দীর্ঘ সমুদ্র পরীক্ষা শেষে চীন আনুষ্ঠানিকভাবে কমিশন করল তার দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সুপার এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার ‘ফুজিয়ান’। শুক্রবার (৭ নভেম্বর ২০২৫) চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদসংস্থা শিনহুয়া এবং সিজিটিএন (চায়না গ্লোবাল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক) এ তথ্য প্রকাশ করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি চীনের নৌবাহিনীর জন্য এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ— যা দেশটিকে প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এক প্রকৃত ‘ব্লু ওয়াটার নেভাল পাওয়ার’-এ রূপ দেবে।
সি জিনপিংয়ের উপস্থিতিতে কমিশনিং অনুষ্ঠান
চীনের প্রেসিডেন্ট ও কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের চেয়ারম্যান সি জিনপিং বুধবার (৫ নভেম্বর ২০২৫) দক্ষিণ চীনের হাইনান প্রদেশের সানইয়া শহরে অনুষ্ঠিত কমিশনিং ও পতাকা প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
তিনি ফুজিয়ান ক্যারিয়ারে উঠে পরিদর্শন করেন এবং এর সক্ষমতা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
২০১৮ সালে এক ভাষণে সি জিনপিং ঘোষণা দিয়েছিলেন,
“একটি শক্তিশালী জনগণনৌবাহিনী গঠনের কাজ কখনও এত জরুরি ছিল না।”
তিনি প্রতিশ্রুতি দেন চীন “দৃঢ়ভাবে নৌবাহিনীর আধুনিকায়ন ত্বরান্বিত করবে” এবং ২০৪৯ সালের মধ্যে বিশ্বমানের সামরিক শক্তি গঠনের লক্ষ্যে কাজ করবে।
নিজস্ব নকশায় নির্মিত প্রথম সুপার ক্যারিয়ার
২০২২ সালের জুনে পানিতে নামানো ও ২০২৪ সালের মে মাসে প্রথম সমুদ্র পরীক্ষা সম্পন্ন করা ফুজিয়ান হলো চীনের তৃতীয় এবং প্রথম সম্পূর্ণ নিজস্ব নকশা ও নির্মাণে তৈরি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার।
এটি চীনের প্রথম ক্যারিয়ার যেখানে ব্যবহৃত হয়েছে আধুনিক ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ক্যাটাপল্ট (EMALS) প্রযুক্তি— যা আমেরিকার ফোর্ড-শ্রেণির ক্যারিয়ারের মতোই উন্নত।
এই প্রযুক্তির ফলে যুদ্ধবিমানগুলোকে দ্রুত, নিরাপদ ও কম চাপের মাধ্যমে উৎক্ষেপণ করা যায়। এটি থেকে J-35, J-15T, J-15D যুদ্ধবিমান এবং Z-20 হেলিকপ্টার সফলভাবে উড্ডয়ন করেছে।
ফুজিয়ান এখন “পূর্ণাঙ্গ ডেক অপারেশন সক্ষমতা” অর্জন করেছে বলে জানিয়েছে চীনা নৌবাহিনী। এর মাধ্যমে চীন দূর সমুদ্রে স্বাধীনভাবে অভিযান পরিচালনা করতে পারবে, যা পূর্বের লিয়াওনিং ও শানডং ক্যারিয়ারে সম্ভব ছিল না।
শক্তির ভারসাম্যে নতুন সমীকরণ
বর্তমানে চীনের হাতে তিনটি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে ১১টি— সবগুলোই পারমাণবিক শক্তিচালিত এবং বিশ্বজুড়ে উপস্থিতি বজায় রাখে।
তবে সংখ্যার বিচারে চীনের নৌবাহিনী এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড়— যেখানে রয়েছে ৩৫০টিরও বেশি যুদ্ধজাহাজ।
বিশ্লেষকদের মতে, “ফুজিয়ান” কমিশনিং চীনকে দ্বিতীয় দ্বীপমালা (Second Island Chain) পর্যন্ত শক্তি প্রদর্শনের সক্ষমতা দেবে— যা যুক্তরাষ্ট্রের গুয়াম, হাওয়াই ও পালাউ ঘাঁটির জন্য কৌশলগত চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করবে।
