজ সম্পদ এবং টেকসই সামরিক সুরক্ষা পরিকল্পনা। তবে ডেনমার্ক, গ্রিনল্যান্ড ও ইইউ-এর দৃly় প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, গ্রিনল্যান্ডকে বিক্রি করা বা দখল করা কোনো ভাবেই আন্তর্জাতিক আইনানুগ আলোচনার বাইরে গিয়ে সম্ভব নয়।
এভাবে, ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড ইস্যু কেবল একটি কল্পকাহিনি বা বক্তৃতার শিরোনাম নয়; এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও নিরাপত্তা কৌশলগত দাবির উত্থান। তবে বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট— কোনো দেশই স্বেচ্ছায় নিজের ভূখণ্ড দখলের অধিকার দেবে না, এবং এই ধরনের কথা শুধু আন্তর্জাতিক কাঠামোতে উত্তেজনা তৈরি করে।
এই নিবন্ধটি সাম্প্রতিক সংবাদ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে লেখা ।
লেখক: হাবিব বাবুল, প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম ।

