অ্যাডভোকেট আনসার খান :গত গ্রীষ্মে বেলারুশ ও পোল্যান্ড সীমান্তে শুরু হওয়া অভিবাসী সংকট এই শীতে গুরুতর আকার ধারণ করেছে-দেশ দুটোকে যুদ্ধের দিকে টেনে নিয়ে যেতে পারে বলে উভয়দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব আশংকা প্রকাশ করেছেন।
বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেন্কো বলেছেন-তাঁর দেশ পোল্যান্ডের সাথে কোনো যুদ্ধ চায় না।পোল্যান্ডের সীমান্তে উদ্ভুত অভিবাসন সংকট সমাধানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাঁর দেশের সাথে কাজ করবে-এটা বেলারুশ আশা করে।তবে শান্তিপূর্ণভাবে সংকট নিরসন সম্ভব না হলে যুদ্ধের আশংকা নাকচ করেননি তিনি।”যদি সংকট-খুব দূরে,যুদ্ধ অনিবার্য”প্রেসিডেন্ট যোগ করেন।
একই-সূরে কথা বলেছেন পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মাতেউস মোরাউইকি।সরাসরি যুদ্ধ শব্দ এড়িয়ে গিয়ে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন-বেলারুশ সীমান্তে অভিবাসী সংকট-“অনেক খারাপ কিছু”-হতে পারে।অন্যদিকে-পোল্যান্ডের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাবলনস্কি বলেছেন-পোলিশ সরকার তার সীমান্তে অভিবাসী আগমন ঠেকাতে সচেষ্ট রয়েছে।”আমরা আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় যেকোনো উপায় ব্যবহার করতে প্রস্তুত-তবে আমরা যেকোনো উত্তেজনা এড়াতে চাই”-যোগ করেন তিনি।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতে-পোল্যান্ড ও বেলারুশের মধ্যে বিরাজমান অভিবাসী সংকট একটি ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতে পরিণত হতে হচ্ছে -যা ইউরোপের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
এদিকে পোল্যান্ডের Rzeczpospolita দৈনিকে ২১-নভেম্বর প্রকাশিত এক জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৫৫-শতাংশ উদ্বেগ জানিয়েছে যে সীমান্তে বিরাজমান সংকট সশস্ত্র সংঘাতে পরিণত হতে পারে।
অভিবাসী সংকট তীব্রতা পাচ্ছে সেটি বোঝা যাচ্ছে এবং এই সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান না হলে যুদ্ধ প্রায় অনিবার্য বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।আর যুদ্ধ যদি সত্যিই বেঁধে যায়-সেক্ষেত্রে যুদ্ধটি”ইউরোপীয় ইউনিয়ন বনাম রাশিয়ার” মধ্যে বৃহত্তর যুদ্ধে পরিণত হতে পারে।কারণ পোল্যান্ড ইইউর সদস্যরাষ্ট্র হওয়ার সুবাদে ইইউ তার সদস্যরাষ্ট্রকে যেকোনো সংকটে সকলপ্রকার সহযোগিতা প্রদানে অঙ্গীকারবদ্ধ।অন্যদিকে বেলারুশের অকৃত্রিম বন্ধু হচ্ছে রাশিয়া এবং সেকারণে রাশিয়া বেলারুশকে তার একচেটিয়া স্বার্থ বিবেচনা করে।তাই বেলারুশের ক্ষতি হয় এমন যেকোনো সংকটে নিরব দর্শক হয়ে থাকবে না রাশিয়া।তাই বেলারুশের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কোনো পদক্ষেপ নিতে চাইলে বেলারুশের পাশে এসে দাঁড়াবে রাশিয়া-এটা নিশ্চিত।
পোল্যান্ড এবং ইইউ তো অভিবাসী সংকট সৃষ্টির পেছনে রাশিয়ার হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করে চলেছে।পোলিশ প্রধানমন্ত্রী মোরাউইকি সম্প্রতি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বলেছেন যে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন অভিবাসী সংকটের পেছনে-“মাস্টার মাইন্ড”হিসেবে ভূমিকা রাখছেন-যা ক্রেমলিন অস্বীকার করেছে।তবে লন্ডনভিত্তিক থিঙ্ক-ট্যান্ক চ্যাথাম হাউসের একজন সহযোগী ফেলো সামান্হা ডি বেন্ডারন বলেছেন-“নিঃসন্দেহে রাশিয়ার যোগসাজশ এবং অঘোষিত সমর্থন রয়েছে।”