ব্রায়ান হার্ট, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাংক CSIS-এর চায়না পাওয়ার প্রজেক্টের উপপরিচালক, বলেন—
“ফুজিয়ান চীনের নজরদারি, সমুদ্র ও আকাশ কার্যক্রমের পরিসর অনেক বাড়িয়ে দেবে। এটি তাদের সামুদ্রিক কৌশলে এক নতুন অধ্যায়।”
তাইওয়ান প্রসঙ্গে সম্ভাব্য প্রভাব
চীন ‘এক চীন নীতি’-এর অধীনে তাইওয়ানকে নিজের ভূখণ্ড দাবি করে। শান্তিপূর্ণ পুনর্মিলনের আশাবাদ ব্যক্ত করলেও প্রয়োজনে বলপ্রয়োগের কথাও অস্বীকার করেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, তাইওয়ান সংকটের ক্ষেত্রে যদি চীন দ্বিতীয় দ্বীপমালা পর্যন্ত ক্যারিয়ার মোতায়েন করতে পারে, তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর প্রতিক্রিয়া বিলম্বিত হতে পারে— যা যুদ্ধের গতিপথ পাল্টে দিতে পারে।
“বিশ্বমানের নৌবাহিনী” গঠনের পথে চীন
চীনের নৌবাহিনী ইতিমধ্যে দক্ষিণ চীন সাগরের দ্বীপগুলোতে স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি, বিমানঘাঁটি ও নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ফুজিয়ানের মতো ক্যারিয়ার— যা দূর সমুদ্রে চীনের উপস্থিতি নিশ্চিত করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর (পেন্টাগন) তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলেছে—
“চীনই একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী, যার ইচ্ছা ও সক্ষমতা রয়েছে বিদ্যমান আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলাকে পুনর্গঠনের।”
ফুজিয়ানের কমিশনিং নিঃসন্দেহে চীনের সামুদ্রিক শক্তি বৃদ্ধির ইতিহাসে এক বড় মাইলফলক। এটি শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়, বরং ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের দৃঢ় ঘোষণা— যা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্যে নতুন এক অধ্যায় সূচনা করেছে।
ক্ষমতা: আধুনিকায়ন প্রচেষ্টাগুলি চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভি (PLAN)-কে একটি “ব্লু-ওয়াটার স্ট্র্যাটেজিক নেভি”-তে রূপান্তর করার লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছে — যা চীনের উপকূলীয় জলের বাইরে দূরবর্তী মহাসাগর ও সমুদ্রে অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম হবে।
· সেনা আধুনিকায়ন: চীন দ্রুত নতুন ও বৃহত্তর যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ ও মোতায়েন করছে, যার মধ্যে আরও বেশি পারমাণবিকচালিত সাবমেরিন ও ডেস্ট্রয়ার অন্তর্ভুক্ত, যাতে তারা মার্কিন নৌবাহিনীর সঙ্গে সক্ষমতার ব্যবধান কমাতে পারে। ২০২৪ সালের হিসাবে, PLAN বিশ্বের সর্ববৃহৎ নৌবাহিনী, সক্রিয় জাহাজের সংখ্যার দিক থেকে।
· কৌশলগত প্রেক্ষাপট: এই আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের উদ্দেশ্য হলো প্রধান শক্তিগুলিকে নিরুৎসাহিত করা, আঞ্চলিক দেশগুলির ওপর চাপ সৃষ্টি করা, বৈশ্বিক প্রভাব বৃদ্ধি করা, এবং দক্ষিণ চীন সাগর ও তাইওয়ানের মতো বিতর্কিত অঞ্চলে চীনের দাবিকে আরও শক্তিশালী করা।
আবু আহমেদ খিজির
চীন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক

