বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মূলভিত্তি হলো প্রাথমিক শিক্ষা। একটি শিশুর চরিত্র গঠন, নৈতিক মূল্যবোধ ও শিক্ষাজীবনের প্রথম পাঠ শুরু হয় প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই। এই গুরুত্বপূর্ণ স্তরটিতে যে মানুষগুলো নিবেদিত প্রাণ হয়ে কাজ করে চলেছেন, তারা হলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, যারা জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তুলছেন, তাদেরই দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত থাকতে হচ্ছে।
সম্প্রতি ‘প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদ’-এর উদ্যোগে সারা দেশের সহকারী শিক্ষকরা দশম গ্রেড প্রদানের দাবিতে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছেন। এই দাবির সঙ্গে যুক্ত আছে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি— উচ্চতর গ্রেড সমস্যার স্থায়ী সমাধান এবং শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতির নিশ্চয়তা। তিনটি দাবিই বাস্তবভিত্তিক, যুক্তিসঙ্গত ও রাষ্ট্রের শিক্ষা উন্নয়নের স্বার্থে প্রয়োজনীয়।
সহকারী শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে ১১তম গ্রেডের দাবি জানিয়ে এলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। অথচ পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর, সিনিয়র স্টাফ নার্স, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা দশম গ্রেডে বেতন পাচ্ছেন। প্রাথমিক শিক্ষকেরা ন্যূনতম স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী হলেও একই মর্যাদা পান না—এটি স্পষ্ট বৈষম্য ও অবিচার।
এই দাবি কেবল আর্থিক সুবিধার নয়; এটি মর্যাদা ও প্রণোদনার প্রশ্ন। একজন শিক্ষক যখন তার কর্মপরিবেশে সম্মান ও ন্যায্য মূল্যায়ন পান, তখন তা সরাসরি তার শিক্ষাদান, মনোবল ও শিক্ষার্থীর মানোন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
দীর্ঘ ১০ বছর বা ১৬ বছর চাকরি শেষে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার কথা থাকলেও, প্রশাসনিক জটিলতা ও অস্পষ্ট নীতির কারণে বহু শিক্ষক এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকেন। এতে শিক্ষক সমাজে ক্ষোভ, অনুপ্রেরণার অভাব ও হতাশা তৈরি হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উচিত এই জটিলতার স্থায়ী ও কার্যকর সমাধান করা, যাতে অভিজ্ঞ শিক্ষকরা প্রাপ্য মর্যাদা পান।
সহকারী শিক্ষকদের জন্য শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতি নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন। বর্তমান কাঠামোতে পদোন্নতির সীমাবদ্ধতার কারণে যোগ্য শিক্ষকরা অগ্রগতির সুযোগ হারাচ্ছেন। ফলে অনেকের মধ্যে কর্মে অনীহা তৈরি হচ্ছে। পদোন্নতির সুষ্ঠু ব্যবস্থা থাকলে শিক্ষকরা আরও উৎসাহ ও দায়িত্ববোধ নিয়ে কাজ করবেন, যা প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলবে।
শিক্ষকদের যুক্তিপূর্ণ দাবিগুলো পূরণ করা শুধু তাদের কল্যাণ নয়—এটি জাতির ভবিষ্যতের প্রতি বিনিয়োগ। একজন শিক্ষক যদি আর্থিক ও মানসিকভাবে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, তবে তিনি আরও নিষ্ঠার সঙ্গে শিশুদের শিক্ষা ও নৈতিকতা গঠনে মনোযোগী হবেন। সন্তুষ্ট শিক্ষক মানে উন্নত শ্রেণিকক্ষ, মনোযোগী শিক্ষার্থী এবং ফলপ্রসূ প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা।
রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের মতো শিক্ষকরাও মর্যাদা ও ন্যায্য পারিশ্রমিকের অধিকারী। যারা গ্রামীণ অঞ্চলের অপ্রতুল সুবিধার মধ্যেও প্রতিদিন শিশুদের আলোয় ভরিয়ে তুলছেন, তাদের দাবি উপেক্ষা করা মানে জাতির ভবিষ্যৎ অবহেলা করা। সরকার যদি এই তিনটি দাবি—
১. সহকারী শিক্ষকদের দশম গ্রেড প্রদান,
২. উচ্চতর গ্রেড সমস্যার স্থায়ী সমাধান, এবং
৩. শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতি নিশ্চিতকরণ
— দ্রুত বাস্তবায়ন করে, তবে শিক্ষক সমাজে নতুন প্রাণ সঞ্চার হবে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা শুধু বেতন বৃদ্ধির জন্য আন্দোলন করছেন না; তারা মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার মান রক্ষার জন্য মাঠে নেমেছেন। তাদের এই দাবি যুক্তিপূর্ণ, মানবিক ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।
যারা জাতিকে গড়ে তোলেন, তাদের মর্যাদা নিশ্চিত করাই একটি সচেতন ও উন্নত রাষ্ট্রের পরিচয়। তাই সরকারের প্রতি অনুরোধ— সহকারী শিক্ষকদের এই দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে তাদের ন্যায্য দাবি পূরণ করুন।
হাবিব বাবুল , প্রধান সম্পাদক , শুদ্ধস্বর ডটকম ।