অভিবাসী নিয়ে সৃষ্ট সীমান্ত সংকট-যা গোটা ইউরোপ ও রাশিয়াকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবার মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে তার পেছনের কারণ বেলারুশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ক্ষমতা বলেই মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।বেলারুশ কর্তৃত্ববাদী শাসনে শাসিত একটি দেশ এবং দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুকাশেন্কো ১৯৯৪-সাল থেকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করে আসছেন এবং ২০২০-সালে দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ষষ্ঠ বারের মতো প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হয়ে লুকাশেন্কো বিজয়ী হয়েছেন মর্মে ঘোষণা করেন।কিন্তু বিরোধী দলগুলো ওই নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তোলে।অর্গানাইজেশন ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড কো-অপারেশন ইন ইউরোপ এর পর্যবেক্ষকরা এটিকে সঠিক নির্বাচন হিসেবে গ্রহণ করেনি।যুক্তরাষ্ট্র,যুক্তরাজ্য,ইইউ,কানাডা ও তাদের মিত্ররা বেলারুশের ওই নির্বাচনকে অফিসিয়ালি স্বীকৃতি দেয়নি।লুকাশেন্কোকে বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে গ্রহণ করেনি ওই দেশগুলো।সংকটের উৎস এখানেই।
বেলারুশের জনগণ নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তোলে এর ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে লুকাশেন্কোর বিরুদ্ধে রাজপথে তীব্র গণ-আন্দোলন গড়ে তোলে।আন্দোলন দমনে সরকার কঠোর নির্যাতন ও নিপীড়নের আশ্রয় নেয়।প্রায় ত্রিশ হাজার বিরোধী রাজনীতিকদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায় বলে অভিযোগ আছে।বিরোধী দলগুলোর প্রতি সমর্থন জানিয়েছে ইইউ-বেলারুশ তাতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে-এর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার বিষয়টি ভাবতে থাকে।তাই বেলারুশের ওই রাজনৈতিক সংকট কেবল বেসামরিক নাগরিকদের অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়নের সাথে সম্পর্কিত নয়-সেটি রাষ্ট্রের সীমানা ছাড়িয়ে প্রতিবেশীদেশগুলোর ওপর প্রভাব ফেলছে।লুকাশেন্কোর স্বৈরাচারী শাসন ইইউ-এর অভ্যন্তরে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে এবং ইউক্রেনের মতো ইইউ মিত্রদের জন্য সত্যিকারের হুমকি সৃষ্টি করেছে বলে অভিযোগ এনেছে ইইউ।
কারচুপির নির্বাচন,স্বৈরাচারী শাসন এবং বিরোধী মত-পথের অনুসারীদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়নের কারণ দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বেলারুশের ওপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং এখন চতুর্থ দফায় ইইউ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
ইইউ কর্তৃক বেলারুশের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার জবাবে এবং মিনস্কের উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য ব্লকের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং নির্বাসিত বিরোধী দলীয় ব্যক্তিদের আশ্রয় দেওয়ার প্রতিবাদস্বরূপ ইইউর রাষ্ট্রগুলোকে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রতিশোধমূলক পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইইউ সদস্যরাষ্ট্র পোল্যান্ড,লিথুনিয়া এবং লাটভিয়া সীমান্তে একটি কৃত্রিম অভিবাসী ঢেউ ও সংকট তৈরি করেছে বেলারুশ সরকার।ওই অভিবাসীরা ইইউ ও বেলারুশের মধ্যে নতুনধরণের সংঘর্ষের ঘটনার কারণ ও অনিচ্ছাকৃত অস্ত্র-উভয়ই হয়ে উঠেছে-আর তাতে সমর্থন রয়েছে রাশিয়ার-অভিযোগ ইইউর।