৫ ডিসেম্বর নেলসন ম্যান্ডেলার প্রয়াণের মুহূর্ত স্মরণেের দিন । আজ বিশ্ব মানবতার এক অনন্য প্রহর। ২০১৩ সালে এই দিনে তিনি পৃথিবীকে বিদায় জানান, রেখে যান সহনশীলতা, প্রজ্ঞা ও অসাম্প্রদায়িক চিন্তার এক গভীর উত্তরাধিকার। উন্নয়নশীল বিশ্বের নেতাদের মধ্যে তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব—শক্তিমান ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেও বিনয় ছিল তার আচরণ এবং কথায় । ক্ষমতা ছিল তার দায়িত্ব, আর মানবতা ছিল তার রাজদণ্ড।
ম্যান্ডেলা ‘আমি’ শব্দটি কম ব্যবহার করতেন। তার প্রতিটি বক্তব্য, প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি রাজনৈতিক অবস্থান জুড়ে ছিল—আমরা। তিনি বলতেন, “আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি, আমরা বর্ণবাদের অবসান করেছি।” মহান নেতা কেবল নেতৃত্বই দেন না, তিনি অন্যদের কৃতিত্ব জানানোর সুযোগ সৃষ্টি করেন—ম্যান্ডেলা সেই বিরল নেতাদের একজন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, সহযোদ্ধা, সহচর ও পূর্বসূরিদের ত্যাগ ও সংগ্রামের ফলেই তিনি সামনে এসেছেন; তিনি নিজেকে কেবল জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে দেখেছেন, ব্যতিক্রমী নায়ক হিসেবে নয়। এই আত্মমর্যাদা, অথচ অহঙ্কারশূন্যতাই তাকে করেছে অনন্য।
সাতাশ বছর কারাবন্দি জীবন—যেখানে মানুষ ভেঙে যায়, আত্মবিশ্বাস গুঁড়িয়ে যায়, বিদ্বেষ জন্মায়। কিন্তু ম্যান্ডেলা মুক্ত হন ১৯৯০ সালে, আর মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে তার প্রথম বার্তা ছিল মিলন, ক্ষমা ও পুনর্মিলন। বর্ণবাদ যার জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে শিকল হয়ে ছিল, সেই মানুষটি কারাগার থেকে ফিরে বলেন—বিদ্বেষের সময় শেষ, নতুন দক্ষিণ আফ্রিকা হবে সবার। সাদা-কালো বিভাজনের দীর্ঘ অন্ধকার ভেঙে তিনি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন সমানাধিকারের রঙধনু রাষ্ট্র। প্রতিশোধহীন রাজনৈতিক প্রয়োজনে নয়, মূল্যবোধের ভিত্তিতে তিনি ক্ষমাকে বেছে নিয়েছিলেন।
১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কালো প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। ক্ষমতা তার নাগালে ছিল, ইতিহাস তার কাঁধে, বিশ্ব তাকিয়ে ছিল। কিন্তু পরের টার্মে আর প্রেসিডেন্ট হতে চাননি। স্বেচ্ছায় অবসর নেন, দলীয় নেতৃত্ব থেকেও সরে দাঁড়ান। যে উপনিবেশ-উত্তর দেশগুলোতে ক্ষমতার লোভ, পরিবারতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্র শাসনব্যবস্থাকে গ্রাস করে—সেখানে ম্যান্ডেলার এই সিদ্ধান্ত সময়ের বিস্ময়। তিনি প্রমাণ করেছিলেন—ক্ষমতায় থাকা নয়, ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াতেও সাহস লাগে, এবং সেই সাহসই সত্যিকার নেতার আলামত।
দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষের কাছে তিনি শুধু রাজনীতির পুরুষ নন; তিনি ছিলেন সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও গর্বের প্রতীক। থিম্বু গোত্রের সন্তান হিসেবে জনগণ তাকে ডাকত মাদিবা—যার অর্থ পিতা। এই নাম তিনি ভালোবেসে গ্রহণ করেন, কারণ এটি ছিল তার শেকড়ের পরিচয়। তিনি বলতেন, নামের আগে পরে বিশেষণের প্রয়োজন নেই; জনগণই যাকে স্বীকৃতি দেয়, তার জন্য সম্মানই প্রকৃত প্রাপ্তির বন্ধন।
মাদিবার জীবন আমাদের শেখায়—সংগ্রাম শুধু অস্ত্রের নয়, সংহতিরও নাম। কারাগারের লোহার দরজা ভেঙে নয়, মানবিকতার আলো দিয়ে তিনি ভেঙেছিলেন ঘৃণার প্রাচীর। স্বাধীনতা তার কাছে ছিল মানবসমতার প্রতিশব্দ। তিনি বিশ্বাস করতেন, শাসন ক্ষমতার উল্লাস নয়, দায়িত্বপূর্ণ মানব রক্ষণ। তাই তিনি রাষ্ট্রকে সামষ্টিক শক্তির ভিত্তিতে দাঁড় করান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, এবং অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের প্রয়োজনে দেন সমান গুরুত্ব। তার নেতৃত্ব শুধু দক্ষিণ আফ্রিকাকে নয়, গোটা পৃথিবীর আন্দোলন, মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও ন্যায়-বিচারের সংগ্রামী মানুষের হৃদয়কে প্রভাবিত করেছে।
আজ যখন আমরা দেখি ক্ষমতার দৌড়ে মানবতা পিছিয়ে যায়, তখন ম্যান্ডেলা আমাদের শেখান— ক্ষমা দুর্বলতার লক্ষণ নয়, তা সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষের সিদ্ধান্ত। নাগরিকের স্বাধীনতা রাষ্ট্রের দয়া নয়, অধিকার। রাজনৈতিক নেতৃত্বের শীর্ষে থাকা মানে বশ্যতা নয়, জনগণের প্রতি জবাবদিহি। তার ভাষণে, তার আচরণে, তার সাধারণ জীবনযাপনে আমরা পাই এই শিক্ষা।
যুগ পাল্টায়, নেতা আসে-যায়, কিন্তু ম্যান্ডেলা থেকে যান মানবতার কালজয়ী পাঠ হিসেবে। মৃত্যুর পরও তিনি জাগিয়ে রাখেন বিবেক—শাসকের, নাগরিকের, মানবসমাজের। তার নাম উচ্চারিত হলে আজও পৃথিবীর লাখো মানুষ মাথা নত করে শ্রদ্ধায়, কারণ ম্যান্ডেলা কেবল দক্ষিণ আফ্রিকার নেতা নন, তিনি বিশ্বমানব।
এই দিনে আমরা যখন তার প্রয়াণ স্মরণ করি, তখন শোকের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে শ্রদ্ধা ও প্রেরণা। আমাদের ভাবতে হয়—আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র, নেতৃত্ব ও নাগরিক জীবনে ম্যান্ডেলার নীতি কতটা প্রয়োগ করতে পেরেছি ? আমরা কি ঘৃণাকে পরাভূত করে ভালোবাসার সম্ভাবনা তৈরি করতে পেরেছি ? আমাদের হাতে কি সুযোগ নেই আরো মানবিক সমাজ নির্মাণের ?
ম্যান্ডেলা তার জীবন দিয়ে দেখিয়েছেন—স্বাধীনতার প্রকৃত রূপ ক্ষমতার দখলে নয়, মানুষের প্রতি ভালোবাসায়। তার স্মরণ আমাদের শুধু অতীতের প্রতি শ্রদ্ধা নয়, ভবিষ্যতের জন্য দিশা। তার রেখে যাওয়া পথ অনুসরণ করাই আমাদের দায়িত্ব, আমাদের অঙ্গীকার।
মাদিবা নেই, কিন্তু মাদিবার আলো আছে—মানবতার প্রদীপ হয়ে। আমরা যদি সেই আলো বহন করি, তবে পৃথিবী একদিন নিশ্চয়ই হবে ঘৃণামুক্ত, বৈষম্যহীন, শান্তিময়।
লেখক: হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম ।

