আমেরিকান প্রত্যাহার ও আফগানিস্তানের ভবিষ্যত

অ্যাডভোকেট আনসার খান :আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ও আলোড়ন হলো,দুইদশকের চলমান আফগান যুদ্ধের অবসান হতে চলেছে কোনোরূপ ফলাফল ছাড়াই।

এটি আমরা সবাই জানি,২০০১-সালের ১১-সেপ্টেম্বর আমেরিকার টুইনটাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীগোষ্ঠী”আল-কায়েদা”কে এই হামলার জন্য দায়ী বলে ঘোষণা করে আমেরিকান সরকার।দেশটি বিশ্বব্যবস্হা থেকে সন্ত্রাস নির্মূল করার অঙ্গীকারে শুরু করে-“সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ।”জোটবদ্ধভাবে সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা করার লক্ষ্যে এ যুদ্ধে শরীক হওয়ার জন্য বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোকে আহবান জানায়।বিশ্বের বহু রাষ্ট্র সারা দিয়ে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে।

সন্ত্রাসবিরোধী এই যুদ্ধের প্রধান টার্গেট করা হয় আফগানিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা আরেক সন্ত্রাসীগোষ্ঠী’তালেবান’সরকারকে।মোল্লা ওমরের নেতৃত্বাধীন তালেবান সরকার টুইনটাওয়ারে হামলার জন্য দায়ী আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীগোষ্ঠী আল-কায়েদার মূখ্য নেতা ওসামা বিন লাদেন ও তার সহযোগীদের আফগানিস্তানের মাটিতে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তোলে আমেরিকা সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের অংশ হিসেবে ২০০১-সালের সাত অক্টোবরে আফগানিস্তানে সামরিক হামলা শুরু করে আমেরিকা ও তার নেতৃত্বাধীন জোটের রাষ্ট্রগুলো।ন্যাটোজোটভুক্ত রাষ্ট্রগুলোসহ বিশ্বের ৪২-টি রাষ্ট্র এই সামরিক হামলায় অংশ নিয়েছিলো।হামলার প্রথম সপ্তাহেই মোল্লা ওমরের নেতৃত্বাধীন তালেবান সরকারের পতন ঘটেছিলো।তবে সম্পূর্ণ বিজয় নিশ্চিত হয়নি,কেননা তালেবান সন্ত্রাসীগোষ্ঠী প্রতিরোধ যুদ্ধ অব্যাহত রাখে।

দুইদশকের প্রান্তে এসে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ঘোষণা করেন তার দেশ ৩১-আগষ্ট ২০২১-সালের মধ্যে আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাবে।এভাবেই আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘস্হায়ী যুদ্ধের সমাপ্তি হতে চলেছে এবং ইতোমধ্যেই ন্যাটোজোটেরসহ আমেরিকান সেনারা আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়া শুরু করেছে।

দীর্ঘমেয়াদী এই যুদ্ধে আমেরিকার ব্যয় হয়েছে প্রায় ২.২ট্রিলিয়ন ডলার।কমপক্ষে ৭১৩৪৪ বেসামরিক লোক নিহত হয়েছে।আফগান ন্যাশনাল মিলিটারি ও পুলিশের ৭৮৩১৪ সদস্য, আমেরিকার ৬৩৮৪ সৈনিক এবং জোটের মিত্র ১১৪৪ সেনা,অন্যদিক বিরোধী পক্ষের প্রায় ৫১০০০যোদ্বা নিহত হয়েছে ওই যুদ্ধে।২০০৯ সাল থেকে ২০২০ সাল সময়কালে ৩৩৫২ মহিলা এবং ৮০৯৯ শিশু জীবন দিয়েছে ওই যুদ্ধে।(তথ্যসূত্রঃহিউম্যান এন্ড বাজেটারী কস্টস অব আফগান ওয়ার প্রজেক্ট,অক্টোবর,২০০১ হতে এপ্রিল, ২০২১,ব্রাউন ইউনিভার্সিটি)।

তবে এতো ত্যাগ ও জীবনদান,এতো ব্যয় এবং চল্লিশেরও অধিক রাষ্ট্রের অংশগ্রহণ অত্যাধুনিক সামরিক উচ্চ প্রযুক্তির সমরাস্ত্র ব্যবহার করেও দুই দশকের যুদ্ধ শেষে আমেরিকার ঝুড়িতে বিন লাদেনের লাশটা নিতে পারলেও কার্যত ঝুড়িটা একদম শূন্যই বলা যায়।তালেবান ও সন্ত্রাসী নির্মূল ও দমন করা সম্ভব হয়নি।বরং দোহায় তালেবানদের সাথে শান্তি আলোচনায় বসে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করে তালেবানদের এক প্রকারের বৈধতা ও অস্তিত্বের প্রতি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়ে দিয়েছে আমেরিকা এবং পশ্চিমা শক্তিগুলো।আমেরিকা ও এর মিত্ররা পরাজয়ের গ্লানি নিয়েই নিজ নিজ দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে।এটি ভবিষ্যতের শান্তিপূর্ণ বিশ্বব্যবস্হার জন্য স্হায়ী হুমকি হয়ে দেখা দিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

এখন সবকিছু চাপিয়ে মূখ্য আলোচনার বিষয় হয়ে দেখা দিয়েছে আমেরিকা ও তার মিত্ররা আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাবার পরে ওখানকার সার্বিক অবস্থাটা কী হতে পারে?এই আলোচনায় দুটি বিষয় সামনে চলে এসেছে।এক.তালেবানরা কী আফগানিস্তানের দখল নিয়ে আবারও রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসবে এবং দুই.তালেবানরা জিতে এসে সরকার গঠন করলে আফগানিস্তানের ভবিষ্যত কী হতে পারে?দুটি বিষয়ের সংক্ষিপ্ত উত্তর হতে পারে;হ্যা,তালেবানদের ক্ষমতায় আসার সমূহ সম্ভাবনা আছে এবং ওরা ক্ষমতায় এলে একটি অনির্দেশ্য এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সূচনা করবে বলে মনে করেন বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞজনেরা।

আমেরিকান প্রত্যাহারের ফলে কমপক্ষে দুটি কারণে তালেবানদের সামরিক শক্তি কিছুটা হলেও বৃদ্ধি পাবে। যেমন;১.বৈদেশিক সমর্থনে পরিচালিত রক্ষণাবেক্ষণ ও সহায়তা কার্যকারিতা ধীরে ধীরে বন্ধ হওয়ার দরুন আফগান সরকারি বাহিনীর প্রযুক্তিগত সুবিধা হ্রাস পাবে এবং ২.সরকারি বাহিনীর প্রধান দূর্বলতা বিদেশি তহবিলের উপর এর নির্ভরশীলতা ক্রমাগত ঝুঁকিতে পড়বে। এতে তালেবানরা সুবিধা পাবে।ফলে তালেবানরা রাষ্ট্র দখলে নিতে পারে।

কাবুল সরকারের মানসিক দূর্বলতা বেশ লক্ষণীয়।আমেরিকানরা কাবুল ছেড়ে চলে যাবে এমন ঘোষণার পর থেকেই কাবুল সরকারের নেতৃত্বের মধ্যে মানসিক চাপ বেড়েছে,সরকার মূখে প্রকাশ না করলেও তাদের মধ্যে দূর্বলতার লক্ষণ ফুটে ওঠেছে এবং তাদের সৈনিকদের মধ্যে তালেবানদের বিষয়ে ভয় দেখা দিয়েছে। সরকারের সেনাদের অনেকেই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছে। এতে করে তালেবান যোদ্ধাদের মধ্যে মনোবল, শক্তির ও সাহসিকতার সৃষ্টি হয়েছে।এছাড়াও আমেরিকার মতো একটি বিশ্বশক্তির সাথে তালেবানদের শান্তি আলোচনা ও চুক্তি স্বাক্ষরের ঘটনাও তাদের মধ্যে ভবিষ্যতের বিজয় সম্পর্কে আশাবাদ জাগ্রত হয়েছে।যুদ্ধের মাঠে যোদ্ধাদের উচ্চ মনোবল জয় ছিনিয়ে আনতে প্রেরণা জোগায় এটা জানা কথা।

কাবুল সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভয়টা হলো যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ব্যয় নির্বাহ নিয়ে। আমেরিকাসহ বিদেশিরা চলে গেলে অর্থ সংকটের আশংকা করছে সরকার।আমেরিকা যুদ্ধের বিরাট একটি অংশ ব্যয় করেছে।অন্যান্য মিত্রদেশগুলো থেকেও অর্থ আসতো।ওরা চলে গেলে অর্থ আসাও বন্ধ হয়ে যেতে পারে এমন আশংকা করছে কাবুল সরকার।

