কাবুলে তালেবান ও ভূ-রাজনীতির মেরুকরণ

অ্যাডভোকেট আনসার খান :আফগানিস্তানে দুই দশক পরে আবারও তালেবানের রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসায় বিশ্বরাজনীতিতে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।তালেবানদের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া নিয়ে বৃহৎ ও অপরাপর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে।ভূ-রাজনীতি,বিশেষকরে,ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানে নতুন মেরুকরণের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।বিশেষত তালেবানের কাবুলের ক্ষমতায় ফিরে আসায় নতুন ভূ-রাজনৈতিক বিপদ ও নিরাপত্তা ঝুঁকির ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হয়।

আফগানিস্তান এখন শক্তিসম্পন্ন উদীয়মান এশিয়ান দেশগুলোর ক্ষমতার দ্বন্দ্বের জন্য-“গ্রেট গেইম”এর কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।কারণ,আফগানিস্তানে প্রতিযোগিতামূলক স্বার্থে বেশ কয়েকটি জাতির জন্য এবং এমনকি সমগ্র প্যান-এশিয়ান সম্পর্কের ক্ষেত্রে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠতে পারে।ইতোমধ্যেই চীন থেকে তুরস্ক পর্যন্ত আফগানিস্তানে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে।অন্যদিকে চীন-পাকিস্তান-তালেবান-এই তিনের মধ্যে সমঝোতার ইঙ্গিত ক্রমেই লক্ষণীয় হতে শুরু করেছে।ওই তিনে যদি জোট গড়ে তোলে তবে সেটা হবে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ-মনে করেন ভারতীয় নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।ওই বিশ্লেষকরা মনে করেন, একই সময়ে, যদি চীন আফগানিস্তানকে চীনের-বিআরআই ও সিপিইসি-তে অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয় এবং তার প্রাকৃতিক সম্পদ(আনুমানিক এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার)পুরোপুরি কাজে লাগাতে সক্ষম হয়,তাহলে ওই অঞ্চলে ভারতের কূটনৈতিক,রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব খর্ব হওয়ার আশংকা দেখা দিবে এবং ভারতকে ওই অঞ্চলে তার কূটনৈতিক প্রভাব থেকে বের করে দিবে।

ভারত এতোদিন মনে করে আসছিলো যে,তার বহু সারিবদ্ধতার তথা ভারসাম্যমূলক কূটনৈতিক কৌশল যুক্তরাষ্ট্র,রাশিয়া এবং চীনের সাথে যুগপৎ কৌশলগত অংশীদারিত্বের সম্পর্ক বজায় রাখায় বৃহৎ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিবর্তন থেকে ভারতকে রক্ষা করবে।কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে চীন থেকে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জগুলো ভারতের এই ধারণাকে দূর্বল করে দিয়েছে।এর ফলে ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝোঁকে পড়তে দেখা গেছে এবং ভারতকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বেশি পরিমাণে কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।

অন্যদিকে আফগানিস্তানের ক্ষমতার পালাবদলে তালেবানর ক্ষমতা দখল এবং ওই নতুন সরকারের সাথে চীনের সম্পর্ক জোরদারকরণের প্রচেষ্টা চীন-ভারত দ্বন্দ্ধকে আরও তীব্র করতে পারে।এছাড়া তালেবানদের সাথে রাশিয়ার সম্ভাব্য ঘনিষ্ট সম্পর্কের কারণে ভারত-রাশিয়ার মধ্যে অধিক পরিমাণে দূরত্ব সৃষ্টি করবে।কুড়ি বছর আগের তালেবান সরকারের ওপর ভারতের চিরবৈরী পাকিস্তানের প্রভাব ছিলো সর্বজনবিদিত এবং বর্তমান তালেবানদের সাথেও পাকিস্তানের প্রভাব ও সুসম্পর্ক চোখে পড়ার মতো এবং তালেবান-পাকিস্তান ঘনিষ্টতা ভারতের জন্য সত্যিই দুঃশ্চিতার বিষয় বলে অনুমান করা যায়।কাজেই এটা বলা যায় যে,চীন,রাশিয়া,পাকিস্তান ও তালেবানের মধ্যে সুসম্পর্ক সৃষ্টি হওয়ার প্রেক্ষিতে ভারতের জন্য অদূর ভবিষ্যতে একটি দুঃসময় অপেক্ষা করছে বলে বিশেষজ্ঞরা আশংকা প্রকাশ করছেন।অর্থাৎ কাবুলের তালেবান সরকারের ক্ষমতা লাভের কারণে ভূ-রাজনীতিতে একটা নতুন মেরুকরণের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে-যা ভারতের জন্য অনূকুল নয় বলেই মনে হচ্ছে।বরং নতুন এই মেরুকরণে ভারতের ব্যাপক ক্ষতির ক্ষেত্র তৈরি করবে এমনটা মনে করা হয়।