বেলারুশ সরকার ইইউ সদস্যরাষ্ট্রগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং ওই দেশগুলোতে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট ও কৃত্রিম বেকারত্বের আবহ তৈরি করে অস্থিতিশীল অবস্থার ক্ষেত্র প্রতিষ্ঠা ও সরকারগুলোকে বেকায়দায় ফেলে বেলারুশ তার দেশের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য ইইউ-কে বাধ্য করার লক্ষ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিবাসী পর্যটক ও শরণার্থীদের পোল্যান্ড,লিথুনিয়া ও লাটভিয়ার সীমান্ত দিয়ে ইইউর দেশগুলোতে পাচার করার উদ্যোগ নেয়।বেলারুশ তার দেশে বিদেশি নাগরিকদের জন্য পর্যটন ভিসা সহজীকরণ করে।ফলে ইরাক,সিরিয়া,আফগানিস্তান প্রভৃতি দেশ থেকে শত-শত শরণার্থী ও ইউরোপে অভিবাসী হতে ইচ্ছুক বিদেশি লোকেরা বেলারুশে এসে ভীড় জমায় এবং বেলারুশ প্রশাসনের সহযোগিতায় আশ্রয় প্রার্থীদেরকে সীমান্ত পেরিয়ে ইইউর দেশগুলোতে-বিশেষকরে পোল্যান্ড,লিথুনিয়া ও লাটভিয়ায় প্রবেশের সূযোগ করে দেয়।ইইউ কর্তৃপক্ষ বেলারুশের ওই উদ্যোগকে ২৭-দেশের ব্লকের বিরুদ্ধে”হাইব্রিড আক্রমণ”বলে অভিহিত করে বলেছে-লুকাশেন্কো ইইউর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে চায়।এক্ষেত্রে অভিবাসীরা মিনস্কের সংকর আক্রমণের একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
অভিবাসীদের প্রবেশ ঠেকাতে পোল্যান্ড সীমান্তে সেনাসংখ্যা বৃদ্ধি করেছে এবং অভিবাসী আশ্রয়প্রার্থীদের ওপর জলকামান ব্যবহার করেছে।একে কেন্দ্র করে পোল্যান্ড ও বেলারুশের মধ্যে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।ইইউ ব্লক পোল্যান্ড,লিথুনিয়া ও লাটভিয়ার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বেলারুশের মানবপাচার ও আগ্রাসন মোকাবেলায় সকলপ্রকার সহযোগিতা করার জন্য।পক্ষান্তরে রাশিয়া তার মিত্র বেলারুশ ও প্রেসিডেন্ট লুকাশেন্কোকে রক্ষার জন্য এগিয়ে এসেছে।রাশিয়া ও পুতিন চায় না কোনো অভ্যন্তরীণ বা বিদেশি শক্তির চাপে তার দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধু লুকাশেন্কো পদত্যাগ করুক বা ক্ষমতাহারা হোক।এমন ঘটনা রাশিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্হা ও ক্ষমতার অভিজাতদের স্থিতিশীলতার জন্য বাস্তব হুমকি সৃষ্টি করবে।রাশিয়ার উইংয়ের অধীনে বেলারুশের সংরক্ষণ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করে।তাই বিশ্লেষকরা বলছেন লুকাশেন্কোর জন্য রাশিয়া যুদ্ধে পর্যন্ত জড়াতে পারে।
বেলারুশ এবং পোল্যান্ডের মধ্যেকার সংকট রাজনৈতিক এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক।ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-কৌশলগত আধিপত্য বিস্তার এর লক্ষ। এর একদিকে আছে রাশিয়া-যে বেলারুশের মাধ্যমে ওই অঞ্চলে তার স্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় নিজের শক্তি প্রদর্শন করে ইইউ-কে বশে রাখতে চায়-যাতে ইইউ রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে না আসে।অন্যদিকে-নিজেদের ব্লকের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ ও নিরাপত্তার বিষয়টি দেখা ইইউর দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।এই ব্লকের সাথে রয়েছে ন্যাটো সামরিক জোট ও যুক্তরাষ্ট্র।এরূপ অবস্থায় যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে সেটি গোটা বিশ্বকেই প্রভাবিত করার আশংকা থাকে।কাজেই ওই সর্বনাশা পথে যেতে চাইবে না কোনো পক্ষই-সেটি বলা যায়।
লেখকঃরাজনৈতিক বিশ্লেষক।