তালেবানদের আর্থিক কোনো সংকট নেই বলে মনে করেন যুদ্ধ বিষয়ে খোঁজখবর রাখেন এমন বিশ্লেষকরা।তালেবানরা যুদ্ধ ব্যয়ের যোগান আফগানিস্তানের বাইরে থেকে পেয়ে থাকলেও দেশীয় উৎসই তাদের প্রধান অবলম্বন।মাদক ব্যবসা,চাঁদাবাজি,মুক্তিপণ আদায় করা,লুটপাট করা ইত্যাদি নানা সূত্র থেকে ওরা প্রচুর পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করে থাকে।তবে তাদের বার্ষিক আয়ের পরিমাণ নিয়ে মতান্তর আছে।জাতিসংঘের কর্মকর্তা,কাবুল সরকার ও অন্যান্য কিছু স্বাধীন সংস্থার সূত্র অনুমান করেন যে,তাদের সম্পদের বার্ষিক আয় প্রায় তিনশো মিলিয়ন ডলার থেকে এক দশমিক চার বিলিয়ন মার্কিন ডলার হতে পারে।আর মার্কিন সরকার মনে করে এই আয়ের ষাট শতাংশই আসে মাদক বানিজ্য থেকে। তবে কিছু কিছু সূত্র দাবি করে,তাদের আয়ের সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য উৎস হলো অবৈধ খনন,যেমন;মূল্যবান পাথর, ট্যালক,অবৈধ বিরল পৃথিবীর খনিজ ইত্যাদি। তালেবানদের নিজস্ব স্টোনস এবং মাইন কমিশন জানিয়েছে ওই খনি থেকে বছরে প্রায় চারশো মিলিয়ন ডলার আয় করে থাকে,যা দিয়ে তালেবানরা তাদের যুদ্ধ ব্যয় মিটিয়ে থাকে। অন্যান্য উৎস থেকে আয়কৃত অর্থ মজুদ থাকে জরুরি ব্যয় মেটানোর জন্য।

আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি ছাড়াও যুদ্ধের রণাঙ্গনেও তালেবানরা ভালো অবস্থানে আছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।বিশেষকরে,আমেরিকা ও মিত্রদের আফগান থেকে প্রত্যাহারের ফলে যুদ্ধের ময়দানে শক্তির ভারসাম্যকে তালেবানদের পক্ষে নিয়ে আসার সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থার এক পর্যবেক্ষণের উদ্বৃতি দিয়ে দ্য ওয়ার্ল্ড স্ট্রিট জার্নাল শংকা প্রকাশ করে লিখেছে,-কাবুল সরকার ছয় মাসের মধ্যে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে যেতে পারে।প্রেসিডেন্ট বাইডেন থেকে সর্বোচ্চ সেনা কমান্ডার জেনারেল অস্টিন মিলার পর্যন্ত আমেরিকান কোনোও নেতাই কাবুল সরকারের অস্তিত্ব টিকে থাকার বিষয়ে নিশ্চিত নন।

ব্রুকিংস ইন্সটিটিউটের থিঙ্ক ট্যান্কের সহযোগী এবং আফগান অঞ্চলের বিশেষজ্ঞ মাদিহা আফজাল আশংকা করেন যে,প্রত্যাহারের সাথে সাথে তালেবান ও কাবুল সরকারের মধ্যে কোনো শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর না হলে সবচেয়ে সম্ভবত পরিণতি হবে গৃহযুদ্ধ,যা একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হতে পারে।এতে হয়তো আফগানিস্তান দ্বিখণ্ডিত হতে পারে,যার একটি অংশ তালেবান অঞ্চল এবং অপর অংশ সম্ভবত আমেরিকার সমর্থনপুষ্ঠ সরকার দ্বারা শাসিত হতে পারে।

অবশ্য কেউ কেউ মনে করেন পাকিস্তান,রাশিয়া,ইরান,চীন ও আল-কায়দার মতো সন্ত্রাসীগোষ্ঠীগুলোর ক্রমাগত সমর্থন নিয়ে শেষপর্যন্ত কাবুল সরকারকে উৎখাত করে তালেবানরা ক্ষমতায় চলে আসতে পারে।

পরিস্থিতি হয়তো এমন নাও হতে পারে। তালেবানরা কাবুলের ক্ষমতায় আসুক এটি আমেরিকা ও পশ্চিমা শক্তি কখনো মেনে নিবে বলে মনে হয় না।কারণ তালেবান ক্ষমতায় এলে শুধু আফগানিস্তানের জন্য নয়,বরং সম্পূর্ণ রিজিওন,এমনকি সারা বিশ্বের জন্য বিপদজনক হয়ে দেখা দিতে পারে বলে মনে করেন সন্ত্রাস নিয়ে গবেষণা করেন এমনসব বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।আমেরিকাও তাই মনে করে।কাজেই তালেবান টেকাতে নিশ্চয়ই বিকল্প কিছু একটা ভাববে আমেরিকা ও কাবুল সরকার। সেক্ষেত্রে গৃহযুদ্ধের আশংকা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

লেখক: আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.