১.চীনের সাথে আফগানিস্তানের উষ্ণ সম্পর্ক যতোই বৃদ্ধি পাবে,ভারতের আফগানিস্তান সম্পর্ক ও এর অর্থনৈতিক বিনিয়োগ(যার পরিমাণ তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অধিক)ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্হ হওয়ার আশংকা করা হচ্ছে।২.চীনের সঙ্গে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ ও দ্বন্দ্ধ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ভারতের বৃহত্তর সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে বেইজিংয়ের সাথে ভারতের দ্বন্দ্ধ আরও গভীর হবে এবং আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক ভারত-রাশিয়ার ঐতিহ্যগত কৌশলগত অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে বড়ধরণের ফাটল দেখা দিতে পারে।৩.আফগানিস্তানের নতুন সরকারের সাথে চীন-রাশিয়া-পাকিস্তানের রাজনৈতিক,কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুসম্পর্ক তৈরি হওয়ায় ভারতের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ককে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।৪.তালেবানদের সহায়তায় ভারতের সীমান্তে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বৃদ্ধি পাওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে।

২০০১-সালে আফগানিস্তানে হস্তক্ষেপের পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত কাবুল সরকারের সাথে ভারতের অর্থনৈতিক,রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর হয়েছিলো।আফগানিস্তানে ভারতের অর্থনৈতিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছিলো এবং অন্যদিকে আফগানদের পক্ষ থেকে ভারত সীমান্তে সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডে মদদ দেওয়ার প্রবণতা হ্রাস পেয়েছিলো।নতুন করে তালেবানরা ক্ষমতায় আসায় তালেবান সন্ত্রাসীরা ভারতের সীমান্তে ও কাশ্মীরে জিহাদি-সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের প্রচার ও প্রসারের জন্য পাকিস্তানের অংশীদার হবে বলে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে।পলিটিক্যাল রিস্ক কনসালটেন্সি ইউরেশীয়া গ্রুপের বিশ্লেষকরা বলেছেন-“ভারত বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন কারণ শেষবার যখন তালেবানরা ক্ষমতায় ছিলো তখন তারা পাকিস্তানী সমর্থিত জঙ্গিদের সহযোগিতাসহ আফগান ভূমিতে তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছিলো।”নয়াদিল্লি তাই এখন উদ্বিগ্ন যে,”একটি শক্তিশালী পাকিস্তান তালেবানদের সমর্থনে ভারতে আঘাত করার সূযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে এবং এটা হলে ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে।”

ভারত মনে করে তালেবানদের সাথে পাকিস্তানের ঘনিষ্টতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্ক শীতল হবে এবং এটি ভারতের জন্য অনূকূল হবে।যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পাকিস্তানের চিরদিনের ঘনিষ্টতা এখন একেবারে উল্টো ও ভিন্ন পথে বিকশিত ও প্রবাহিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় ভারত পুলকিত হয়েছে এই ভেবে যে,এর ফলে ওয়াশিংটনের সাথে নয়াদিল্লীর কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও ঘনিষ্ট হবে।এমনটা হলে ভারতের আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা সংহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

