আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার ও সরকারি দলের নীলনকশা বাস্তবায়ন করতেই গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) এর সংশোধনী আনা হয়েছে বলে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে ছয় দলীয় জোট গণতন্ত্র মঞ্চ।
আজ শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে গণতন্ত্র মঞ্চ। রাজধানীর তোপখানা রোডের রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এই সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন গণতন্ত্র মঞ্চের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জেএসডি সভাপতি আসম আব্দুর রব, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, ভাসানী অনুসারী পরিষদের আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু প্রমুখ।
গণতন্ত্র মঞ্চের পক্ষে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, গত ৪ জুলাই সংসদে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) এর সংশোধনী বিলটি পাস করে ভোট বন্ধে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা কমিয়ে আনা হল। এই সংশোধনীর মাধ্যমে যে কোনো অনিয়মের কারণে ভোট বন্ধ রাখতে এই পর্যন্ত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের যে ক্ষমতা ছিল বাস্তবে তা কেড়ে নেওয়া হল। আরপিওর ৯১ (ক) অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন যদি মনে করে যে তারা আইনানুগভাবে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে সক্ষম হবে না, তাহলে তারা নির্বাচনের যে কোনো পর্যায়ে ভোট বন্ধ রাখতে পারে। অর্থাৎ সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য পরিস্থিতি অনুকূল না হলে নির্বাচন কমিশন ভোট গ্রহণের আগেই নির্বাচন বন্ধ করতে পারত। এখন এই ক্ষমতা সীমিত করে কেবল ভোটের দিন সংসদীয় আসনের কতিপয় কেন্দ্রের ভোট স্থগিত রাখতে পারবে, পুরো সংসদীয় আসনের নয়। সংশোধিত আরপিও অনুযায়ী, নির্বাচনের পরিবর্তে ‘ভোট গ্রহণ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।’
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়েছে, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনের আসল ক্ষমতা ছিল আরপিওর ৯১(ক) ধারা। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) এর সংশোধনী বিল পাস করে এখন নির্বাচন কমিশনকে প্রকারান্তরে ঠুটো জগন্নাথে পরিণত করা হল। এই সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা আরও সংকুচিত করা হল। এটা অত্যন্ত স্পষ্ট যে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে বাড়তি সুবিধা দিতে এবং জাতীয় নির্বাচনে সরকারি দলের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করতেই এই সংশোধনী আনা হয়েছে।
গণতন্ত্র মঞ্চের পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, এমনিতেই বর্তমান নির্বাচন কমিশনের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নানা দিক থেকে গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ, গোটা নির্বাচনী ব্যবস্থাই যেখানে ভেঙে দেওয়া হয়েছে সেখানে নির্বাচন কমিশনের অবশিষ্ট ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার এই তৎপরতা নির্বাচন কেন্দ্র করে সরকারি দলের স্বেচ্ছাচারীতা, আধিপত্য ও কর্তৃত্ব আরও বাড়িয়ে তুলবে। তদুপরি ক্ষমতাসীন সরকার যখন আর আর একটি সাজানো একতরফা নির্বাচনের পাঁয়তারা করছে তখন ভোট বাতিলে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা কমানো যে পুরোপুরি দুরভিসন্ধিমূলক ভাও স্পষ্ট বোঝা।
আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সরকার ও সরকারি দলের নীলনকশা বাস্তবায়ন করতেই যে এই সংশোধনী আনা হয়েছে তাও অত্যন্ত পরিষ্কার। আর নির্বাচন কমিশন যেভাবে উপযাচিতভাবে নিজেদের ক্ষমতা কমানোর সংশোধনী হাজির করে সরকারি দলের ভোট কারচুপির রাস্তা প্রশস্ত করে দিয়েছে তা বিস্ময়কর ও আপত্তিকর। কারচুপি, জালিয়াতি ও সন্ত্রাসসহ নানা কারণে একটি নির্বাচনী এলাকার সময় নির্বাচন বাতিলে নির্বাচন কমিশনের যে ক্ষমতা ছিল এখন তা না থাকায় নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীনদের নয়-ছয় করার সুযোগ আরও বৃদ্ধি পেল। এর মধ্য দিয়ে আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সরকারি দলের কুমতলবও বেরিয়ে এসেছে।’
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, ‘সরকারি দলের আর একটি একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠানের পাঁয়তারার কারণে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নানা দিক থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ। আরপিও’র এই সংশোধনী এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সংবিধান নির্বাচন কমিশনকে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের যে দায়িত্ব দিয়েছে আইপিওর এই সংশোধনী তারও পরিপন্থী। এর মধ্যে দিয়ে নির্বাচন কমিশনের হাত-পা বেঁধে ফেলা হলো। আরপিওর ধারা অনুযায়ী আগে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সাতদিন আগে যাবতীয় বকেয়া বিল পরিশোধের বাধ্যবাধকতা ছিল। এখন ক্ষুদ্রঋণ, টেলিফোন, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির বকেয়া বিল একদিন আগে জমা দিলেও চলবে। এর মধ্য দিয়ে নির্বাচনে ঋণখেলাপি ও বিলখেলাপিদের দৌরাত্ম আরও বেড়ে যাবে।’
গণতন্ত্র মঞ্চের লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, এসব কারণে এই সংশোধনী কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা অনতিবিলম্বে এই সংশোধনী প্রত্যাহার করে নেওয়ার আহ্বান জানাই। তা না হলে এই সংশোধনী প্রত্যাহারসহ অবাধ, গণতান্ত্রিক ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিপন্থী যাবতীয় ধারা ও তৎপরতা বাতিলে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করার দাবি আদায় করব।