বিশেষকরে,ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের অভিন্নতা থাকায় দুটি দেশের মধ্যে সম্পর্ক দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। দেশ দুটি মনে করে ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য চীন একটি নতুন চ্যালেঞ্জ এবং ওই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার লক্ষ্যে ওয়াশিংটনের কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অস্ট্রেলিয়া,ভারত ও জাপান-তিন দেশ নিয়ে -চতুর্ভুজ নিরাপত্তা কৌশলগত অংশীদারিত্ব”গড়ে তোলেছে এবং ওয়াশিংটনের কৌশলগত অগ্রাধিকারের তালিকায় নয়াদিল্লীকে একেবারে শীর্ষে রাখা হয়েছে।

ওয়াশিংটনের চতুর্ভুজ নিরাপত্তা কৌশলের বিপরীতে চীনও নানা কৌশল নিয়ে আগাচ্ছে এবং একারণে ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশ ভারতকে অন্যতম প্রতিপক্ষ হিসেবে গণ্য করছে চীন।এজন্য চীন-ভারত দ্বন্দ্ধ তীব্র হয়ে ওঠেছে।আফগানিস্তানে চীনের ভূমিকা তারই বহিঃপ্রকাশ। চীন-পাকিস্তান মৈত্রী এবং উভয় রাষ্ট্রের তালেবানদের প্রতি সমর্থন,সহযোগিতা ও উষ্ণতা বৃদ্ধির চেষ্টা তাই ভারতের জন্য একটি জাতীয় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠবে বলে মনে করা হয়।ওয়াশিংটন-নয়াদিল্লীকে দৃষ্টিতে রেখেই চীন আফগানিস্তানে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেছে।চীন তার বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ(বিআরআই) প্রকল্প আফগানিস্তানে সম্প্রসারিত করার উদ্যোগ নিয়েছে,যা ইসলামাবাদ ও কাবুল স্বাগত জানিয়েছে।এজন্যই ভারত অবশ্যই কাবুলে চীনের বৃহত্তর ভূমিকা নিয়ে উদ্বিগ্ন ও চিন্তিত।

যুক্তরাষ্ট্রের চতুর্ভুজ পরিকল্পনার জবাবে বেইজিং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওই অঞ্চলে তার অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব ক্রমাগত প্রসারিত করে চলেছে এবং নেপাল-বাংলাদেশ-শ্রীলংকা এখন চীনের প্রধান অংশীদার হয়ে ওঠেছে।মালদ্বীপ ও ভূটানের দিকেও হাত বাড়িয়েছে চীন এবং মিয়ানমার চীনের বগলেই আছে।এসব বিষয় নয়াদিল্লীর উদ্বেগের কারণ হয়েছে।এরমাঝে আবার আফগানিস্তানে একটি চীন-পাকিস্তান অংশীদারিত্বকে প্রকৃতপক্ষে নয়াদিল্লী তার সংবেদনশীল উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে গণ্য করছে।তাছাড়াও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেইজিংয়ের সাথে মস্কোর ক্রমবর্ধমান কৌশলগত অংশীদারিত্ব ভারতের জন্য সুখবর নয়।এই অংশীদারিত্ব এখন পাকিস্তান এবং তালেবানদের দিকে রাশিয়ার ঝোঁকের কারণে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।অন্যদিকে চীন বিআরআই এবং আসিয়ানের আরসিইপি বানিজ্য চুক্তির মাধ্যমে বেইজিংয়ের সাথে এশীয় সমুদ্র অর্থনীতির গভীর একীকরণের জন্য একটি কাঠামো তৈরি করেছে,যা ভারতের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলছে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে যে,আফগানিস্তানে তালেবানদের ক্ষমতায় ফিরে আসায় অত্রাঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে একটি মেরুকরণ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠেছে,যার আলামত ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।

 

লেখক: আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.